শুক্রবার, ৮ জানুয়ারী, ২০২১

আধুনিক শিক্ষা ভাবনায় খুজিস্তা আকতার বানু

খুজিস্তা আকতার বানু


ডা.শামসুল হক 


      কজন মুসলিম মহিলা হিসেবে তো বটেই, এই উপমহাদেশের প্রথম মহিলা হিসেবে খুজিস্তা আকতার বানু কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তর বিভাগের প্রথম পরীক্ষক হিসেবে নিয়োগপত্র পেয়েছিলেন। আবার তিনিই হলেন ভারতীয় মুসলিম মহিলাদের মধ্যে প্রথম, যিনি কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও বিশেষ ডিগ্রি অর্জন করে দেশের মুখ উজ্জ্বল করেছিলেন।

        সেই সময় মুসলমান সমাজের মেয়েরা শিক্ষাদীক্ষা বা অন্যান্য বিষয়ে এতটাই পিছিয়ে পড়েছিলেন যে, সেটা ভীষণভাবে ভাবিয়ে তুলেছিল আকতার বানুকে। যদিও সেই সময় অন্যান্য সমাজের মেয়েরাও সেই ব্যাপারে খুব বেশি এগিয়ে ছিলেন তা নিশ্চয়ই নয়, কিন্তু তবুও তাঁদের মধ্যে যেটুকু অগ্রগতি দেখা গিয়েছিল মুসলিম মহিলাদের মধ্যে সেটুকুও দেখা যায়নি। আর সেই জন্যই তাঁদের জন্য এগিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছিলেন তিনি।  

        বেগম রোকেয়ার মতো মুসলিম মহিলারা অবশ্য শিক্ষার প্রসারের জন্য প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। রোকেয়ার সঙ্গে সহযোগিতা করছিলেন তাঁর স্বামী সাখাওয়াত হোসেন সাহেব এবং অন্যান্য অনেকেই। কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় তাঁদের সেই সংগ্রাম তেমন একটা উচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়নি বলেই আকতার বানুও এগিয়ে এসেছিলেন সংগ্রাম দীর্ঘজীবী হোক সেই আশা নিয়েই। 

        বেগম রোকেয়া কলকাতার বুকে স্কুল প্রতিষ্ঠার বছর দুয়েক আগেই আকতার বানু স্থাপন করেছিলেন নিজের স্কুলটি। অবশ্য রোকেয়া সাহেবার স্কুলটি ভাগলপুরে চলছিল বেশ ভালোভাবেই। কলকাতাতেও তেমন একটা শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান স্থাপনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেই ১৯১১ সালে তিনি সেটি স্থাপন করেন। আর আকতার বানু তালতলার ওলিওল্লাহ লেনে মেয়েদের জন্য স্কুল খোলেন ১৯০৯ সালে। 

        তালতলার সেই স্কুলটি চার বছর চলার পর ১৯১৩ সালে তা স্থানান্তরিত করা হয় মির্জা গালিব স্ট্রিটে। সেই স্কুলের তখন নতুন নামকরণ করা হয় সোহরাওয়ার্দী বেগম মুসলিম গার্লস হাইস্কুল। সেই সময় বিখ্যাত শিক্ষানুরাগী লেডি মিন্টো সেই স্কুলের দ্বার উদ্ঘাটন করেন। সেই স্কুলে তখন ইসলামি ঐতিহ্যের সঙ্গে বাংলা, সংস্কৃত এবং ইংরেজি শিক্ষাও দেওয়া হত।

       নিজের ছাত্রজীবনে তিনি নিজে যেসব প্রতিবন্ধকতার শিকার হয়েছিলেন তা ভুলতে পারেননি কিছুতেই। তাই তিনি চেয়েছিলেন আগে নিজে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে উঠুন, তারপর ভাববেন অন্য মেয়েদের সমস্যার কথা।

        তাঁর শিক্ষাজীবন শুরু হয় হুগলি শহরে। সেই সময় হুগলি মাদ্রাসা ছিল স্থানীয় এলাকার শিক্ষার মূল প্রাণকেন্দ্র। মাদ্রাসা হলেও সেই শিক্ষালয়টি ছিল হিন্দু-মুসলিম সকল ছাত্রদের জন্য আদর্শ এক প্রতিষ্ঠান। অবশ্য সেখানে মেয়েদের কোনও প্রবেশাধিকার ছিল না বলেই মেয়েরা পিছিয়ে পড়েছিলেন ভীষণভাবেই।

         মাদ্রাসার পাশেই অবশ্য ছিল একটা মিশনারি স্কুল। সেখানে অনেক চেষ্টার পর মেয়েদের লেখাপড়ার সুযোগ এলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় নিশ্চয়ই কম ছিল। তবে আকতার বানু আক্তার বানু সেই স্কুলে স্থান পেয়েছিলেন নিজের যোগ্যতাতেই।

মুসলিম মহিলাদের শিক্ষা বিস্তারের জন্য আজীবন সংগ্রাম চালিয়েছিলেন আক্তার বানু। আর সেজন্য তিনি যা কিছু করেছিলেন, তা সম্পূর্ণ নিজেরই সিদ্ধান্তে এবং নিজের মনের উপর অসামান্য নিয়ন্ত্রণকে ভরসা করেই। কারণ তিনি ছিলেন বর্ধিষ্ণু এক মুসলিম পরিবারের কন্যা এবং তাঁকে বেড়েও উঠতে হয়েছিল অতি রক্ষণশীল এক বন্ধনের মধ্যে বন্দি থেকেই। কিন্তু তবুও তার মধ্যেই কিছু ফাঁকফোকর খুঁজেই তিনি বেরিয়ে আসেন বাইরের জগতেই। আর সেটা সম্ভব হতো শুধুমাত্র তাঁর পিতা তাঁর সহায় ছিলেন বলেই। তিনি নিজেও শিক্ষক ছিলেন। শিক্ষাকে ভালোও বাসতেন। তিনিও চাইতেন তাঁর মেয়ে উচ্চশিক্ষার সুযোগ পাক। তাই মেয়েকে ততটুকু স্বাধীনতা দেওয়া সম্ভব, তা দিতেই চেষ্টা করেছিলেন তিনি। 

     আকতার বানুর জন্ম ১৮৭৩ সালে হুগলিতে। তাঁর পূর্ব-পূরুষরা ছিলেন বিখ্যাত সোহরাওয়ার্দী বংশের সন্তান। তাঁরা ভারতের স্থায়ী নাগরিক ছিলেন না। ইরাক থেকে তাঁরা প্রথমে চলে আসেন মেদিনীপুরে। তারপর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে যান অন্যত্র। আক্তার বানুর বাবা চলে আসেন হুগলিতে। সেখানেই কলেজে অধ্যাপনার কাজ নেন তিনি। 

        কলকাতা হাইকোর্টের বিখ্যাত ব্যারিস্টার রহিম জাইদির সঙ্গে বিয়ে হয় তাঁর। তাঁর স্বামীও ছিলেন সোহরাওয়ার্দী বংশের সন্তান। তাই পিতৃকূল এবং শ্বশুরকূল, তাঁর সব দিকটাই ছিল আভিজাত্যের মোড়কে অতি নিপুণভাবেই মোড়া। কিন্তু তবুও নিজ সিদ্ধান্তে অটল থেকেই তিনি কাজ করেছিলেন অসহায় মেয়েদের জন্যই।

          সমাজসেবামূলক অনেক কাজেই নিজেকে ব্যস্ত রাখতে চাইতেন তিনি। পাশাপাশি নিজের শিক্ষার সম্প্রসারণের চেষ্টাও ছিল তাঁর মধ্যে। তাই তো ভারত সরকারের এগজামিনেশন বোর্ডের তরফ থেকে তিনি পেয়েছিলেন অতি সন্মানজনক পদবি ডিগ্রি অব অনার্স। তিনি প্রমাণ করে দিয়েছিলেন যে, প্রচেষ্টা যদি সৎ হয় এবং নিজের যোগ্যতা যদি ঠিকভাবে প্রয়োগ করা যায়, তাহলে সব কাজে সফলতা মিলবেই মিলবে। তখন ধর্ম বা প্রতিবন্ধকতার কাছে সাম্প্রদায়িকতাও হার মানবে নিশ্চিতভাবেই।

কোনও ধর্ম বা ধর্মীয় পরিমণ্ডলের যে-কোনও শ্রেণির মানুষকে তিনি কোনওভাবেই দেখেননি অশ্রদ্ধার চোখে। দরিদ্র শ্রেণির মানুষগুলোর সমস্যার কথাও তিনি শুনতেও অতি আন্তরিকতার সঙ্গেই। ছিল মেয়েদের স্বাস্থ্য রক্ষার প্রতিও তীক্ষ্ণ নজর। মেয়েরা যাতে সবসময় সঠিক চিকিৎসা পায়, তার জন্য যোগাযোগ রাখতেন লেডি ডাফরিনের সঙ্গেও।

          মেয়েদের কল্যাণের জন্য অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছিলেন আকতার বানু। কিন্তু খুব বেশি দিনের আয়ু নিয়ে তিনি এই পৃথিবীতে আসেননি। ১৯১৯ সালে কলকাতার অতি নোংরা কয়েকটি বস্তিতে বাড়ে কলেরার প্রকোপ। একটা সময় তা আবার মহামারির রুপ নেয়। তখন আর স্থির থাকা সম্ভব হয়নি তাঁর পক্ষে। ছুটে আসেন সেইসব বস্তিগুলোতে। সেখানে চিকিৎসকের পাশাপাশি আক্রান্ত মানুষদের সেবার দায়িত্বটুকুও তুলে নেন নিজের কাঁধেই। কিন্তু একনাগাড়ে রোগীদের সেবা করতে করতেই তিনিও আক্রান্ত হয়ে যান সেই রোগেই। 

       তাঁকে সুস্থ করে তোলার প্রাণপণ চেষ্টা করেন চিকিৎসকরা। কিন্তু বাঁচানো যায়নি তাঁকে। মাত্র পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সেই নিজেকে সংহার করেই নিজের জীবনের উপসংহার রচনা করেছিলেন সমাজসেবী খুজিস্তা আকতার বানু। 



(লেখক জুপিটার ফার্মাসিউটিক্যালসের আয়ুর্বেদ বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত গবেষক এবং প্রাবন্ধিক)

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only