মঙ্গলবার, ১২ জানুয়ারী, ২০২১

ভিনধর্মে বিয়ে,হোটেলে ঘর পেল না দম্পতি,নিন্দায় সরব মানবাধিকার কর্মীরা



পুবের কলম প্রতিবেদক­:প্রেম,ভালোবাসা কিংবা বৈবাহিক সম্পর্ক মানে কোনও জাতি-ধর্মের বিভেদ রেখা। লিঙ্গ ও বর্ণের অর্গল ভেঙে দু’জন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির সহমতে গড়ে ওঠে সর্ম্পক। দেশ-কাল সীমানার ভেদ মুছে আন্তর্জাতিকভাবে মানুষের অধিকারের অঙ্গ হিসাবে স্বীকৃত হয়েছে আন্তঃধর্ম বিবাহের অধিকার। স্বাধীন ভারতের সরকারও আন্তঃবর্ণ ও আন্তঃধর্ম বিবাহের সেই অধিকারকে স্বীকৃতি দিয়েছে। ১৯৫৪ সালে দেশের সংসদে পাস হয়েছে ‘স্পেশাল ম্যারেজ অ্যাক্ট’। কিন্তু আরএসএস ও বিজেপি ‘লাভ জিহাদ’-এর নামে দু’জন প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকারকে কেড়ে নিতে চাইছে। দেশের কয়েকটি প্রদেশে আইন বা অর্ডিন্যান্স এনে আন্তঃধর্ম বিবাহ নিষিদ্ধ করতে উঠেপড়ে লেগেছে। শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে এগিয়ে থাকা বাংলার বুকেই এবার ভিনধর্ম বিবাহিত হওয়ায় এক দম্পতি বেসরকারি লজে পেল না ঘর। রবিবার ঘটে যাওয়া এমনই ঘটনার প্রেক্ষিতে সরব হয়েছেন মানবাধিকার কর্মীরা।

একজনের নাম তৌসিফ হক। অন্যজন জয়ন্তী বিশ্বাস। তাঁরা স্বামী-স্ত্রী হলে টাইটেল  বা পদবি কেন আলাদা? স্রেফ এই কারণেই বিবাহের নথি দেখিয়েও ঘর না দেওয়ার অভিযোগ উঠে এক বেসরকারি লজ কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে। রবিবারের এই ঘটনা সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজেই তুলে ধরেছেন পেশায় চিত্রশিল্পী বর্ধমানের বাসিন্দা তৌসিফ হক।

প্রসঙ্গত, এক পরিচিত দাদার আমন্ত্রণে স্ত্রীকে নিয়ে হুগলিতে পিকনিক করতে যান তৌসিফ হক। কিন্তু আচমকা তাঁর স্ত্রী জয়ন্তী অসুস্থ হয়ে পড়েন। ফলে বাড়ি ফেরার কথা থাকলেও পরিস্থিতি দেখে তা বাতিল করেন তিনি। তাঁরা হুগলির চুঁচুড়ায় থাকার মনোস্থির করেন। তৌসিফ ও তাঁর স্ত্রী চুঁচুড়ার গোবিন্দনগরের সুলেখা লজে যান। শিল্পীর অভিযোগ, লজ কর্তৃপক্ষ তাঁদের দু’জনের নামের পদবি কেন ভিন্ন, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। শুধু তাই নয়, তাঁদের ঘর দিতে অস্বীকার করার পাশাপাশি তর্কাতর্কিও করে বলে অভিযোগ। তৌসিফ হক জানান,স্পেশাল ম্যারেজ অ্যাক্টে তাঁরা বিয়ে করেছেন এবং ভারত সরকার প্রদত্ত বিয়ের সার্টিফিকেটও দেখানো হয়। বিয়ের ছবিও দেখানো হয়েছিল, তারপরও লজ কর্তৃপক্ষ তাঁদের ঘরভাড়া দিতে অস্বীকার করে। তাঁদের বিয়ের সার্টিফিকেট নাকি বৈধ নয়, তাঁরা মানেন না বলেই দাবি করে লজ কর্তৃপক্ষ। যদিও লজ কর্তৃপক্ষ সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তাঁদের অভিযোগ, ওই যুগল বিয়ের কোনও নথি দেখাতে রাজি হননি। সুলেখা লজের অন্যতম মালিক প্রদীপ রায়ের দাবি,ওঁরা থাকার জন্য এসেছিলেন ঠিকই। কিন্তু স্বামী-স্ত্রী দুই ধর্মের হওয়ায় আমাদের সন্দেহ হয়। আমরা তাঁদের বৈধ নথি দেখতে চাই। উনি হোয়াটসঅ্যাপে বিয়ের ছবি দেখিয়েছিলেন। কিন্তু আমাদের সন্দেহ কাটেনি।’


এ দিকে ঘটনার নিন্দায় সরব হয়েছেন বিভিন্ন নাগরিক সংগঠনের নেতৃত্ব ও মানবাধিকার কর্মীরা। অধ্যাপক সুজাত ভদ্র বলেন,ভিনধর্মে বিয়ের আইন আছে। বিয়ের পর টাইটেল আলাদা করতে হবে এমন কোনও কথা নয়। এমনকী অবিবাহিত হলেও হোটেলে ঘর পাওয়া মানুষের অধিকার। কড়া নিন্দা জানাচ্ছি। প্রশাসনের উচিত আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া। বাংলা সংস্কৃতি মঞ্চের সম্পাদক তন্ময় ঘোষ বলেন,বিহার-উত্তরপ্রদেশের কালচার রাজ্যে আমদানি করার মতো ঘটনা। এখনই ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি খারাপ হবে। প্রেম-ভালোবাসা ও বিয়ে দু’জন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির ইচ্ছাতেই হয়। ফলে অন্যদের নাক গলানোর অধিকার নেই। বন্দিমুক্তি কমিটির সম্পাদক ছোটন দাস বলেন, কে কার সঙ্গে থাকবে বা বিবাহ করবে তা একান্তই নিজস্ব ব্যাপার। ফলে বিবাহিত দম্পতি প্রমাণ করার জন্য সার্টিফিকেট নিয়ে ঘুরতে হবে তা কোথাও শুনিনি। পদবি নিয়েও যে আপত্তি তোলা হয়েছে,তার নিন্দা জানাচ্ছি। প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ দরকার। মানবাধিকার সংগঠন এপিডিআর-এর রাজ্য নেতা রঞ্জিৎ শূর বলেন,লজ মালিককে অবিলম্বে গ্রেফতার করা উচিৎ। কেন-না, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হলে এই ধরনের ঘটনা বাড়বে। বিজেপি নেতাদের সাম্প্রতিকালের কাজকর্মের জন্য এমন মানসিকতা ভেতরে ভেতরে বাড়ছে,তৌসিফের সঙ্গে যা হয়েছে সেটা তারই বহির্প্রকাশ।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only