মঙ্গলবার, ১২ জানুয়ারী, ২০২১

স্বামীজি ভারতের এক অন্তরাত্মা, বুঝল না কেউ



বিশেষ প্রতিবেদনঃসার্ধ শতবর্ষ অতিক্রম করে মানুষ তাঁর মানবিক ভাবনার প্রতি উদাসীন হননি। আজও তিনি আমাদের হৃদয় জেগে আছেন ধর্মের উর্দ্ধে একজন মানুষ হিসেবে। আজ ১২ জানুয়ারি,যুব দিবস।  কাশ্মীর থেকে কন্যা কুমারী তাঁকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছে। মাত্র ৩৯ বছর বয়সে তিনি দেহত্যাগ করেন। আজও তিনি যুবসমাজের আইকন। বিবেক কথায় সাকিল আহমেদ।

সাকিল আহমেদ


নদীর ঢেউ কজন বোঝে? ক’জন খোঁজে উৎসের স্রোতধারা? উৎসব মুখর বাঙালি জাতি সময় সুযোগ পেলে উৎসবে মেতে উঠে। রক্তদান এক জীবন দান। সেই রক্তদান আজ উৎসবে পরিণত হয়েছে। উৎসাহী মানুষ উৎসাহ দেখিয়ে জীবন বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়াচ্ছেন। তাই উৎসব। 

আজ ভারত পথিক স্বামী বিবেকানন্দের জন্মদিন। জন্মোৎসব। ১২ জানুয়ারি,স্বামীজির জন্মদিন। দেখতে দেখতে সার্ধ শতবর্ষ অতিক্রম করেছে। তবুও তিনি দেশ ও জাতির প্রেরণা। সারা বাংলা এই দিনটি ‘যুব দিবস’ পালন করে তাঁকে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। একজন ভারতীয় সন্ন্যাসীর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের কী বা আছে আর কী নেই সেটাই বিষয়। 

যোগী আদিত্যনাথ তিনিও সন্ন্যাসী, অন্তত তাঁর নামটা শুনলে তাই মনে হয়। তিনি এখন একজন রাজনীতিবিদ। মানুষে-মানুষে ভেদাভেদ, নানা আইন চাপিয়ে দেশকে অন্য বিপদের দিকে ঠেলে দিচ্ছেন। তখন আমার আলোচনা আর এক সন্যাসীকে নিয়ে, শ্রদ্ধায় ভক্তিতে দেশের কঠিনতম পরিস্থিতিতে তাঁর বাণী আমাদের পথ দেখাতে পারে। আমাদের মিলন মহান অন্তরাত্মাকে বিবেকবান করে তুলতে পারে।

আমরা যখন দিশেহারা,সঙ্কট যখন অক্টোপাসের মতো আঁকড়ে ধরছে। স্বামী বিবেকানন্দ এবং তাঁর জীবন ও বাণী আমাদের মুক্তির উপায় বাতলে দিতে পারে।

স্বামী বিবেকানন্দ বলছেন,আমাদের দেশের মস্তিষ্ক হোক বৈদান্তিক,শাসন হোক ইসলামিক। অর্থাৎ ধর্মের নামে ধর্মের কোনও ভেদাভেদ নয়,বৈদান্তিক শিক্ষার ভিতর গড়ে উঠুক জীবন,আত্মা।

ভারত আত্মা। আত্মনির্ভর শক্তির আত্মা। আর ইসলামিক শাসন। যে শাসনের ভিতর কোনও শোষণের কথা নেই,ধনী-দরিদ্রের কোনও ভেদাভেদ নেই, শ্রমিকের ঘাম শুকনোর আগে মজুরি মিটিয়ে দেওয়ার কথা বলে,ধর্ষককে পাথর ছুঁড়ে মারার কথা বলে ও মানব প্রেমের কথা বলে, সেই শাসন দেশে জরুরি। শ্রমিক,মেহনতি মানুষ পাক তার শ্রমের মূল্য, ঘামের দাম।

স্বামী বিবেকানন্দকে আমরা স্মরণ করব তাঁর ধর্মীয় উদারতার কথা দিয়ে। তাঁর মানবপ্রেমিক বক্তব্য দিয়ে। তাঁর মানব-প্রেম ও পড়শি-প্রেম দিয়ে। শ্রদ্ধা দিয়ে।

মহামুক্তিকামী লালন যেখানে বলছেন, মানুষ ধর। মানুষকে ভালোবাসা সেতো ঈশ্বরকে ভালোবাসা। স্বামীজি বলছেন, ‘জীবে প্রেম করে যেইজন, সেইজন সেবিছে ঈশ্বর।’ অর্থাৎ জীবের বা জীবনের ভালোবাসা। ভারতের মাটি-মানুষকে ভালোবাসা। তাঁর ধর্মগুরু ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ বলছেনঃ ‘যত মত তত পথ।’ একটা পুকুরের যেমন স্নানের ঘাট ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু সবার উদ্যেশ্য যেখানে স্নান করা, সে যে মতবাদের হোন না কেন,মানুষকে ভালোবাসতে পারলে ঈশ্বর, আল্লাহ্কে পাওয়া যায়। কাজী নজরুল ইসলাম বলছেনঃ‘ও কারা বেদ বাইবেল চুম্বিছে মরি মরি... মানুষ এনেছে গ্রন্থ,গ্রন্থ আনেনি মানুষ কোনো।’ ধর্মের রীতি নীতি অনুশাসন আলাদা হলেও মানুষের ভালোবাসাকে অস্বীকার করা যাবে না।

বেদ বলছে,‘ধর্ম ধারয়তি প্রজা।’ ধর্ম যা প্রজাকে ধারণ করে। জলের ধর্ম যেমন উপর থেকে নীচে গড়িয়ে পড়া,মানুষের ধর্ম হোক সত্যের দিকে ঝুঁকে পড়া।

আল কুরআন বলছেঃ‘তোমার ধর্ম তোমার কাছে,আমার ধর্ম আমার কাছে।’

স্বামী বিবেকানন্দ যেন এই সব মহান বাণীর উত্তর সাধক। তিনি বলছেনঃ‘আলো নিয়ে এসো প্রত্যেকের কাছে, আলো নিয়ে এসো। দরিদ্রের কাছে,ধনীর কাছে,এভাবে সবার কাছে আলো নিয়ে এসো।’

তিনি তাঁর আত্মশক্তি জাগ্রত করে বলছেন,‘আমাদের ভিতরে অনন্ত শক্তি,অপার জ্ঞান,অদম্য উৎসাহ আছে। আগে আপনার ভেতর অন্তর্নিহিত আত্মশক্তিকে জাগ্রত কর,তারপর দেশের ইতর সাধারণ সকলের ভেতর যতটা পারিস ওই শক্তিতে বিশ্বাস জাগ্রত করে প্রথমে অন্ন সংস্থান,পরে ধর্মলাভ করতে তাদের শেখা। এদের শরীরে বল নেই, হ্রদয়ে উৎসাহ নেই, মস্তিষ্কে প্রতিভা নেই,কী হবে রে জড়পিণ্ড গুলো দ্বারা? আমি নেড়েচেড়ে এদের ভিতর সাড় আনতে চাই, এজন্য আমার প্রাণান্ত পণ। এসব কথা যিনি বলেন তিনি সাধারণ আর পাঁচটা যোগীর মতো নন।

তিনি বলছেন,‘যতদিন ভারতের কোটি কোটি লোক দারিদ্র ও অজ্ঞানতার অন্ধকারে ডুবে রয়েছে,ততদিন তাদের পয়সায় শিক্ষিত যারা তাদের দিকে চেয়েও দেখছে না,তাদের প্রত্যেক ব্যক্তিকে আমি দেশদ্রোহী বলে মনে করি।’

স্বামীজি কোনও ধর্ম বা ধর্মমতকে ছোট করে দেখেননি। তিনি বলেন,‘অতীতে যত ধর্ম সম্প্রদায় ছিল,আমি সবগুলোই সত্য বলিয়া মানি এবং তাহাদের সকলের সহিতই উপাসনায় যোগদান করি। প্রত্যেক সম্প্রদায় যেভাবে ঈশ্বরের আরাধনা করে,আমি তাহাদের প্রত্যেকের সহিত ঠিক সেইভাবে তাঁহার আরাধনা করি। আমি মুসলমানদিগের মসজিদে যাইব, খ্রিস্টানদিগের গির্জায় প্রবেশ করিয়া ক্রুশবিদ্ধ ঈশার সম্মুখে নতজানু হইব,বৌদ্ধদিগের বিহারে প্রবেশ করিয়া বুদ্ধের ও তাঁহার ধর্মের শরণ লইব, এবং অরণ্যে গমণ করিয়া সেই সব হিন্দুর পার্শ্বে ধ্যানে মগ্ন হইব, যাঁহারা সকলে হ্রদয় কন্দর উদ্ভাসনকারী জ্যোতির দর্শনে সচেষ্ট শুধু তাহাই নয়, ভবিষ্যতে যে সকল ধর্ম আসিতে পারে তাহাদের জন্যও আমার হ্রদয় উন্মুক্ত রাখিব।’

সারাজীবন তিনি তাঁর হ্রদয় উন্মুক্ত রেখেছিলেন। সার্ধ শতবর্ষ অতিক্রম করে মানুষ তাঁর মানবিক ভাবনার প্রতি উদাসীন হননি। আজও তিনি আমাদের হ্রদয়ে জেগে আছেন ধর্মের উর্দ্ধে একজন মানুষ হিসেবে। ১২ জানুয়ারি যুব দিবস।  কাশ্মীর থেকে কন্যা কুমারী তাঁকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছে। মাত্র ৩৯ বছর বয়সে তিনি দেহত্যাগ করেন। আজও তিনি যুবসমাজের আইকন।

তিনি বলেছিলেন,‘যুবরা,গীতা না পড়ে ফুটবল খেলো। সুস্থ শরীর গঠন না করতে পারলে যুব সমাজের মুক্তি নেই।’ ১৩০ কোটির দেশ ভারত। আজও আমরা একটা পেলে,মারাদোনা,মেসি পায়নি। ফুটবল ইন্ডিয়া বহু গোল খেয়ে যাচ্ছে বিশ্বে।

জ্ঞানের আলো প্রেমের আলোর পাশাপাশি তিনি বলেছিলেন,‘দরিদ্র ভারতের প্রতিটি মানুষ অন্ন পাক। ক্ষুধার আর্তনাদ বন্ধ হোক।’ তিনি আরও বলেছিলেন,‘সেদিন আমি শান্তি পাবো,প্রতিটি বাড়ির ভাতের ফ্যান ক্ষুধা দূর করে গঙ্গায় পড়ছে। এমন মানব জন্ম আর কী হবে? আমরা অপেক্ষায় রইলাম। 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only