শুক্রবার, ৮ জানুয়ারী, ২০২১

ভারতীয় বাঙালি মুসলিম সমাজ : উত্তরণের মুহূর্ত

(প্রতিকি চিত্র)


বিশেষ প্রতিবেদনঃস্বাধীনত্তোরকালে এ-বাংলায় ক্ষমতার কাছাকাছি ও নীতি নির্ধারণের আশপাশে বাঙালি মুসলমানের উপস্থিতি নেই বললেই চলে। বাঙালি মুসলমানদের সমস্যা বহুমাত্রিক এবং প্রায় সবগুলিই দীর্ঘদিনের। দু-চারজন এ থেকে উত্তরণের পথ খোঁজার চেষ্টা করলেও তার সুফল সেভাবে আসেনি। এই প্রেক্ষিতে হাল না ছেড়ে সমাধানের পথ দেখানোর প্রয়াসী হয়েছেন একরামূল হক শেখ। 

একরামূল হক শেখ 


 

 -বাংলার বাঙালি মুসলমানদের সমস্যা বহুমাত্রিক এবং প্রায় সবগুলিই দীর্ঘদিনের। দু-চারজন জং ছাড়াবার চেষ্টা করলেও তার সুফল সহজলভ্য হয়নি। সবচেয়ে বড় সমস্যা কলকাতা। রাজধানীতে ক্ষমতার কাছাকাছি ও নীতি নির্ধারণের আশেপাশে স্বাধীনতা উত্তরকালে বাঙালি মুসলমানের উপস্থিতি নেই বললেই চলে। সেই ট্র্যাডিশন এখনও বহাল। কলকাতায় উজ্বল বাঙালি মুসলমান হাতে গোনা মাত্র কয়েকজন। তার একটি বড় অংশ আবার পরিচয় নিয়ে দ্বিধান্বিত। তাঁদের আগমার্কা সেকুলারিজম ও অসাম্প্রদায়িকতার শ্বেতশুভ্র আলখাল্লায় সংকীর্ণ সাম্প্রদায়িক ‘মুসলিম’ দাগ যাতে না লাগে সেজন্য তাঁরা থাকেন চরম সতর্ক। সর্বত্র  উর্দুভাষীদের  দাপট, বাসে-ট্রামে, রাস্তায়-মিটিং-মিছিল-ব্যানারে। কলকাতার বিভিন্ন তথাকথিত মুসলিম এলাকায় উর্দুভাষীদের নজরকাড়া আধিপত্য। মহামেডান স্পোর্টিং, ইসলামিয়া হাসপাতাল, মুসলিম ইনস্টিটিউট, হুমায়ূন কবীর ইনস্টিটিউট প্রভৃতিতে বাঙালি মুসলিম পরিচালক,কর্মকর্তা,সদস্য প্রায় শূন্য। বড় বড় ঐতিহ্যবাহী মসজিদে ইমামতির ক্ষেত্রে বাংলাভাষী অস্তিত্বহীন। যদিও বাস্তবতা হল, বেশকিছু মসজিদে বাঙালি নামাযীর সংখ্যা নগণ্য নয়। সমগ্র কলকাতার ক্ষেত্রেই এটি প্রযোজ্য। বেড়ে যাওয়া কলকাতার প্রান্তিক অংশের দু-একটি মসজিদে জুম্মার দিনে খুতবার আগের আলোচনা বাঙালি ইমামের জন্য বাংলা ভাষায় হলেও হতে পারে। 

একটা কথা মনে রাখা দরকার,ধর্মীয় বিশ্বাসে সমধর্মী হলেও সাংস্কৃতিক ও সামাজিক দিক থেকে এদের মধ্যে পার্থক্য বিস্তর। বিশাল। স্বাভাবিক। বছর কয়েক আগে কবি শঙ্খ ঘোষ এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন,‘‘রাজনৈতিক ( এবং সেই সঙ্গে সামাজিক) জগতে এই আশ্চর্য একটা ভুল ঝোঁক আজও রয়ে গেছে কেবল অবাঙালি মুসলিমদেরই ‘মুসলিম সমাজ’ বলে ভাবা,বাংলার মুসলিম সমাজকে তেমনভাবে লক্ষ না করা।’’  দুটো দৃষ্টান্তের শরণ নিতে পারি। পশ্চিমবঙ্গ উর্দু অ্যাকাডেমি বামফ্রন্টের আমলে ১৯৭৮-এর ১ এপ্রিল স্বয়ংশাসিত সংস্থা হিসেবে শুরু হলেও বর্তমানে এটি সংখ্যালঘু বিষয়ক ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের অন্তর্গত। এর মুখ্য কাজ রাজ্যে উর্দু ভাষা ও সাহিত্য অধ্যয়নের প্রচার, উন্নতি এবং উৎসাহ প্রদান। প্রত্যেক বছর উর্দু অ্যাকাডেমি প্রাঙ্গণে উর্দু বইমেলাও সেই লক্ষ্যে অনুষ্ঠিত হয়। গত ২০১৫ সালের ২৯ মে, শুক্রবার কলকাতার নজরুল মঞ্চে ‘জশন-এ-ইকবাল’ শীর্ষক এক মহতী অনুষ্ঠানে আল্লামা ইকবালকে মরণোত্তর ‘তারানা-এ-হিন্দ’ উপাধি দেওয়া হয়। সম্মানটি গ্রহণ করেন পাকিস্তান থেকে আগত তাঁর নাতি ওয়ালিদ ইকবাল। বেশ জাঁকজমকপূর্ণ এই অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও উপস্থিত ছিলেন। অভিজ্ঞতায় দেখা যায়,  প্রতিবেশী সম্প্রদায়ের কাছে পশ্চিমবঙ্গ উর্দু অ্যাকাডেমি,উর্দু বইমেলা,‘জশন-এ-ইকবাল’ প্রভৃতি সবকিছুতেই সমগ্র মুসলিম সম্প্রদায়কে জড়িয়ে ফেলা হয়। সদর্থক অর্থে কেউ কেউ এগুলিকে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জন্য অনাবশ্যক ভাবেন না। তবে সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়ের একটি বড় অংশ বিশ্বাস করেন, এগুলি মুসলিম তোষণ ও পক্ষপাতদুষ্ট সরকারি বদান্যতা। উর্দু ভাষা ও সংস্কৃতির উন্নয়নে রাজ্যের বাঙালি মুসলিমের আদৌ সরাসরি সংস্পর্শ ও উজ্জীবনের কিছুই নেই। কারণ পশ্চিমবঙ্গের পঁচানব্বই শতাংশের বেশি মুসলমান বাংলাভাষী। তাঁদের যাপিত জীবন ও শিক্ষা-সংস্কৃতিতে উর্দু হিন্দির মতোই অন্যের মাতৃভাষা।   দুর্ভাগ্যের হলেও সত্য যে, আগের বামফ্রন্ট সরকারের মতো বর্তমান তৃণমূল কংগ্রেসের মুসলমান নেতৃত্বে আনুপাতিক হারে বাংলাভাষীদের প্রতিনিধিত্ব বেশ কম। একটি হিসেবে দেখা যায়,জন্মসূত্রে মুসলমান সাংসদদের প্রায় চল্লিশ শতাংশ উর্দুভাষী,যেখানে রাজ্যের মুসলমানদের মধ্যে তাঁরা দশ শতাংশও না। 

 আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় শিশুশ্রেণি থেকে স্নাতকোত্তর পর্যন্ত কোথাও ইসলামীয় নীতিকথা,ঐতিহ্য,সভ্যতা,সংস্কৃতি,জ্ঞান-বিজ্ঞান,দর্শনের  সিলেবাস ভিত্তিক চর্চা নেই।কিন্তু এটি ছিল খুব জরুরি। এবং এখনও একইভাবে আবশ্যক।  পারস্পরিক ভাব বিনিময় এবং গভীরভাবে জানাচেনার জন্য প্রতিবেশীর শাস্ত্র,সঙ্গে ইতিহাস-ঐতিহ্যও আমাদের যাপিত জীবনের অঙ্গ হওয়া উচিত বলে আহ্বান জানিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ­ ‘বাংলাদেশে হিন্দু-মুসলমান যখন ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী,পরস্পরের সুখ-দুঃখ নানা সূত্রে বিজড়িত,একের গৃহে অগ্নি লাগিলে অন্যকে যখন জল আনিতে ছুটাছুটি করিতে হয়,তখন শিশুকাল হইতে সকল বিষয়েই পরস্পরের সম্পূর্ণ পরিচয় থাকা চাই। বাঙালি হিন্দুর ছেলে যদি তাহার প্রতিবেশী মুসলমানের শাস্ত্র ও ইতিহাস এবং মুসলমানের ছেলে তাহার প্রতিবেশী হিন্দু শাস্ত্র ও ইতিহাস অবিকৃতভাবে না জানে তবে সেই অসম্পূর্ণ শিক্ষার দ্বারা তাহারা কেহই আপন জীবনের কর্তব্য ভালো করিয়া পালন করিতে পারিবে না।’ রাজনেতা ও শিক্ষাবিদরা কবিগুরুর এই অভিজ্ঞতায় নিজেদের জারিত করে শিক্ষাক্রম নির্মাণ করতে পারলে বাঙালি সমাজ সমৃদ্ধ ও উপকৃত হত নিশ্চয়।    

অন্যদিকে প্রাচ্যবিদদের মহানবী-বিদ্বেষ ও ইসলাম-আতঙ্কের মধ্যেও আন্তর্জাতিক পরিসরে মহানবী সা. ও ইসলাম নিয়ে আলাপ ও বহু উজ্জ্বল গ্রন্থের প্রকাশ কিন্তু বিরামহীন। পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম জনসংখ্যার ভারতে ইসলাম চর্চা প্রান্তিক অবস্থানে মুমুর্ষু হয়ে বেঁচে আছে। বাস্তবতা হল, আরবি-ফারসি এবং মুখ্যত উর্দু ভাষায় অসরকারি ইসলামি শিক্ষাকন্দ্রের মাধ্যমে চর্চাই ভরসা।  সেখানে আবার জনপরিসরের প্রধান স্থানীয় ভাষায় চর্চার হাল অস্তিত্বহীন। বেদনাদায়ক বিষয় এই যে,ইসলামি শিক্ষাকেন্দ্রের মূল প্রতিষ্ঠান খারেজি মাদ্রাসায় যুগোপযোগী ভাবনার এবং উর্দু-ফারসি-আরবি ভাষার বাইরে হিন্দি,বাংলা, তামিল,মালায়ালম,অসমীয়া প্রভৃতি ভাষায় ইসলাম চর্চায় ধারাবাহিক অনাগ্রহ। এর সঙ্গে দিনে দিনে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে সরকারি স্তরে ও পত্র-পত্রিকায় ইসলাম চর্চাকে কালো তালিকাভুক্ত করা। বিদ্বেষ ও বিকৃতির কথা না হয় ছেড়েই দিলাম। আমাদের রাজ্যের অবস্থাও বেশ করুণ। ছাত্র-ছাত্রীরা ইসলাম-এর ন্যূনতম পরিচয় পায় না এবং ধর্মের ইতিহাসকারদের কাছে ইসলাম এখনও বিদেশি! ফলে ইসলামের মহানবী সা.-এর অনন্য জীবনগাঁথা ও পথ চলার অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত, পুরোটাই অপরিচয়ের অন্ধকারে। মহানবী সা.-ই যেখানে অজানা সেখানে তাঁর ব্যবসায়ী স্ত্রী খাদিজা রা. কিংবা বিদ্বান স্ত্রী আয়েশা রা. সহ চারজন সৎ খলিফা ও শাসক আবুবকর-উমার-উসমান-আলি রা.-এর মহত্ব ভারতীয় জমিনে  রয়ে গেল অজারিত। উমাইয়া শাসক খলিফা উমার ইবন আবদুল আজিজ রা. (৬৮২-৭২০) যিনি দ্বিতীয় উমর হিসেবে সমধিক পরিচিত, তাঁর দুটি কালির দোয়াত ছিল। একটি  ব্যবহার করতেন শাসন সংক্রান্ত বিষয়ে এবং অপরটি তাঁর ব্যক্তিগত লেখালেখির জন্য। প্রথমটির খরচ সরকারি কোষাগার থেকে ব্যয়িত হলেও অন্যটির খরচ তিনি তাঁর নিজস্ব আয় থেকে পরিশোধ করতেন। এরকম সুশাসকের ব্যক্তিগত কৃচ্ছসাধন আমাদের তরুণ-তরুণীদের আর কবে জানানো হবে! ইসলামের স্বর্ণ যুগের বিশিষ্ট মনীষী নিয়েও নেই  কোনও তাপ-উত্তাপ। ‘বীজগণিতের অন্যতম জনক’ যাঁর বইয়ের নাম ( Kitab al-Jabr wa-al-muqabala) থেকে বীজগণিত অর্থাৎ algebra শব্দের উদ্ভব, সেই আলখাওয়ারিজমী ( ৭৮০-৮৫০), দার্শনিক-বিজ্ঞানী ইবন সিনা ( ৯৮০-১০৩৭), সমাজবিজ্ঞানের জনক ইবন খালদুন (১৩৩২-১৪০৬), অনেকের মতে গুটিবসন্ত ও হাম চিকিৎসার জন্মদাতা জাকারিয়া আল-রাজি (৮৬৫-৯২৫),দার্শনিক আল-কিন্দি ( ৮০১-৮৭৩),শল্য চিকিৎসাবিদ আল-জাহরাবি (৯৩৬-১০১৩), অন্যতম প্রাচীন লাইব্রেরি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাত্রী মহীয়সী ফাতিমা আল-ফিহরি ( ৮০০-৮৮০) প্রমুখদের কথা না-জানা ও না-জানানো ভারতীয় প্রেক্ষাপটে সাম্প্রদায়িক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বহু ব্যধির কারণ।  দুর্ভাগ্যের বিষয়,দেশসহ রাজ্যের কোনও কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামি দর্শন পঠন-পাঠনের সুযোগ নেই।  পক্ষান্তরে পাশ্চাত্য ও প্রাচ্য দর্শনের পাঠ ও উচ্চ ডিগ্রি গ্রহণে আমাদের উচ্চতম শিক্ষাঙ্গন উতু্যঙ্গ উদার।  রাজ্যে উচ্চ মাধ্যমিক স্তর থেকে দর্শনের যে পাঠ শুরু হয় সেখানে ইসলামীয় বা মুসলিম দর্শন না থাকলেও চার্বাক,বৌদ্ধ,জৈন,ন্যায়,সাংখ্য,যোগ,মীমাংসা,বেদান্ত সবই  বিদ্যমান।  দুনিয়াজুড়ে চর্চিত ও পঠিত দার্শনিক আল-কিন্দি (৮০১-৮৭৩),আল-ফারাবি (৮৭২-৯৫১),আল-গাজালি (১০৫৮-১১১১),ইবন রুশদ ( ১১২৬-১১৯৮), ইবন সিনা,ইবন খালদুন প্রমুখ বহুবিদ্যাজ্ঞ মনীষীদের বুদ্ধিগত  আলোচনা-গবেষণা ক্রমবর্ধমান।  বাংলাদেশে ইসলামীয় বা মুসলিম দর্শনের গ্রন্থের সংখ্যা ও চর্চা দেখে বিস্মিত হতে হয়।  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শন বিভাগের অধ্যাপক ডক্টর আমিনুল ইসলাম সহ অনেকেরই এ-বিষয়ে বৈচিত্র্যময় উচ্চমার্গীয় আলোচনার সঙ্গে পরিচয় হতে পারি।  আমিনুল ইসলামের কয়েকটি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ হল ­ মুসলিম ধর্মতত্ত্ব ও দর্শন,মুসলিম দর্শন ও সংস্কৃতি,ইসলাম ধর্ম ও মুসলিম দর্শন।        

       আমাদের সরকারি-বেসরকারি আলাপ-আলোচনায়,শিক্ষাচর্চায়,গবেষণা কার্যক্রমে আরবি-ফারসি নামধারী যে কয়েকজন সৌভাগ্যবান জায়গা পেয়েছেন তাঁরা প্রায় সকলেই ভারতের শাসক।  বিশেষ করে মোগল শাসকবৃন্দ।  স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যে মুখ্যত এঁদের কালো অর্ধ-সত্য ও কিংবদন্তী অংশেরই জয়জয়কার।  ব্যতিক্রমভাবে উজ্জ্বল অংশ তমসাবৃত।  তাঁদের বিচু্যতি ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের উদার ব্যাখ্যা নিচু ক্লাসে না থাকায় শৈশব ও কৈশোরের পড়ুয়ারা একচক্ষু হরিণের মতো অন্যদিক নিয়ে আঁধারেই থাকে। তারা হয়ে উঠে ক্রোধী-বিদ্বিষ্ট-প্রীতিশূন্য।  আরও একটা ব্যাপার ভাবা দরকার। মুসলিম সমাজের চেয়ে নানা পরিমাপে বহু কদম এগিয়ে যাওয়া প্রতিবেশী সম্প্রদায়ে সংখ্যালঘু  শিক্ষিত উচ্চগোষ্ঠীর সঙ্গে সব বিষয়ে তুলনা করে মুসলিম সমাজের উন্নতির পরিমাপ করা যুক্তিসঙ্গত কিনা। একটি সেমিটিক ধর্মের বিশিষ্টতা হিন্দুধর্মে বা সংস্কৃতিতে খোঁজ না করাই শ্রেয়।  এটাও মাথায় রাখা দরকার, মানবিকতা,প্রগতিশীলতা,যুক্তি ও ন্যায়বোধ, মঙ্গলাকাক্ষার কিন্তু হিন্দু-মুসলিম কিংবা বাঙালি-অবাঙালি হয় না।

বাঙালি হিন্দু ও মুসলমানের মধ্যেকার অপরিচয় ও পারিবারিক সংস্কারবোধ আরও একটা বড় সমস্যা।  কথাসাহিত্যিক সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ বিষয়টি নিয়ে বাস্তবমুখী অভিনব উপলব্ধি করেছেন। উভয় সমাজের মধ্যে সুদৃঢ় বন্ধনের প্রশ্নে ১৯৯৬-এ তিনি লিখছেন­ ‘‘এ দেশে জন্মসূত্রে মুসলিম হওয়ার একটা বড় লাভ অনেকগুলো সংস্কৃতির উত্তরাধিকার অর্জন। একজন নিরক্ষর মুসলিম ইসলামী সংস্কৃতি ও হিন্দু সংস্কৃতি বলতে যা বোঝায় তা দুটোই বোঝেন। একজন শিক্ষিত মুসলিম ইসলামী,হিন্দু এবং খ্রীস্টান ঐতিহ্যলালিত ইউরোপীয় সংস্কৃতিকেও বোঝেন। পক্ষান্তরে, একজন নিরক্ষর হিন্দু শুধু নিজেদের সংস্কৃতিটাই বোঝেন এবং শিক্ষিত হিন্দু নিজেদের সংস্কৃতি এবং পূর্বোক্ত ইউরোপীয় সংস্কৃতি সম্পর্কে অবহিত। তাই একজন মুসলিম অন্নপ্রাশন কি তা জানেন। কিন্তু একজন হিন্দু ’আকিকা’ কি তা জানেন না। তিনি জানতে চান কিংবা চান না তার চেয়ে বড় কথা তাঁকে জানানোর দায়িত্ব তো ‘মুসলিমেরই’। যা সৎ, যা মহৎ,যা উৎকৃষ্ট তার প্রতি কোন মানুষই মুখ ফিরিয়ে থাকতে পারে না। কাজেই মুসলিম সমাজ,ধর্ম,সংস্কৃতি তথা আচার-আচরণ হিন্দুদের কাছে সুচারুরুপে পরিবেশনের দায়িত্ব মুসলিমদেরই নিতে হবে।’’ অবশ্যই এটি অতুলনীয় অভিজ্ঞতালব্ধ হীরকদ্যুতি।  

আমাদের মিডিয়া অনেক কিছুই দেখায়,শোনায় ও পড়ায়। নানা ঐতিহাসিক কারণে পিছিয়ে পড়া মুসলমান সমাজও এই কত কিছুর মধ্যে একটু বেশি থাকলে পথ সুগম হত।  কিঞ্চিত যেটুকু ছিল বা আছে সেখানে যথার্থ মূল্যায়নের পরিবর্তে অধিকাংশই নেতিবাচক,অনালোকিত,অমার্জিত। এই সমাজের উজ্জ্বল সামাজিক অবদান থাকে অনালোচিত ও আচ্ছাদিত। প্রতিবেশীরা সমমানের না হলে যে গোটা সমাজের অসুবিধা হয়,এটা অবাস্তব নয়।  তাই পিছিয়ে পড়া প্রতিবেশীদের একই কাতারে তুলে আনতে অগ্রণী ভূমিকা গ্রহণ করা প্রতিবেশীর দায়িত্ব ও কর্তব্য।

আল-আমীন মিশনের সাধারণ সম্পাদক এম নুরুল ইসলাম ও তাঁর সহযোগীরা,আজ থেকে তিন দশক আগে নিজস্ব সমাজের শিক্ষা-তমসা দূর করতে যে মোমবাতি জ্বালিয়েছিলেন, সেটি আজ প্রায় অনেকগুলো ফ্লাড লাইটে পরিণত।  আল-আমীনের পাশাপাশি আরও বহু মিশন আলোকায়নের পথে প্রচেষ্টারত। তবু আজও প্রতিবেশী এবং স্ব-সমাজের বহু প্রাজ্ঞ-বিজ্ঞদের মুখে আমরা হামেশাই শুনে থাকি, মুসলিমরা মাদ্রাসায় পড়লে উন্নতি কী করে সম্ভব! কষ্ট,দুঃখ,অভিমান বা অশ্রদ্ধা কিছুই হয় না। শুধু করুণা ছাড়া! কারণ, কলম-শূন্য সম্প্রদায়ের অংশ আমরা, হাতুড়ি মারায় ক্লান্তি না আসাই উত্তম!

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only