বৃহস্পতিবার, ৭ জানুয়ারী, ২০২১

ভারতীয় সেনাবাহিনীতে আদৌ ‘মুসলিম রেজিমেন্ট’ বলে কিছু নেই


বিশেষ প্রতিবেদনঃ
দেশের সম্প্রীতি বিনষ্টের অভিপ্রায়ে সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়ায় এক ভুয়ো টু্যইটারে দাবি করা হয়,ভারতীয় সেনাবাহিনীতে নাকি ‘মুসলিম রেজিমেন্ট’ নামে এক সেনাদল ছিল যারা ১৯৬৫ সালে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে অস্বীকার করেছিল। কিন্তু ‘মুসলিম রেজিমেন্ট’ বলে ভারতীয় সেনাবাহিনীতে আগেও কিছু ছিল না, এখনও নেই। তাই এত বড় মিথ্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছেন দেশের বহু উচ্চপদস্থ সেনা অফিসার থেকে শুরু করে বিদ্বজ্জনেরা। আলোকপাতে সেখ হাসান ইমাম

সেখ হাসান ইমাম



ম্প্রতি প্রাক্তন নৌ-সেনাপ্রধান অ্যাডমিরাল এল রামদাস সহ ১২ জন বিভিন্ন পদাধিকারী প্রাক্তন সেনা রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দ, শীর্ষ আদালতের প্রধান বিচারপতি এস এ বোবদে, প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং, ‘চিফ অব ডিফেন্স স্টাফ’ বিপিন রাওয়াত এবং তিন বাহিনীর প্রধানদের কাছে প্রেরিত একপত্রে অভিযোগ করেছেন যে, সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি অবাস্তব ও সাম্প্রদায়িকতা দুষ্ট পোস্ট বার বার টুইট করা হচ্ছে, যার উদ্দেশ্য দেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিকে বিনষ্ট করা এবং ভারতীয় মুসলমানদের বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে বরবাদ করে দেওয়া। এই আবর্তমান টু্ইটটির বিষয়বস্তু কী?

"In 1965, there was a regiment in Indian Army called 'Muslim Regiment' which refuse to fight against Pakistan after which it was dismantled." অর্থাৎ ভারতীয় সেনাবাহিনীতে মুসলিম রেজিমেন্ট নামে একটি সেবাদল ছিল যারা ১৯৬৫ সালে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে অস্বীকার করে এবং তার ফলে এই বাহিনীর বিলোপসাধন করা হয়। (দ্রঃ দ্য টেলিগ্রাফ- ১৫/১০/২০)। ওই পত্রে এই দূরভিসন্ধিমূলক পোস্টকারীদের ধিক্কার জানানো হয়েছে এবং ভারতীয় সেনাবাহিনীর ধর্মনিরপেক্ষ ও অরাজনৈতিক চরিত্র যাতে ক্ষুদ্ধ না হয়, তা সুনিশ্চিত করার জন্য আকুল আবেদন করা হয়েছে। আজ যেখানে সীমান্তে চিন-ভারত সম্পর্কের ক্রমাবনতি ঘটছে। সেখানে এই ধরনের টু্ইট করে কট্টর হিন্দুত্ববাদী দলগুলি আত্মঘাতী খেলায় মেতে প্রকারান্তরে কি দেশের ঐক্যও সংহতিকে বিপন্নতার দিকে ঠেকে দিচ্ছে না? এরা যদি প্রকৃত দেশপ্রেমিক হয়, দেশের মঙ্গল যদি এদের কাম্য হয়,তাহলে এদের উচিত দেশের প্রকৃত ইতিহাসকে অনুধাবন করা ও তাকে সম্মান জানানো। অন্যথায় তাদের এই সব কাজ বোধবুদ্ধিহীন অর্বাচীনদের হঠকারিতা বলে চিহ্নিত হবে।

আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে এই সত্যকে তুলে ধরেছে যে ইংরেজদের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা সংগ্রামে এবং চিন-পাকিস্তান আক্রমণের মোকাবিলায় এ দেশের দেশপ্রেমী মুসলমানরা বরাবরই সামনের সারিতে থেকে সব সম্প্রদায়ের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করেছেন। এ বিষয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা একান্তই প্রাসঙ্গিক। পলাশী যুদ্ধের অব্যবহিত পরেই হল সন্ন্যাসী ফকির বিদ্রোহ। এর ব্যাপ্তি ১৭৬০ থেকে ১৮০০ সাল পর্যন্ত প্রায় ৪০ বছর। হিন্দু সন্ন্যাসী ও মুসলমান ফকিরদের এই সংগ্রাম ইংরেজদের প্রভুত্বকে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল। ‘‘সন্ন্যাসী-নেতা ভাবানীপাঠক,দেবী চৌধুরানি এবং ফকির নেতা মজনুশাহ,চেরাগ আলি,মুসা,পরাগলশাহ প্রমুখ ইংরেজ শোষণের বিরুদ্ধে কৃষক সমাজকে ঐক্যবদ্ধ হতে আহ্বান জানিয়েছিলেন।’’(আধুনিক ভারতের রুপরেখা-২য় পত্র/অধ্যাপক জি কে পাহাড়ি, পৃঃ ২৪০)। এরপর যে তিনটি আন্দোলন, ফরাজী আন্দোলন (১৮১৮ খ্রিঃ), ওয়াহাবী আন্দোলন (১৮২৭ খ্রিঃ) ও সিপাহি বিদ্রোহ (১৮৫৭ খ্রিঃ),সবগুলিতেই মুসলমানদের যথেষ্ট অগ্রণী ভূমিকা ছিল। আর এগুলি ছিল হিন্দু-মুসলমানের যৌথ আন্দোলন। বিস্তারিত আলোচনার সুযোগ নেই, তবে ঐতিহাসিক সত্যের নির্যাসটুকু তুলে ধরা যায়। ঐতিহাসিক অতুল চন্দ্র রায়ের মন্তব্যঃ ‘‘ফরাজী আন্দোলন প্রথমে ইসলাম ধর্মের সংস্কার আন্দোলন হিসেবে শুরু হইলেও, আন্দোলনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কর্মসূচি স্থানীয় হিন্দু কৃষকদের এক বৃহৎ অংশকে উদ্বুদ্ধ করিয়াছিল। দুদুমিয়ার নেতৃত্বে গ্রাম-বাংলায় স্থানীয় সরকার গঠন, স্থানীয় আদালত স্থাপন ও কর আদায় প্রভৃতি কার্য ফরাজী আন্দোলনকে জনগণের প্রকৃত স্বাধীনতা সংগ্রামের বৈপ্লবিক রুপ দান করিয়াছিল।’’... (ভারতের ইতিহাস আধুনিক যুগ/পৃঃ ২৫৬)। ওয়াহাবী আন্দোলনের গুরুত্ব সম্পর্কে ইতিহাসবিদ অধ্যাপক পাহাড়ীক মনচহ্যঃ‘‘সৈয়দ আহমদ ইসলামের আদর্শে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ইংরেজ অধিকৃত ভারতবর্ষকে ‘শত্রুর দেশ’ বলে অভিহিত করেন। কলকাতা হাইকোর্টের ব্যারিস্টার মিঃ এনেষ্টি আমীর খাঁ মামলায় প্রমাণ করেন যে, ওয়াহাবী আন্দোলন ছিল রাজনৈতিক এবং ভারত থেকে ব্রিটিশ শাসন উচ্ছেদ ছিল তাদের মূল লক্ষ্য।’’ (আধনিক ভারতের রুপরেখা... পৃঃ ২৪৩)। কেয়ামুদ্দিন আহম্মদ এই আন্দোলনকে ইংরেজ বিরোধী ভারতের প্রথম স্বাধীনতা আন্দোলন বলে অভিহিত করেছেন। ঐতিহাসিক স্মিথও এই আন্দোলনকে অসাম্প্রদায়িক বলে উল্লেখ করেছেন। ‘‘শেষ পর্যন্ত দমিত হলেও এই আন্দোলন ভারতের ইংরেজ শাসনের ভিতকে নড়িয়ে দিতে পেরেছিল।’’ (ঐ... পৃঃ ২৪৫)। একইভাবে সিপাহি বিদ্রোহ বা ভারতের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন শেষ মুঘল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফর। তখন বিদ্রোহীদের কাছে এই মুঘল সম্রাট জাতীয়তাবাদের প্রতীক হিসাবেই বিবেচিত হয়েছিলেন। বলা যায়, এই জন্যেই তিনি হয়েছিলেন অবর্ণনীয় নির্যাতনের শিকার। তাঁর ত্যাগ ও অশেষ দুঃখবরণ তাঁকে ট্রাজেডির নায়কের মর্যাদা দিয়েছে। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস পরিচালিত স্বাধীনতা আন্দোলন এবং নেতাজির আজাদ-হিন্দ-ফৌজের মুক্তি সংগ্রামে অন্য সম্প্রদায় অপেক্ষা মুসলমানদের ভূমিকা কম গৌরবোজ্জ্বল নয়। হিন্দু মহাসভা, আরএসএস ও মুসলিম লীগের সাম্প্রদায়িক রাজনীতি দেশের সামগ্রিক সম্প্রীতির পরিবেশকে কলুষিত করলেও, জাতীয়তাবাদী মুসলমানরা লীগকে সমর্থন করেননি এবং সর্বস্ব পণ করে স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। মুসলমানদের বৃহত্তম ধর্মীয় সংগঠন জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ মুসলিম লীগের দ্বিজাতিতত্ত্বের সমালোচনা করে ভারত ভাগের তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন। রণক্লান্ত কংগ্রেস নেতৃবৃন্দ ও আত্মসর্বস্ব লীগ নেতাগণ জনমতকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে, তাদের অবর্ণনীয় দুঃখ-দুর্দশায় নিক্ষেপ করে দেশভাগ মেনে নেন।

দেশ-বিভাজনের চরম ঘৃণ্য সাম্প্রদায়িকতার শিকার হয়েও,জন্মভূমির প্রতি আনুগত্য প্রদর্শনে স্বাধীনোত্তর ভারতের মুসলিম মানস কখনও পিছু হটেনি। ভারতীয় সেনাবাহিনীতে মুসলিম সৈনিকরা বার বার কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে স্বদেশ প্রেমের পরাকাষ্ঠা দেখিয়েছেন। ১৯৬৫ সালের যে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের কথা ওই ‘ফেক’ টু্ইটে বলা হয়েছে, সেই যুদ্ধেই আমেরিকান ট্যাঙ্ক ধ্বংসে অসীম বীরত্ব প্রদর্শন করে শহিদ হওয়ার জন্য হাবিলদার আধুল হামিদকে সেনাবাহিনীর সর্বোচ্চ সম্মান মরণোত্তর ‘পরমবীর চক্র’ দিয়ে সম্মানিত করা হয়। ওই যুদ্ধেই মেজর জেনারেল মহম্মদ জাকি এবং মেজর আধুল রাফ খানকে মরণোত্তর বীরচক্র প্রদান করা  হয়। এখানে উল্লেখ্য যে, আধুল রাফে খান শহিদ হন পাকিস্তানের সেই সেনাবাহিনীর হাতে যার নেতৃত্বে ছিলেন তাঁর কাকা মেজর জেনারেল সাহিবজাদা ইয়াকুব খান। এখানে ব্রিগেডিয়ার ওসমানের কথা বিশেষ উল্লেখের দাবি রাখে। মহম্মদ আলি জিন্না ব্যক্তিগতভাবে তাঁকে পাকিস্তানে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করেন, যা তৎক্ষণাৎ প্রত্যাখ্যাত হয়। ১৯৪৮ সালের জুলাই মাসে কাশ্মীর রণাঙ্গনে পাকিস্তানি হানাদারদের সঙ্গে যুদ্ধে শহিদ হন। তাঁকে মরণোত্তর ‘মহাবীর চক্র’ প্রদান করা হয়। বিস্তর উদাহরণ আছে। আগ্রহী পাঠকের কৌতুহল উদ্দীপ্ত হলে শ্রম সার্থক হবে। ভারতীয় সেনাবাহিনীতে ‘রাজপুত রেজিমেন্ট’,‘জাঠ রেজিমেন্ট’, ‘গোর্খা রেজিমেন্ট’,‘সৎশ্রী আকাল পাঞ্জাব রেজিমেন্ট’ থাকলেও,কখনও মুসলিম রেজিমেন্ট ছিল না, এখনও নেই। সরকারের উচিত এই সব দেশদ্রোহী পোস্টকারীদের খুঁজে বের করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া এবং ওই সমস্ত সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মকে সাবধান করে দেওয়া, যারা এই সব দেশ বিরোধী পোস্টের বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। আসুন একসঙ্গে বলি...‘মেরা ভারত মহান’।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only