বৃহস্পতিবার, ১৪ জানুয়ারী, ২০২১

এবার প্রার্থী বাছাইয়ে শাসকদলকে আরও বিচক্ষণ হতে হবে



বিশেষ প্রতিবেদনঃপ্রবল পরাক্রান্ত রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের মোকাবিলায় অগ্নিকন্যা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল তৃণমূল কংগ্রেসের তূণের এবারের অন্যতম তিরটি হতে পারে রাজ্যের বিপুল সংখ্যক মুসলিম ভোট। যদি সেই তীর সঠিকভাবে ব্যবহার করা যায়,তৃতীয়বারের জন্য ক্ষমতায় ফেরার লড়াই অনেকটাই সহজ হয়ে ওঠার সম্ভাবনা প্রবল। লিখছেন মোশারফ হোসেন।

মোশারফ হোসেন



পশ্চিমবঙ্গের আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের দিনক্ষণ ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে। ফলে যুযুধান প্রতিটি রাজনৈতিক শিবিরেই তুমুল ব্যস্ততা শুরু হয়ে গিয়েছে। একদিকে ব্যস্ততা যেমন সংগঠনকে আরও মজবুত করে তোলার,অন্যদিকে তেমনি প্রার্থী বাছাইয়ের। প্রার্থীরাই দলের প্রতিনিধি। সেই প্রতিনিধিদের পাওয়া ভোটের সুবাদেই দলের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে। যদিও ইদানিং রাজ্যের প্রধান দুই প্রতিপক্ষ একদিকে বিজেপি ও অন্যদিকে তৃণমূল কংগ্রেস,তাদের প্রার্থীদের চেয়ে দলীয় প্রধান নেতৃত্বকেই লড়াইয়ের ময়দানে সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে চাইছে। 

পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি নেতাদের সাম্প্রতিক সবচেয়ে আলোচিতরা তো প্রকাশ্যেই ঘোষণা করছেন,পশ্চিমবঙ্গকে নরেন্দ্র মোদির হাতে তুলে দেওয়ার জন্যই তাদের লড়াই। যদিও ভোটটি বিধানসভার। বিধানসভার ভোটে কেন্দ্রীয় সরকার গড়া হয় না। এই ভোটের নিরিখে রাজ্য সরকার গঠিত হয়। যেহেতু মুখ্যমন্ত্রীর নেতৃত্বেই সরকার,তাই বলা চলে রাজ্যের পরিচালনভার মুখ্যমন্ত্রীর হাতে তুলে দেওয়া হয়। বিজেপি নেতাদের কথাবার্তা শুনে এক অর্বাচীন জিজ্ঞেস করলেন, তাহলে কি নরেন্দ্র মোদি মহাশয় দেশের প্রধানমন্ত্রীর পদ ছেড়ে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রিত্ব করতে উদ্গ্রীব হয়ে উঠেছেন? এ-রাজ্যে পদ্মপার্টি ভোটে জিতলে গুজরাতনন্দন মোদিজিই কি সেই আসনে আসীন হবেন, একদা যে আসন অলংকৃত করেছিলেন পশ্চিমবঙ্গের রুপকার ডা. বিধানচন্দ্র রায়? ওই প্রশ্নের কী জবাব দেব আমি! বললাম,ভোটে জিতলে কার হাতে পশ্চিমবঙ্গকে তুলে দেবেন,তা ওদের ব্যাপার। তেমন সুযোগ মিললে হয়তো সদ্য আমেরিকার মসনদ হারানো ট্রাম্পকেও সান্ত্বনা দিতে তাঁর হাতে বাংলার শাসনভার তুলে দিয়ে কেউ বন্ধুকৃত্য করতে পারেন। ‘আগলি বার ট্রাম্প সরকার’ আমেরিকায় সম্ভব না হওয়ায় বাংলায় তা করার কোনও সুযোগ রয়েছে কি-না সেই ব্যাপারে গবেষণাও শুরু হয়ে যেতে পারে। আমার বিশ্বাস,ওরকম হলে মোটা জলপানির বিনিময়ে ‘গবেষক’ হতে বহু ‘যোগ্য ব্যক্তিই’ লাইনে দাঁড়াবেন। গবেষণার ফলও বেরবে কর্তার মর্জি বুঝে। ক’বছর আগেও অসম্ভব মনে হলেও আজকাল বহু ব্যাপারেই যেরকম দেখা যাচ্ছে। মোট কথা,ওদের পাঁঠা ওরা ল্যাজে কাটবেন না মুড়োয় কাটবেন,তা আমি বলার কে? তার আগে অবশ্য পাঁঠাটাকে নাগালে পেতে হবে।

সে যাই হো,শুরুতে যে কথা বলছিলাম। এই মুহূর্তে প্রতিটি শিবিরেই প্রার্থী বাছাই পর্ব জোরকদমে জমে উঠেছে। বিজেপি’র হুঙ্কার,তারা এবার পশ্চিমবঙ্গ দখল করবেই। উল্টোদিকে তৃণমূলের অভয়বাণী,ওসব কষ্টকল্পিত ব্যাপার। স্বপ্নে রাবড়ি খাওয়ার মতোই অবাস্তব কল্পনা। দশ বছর আগে বাংলার মসনদে যে ঘাসফুল পাপড়ি মেলেছে,সেই পাপড়ি এবারও তরতাজাই থাকবে। কোনও শক্তিই তাকে উপড়ে ফেলতে পারবে না। তবে,মুখে যাই বলুন না কেন, এবারের লড়াইটা শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষে আগের যে-কোনও লড়াইয়ের চেয়ে অনেকটাই আলাদা। তেইশ বছরের তৃণমূল দল আগে কোনও বিধানসভা ভোটে এবারের মতো শক্ত চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েনি বলেই অনেকের ধারণা। এর পিছনে বহু কারণ থাকলেও ফল কিন্তু একটাই। তা হল,এবারের প্রতিপক্ষ অন্য সমস্ত বারের তুলনায় অনেক বেশি সংগঠিত। অনেক বেশি সমরাস্ত্রে সজ্জিত। অনেক বেশি সুসংহত। 

মুখে যে যাই বলুন না কেন, প্রবল পরাক্রান্ত রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের মোকাবিলায় অগ্নিকন্যা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল তৃণমূল কংগ্রেসের তূণের এবারের অন্যতম তিরটি হতে পারে রাজ্যের বিপুল সংখ্যক মুসলিম ভোট। যদি সেই তীর সঠিকভাবে ব্যবহার করা যায়,তৃতীয়বারের জন্য ক্ষমতায় ফেরার লড়াই অনেকটাই সহজ হয়ে ওঠার সম্ভাবনা প্রবল। আগের দু’টি বিধানসভা ভোটে তো বটেই,বছর দেড়েক আগের লোকসভা ভোটেও তৃণমূলের দুর্গ রক্ষায় রাজ্যের তিরিশ-বত্রিশ শতাংশ মুসলিম ভোট যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল,সেই ব্যাপারে কোনও পক্ষেরই কোনও সন্দেহ নেই। ওই তিরিশ-বত্রিশ শতাংশ ভোটারের সমর্থন এবারও অটুট থাকলে ২০২১-এর বিধানসভা ভোটের ফল ঘোষণার পর ফের মুখ্যমন্ত্রী পদে শপথ নেওয়া থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে কেউ আটকাতে পারবে না, এটা জলের মতোই পরিষ্কার। কারণ পশ্চিমবঙ্গের বাকি ভোটারদের সিংহভাগ এখনও এমন বিভ্রান্ত হয়ে যাননি যে সাম্প্রদায়িক এবং বিভিন্ন বিষয়ে নেতিবাচক মনোভাবাপন্ন একটি দলকে বাংলার মাটিতে দাপাদাপি করার সুযোগ দেবেন। পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি স্বভাবগতভাবেই অত্যন্ত শান্তিপ্রিয়। এর প্রমাণ মিলেছে ১৯৪৬-এ,১৯৬৪ সালে। ওই দুই কালো দাগওয়ালা বছরে কলকাতা শহরে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার আগুন জ্বলে উঠলেও পশ্চিমবঙ্গের কোনও গ্রামে তা ছড়িয়ে পড়েনি। গ্রাম-বাংলার কোথাও কোনও হিংসাত্মক ঘটনা ঘটেনি। শুধু তাই নয়,ওই দু’বারই কলকাতায় হিংসাত্মক ঘটনায় প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে বাঙালি হিন্দু-মুসলিম ছিল না বললেই চলে। পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি মুসলিম তো নয়ই,বাঙালি হিন্দুরাও কোনওভাবেই চান না, রাজ্যের গ্রামে গ্রামে কোনওরকম সাম্প্রদায়িক অশান্তির আগুন জ্বলে উঠুক। কারণ, সহজাত শান্তপূর্ণ মনোভাবের পাশাপাশি আরও একটি বিষয় এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য। বাঙালি হিন্দু-মুসলিমরা এই সত্যটা না বোঝার মতো অবার্চীন নন, যে আগুন লাগলে ক্ষতি সবারই হয়। পশ্চিমবঙ্গের গ্রামগুলিতে হিন্দু-মুসলিমের বসবাস ও সম্পর্ক অনেকটা রুটির সঙ্গে নুনের মতো। রুটি তৈরি হয়ে যাওয়ার পর নুনের উপস্থিতি মেলে রুটির প্রায় গোটা অবয়ব জুড়েই। রুটি থেকে আটা আর নুনকে আলাদা করা যায় না। আলাদা করতে গেলে ছিঁড়তে ছিঁড়তে একসময় গোটা রুটিটাই বাতিল হয়ে যাবে।

কিন্তু প্রশ্ন হল,রাজ্যের মুসলিম ভোটাররা এবারও কি আগের মতোই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দলের অনুকূলে এককাট্টা রয়েছেন? না কি সেখানে কোনও ফাঁকফোকর সৃষ্টি হয়েছে? 

এ প্রশ্নের উত্তর এই মুহূর্তে সরাসরি এককথায় দেওয়া খুবই কঠিন। কিছুটা সংশয়েরও বটে! কেন? 

একটি জনপ্রিয় বাংলা গানের একটি কলি,‘খুব জানতে ইচ্ছে করে,তুমি কি সেই আগের মতোই আছো?’ রাজ্যের মুসলিম জনগোষ্ঠীর উদ্দেশে যদি ওই প্রশ্ন ছোঁড়া যায়,তাহলে বলতে পারি পশ্চিমবঙ্গের মুসলিম সমাজ আর আগের মতো নেই। এ-বাংলার দশ-বিশ বছর আগের মুসলিম সমাজ আর আজকের মুসলিম সমাজের মধ্যে গুণগত,প্রকৃতিগত অনেকটাই পার্থক্য ঘটে গিয়েছে। বিজ্ঞানের ভাষায় বলা যেতে পারে বিবর্তন। শিক্ষা,সংস্কৃতি,সমাজভাবনা,রাজনৈতিক চেতনা, প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি মুসলিম সমাজ আজ অনেকটাই আত্মসচেতন,আত্মনির্ভর। নিজেদের অবস্থান ও ক্ষমতা সম্পর্কে মূল্যায়নে অনেকটাই সক্ষম। এই সচেতনতা,এই বিশ্লেষণ ক্ষমতাই তাদের চোখে স্পষ্ট করে দিয়েছে, তাদের প্রতি ক্ষমতাধরদের প্রকৃত দৃষ্টিভঙ্গিটি ঠিক কীরকম। একসময় বামফ্রন্টকে তারা দু’হাত ভরে সমর্থন দিলেও প্রতিদানে তেমন কিছু মেলেনি। বরং মুখে বন্ধুত্বের কথা বললেও কার্যক্ষেত্রে পিছন থেকে ছুরি মারা হয়েছিল। ২০০৬-এর শেষে প্রকাশিত সাচার কমিটির রিপোর্ট সেই বাস্তব ছবিটিকে নগ্নভাবে প্রকাশ করে দিয়েছিল। ওই একটি রিপোর্টই পশ্চিমবঙ্গের মুসলিম সমাজের চোখ খুলে দেয়। তারা নিজেদের প্রকৃত অবস্থার সামগ্রিক ছবিটা দেখতে পায়। শিউরে ওঠে। এর প্রতিফলন ঘটে পরবর্তী ভোটগুলিতে।

তৃণমূল সরকারের দশ বছরেও বহু নায্য প্রাপ্য বাংলার মুসলিম সমাজের নাগালের বাইরে রয়ে গিয়েছে। অপূরিত রয়েছে বহু প্রত্যাশা। ঘোষিত প্রতিশ্রুতির সঙ্গে বাস্তবে প্রাপ্তির ফারাক এখনও অনেকটাই। এরই পাশাপাশি ক্ষমতাসীনদের বিভিন্ন পদক্ষেপ রাজ্যের মুসলিমদের জন্য প্রতিকূল পরিস্থিতি সৃষ্টিতে পরোক্ষে সহায়ক হয়ে উঠেছে। এই সমাজটাকে সত্যিকার দরদ দিয়ে বোঝার চেষ্টার বদলে, তাদের সমস্যার প্রকৃত সমাধানে আন্তরিক উদ্যোগের বদলে অনেক সময়ই কিছু চটকদার কর্মসূচি ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। যা আদতে ওই জনগোষ্ঠীর মৌলিক উন্নয়নের সহায়ক নয়। 

এমনকি রাজনীতির অঙ্গনে প্রতিনিধি বাছাইয়ের ক্ষেত্রেও বহু ক্ষেত্রেই সুবিচার হয়নি। এ ব্যাপারে মাপকাঠি হিসেবে আজও মুসলিমদের সম্পর্কে বহু পুরনো বস্তাপচা ভাবনা-চিন্তাকেই গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ফলে সমাজের প্রকৃত প্রতিনিধিত্ব আজও প্রায় অধরা। সংখ্যার বিচারে যে জনগোষ্ঠী রাজ্যের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ,একইসঙ্গে যাদের মধ্যে নেতৃত্ব দেওয়ার মতো বহু প্রতিভাবান মানুষ রয়েছেন, সেখানে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কাদের বেছে নিয়েছেন দণ্ডমুণ্ডের কর্তাকর্ত্রীরা? অথচ প্রকৃত উন্নয়ন চাইলে যোগ্য নেতৃত্বকে সামনে আনা জরুরি। নইলে উন্নয়ন কেবল কথার কথাতেই সীমায়িত থেকে যাবে,আর, অন্যদিকে ধিকি ধিকি জ্বলতে থাকা ক্ষোভের তুষের আগুন নানা ফাঁকফোকর দিয়ে বেরিয়ে লেলিহান শিখার রুপ নিতে চাইবে। কারণ সামান্য আগুনে ঘি ঢেলে তাকে অগ্নিকাণ্ডে পরিণত করতে ঘরে-বাইরে বিভিন্ন শক্তি ক্রমশ সক্রিয় হচ্ছে। তাদের লক্ষ্য পূরণ হলে যে ফল মিলবে,তা বর্তমান ক্ষমতাসীন দলের পক্ষে স্বস্তিদায়ক না হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। তাই তাদের নিজেদের স্বার্থের কথা ভেবেই এবার প্রার্থী তালিকা তৈরির সময় রাজ্যের মুসলিম জনগোষ্ঠীর সংখ্যার অনুপাত এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলি মাথায় রাখা উচিত বলে মনে করি। 

যুদ্ধের পরিবেশ বদলেছে। বদলেছে মেজাজ। ক্ষমতাসীনদের গড় রক্ষা করতে গেলে সচেতন হতে হবে। যুগোপযোগী কৌশল নিতে হবে। ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিতে হয়। পৃথ্বীরাজকে শিক্ষা নিতে হয়েছিল। ইব্রাহীম লোদিকেও। শত্রু সম্পর্কে উদাসীন মনোভাব পৃথ্বীরাজকে ক্ষমা করেনি। যুগোপযোগী অস্ত্রের অভাব কাবু করেছিল ইব্রাহীম লোদিকে। ক্ষমতার আসর থেকে পৃথ্বীরাজ ও লোদিকে বিদায় নিতে হয়েছিল,জয়ের নিশান উড়েছিল মুহাম্মদ ঘোরী আর বাবরের হাতে।    


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only