শনিবার, ২ জানুয়ারী, ২০২১

ক্যানসারের অ্যানসার কী? পড়ুন কর্কট-কথা




বিশেষ প্রতিবেদনঃ ক্যানসার তথা কর্কটরোগ জনমানসে এখন অনেকটাই পরিচিত। ক্যানসার হলে নো অ্যানসার! এই ভাবনাকে দূরে সরিয়ে মানব-মনে এসেছে রোগকে জয় করার প্রবণতা। বছরের এক দীর্ঘসময় ধরে দেশ দেখেছে করোনাকালীন লকডাউন, ধীরে ধীরে আনলক পর্ব কাটিয়ে কেমন আছেন ক্যানসার আক্রান্ত রোগীরা? কোথায়ই বা করাচ্ছেন তারা তাদের চিকিৎসা? এক দীর্ঘ লকডাউনের জেরে কেমোথেরাপি না নিতে পারায় কপালে চিন্তার ভাঁজ সকলেরই। কীভাবেই বা সম্ভব এই রোগকে আটকানো? সে কথাই জানালেন, ক্যানসার নিউট্রিশন রিসার্চ এবং ক্যানসার ড্রাগ ম্যানুফ্যাকচারার ‘এসপেরের গ্রুপ’-এর প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও রক্তিম চট্টোপাধ্যায়। শুনলেন অদিতি চট্যোপাধ্যায়।

 রক্তিম চট্টোপাধ্যায়

    


বর্তমানে সমগ্র ভারতে ২.৮ মিলিয়ন অর্থাৎ কম-বেশি ২৮ লক্ষ জনসাধারণ কর্কটরোগে আক্রান্ত। ক্যানসারের বিভিন্ন অংশের মধ্যে ব্রেস্ট ক্যানসার, সারভিক্যাল ক্যানসার এবং কোলোরেক্টাল ক্যানসারের পরিমাণ শতাংশের হারে বছর বছর বাড়ছে। এছাড়াও, প্রতিবছর কমবেশি ১১ লক্ষ মত মানুষের দেহে মারণ এই জীবাণু বাসা বাঁধছে। সেদিক থেকে মৃতু্যহারের দিকেও চোখ মেললে দেখা যাবে কেরল,মিজোরাম,হরিয়ানা,দিল্লির পর বাংলার স্থান দশমে। অন্যদিকে বাংলার মোট জনসংখ্যার ৬ শতাংশ ডায়াবেটিস রোগে আক্রান্, যার মধ্যে প্রথম স্থানে রয়েছে হাওড়া ১৪ শতাংশ, কলকাতা ১৩ শতাংশ,এবং বর্ধমান ৯ শতাংশ,যা খুবই চিন্তার বিষয়। পাশাপাশি এক সমীক্ষার রিপোর্ট অনুযায়ী বাংলায় স্থ(লতায় আক্রান্ত ৭.৫ শতাংশ,যা কলকাতার মধ্যে শুধুমাত্র মহিলাদের ক্ষেত্রে ১৩ শতাংশ। 

মূলত কী কী কারণে মানুষের শরীরে ক্যানসার বাসা বাঁধে?

অতিরিক্ত ওজন তথা স্থ(লতা এবং তামাক ও মদ্যপান অন্যতম কারণ। এছাড়াও, ডায়াবেটিস অর্থাৎ মধুমেহ, রেডিয়েশন, ব্যাকটেরিয়া-ভাইরাস ও অন্যান্য জীবাণুঘটিত সংক্রমণও এই রোগে প্রভাব বিস্তার করে। অনেকক্ষেত্রে বাড়ির যদি কেউ এই রোগে আক্রান্ত হয় তাহলেও একটা সম্ভবনা থেকে যায়। 

কম বয়সীদের মধ্যেও ক্যানসারের প্রবণতা বাড়ছে কেন?

বর্তমানে তরুণ-তরুণীদের মধ্যে ক্যানসারের প্রবণতা বাড়ছে। এটা কিছুটা নির্ভর করছে জীবনযাত্রা ও খাদ্যাভাস্যের ফলে। মাত্রাতিরিক্ত ধূমপান,মদ্যপানের জেরে তারা এই রোগের শিকার হচ্ছেন বলে মত বিশেষজ্ঞদের। রাজ্যে যেহেতু প্রচুর পরিমাণে শাকসবজি উৎপন্ন হয় সেহেতু খাদ্য তালিকায় জাঙ্ক ফুড, ফাস্ট ফুড বাদ দিয়ে নিয়মিত প্রচুর সবজি, স্যালাড এবং মরশুমি ফল খেতে হবে। স্বাস্থ্যসম্মত জীবনযাত্রায় অভ্যস্থ হতে হবে।  

করোনাকালে সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থা খুবই খারাপ, সেখানে ক্যানসার রোগীরা যথাযথ কেমো নিতে পারছে না। তাহলে উপায়?

লকডাউনে এটা একটা গভীর সমস্যা ছিল। কিন্তু দেশের অন্যান্য রাজ্যের তুলনায় গত দশ বছরে পশ্চিমবঙ্গের চিকিৎসা ব্যবস্থার যথেষ্ট উন্নতি ঘটেছে। আগে ক্যানসার ধরা পড়লেই মানুষ ভেলোর, চেন্নাইয়ে ছুটতো কিন্তু এখন আর সেটা হয়না। পশ্চিমবঙ্গের সরকারি মেডিকেল কলেজ এককথায় এখন অনেক উন্নত বলা যায়। এখানে অনেক কম খরচে চিকিৎসা হওয়া ছাড়াও ফেয়ার প্রাইস শপের মাধ্যমে ন্যায্যমূল্যে ওষুধ পাওয়া যায় যা বাংলার ভুক্তভোগীদের জন্য বিশেষ সহায়ক। রেডিয়েশন থেরাপি ও কেমোথেরাপির খরচও এখানে কম। কিন্তু লকডাউনের জেরে রেডিয়েন্স নিতে না পারার জেরে আশঙ্কা করা হচ্ছে আগামী দশ বছরের মধ্যে ভারতে ক্যানসারে মৃত্যুহার সর্বাধিক হবে। 

রোগ কীভাবে ধরা যাবে? ক্যানসার কি বংশ পরম্পরায় হতে পারে?

এক্স-রে,এমআরআই স্ক্যান,বায়োপসি,পেট স্ক্যান,আল্ট্রাসনোগ্রাফি টেস্টের মধ্যে দিয়ে রোগকে চিহ্নিত করা যায়। এছাড়া, উন্নততর জেনেটিক পরীক্ষার দ্বারাও ক্যানসার চিকিৎসা সম্ভব। 

অনেকক্ষেত্রে বাড়ির যদি কেউও এই রোগে আক্রান্ত হয় তাহলে একটা সম্ভবনা থেকে যায়। 

হলে পরে ক্যানসার,নেই কোনও অ্যানসার,কথাটা কতটা সত্যি?

প্রথম পর্যায়েই যদি ধরা পড়ে তাহলে অনেকটাই বাঁচোয়া,যদিও তা নির্ভর করছে ব্যক্তি বিশেষের ওপর। যথাসম্ভব শরীর থেকে সুগার, ফ্যাট ও তামাকজাত দ্রব্য ও মদ্যপানের প্রতি আসক্তি কমালে অনেকটাই রোগকে দমন করা যাবে।  

সমীক্ষার রিপোর্ট অনুযায়ী আমেরিকায় ৬০ শতাংশ লাংস ক্যানসার জনিত মৃত্যুহার কমেছে, ভারতে কোথায় খামতি?

আমেরিকাতে লাংস ক্যানসার দমনের নয়া আবিষ্কৃত ড্রাগের মূল্য মানুষের সাধ্যের মধ্যে কিন্তু আমাদের দেশে তা ব্যয়বহুল, যা এক জ্বলন্ত সমস্যা। 

কোভিড-১৯ এর জেরে বহু রোগী মনের জোর হারিয়ে ফেলেছেন। সেক্ষেত্রে কী করা উচিত?

অর্থনৈতিক দিক থেকে মানুষ কমজোর হয়ে যাওয়ায় পেটের ভাত জোগাড় করাই তাঁদের কাছে দুষ্কর হয়ে পড়েছে। এমতবস্থায় তারা চিকিৎসা করবে না পেটের ভাতের সংস্থান করবে তা সত্যিই জনসমক্ষে আজ এক বড় পরীক্ষা। আক্রান্তদের বাঁকা চোখে না দেখে তাঁদের মনের জোর বাড়ানো উচিত, ভাবা দরকার কতটা মানসিক টানাপোড়েনের দোলাচলে পরিবারগুলি দিন পার করে। বরঞ্চ পারিপার্শ্বিক দিক থেকেও যাতে তারা মনের জোর না হারায় সেদিকে বিশেষ নজর দিতে হবে, প্রয়োজনে সেমিনারের আয়োজন করতে হবে। রোগকে ঘৃণা করুন রোগীকে না। 

অনেকক্ষেত্রে জেলা ছাড়িয়ে সুদূর মফঃস্বলে চিকিৎসা করানোটা অনেক কঠিন হয়ে পড়ে। সেক্ষেত্রে কী করণীয়?

রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে ডায়াগনিস্টিক সেন্টারের মাধ্যমে যদি দ্রুত রোগনির্ণয় ও প্রাথমিক চিকিৎসা করানো যায় তাহলে আগামীদিনে অনেকটাই দেরি হওয়া থেকে আটকানো যাবে। নতুন টেকনোলজি যেমন আর্টিফিশিয়াল ইনটেলিজেন্স, জেনেটিক টেস্টের মাধমে দ্রুত ক্যানসার নির্ণয় করা যায়, যা বৃহত্তর জনস্বার্থে একপ্রকার আশার আলো বলা যেতে পারে।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only