রবিবার, ১০ জানুয়ারী, ২০২১

লাভ মানে ভালোবাসা, জেহাদ নয়

(এমনই পোস্টার ছাপিয়ে উসকে দেওয়া হচ্ছে লাভ জিহাদের মিথ্যে ধারণাকে)


বিশেষ প্রতিবেদনঃ‘লাভ জিহাদ’ শধবন্ধটিই পরস্পরবিরোধী। সবচেয়ে লক্ষণীয়, ঘরের সঙ্গে ফারসি শধ ‘ওয়াপসি’ এবং লাভের সঙ্গে আরবি শধ ‘জিহাদ’ যুক্ত করা হয়েছে অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে। নাম মুখে না এনেও পরিষ্কার করে দেওয়া হচ্ছে আক্রমণের বর্শামুখ কোনদিকে, কাদের দিকে ও কীভাবে পরিচালিত হবে।লিখছেন সুজাত ভদ্র। 

সুজাত ভদ্র


         

(আজ প্রথম কিস্তি)

ভালোবাসা আর মৃত্যু মানুষের জীবনে কখন এসে হাজির হয়, কেউ বলতে পারেন না। প্রেমের ফাঁদ পাতা থাকে ভুবনে এই সর্বজনীন সত্য এই মুহূর্তের নতুন ভারতে অচল, ভিন্ন জাতে, ভিন্ন ধর্মে প্রেম ও বিবাহ প্রশংসিত হবে না। উল্টে, নিন্দিত হবে, এমনকি অপরাধ বলে বিবেচিত হবে। 

গণতন্ত্রের মানদণ্ড সূচকে সবচেয়ে নিচে স্থান পাওয়া উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রীর হুঙ্কার অনুসারে (৩১ অক্টোবর,২০২০), সেরকম আন্তঃধর্মে প্রেম ও বিবাহ হলে, ‘রাম নাম সত্য হ্যায়’ পথে যাত্রা করিয়ে দেওয়া হবে! ফলে নতুন ভারতে প্রেম ‘দুটি স্বাধীন দেহ... একটি হৃদয়’ এখন থেকে ধর্ম ও সম্প্রদায়ের খাঁচায় ঢুকিয়ে দেওয়ার আইনি প্রচেষ্টা শুরু হয়েছে। স্বাধীন, প্রাপ্তবয়স্ক নারীর দেহ ও মনের উপর সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়ের সর্বস্বতা কায়েম করা শুরু হল,দলন করা হল ব্যক্তি-ইচ্ছা ও স্বাধীনতার। প্রয়োজনে হিংসার মাধ্যমে ফাইনাল সলিউশন করার পন্থা নিতেও তেনারা পিছপা হবেন না। ফলে গণতন্ত্রের রুপটাই বদলে যাচ্ছে। বিশ্বের সমস্ত গণতন্ত্রের মতো এখানেও সংখ্যালঘু সম্প্রদায় সমূহ সব ধরনের সাংবিধানিক ও আইনি সুরক্ষা পাবে। ভারতের সংবিধানে তার বন্দোবস্তও আছে। তাকে উল্টে দিয়ে হিন্দুত্ববাদীরা সংখ্যালঘুদেরই আক্রমণকারী বলে চিহ্নিত করে নিজেদের অস্তিত্বের জন্য নাকি আত্মরক্ষার লড়াই করছেন। সমাজের সব ধরনের সুবিধাভোগী সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়,প্রয়োজনে হিংসার মাধ্যমেই অস্তিত্ব রক্ষা করা হবে বলে সওয়াল করছে। সংখ্যাগুরু আক্রমণকারী হয়ে গেল আক্রান্ত,আর ভিক্টিম সংখ্যালঘু হয়ে গেল আক্রমণকারী! 

           কিছুদিন আগে দেখেছি, পোশাক-পরিচ্ছদ থেকে খাদ্যাভ্যাস নিয়ে একপ্রস্থ আক্রমণ। চূড়ান্ত অসহিষ্ণুতা,বলি হয়েছেন গৌরী লঙ্কেশ সহ একাধিকজন।সাম্প্রতিক পর্বে শুরু হয়েছে নানাধরনের হুমকি,হুঙ্কার,বড়দিনে গির্জায় ভিন্নধর্মী (পড়ুন হিন্দু) যেতে পারবেন না ও এই হিন্দু তালিবানি ফতোয়া অমান্যের পরিণতি কী হবে? বেদম প্রহার ও উল্লাসের সঙ্গে হত্যা। হিংসা তখন হয়ে ওঠে গণ-বিনোদন। এই নৃশংস কর্মে যে এরা বেশ দক্ষ তার সাক্ষী ভারতবাসীরা,২০১৪ থেকে অবশ্যই ‘রাষ্ট্রীয় প্রশয়ে, অনুপ্রেরণায়’ ধারাবাহিক গণপিটুনির পর্বে। তথ্য বলছে, ২০১৫ সাল থেকে ১১৫টি গোমাংসকে ঘিরে গুজব রটনা সংক্রান্ত ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৪৬, আহত ১৪৬ জন। ভ্যালেন্টাইন দিবস পালন করা যাবে না, করলে ‘অপারেশন মজনু’-এর সার্জিকাল স্ট্রাইকের ধাক্কা সামলাতে হবে। ভারতীয় ঐতিহ্যসম্মত মিশ্র সংস্কৃতির গৃহ বা সংসার যুক্ত কোনও বিজ্ঞাপন দিলে কী হবে টাটা সংস্থা ‘তনিশ্ক’ সম্প্রতি হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে। বিপুল জনসমর্থন পাওয়া সত্ত্বেও, সংস্থাটি বিজ্ঞাপনটা প্রত্যাহার করে নেয়। বুঝতে পারে, সুরক্ষাটুকুও পাওয়া যাবে না। অন্যদিকে, এই উদাহরণের মাধ্যমে তেনারা বার্তা পাঠালেন সর্বত্র, ভবিষ্যতে কেউ তনিশকের পথে হাঁটলে একই পরিণামের মুখোমুখি হতে হবে।

বিক্রম শেঠের গল্প অবলম্বনে তৈরি ছবিতে মন্দিরকে পেছনে রেখে চুম্বন দৃশ্য থাকবে কিনা তাও ঠিক করে দেবে সুপার সেন্সর, স্বঘোষিত নৈতিক পুলিশ-রুপী ধর্মান্ধ শক্তি! সৌধ গুঁড়িয়ে দিতে পটু সেবকদের তো তাহলে আগে নির্দেশ দেওয়া উচিত ছিল, কোণারক বা খাজুরাহের মন্দির গুঁড়িয়ে দেওয়ার, পুড়িয়ে দেওয়ার, দ্বিতীয় শতকে রচিত বাৎস্যায়নের কামসূত্র সহ নানা প্রাচীন গ্রন্থে, উচিত ছিল কামদেবকে চির নির্বাসনে পাঠিয়ে দেওয়ার। আবার, এটাও লক্ষণীয়, আপত্তির কারণটাও আদপেই খুব পরিষ্কার নয়, কীসে আপত্তি? মন্দির ব্যাকগ্রাউন্ডে রাখার জন্য? চুম্বনের দৃশ্যের জন্য? হিন্দু নারী চুম্বন দিচ্ছে বলে? না, হিন্দু নারী মুসলমান প্রেমিককে দিচ্ছে বলে? আপত্তিকারীরা কি জানে,ওনাদের অতি প্রিয়, চোখের মণি প্রাচীন ভারতের চালু যথেচ্ছ যৌনাচারের সংস্কৃতিকে ঘোর রক্ষণশীল ব্রিটিশরা ১৯২৮ সালে আইন এনে এগুলোর প্রচার নিষিদ্ধ পর্যন্ত করতে চেয়েছিল। 

ফলে, ক্ষমতায় দম্ভের সঙ্গে অজ্ঞতার ঔদ্ধত্যের যুগলবন্দি কী নিদারুণ দুর্ভোগ নিয়ে এসেছে ও আনবে তার স্পষ্ট প্রমাণ যাওয়া যাচ্ছে নতুন ভারতের নব পর্যায়ের লাভ জিহাদের প্রকল্পে। উত্তরপ্রদেশে অধ্যাদেশের মাধ্যমে পুলিশ এবং বেসরকারি ছোট-বড় হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের কর্মীদের যৌথ অভিযান শুরু হয়েছে,আন্তঃধর্মে বিবাহে ইচছুক যুবক-যুবতীর উপর নজরদারি,হেনস্থা,বলপূর্বক বিয়ে ভেঙে দিয়ে মুসলিম সম্প্রদায়ের যুবক বরকে হাজতে নিয়ে যাওয়া ঘটেই চলেছে। এই নিবন্ধ লেখার সময় পর্যন্ত অর্থাৎ এই অর্ডিন্যান্স পাস হওয়ার সময় (২৭ নভেম্বর) থেকে একমাস জুড়ে উত্তরপ্রদেশের পুলিশ হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলোর যোগসাজসে ৫১জনকে গ্রেফতার করেছে, ডজন খানেক এফআইআর রুজু করা হয়েছে। প্রায় সবকটি ক্ষেত্রে তৃতীয় পক্ষ (পড়ুন উগ্র হিন্দুত্ববাদী ভিজিলান্ট গোষ্ঠী) থানায় অভিযোগ দায়ের করেছে। এমনকি, পুলিশ নাবালকের বিরুদ্ধে ভুয়ো অভিযোগ এনে বেআইনিভাবে হাজতে গ্রেফতার করে রেখে দিয়েছে। রুপালী রেখা একটা, এলাহাবাদ হাইকোর্ট প্রশংসনীয় হস্তক্ষেপ করে আন্তঃধর্ম বিবাহকে রক্ষা করছে বার বার,বিবাহিত দম্পতিদের পুলিশি নিরাপত্তার আদেশ দিচ্ছে। তবু সংবাদে প্রকাশ, উত্তরপ্রদেশ জুড়ে ত্রাসের আবহাওয়া সৃষ্টি করেছে যৌথভাবে পুলিশ প্রশাসন ও হিন্দু যুব গুন্ডা বাহিনী। আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ে শতবর্ষ প্রতিষ্ঠা দিবস অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর ঐতিহাসিক বক্তব্যের (ধর্ম এবং জাতপাতের |র্ধ্বে মানবতাকে স্থান দিতে হবে, এবং বহু স্বরের বৈচিত্র ভারতীয় সভ্যতার গর্ব ইত্যাদি) কোনও গুরুত্বই তাঁর দল, উত্তরপ্রদেশ বিজেপি বা হিন্দুত্ববাদীরা দিচ্ছে না। কারণ, তারাও জানে, সাংবিধানিক প্রধান হিসাবে প্রধানমন্ত্রীকে এসব প্রকাশ্যে বলতে হয়। তাই তাঁর বলা। আসলে, সেই তিনিই তো প্রকাশ্যেই উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রীর ভূয়সী প্রশংসায় পঞ্চমুখ! প্রধানমন্ত্রী নিজে এও জানেন যে, লাভ জিহাদ ভুয়ো এবং সংবিধান বিরোধী। তবুও তিনি তাঁর মূল আদি সংগঠন আরএসএস-এর আদর্শে আজও অটল থাকার সুবাদে তাঁর Subterranean স্তরে এই সমস্ত ভুয়ো প্রকল্পের প্রতি পূর্ণ সমর্থন জুগিয়ে যাচ্ছেন পাথুরে নীরবতার মাধ্যমে।   

        ভুয়ো, কাল্পনিক আলোচ্য প্রকল্পটির উদ্দেশ্যকে আইনি সুরক্ষা দেওয়ার জন্য পাতলা আবরণ দেওয়া হয়েছে অবশ্য, উত্তরপ্রদেশের আইন কমিশনের প্রধান প্রাক্তন বিচারপতি মিত্তলের পরামর্শে, জোর করে ধর্মান্তকরণ রোখবার তাগিদেই যেন আলোচ্য অধ্যাদেশ! বিচারপতি স্বীকার করে নিয়েছেন, সরাসরি লাভ জিহাদ বা আন্তঃধর্ম আটকাবার লক্ষ্যে প্রণীত কোনও আইন ধোপে টিকবে না, অতএব ঘুর পথে, যদিও ভারতে বলপূর্বক ধর্মান্তকরণ রুখতে দন্ড সংহিতা সহ একাধিক নির্দিষ্ট আইন চালু আছে। তবু, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে ভিন ধর্মে বিবাহের সঙ্গে ধর্ম পরিবর্তন জুড়ে দেওয়া হল। এটার আইনি পথপ্রদর্শক কিন্তু হিমাচল প্রদেশ (২০০৬) এবং উত্তরাখণ্ড (২০১৮)। তবু উত্তরপ্রদেশ এখন নজর কাড়ছে কারণ অধ্যাদেশ পাস করিয়েই যুদ্ধকালীন তৎপরতায় আগ্রাসী ভাবে তার প্রয়োগ। ইসলামোফোবিয়া ভূত তাড়া করে বেড়াচ্ছে ক্ষমতাসীন হিন্দুত্ববাদী শক্তিদের,তাই মধ্যপ্রদেশ, হরিয়ানা ও কর্নাটক দোসর হতে রাজি হয়েছে। নির্বাচিত সরকারকে সম্পূর্ণ ন্যক্কারজনক কায়দায় ভেঙে ক্ষমতায় আসীন বিজেপির মধ্যপ্রদেশ সরকার বিধানসভা পর্যন্ত এড়িয়ে উত্তরপ্রদেশের মতোই অধ্যাদেশ জারি করতে চলেছে। পরবর্তী প্রকল্প অভিন্ন দেওয়ান বিধি চালু করার।

   

(লেখকঃমানবাধিকার আন্দোলনের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব)

              


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only