বৃহস্পতিবার, ৪ মার্চ, ২০২১

বাংলা সাহিত্যের মেধাবী কথাকার সোহারাব হোসেন



বাংলা সাহিত্য জগতে সোহারাব হোসেন একটি নক্ষত্র৷ উপন্যাস, গল্পের জাদুকরী বয়ান চমকে দিয়েছে পাঠককে৷ গত ২ মার্চ ছিল তাঁর প্রয়াণ দিবস৷ তাঁর জীবন ও সাহিত্য নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করেছেন 

গোলাম রাশিদ

--------------------------------
উত্তর চব্বিশ পরগণা জেলার বসিরহাটের একটি গ্রামের নাম সাংবেড়িয়া। বাবা-মা আর ছোট্ট বোনকে নিয়ে মাটির ঘরে সংসার একটি কলেজ-পড়ুয়া ছেলের। দারিদ্র তাদের দাওয়ায়, উঠোনে রোদের মতো খেলা করে। বসিরহাট কলেজের বাংলা অনার্সের ছাত্র সে। তখন সে বিএ তৃতীয় বর্ষে পড়ছে।  রোজগারের তাগিদে আর শেখার অদম্য ইচ্ছা নিয়ে একটি খবরের কাগজে শিক্ষানবিশ হিসেবে যোগ দিল স্বল্পভাষী ছেলেটি। গ্রামের ছেলে সকালে উঠে আসত ট্রেন ধরতে। বাড়ি ফিরত শেষ ট্রেনে। শেষ ট্রেন সে কখনও মিস করত না।

এই ছেলেটি তখন ছিল ক্লাস ফোরের তুখোড় ছাত্র। তার শিক্ষক আবু ছালেক আহমেদ তাকে একটা বই দিয়ে বললেন, যা মুখস্থ করে ফেল। সে সত্যিসত্যিই বইখানা মুখস্থ করে ফেলল । সেটা সাতের দশকের কথা। তখন সেন্টার পরীক্ষা নামে একটি পরীক্ষা হত,  যার সিট পড়ত অন্য কোনও স্কুলে।  আর সেই সেন্টার পরীক্ষায় বসিরহাট পশ্চিম  সার্কেলে ছেলেটি প্রথম হয়। এই ছেলেটিই পরে হয়ে উঠবে বাংলা সাহিত্যের অন্যতম সেরা কথাকার। এ গল্প তারই গল্প।

এ গল্পের শুরু ১৯৬৬-তে। সাংবেড়িয়ার অতিসাধারণ পরিবারে আমিনা বেগম ও রুস্তম আলির ঘরে ২৫ নভেম্বর  জন্ম নিল সোহারাব। নাম রাখার সময় তার বাড়ির লোক কি ভেবেছিলেন ফারসি সাহিত্যের ('শাহনামা', ফেরদৌসি) বীর যোদ্ধা সোহারাবের মতো তাদের ছেলেও জঙ্গের ময়দানে লক্ষ্যে হবে অবিচল, দাঁতে দাঁত চেপে লড়াই করে জয় ছিনিয়ে আনবে এই জীবন যুদ্ধের ময়দানে? না-ভাবলেও সোহারাব সেটাই করেছিলেন। দারিদ্রকে তুড়ি মেরে প্রতিষ্ঠা করবেন বিজয়স্তম্ভ। একদিন অন্ধপ্রায় চোখে রচনা করবেন কালজয়ী গল্প-উপন্যাস। মানুষের ভালোবাসা কান্না হয়ে ঝরবে তাঁর চলে যাওয়া পথের দিকে তাকিয়ে।

আর দশটা গ্রামের ছেলের মতোই কেটেছিল সোহারাবের শৈশবকাল । ছোটবেলায় সোহারাব ছিল গ্রামের চঞ্চল ছেলেদের মতোই দুষ্টু। আর ছিল নেতৃত্ব দেওয়ার সহজাত গুণ। তাই পাড়ার ছেলেদের সঙ্গে খেলার সময় 'সোরাব'  ছিল সর্দার। মার্বেল খেলায় ওর জুড়ি মেলা ভার। নিশানা মিস হত না প্রায় সময়ই। এককথায় পাকা ছেলে। তাই বলে দায়িত্ববোধের কিন্তু অভাব ছিল না। প্রাইমারি স্কুল ঘরের চাবি থাকত তার কাছে। সঠিক সময়ে ঘর খোলার গুরুদায়িত্ব সে পালন করত নিষ্ঠার সঙ্গে। স্বাধীনতা দিবস কিংবা প্রজাতন্ত্র দিবসের দিন সন্ধ্যায় পতাকা নামিয়ে ভাঁজ করে তুলে রাখার দায়িত্বও সে অবহেলা করেনি কখনও।

সোহারাব হোসেন (১৯৬৬-২০১৮) সেই সময় কুঁড়ি। চোখে অনেক স্বপ্ন। কবিতা লেখেন।বেরিয়েছে কাব্যগ্রন্থ 'বৃষ্টির নামতা'। সাড়া ফেলেছে সাহিত্য মহলে। ছাত্রাবস্থাতেই বের করছেন  'গাঙ' নামের একটি লিটল ম্যাগাজিন। স্কুল জীবনে কৃতি ছাত্র হিসেবেই পরিচিত ছিলেন সোহারাব। তবে উচ্চমাধ্যমিকে আশানুরূপ রেজাল্ট না হওয়ায় বাংলা নিয়ে  বসিরহাট কলেজে ভর্তি হন। কিছু কিছু সিদ্ধান্ত লাইফচেঞ্জিং হয়, যা মোড় ঘুরিয়ে দেয় জীবনের। এই সিদ্ধান্তটি ছিল এমনই। বাংলা নিয়ে পড়ার ফলে সাহিত্যের অন্দরমহলে ঢুকে গেলেন সোহারাব। শুরু হল সাফল্যের সিঁড়ি ভাঙা।

বসিরহাট কলেজের কৃতি সোহারাব এম এ পড়ার জন্য ভর্তি হলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে। নাগরিক জীবনের সঙ্গে ওঠাবসা শুরু হল তাঁর। ঠিকানা হল ৫১, বৈঠকখানা রোড, এখনকার কারমাইকেল হলের পুরাতন বিল্ডিংয়ের ৩৮ নং ঘরে। শেয়ালদহর এই হস্টেল স্থাপিত হয় ১৯১৭ সালে। তখনকার ছোটলাট লর্ড কারমাইকেলের নামে হস্টেলের নাম। এই হস্টেলে এক সময় থেকেছেন প্রাক্তন মন্ত্রী আবদুস সাত্তার, মন্ত্রী আবদুর রেজ্জাক মোল্লা, আহমদ হাসান ইমরান-সহ অবিভক্ত বাংলা ও অসমের বহু কৃতি ব্যক্তিত্ব।

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে সোহারাব প্রথম বাঙালি মুসলিম ছাত্র যে বাংলাতে এমএ পরীক্ষায় ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হয়ে নজির সৃষ্টি করেন।
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের গোল্ড মেডালিস্ট সোহারাব এমএ পাশ করার পর গবেষণা শুরু করলেন।  বিষয়: বাংলা ছোটগল্পে ব্রাত্যজীবন (১৯০১-১৯৯০)। গবেষণার সঙ্গে সঙ্গে চলতে থাকল লেখালেখি। এতদিন কবিতা লিখেছেন। এবার গল্পের জাদু নিয়ে হাজির হলেন সোহারাব। এক ভিন্ন আখ্যান,পরিধি আর ভাষা, সঙ্গে মনস্তত্ত্বের মিশেল। আর পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার মুহুর্তেই প্রবেশ করলেন জীবনের দ্বিতীয় পর্বে। বিয়ে করলেন দীর্ঘ দিনের আপনজন মুনিয়া বারিকে। শুরু হল পথচলা। এ পথের শেষ কোথায়?

সোহারাব----সাফল্যের শীর্ষে
--------------------------------
সোহারাব হোসেন লেখক হিসেবে সফল একজন লেখক। যাঁরা লেখক হিসেবে খুব সফল হন, তাঁরা অ্যাকাডেমিক দিকে অত সফল হন না। ব্যতিক্রম আছে। যেমন: হুমায়ূন আহমেদ। হুমায়ূন পলিমার কেমিস্ট্রিতে  আমেরিকা থেকে পিএইচডি করে এসেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক ছিলেন। এক সময় লেখালেখি ও ছবি পরিচালনা করার জন্য শিক্ষকতা ছাড়েন। সোহারাব হোসেন শিক্ষকতা ছাড়েননি। তিনি দক্ষভাবে সবকিছু সামলে সাহিত্যিক সোহারাব হয়ে উঠেছেন। এবং মাত্র ৫২ বছরের জীবনে পেশাগতভাবেও  আশ্চর্যজনকভাবে সফল ছিলেন।

তাঁর পেশাগত জীবন কবে থেকে শুরু? সেই অর্থে তিনি যখন কারমাইকেল হস্টেলে থাকতে শুরু করেন তখন থেকেই তাঁর পেশাগত জীবন শুরু হয়ে যায়। রাত তিনটে-চারটে পর্যন্ত তিনি পড়াশোনা করতেন। পুরনো প্রশ্নপত্র,  স্যারেদের সাজেশন দেখে সম্ভাব্য প্রশ্ন তৈরি করতেন। লাইব্রেরী থেকে নিয়ে আসতেন রেফারেন্স বই। নোট বানাতেন। এখন নোট বানানো তো অর্থকরী নয় কিছু। না, সোহারাব সেটাই করতেন। যারা প্রাইভেট কোর্সে এমএ পরীক্ষা দেবে তাদের কাছে সে নোট বিক্রি করতেন। নগদ টাকায়। তাঁর বাবা তখন কলেজ স্ট্রিটে এক ফলের  আড়তে কাজ করতেন। আয় ছিল সামান্যই।  সোহারাব সেটা বুঝতেন ভালোভাবেই। তাই সে নিজেই কিছু রোজগার করে পড়াশোনার খরচ চালানোর চেষ্টা করতেন।

এর পূর্বে সোহারাব কিছুদিনের জন্য সাংবাদিকতা করেছেন। ১৯৮৮ -এর শেষ দিকে সোহারাব 'বর্তমান' পত্রিকায় ট্রেনি জার্নালিস্ট হিসেবে কাজ শুরু করেন। রিপোর্টার ছিলেন তিনি। প্রচণ্ড খাটুনির কাজ ছিল। যেহেতু মানুষটার নাম সোহারাব, তাই পরিশ্রমের ক্লান্তিকে তিনি গ্রাহ্য করতেন না। কোনও কিছু শেখার অদম্য ইচ্ছা তাঁর মধ্যে ছিল। তাই সকালে বেরিয়ে এসে সারাদিন কাজ করে শেষ ট্রেনে ঘরে ফিরতেন। সোহারাব শেষ ট্রেনে ঘরে ফিরেছেন। কোনওদিন থেকেও গেছেন অফিসের উপরে। সেখানে একটা ঘুমোনোর জায়গা থাকত। সোহারাব এই কাজ ১৯৮৯-এর প্রথম দিকেই ছেড়ে দেন। ট্রেনি হিসেবে যা বেতন পেতেন, তার থেকে বেশি খাটুনি ছিল। পড়াশোনার সময় পেতেন না। সোহারাব মনোযোগী পড়ুয়া। তিনি কেন এত ত্যাগ স্বীকার করবেন? অতএব, বর্তমানের পাততাড়ি গুটিয়ে একদিন চলে আসবে সোহারাব। তাঁর এই চলে আসা,  চলে যাওয়া নয়। কারণ সংবাদপত্রের এক বিশাল জগত থেকে তিনি চলে গেলেও সাহিত্যের এক বিশাল জগত তাঁর সামনে খুলে গিয়েছিল। সেই দরজা দিয়ে তিনি ঢুকেছিলেন অনন্ত নক্ষত্রবীথির মধ্যে। সেখানে তিনি ছিলেন আলাদা। শুকতারার মতো।

মানুষের জীবন কোনও ছোটখাটো উপন্যাসের থেকে কম নয়। আর সে গল্পের চরিত্ররা যদি সোহারাবের কলম থেকে বেরোয়, তবে তারা হয় বাস্তব থেকে তুলে নেওয়া একটুকরো জীবনের গল্প। সোহারাবের জীবন কোনও ছোটগল্পের চেয়ে কম কিছু নয়। তাঁর 'মহারণ' উপন্যাসের  সেই কেয়ামতের মতো, যে  আত্ম-আবিষ্কারের আশায় ছুটে বেড়ায় দিকশূন্যপুরের দিকে। সোহারাবও থেমে থাকেনি এক জায়গায়। এমএ পড়েছেন মন দিয়ে। এরপর তাঁর সামনে খুলে গেছে পেশাগত জীবনের এক একটি দরজা।

এমএ পাশ করে  বিএডে ভরতি হন। টিউশন পড়ানো শুরু করেন। এ যেন বাঙালির এক কুটির শিল্প। অনার্স, এমএ কিছুই বাদ দেননি তিনি। সবাইকে পড়াতে শুরু করেন যত্নসহকারে।  কিন্তু এটা লেখার কী প্রয়োজন? আসলে সোহারাব যে পরবর্তীকালে একজন জনপ্রিয় শিক্ষক হয়ে উঠবেন তার পটভূমি এখানেই রচনা হতে শুরু করে। তাঁর পড়ানোর স্টাইল, টেকনিক, মৌলিকতা সবকিছুই ছিল নতুনত্বে মোড়া। এই সময় আংশিক সময়ের অধ্যাপক রূপে যোগ দিলেন বসিরহাট কলেজে। সালটা ১৯৯১। দু'বছর এখানে তিনি যোগ্যতার সঙ্গে পড়িয়েছেন। কলেজে সেই সময় পার্ট টাইম শিক্ষকদের অনার্স ক্লাস দেওয়া হত না। সোহারাব হোসেন সমস্ত বাধা-বিঘ্নকে অতিক্রম করে সকলের মন জয় করে নেন। তাঁর পড়ানোর কৌশল জনপ্রিয়তা পায়। কলেজ তাঁকে অনার্সের ক্লাস দিতে বাধ্য হয়।

এরপর সোহারাব স্কুলে স্থায়ী চাকরি পেলেন। এটা অতি আনন্দের ছিল তাঁর জন্য। যেখানে কৈশোরকালের একটা মূল্যবান অংশ কেটেছে,  রঙিন জীবনের স্বপ্নের দেখা মেলে যে ময়দানে, সেই ধান্যকুড়িয়া হাই স্কুলে তিনি শুরু করলেন পেশাগত জীবনের প্রথম ইনিংস। বাংলার শিক্ষক হিসেবে এখানে যোগ দিলেন তিনি। ১৯৯৩ থেকে ১৯৯৬ পর্যন্ত তিনি এখানে শিক্ষকতা করেছেন।
পিএইচডি শেষে  অধ্যাপক হিসেবে কলকাতার আনন্দমোহন কলেজে যখন যোগদান করলেন তখন সালটা ১৯৯৬।  এই বছরেই বেরোবে তাঁর প্রথম গল্পগ্রন্থ 'দোজখের ফেরেশতা'। চমকে দিলেন সায়েব আলির স্রষ্টা। সে কবর খোড়ে। আর এই কবর দেওয়ার সময় নাকে আসে মৃতদেহের গন্ধ। গন্ধের ধরন দেখে সে বুঝতে পারে, মুর্দা দোজখে যাবে, না বেহেশতে। গল্পের শেষে সায়েব আলি দেখে তার নিজের না-মরা দেহ থেকেই পচা গন্ধ বেরোচ্ছে।

তাঁর বর্ণবহুল পেশাগত জীবনের অন্যতম অধ্যায় হচ্ছে পশ্চিমবঙ্গ মাদ্রাসা শিক্ষা পর্ষদের সভাপতি পদে যোগ দেওয়া। ২০০৬ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি এই কাজে যোগ দেন। এতদিন শিক্ষামহলে তাঁর জয়জয়কার ছড়িয়ে পড়ছিল।  এবার শিক্ষাজগতের বাইরে প্রশাসনিক মহলে সোহারাব রাজার মুকুট পরলেন। কাকদ্বীপ থেকে কোচবিহার তাঁর ছোটা শুরু হল । মাদ্রাসা শিক্ষার পুনর্গঠনে তাঁর ভূমিকা যথেষ্ট। একটা ঘুমন্ত জাতিকে জাগাবার জন্য তিনি এগিয়ে এসে ব্যাটন তুলে নিলেন। মাদ্রাসা শিক্ষা পর্ষদের সভাপতি হয়ে তিনি এলেন মুসলিম সমাজের একেবারে অন্দরে। তাদের হাল-হকিকত বুঝে নিলেন, পরখ করলেন।  তাদের সঙ্গে নিবিড়ভাবে মিশলেন। তিনি একজন লেখক। আগেও তিনি তাঁর অন্তর্ভেদী অর্জুনের দৃষ্টি দিয়ে দেখেছেন সমাজকে। এবার তিনি তা দেখলেন বৃহত্তর রূপে। দিনাজপুর,মালদা, মুর্শিদাবাদ,  দক্ষিণ ২৪ পরগনা--বাংলার মুসলিমদের জবানবন্দি লিপিবদ্ধ হল তাঁর কাছে। আর তাঁর উপলব্ধি হল অনন্য। যে কাউকে নাড়া দেবে তাঁর এই কথাগুলো---
'গতানুগতিক ধর্মাচরণ আমার ভালো লাগে না। ইসলাম ও মুসলমানের মধ্যে আমার কাছে আগে মুসলমান, পরে ইসলাম। আমি মুসলমানের ভালো চাই। চাই মুসলমান সুস্থ-সুন্দর-শুভ ও সংস্কৃতি মনস্ক হোক। মুসলমান সুন্দর হলে ইসলামের ভালো হবে। ইসলাম ভালো, শাশ্বত।  কিন্ত সমাজে ভালো মুসলমান না তৈরি হলে ইসলামকে কেউ ভালো বলবে না। '

লেখকের এক জীবন
------------------
একজন লেখক একজন স্রষ্টা।  তিনি দেখেন, যা সাধারণ মানুষ দেখতে পেলেও উপলব্ধি করতে পারে না। তিনি লেখেন। কালের ইতিহাস তাঁর কলমের কালিতে লেখা হয়। সে অর্থে জীবনের সীমিত সময়  এই ইতিহাস লিখনের কাজে ব্যয় হয়। তার মূল্যায়ন,  ব্যাপ্তি, প্রভাব ছড়িয়ে যায় যুগ-যুগান্তরের সীমানা ছাড়িয়ে। তিনি হয়ে ওঠেন কালজয়ী।  তখন আমরা লেখকের জীবনকে এক জীবন বলতে পারি না। কিন্তু নশ্বর পৃথিবীর জীবনকে বাস্তব দৃষ্টিতে দেখলে যে এক জীবন আমরা পাই তা সোহারাব হোসেন কাটিয়েছেন তুমুল বৃষ্টিপাতের মধ্যে। এই বৃষ্টি সৃষ্টিধারার, সৃষ্টিকালের।বৃষ্টিতে উর্বর হয়ে উঠেছে সাহিত্যের আঙ্গিনা। যে ফসল ফলেছে, তার প্রভাব,ব্যাপ্তি আমরা জানি না। জানি শুধু এক জীবনের প্রাপ্তি।

সোহারাব হোসেন লেখালেখি শুরু করেন কবিতা দিয়ে। কাফেলা ও নতুন গতি আটের দশকে তখন রমরমিয়ে চলছে। আবদুল আজীজ আল আমানের নেতৃত্বে বসছে শেষ রোববারের সাহিত্য আসর। তারুণ্য আর অভিজ্ঞতার মিশেলে তৈরি হচ্ছে  এক নতুন অঙ্গন। সেখানে সোহারাবের উপস্থিতি ছিল। কাফেলা ও নতুন গতির পুরনো সংখ্যা খুঁজলে স্কুল ছাত্র সোহারাবের লেখা মিলতেই পারে।
কথাসাহিত্যিক সোহারাবের আধিপত্যে কবি সোহারাব চাপা পড়ে গিয়েছে। তিনিও নব্বইয়ের দশকের পর তেমন একটা কবিতা লেখেননি। তবে অল্প সময়ের কবিতা চর্চায় তিনি যে স্বাক্ষর রেখে গেছেন তা হেলাফেলা করবার মতো নয়।
'তমাল-তরু আবরণে কাঁচুলির আভা ফোটে লতানো ঘুমের দেশে, /
আজ এই বাংলায় চটকল শ্রমিকের পা ঘেঁসে জন্মায় নবীন ঘাস,/
সিদ্ধ-পুরুষ মুনির সাধনায় ঘামজলের ফোঁটা পড়ে দুরন্ত বালকের,/
বাঙালির তপোবনে চরে আজ বিষ্ঠাময় এ যুগের লাস। '

এই কবিতার ভাষা সোহারাবের একান্তই নিজস্ব।  ১৯৮৭তে প্রকাশিত হয় প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'রক্তদেহে অন্যস্বর'। এরপরের বছর 'বৃষ্টির নামতা'। এই দুখানা কবিতার বই ও কিছু অগ্রন্থিত কবিতা দিয়ে পরবর্তীকালে 'কবিতা সংগ্রহ' সংকলনটি প্রকাশিত হয়।

সোহারাবের নিজস্ব ভুবন উপন্যাস ও ছোটগল্প।  তিনি এমন কিছু উপন্যাস লিখেছেন যা এত কম বয়সে লেখা সম্ভব নয়। তাঁর কাহিনি জুড়ে থাকে আমাদের না-দেখা মানুষেরা, তাদের সংলাপ আর মনের জটিল আবর্ত। প্রথমেই চলে আসে তার মহাকাব্যিক উপন্যাস 'মহারণ'-এর কথা। মহারণের পটভূমি বিস্তৃত। নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে, কেয়াপাতার নৌকা, পূর্ব-পশ্চিম, খোয়াবনামা,  অলীক মানুষ, তিস্তাপারের বৃত্তান্ত প্রভৃতি উপন্যাসের সঙ্গে পাশাপাশি রেখে মহারণ কখনও আলোচিত হয়নি। মহারণ খুব অল্প বয়সের লেখা। কেয়ামত যেন এক জীবন্ত ফসিল।  সে কখনো বাস্তবতার মাটিতে পা দিয়ে চলতে থাকে। কখনো বা চলে যায় সুদূর অতীতে। সেই অতীতে যেখানে তাদের সব ছিল। এই উপন্যাসে সোহারাব দেখিয়েছেন মালিক শ্রেণি ও শ্রমিক শ্রেণির দ্বন্দ্ব। যা যুগের পর যুগ ধরে চলে আসছে। এক রাজা যায়, অন্য রাজা আসে। কেয়ামতরা পদদলিত হতে থাকে। ফকির বিদ্রোহের নেতা মজনু শাহকে আদর্শ করে কেয়ামত লড়াই করার কথা ভাবে। সোহারাবের গল্প বলার একটি বৈশিষ্ট্য এই যে, তিনি অতীতচারী। অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে তিনি বর্তমানে প্রয়োগ করেন। ফকির মজনু শাহ আর কেয়ামত যেন দুই শাশ্বত চরিত্র। তাদের লড়াই, আখ্যান, মিথ, কাম-প্রেমের দ্বন্দ্ব, জমির লড়াই, মানুষের জেগে ওঠা সবকিছু মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। রচনা করে এক মহারণের পটভূমি ।

'মহারণ'য়েই  শুধু নয়,  সরম আলির ভুবন, মাঠ জাদু জানে,  সওকাত আলির প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি, গাঙ বাঘিনী,  আরশি মানুষ-সহ এক ডজন উপন্যাসেই মিথকে তিনি উপুর্যপরি ব্যবহার করেছেন, অতীত ইতিহাসের সঙ্গে বর্তমানের ব্যঞ্জনাকে মিলিয়েছেন, বলেছেন অন্ত্যজ মানুষের জীবনের কথা। বসিরহাট, সুন্দরবনের গ্রামের মানুষের মুখের ভাষা ফুটে উঠেছে তাঁর লেখায়। 'মহারণের কথনশৈলী প্রসঙ্গে' শীর্ষক এক নিবন্ধে ড. সাইফুল্লা জানাচ্ছেন, বঙ্কিম যুগে বাংলা উপন্যাসের কথনশৈলীতে প্রায়শ নাটকীয় ঢঙের অনুবর্তন লক্ষ করা যেত। চরিত্রের নাম উদ্ধৃত করে তার সংলাপ সন্নিবিষ্ট করা হত। উত্তরকালে এই রীতি প্রায় পরিত্যক্ত হয়। সোহারাব ঠান্ডা ঘরে চলে যাওয়া সেই রীতিকেই নতুন করে প্রতিষ্ঠা দিয়েছেন তাঁর উপন্যাসে। এ জন্যই তিনি ভিড়ের মধ্যে আলাদা একটি চলার পথ করে নিতে পেরেছিলেন৷


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only