রবিবার, ১৪ মার্চ, ২০২১

কিডনি কথা

শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ কিডনির কোনও সমস্যা হলে যেমন ভয়ের কারণ রয়েছে, তেমনি সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে কিডনি রোগ নিরাময় করা সম্ভব। কিডনি রোগ তা প্রতিরোধের উপায় সম্পর্কে জানাচ্ছেন কনসালট্যান্ট নেফ্রোলোজিস্ট অ্যান্ড রেনাল ট্রান্সপ্ল্যান্ট ফিজিসিয়ানডা. অনুপম মজুমদার। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ওসিউর রহমান

 


 

দিন দিন কিডনি রোগীর সংখ্যা বাড়ার কারণ কী?

ব্যস্তময় ইঁদুর দৌড় জীবনযাপন, মানসিক চাপ, শাকসবজিতে কীটনাশক ব্যবহার,  পরিবেশ দূষণ, তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার, অনিয়মিত ঘুম, বেশি পরিমাণে লবণ তেল-মশলাযুক্ত খাবার গ্রহণ প্রভৃতি ফ্যাক্টর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে কিডনি খারাপ হওয়ার জন্য অনেকাংশে দায়ী।

কী করে বুঝব যে কিডনির রোগ হয়েছে?

বোঝার একমাত্র উপায় প্রতি বছর নেফ্রোলজিস্টর পরামর্শ নেওয়া। পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্যে প্রথমেই ইউরিন পরীক্ষা করতে হবে। রক্তে ইউরিয়া, ক্রিয়েটিনিন, হিমোগ্লোবিন, ক্যালসিয়াম, ইউরিক অ্যাসিডের পরিমাণ ঠিক আছে কিনা দেখতে হবে

এছাড়া কিডনির আলট্রাসোনোগ্রাফি করতে হবে। তবে যদি ইউরিনের মাধ্যমে প্রোটিন মাত্রা অতিরিক্ত বেরিয়ে যায়আরবিসি বেরিয়ে যায়, কিডনির সাইজ যদি ছোট হয়ে যায় তাহলে কিডনির রোগ হয়েছে বলে বোঝা যায়।

কোমরে ব্যথা বা প্রস্রাব লালচে হলেই কিডনির সমস্যা বলে মনে করা হয়এটা কি ঠিক?

কিছু কিছু কিডনির সমস্যায় এটা হতে পারে। যেমন পাথর হলেপলিসিস্টটিক রোগ হলে বা কিডনি রোগ থেকে ক্যালসিয়াম কমে গেলে। তবে কোমরে ব্যথা মানে কিডনির সমস্যা তা নয়।

কী কী কারণে এই ধরণের সমস্যা হতে পারে?

প্রস্টেট বা মূত্রথলির ক্যানসারের মত সমস্যা হলে এই ধরণের সমস্যা দেখা দিতে পারে। সেইজন্য এই রকম সমস্যা দেখা দিলেই যতশীঘ্রই নেফ্রলোজিস্ট দেখানো তাঁর পরামর্শমত চিকিৎসা চালানো প্রয়োজন।

কিডনির রোগের লক্ষণ কী?

সাধারণ ভাবে কিডনি রোগের লক্ষণ খুব ভাল ভাবে বোঝা যায় না। যতদিন পর্যন্ত কিডনিটা ৭০-৮০ শতাংশ খারাপ না হয় ততক্ষণ বোঝা যায় না। সেইজন্য এই রোগটা সায়েলেন্ট কিলার বলা হয়। তবে কিছু লক্ষণ দেখা দেয় যেমন- ক্ষুধামান্দ্য, বমি বমি ভাব, ঘন ঘন জ্বর হওয়া–, প্রস্রাবে জ্বালা, মাথা ঘুরানো, দুর্বল লাগা, চোখের পাতা ফুলে যাওয়া, সকালের দিকে পা ফুলে যাওয়া, হঠাৎ করে উচ্চ রক্তচাপ ধরা পড়া, রক্তাল্পতা ইত্যাদি।

কী কী কারণে কিডনি রোগ হয়?

কিছু রোগ আছে যেগুলো সরাসরি কিডনির ক্ষতি করে। আবার এমন কিছু স্টিস্টেমিক রোগ আছেসেগুলো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে দেহের অন্যান্য অঙ্গের সঙ্গে সঙ্গে কিডনিরও ক্ষতি করে। যেমন- অনিয়ন্ত্রিত উচ্চরক্তচা ডায়াবেটিস থাকলে কিডনির রোগ হওয়ার সম্ভাবনা অনেকগুণ বাড়িয়ে দেয়। বংশে কিডনি রোগী থাকলে পরিবারের অন্য কারও সেই রোগ হতে পারে। এছাড়া মূত্রে সংক্রমণ, কিডনিতে বার বার পাথর হওয়া, কানেক্টিভ টিসু ডিসঅর্ডার, প্রসেস্ট বৃদ্ধি, শরীরের অন্য অংশে ইনফেকশন,  অতিরিক্ত মদ্যপানজল কম খাওয়া প্রভৃতি কারণে কিডনির সমস্যা হতে পারে।

কখন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে যাওয়া অবশ্যক?

ইউরিনে ফেনা হওয়াসকালে ঘুম থেকে উঠলে মুখ পা ফোলারক্তাল্পতা, প্রস্রাব লাল হওয়া, প্রস্রাব কম হওয়া, শ্বাসকষ্ট প্রভৃতি উপসর্গ দেখা গেলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ জরুরি।

কিডনি রোগ কি নিরাময়যোগ্য? রোগ নির্ণয়ের জন্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা কী?

কিছু কিছু কিডনি রোগ প্রাথমিক অবস্থায় ধরা পড়লে নিরাময় করা সম্ভব। তবে বাকিগুলি নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে।

রোগ নির্ণয়ে ইউএসজি (কেইউবি)– ইউরিনের রুটিন চেক আপমূত্রে অ্যালবুমিন ক্রিয়েটিনিন সমতা পরীক্ষা এবং প্রয়োজন হলে কিডনি বায়োপসি করতে হয়।

 ডায়াবেটিকদের কি কিডনি রোগ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে?

কিডনির রোগের প্রধান কারণ হল ডায়াবেটিস। যাদের ডায়াবেটিস থাকে তাদের ৫০ শতাংশেরও বেশি লোকের ডায়াবেটিক কিডনি ডিজিজ হতে পারে। নিয়মিত চেক আপের মধ্যে থাকলে ডায়াবেটিস যে কিডনিটার ক্ষতি করতে যাচ্ছে তা বোঝা যায়। এবং সেটা করা গেলে ওষুধের মাধ্যমে কিডনি খারাপ হওয়ার গতিটাকে অনেকটা ধীরে করে আনা সম্ভব। তাছাড়া ডায়াবেটিস রোগীদের নন-ডায়াবেটিক কিডনি ডিজিজও হতে পারে।

কখন কিডনি ফেলিউর বলা হয়?

যখন বিভিন্ন অসুখের কারণে কিডনিদুটি স্বাভাবিক ভাবে কাজ করতে পারে না বা কিডনির কার্যক্ষমতা কমে যায় তখন তাকে কিডনি ফেলিউর বলা হয়। এক্ষেত্রে মূত্রের সঙ্গে হাই লেভেল ইউরিয়া যায় এবং তার সঙ্গে অন্যান্য প্যারামিটারগুলি অ্যাবনরমাল হয়ে যায়। যেমন- রক্তল্পতা হতে পারেইউরিক অ্যাসিড এবং ফসফেটের মাত্রা বেড়ে যেতে পারে। ক্যালসিয়াম কম হয়ে যেতে পারে। হাড়ে ব্যথা হতে পারেক্রিয়েটিনিন এবং ইউরিয়া লেবেল বেড়ে যেতে পারেইলেক্ট্রোলাইট অ্যাবনরমাল হতে পারে।

ডায়ালিসিস বা কিডনি প্রতিস্থাপন কখন প্রয়োজন?

যখন কিডনি ৯০ শতাংশ খারাপ হয়ে যায় এবং তার সঙ্গে অসহ্যকর কিডনি ফেলিওর লক্ষণগুলি চলে আসে।

কিডনি সুস্থ সবল রাখতে আপনার পরামর্শ...

রক্তচাপব্লাড সুগার নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবেইউরিনে জ্বালা হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। এছাড়া পর্যাপ্ত পরিমাণে জল ( থেকে . লিটার) খাওয়ানুন কম খাওয়াফাস্ট ফুড এড়িয়ে চলামাদক দ্রব্য না খাওয়াওজন নিয়ন্ত্রণে রাখাসকাল বিকালের খাবার সঠিক সময়ে খাওয়াযতটা সম্ভব মানসিক চাপ উত্তেজনাকে এড়িয়ে চলাসর্বোপরি বছরে অন্ততঃ একবার কিডনির কোনও সমস্যা আছে কি না সেটা জানার জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া।

কিডনি রোগীর খাদ্য তালিকা

 

 কী কী খাবার খাওয়া যাবে না

দুধ দুধজাত খাবারমাখনঘিচীজভাজা খাবারডাবের জলফলের রসকোল্ড ড্রিংকযে কোনও টক জাতীয় ফলকাজুকিসমিসআখরোটবাদাম নারকেলচকোলেটযে কোন শাকওনিম পাতাকারী পাতামাসরুমকাঁঠালের বীজকচু ডাটা লতিরাঙালুকাঁচা কলাওলকচুআমলিচুকাঁঠালকলাবেদানাতরমুজসবেদাগুড়মধুমিঠাইকেকনোনতা বিস্কুটআচারসসপাঁঠার মাংসডিমের কুসুমমাছের মাথামাছের ডিমমাছের তেলচিংড়িকাঁকড়া।

মাঝে মাঝে খাওয়া যাবে

- ঘণ্টা জলে ভিজিয়ে (লিচিং) রাখা যে কোনও ডাল বা ডালের তৈরী জিনিস। এছাড়া স্যুপশুকনো লঙ্কাধনেজিরেমেথি দানাপোস্তসরষেডবল টোনড দুধটোনড দুধ।

যেসব খাবার খাওয়া যাবে

) সবজির মধ্যে পটলশিমফুলকপিওলকপিগাজরপেঁয়াজসাদা মূলোকরলাবেগুনবীনস্বরবটীপেঁয়াজকলিকুমড়োক্যাপসিকামবীটআলু। (লিচিং টাইম ঘণ্টা) ) উচ্ছেকরেলাঝিঙেলাউপেঁপেচিচিংগেমেথি শাকশশাকাঁচা আমকাঁচা কুমড়োস্যালাড (শশাপেঁয়াজ) লিচিং টাইম ১০-১৫ মিনিট। ফলের মধ্যে আপেলপাকা পেঁপেপেয়ারানাসপতি।

এছাড়া মাছমাংসডিম ৭০-৮০ গ্রাম প্রতিদিনযাদের ডায়ালিসিস হচ্ছে তাদের জল খাওয়ার পরিমাণ ৫০০-৮০০ মিলি. প্রতিদিনকিডনি রুগী অথচ যাদের ডায়ালিসিস হয় না তাদের জল খাওয়ার পরিমাণ -. লিটার প্রতিদিন। ডাল ৫০-৭০ গ্রাম একদিন ছাড়া। তবে অন্যান্য টক জাতীয় জিনিস খাওয়া একদম বাদ হলেও টক দই তিনবেলা খাওয়া যেতে পারে।

যোগাযোগ­ ৯৮৩৬১৬২৪১০

 

 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only