মঙ্গলবার, ২৩ মার্চ, ২০২১

অসমে বিজেপির বিজয় সহজ হবে না, মহাজোটও দিসপুরের সমান দাবিদার

বিশেষ প্রতিবেদক: সেভেন সিস্টার্স’-এর গুরুত্বপূর্ণ রাজ্য অসমে ২৭ মার্চ থেকে বিধানসভা ভোট হতে চলেছে। পরে অবশ্য আরও দুদফায় নির্বাচন হবে। তারিখ হল এপ্রিল এপ্রিল। অসম বিধানসভায় ১২৬টি আসন রয়েছে। অর্থাৎ কোনও পক্ষ ৬৪টি আসন দখল করতে পারলেই সরকার গঠন করতে পারবে। অসম প্রদেশটি বিজেপির জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, উত্তর-পূর্ব ভারত নিয়ে বিজেপির যে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা রয়েছেঅসমে জিততে না পারলে তার বাস্তবায়ন অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।



২০১৬- বিধানসভা নির্বাচনে ১২৬টি বিধানসভা কেন্দ্রের মধ্যে কংগ্রেস পেয়েছিল মাত্র ২৬টি। তাদের ভোট-শেয়ার ছিল ৩০. শতাংশ। বিজেপি ২৯. শতাংশ মানুষের ভোট পেয়ে ৬০টি আসন হাসিল করেছিল। বিজেপির মিত্র দল অসম গণপরিষদ (এজিপি) মোটামুটি ১২ শতাংশ এবং বোড়োল্যান্ড পিপলস ফ্রন্টও (বিপিএফ) ১২ শতাংশ ভোট পেয়ে যথাক্রমে ১৪ ১২টি আসন হাসিল করে। ফলে শাসক বিজেপি জোটের আসন সংখ্যা দাঁড়ায় ৮৬-তে। ২০১৬- পর কংগ্রেসের আসন সংখ্যা কমে গিয়ে দাঁড়ায় ১৯-এ। পূর্বতন মুখ্যমন্ত্রী এবং কংগ্রেস নেতা তরুণ গগৈয়ের মৃত্যুর ফলেও কংগ্রেস দল অসমে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখন কংগ্রেসের একটি বড় সমস্যা হচ্ছে দলটির মধ্যে নেতৃত্বের অভাব।

তবে একটি বিষয়ে কংগ্রেস কৃতিত্ব দাবি করতে পারে। তারা বেশ কয়েকটি দলকে নিয়ে একজোট গঠনে সক্ষম হয়েছে। আর এই জোটের মদদেই কংগ্রেস পুনরায় অসমের রাজধানী দিসপুর দখলের স্বপ্ন দেখতে আরম্ভ করেছে। অনেকে বলছেনযদি কংগ্রেস ২০১৬ সালে এআইইউডিএফ-এর সঙ্গে জোট গঠন করতে পারত তাহলে হয়তো বিধানসভা নির্বাচনে তাদের ফলাফল এতটা খারাপ হত না। বর্তমানে কংগ্রেসের সঙ্গে জোটে রয়েছে বদরুদ্দিন আজমলের নেতৃত্বাধীন এআইইউডিএফ (গত বিধানসভা নির্বাচনে তারা ১৩টি আসন দখল করেছিল) এবার কংগ্রেসের সঙ্গে জোটে আরও শামিল হয়েছে সিপিএমসিপিআইআঞ্চলিক গণমোর্চা এবং সিপিআইএমএল (লিবারেশন)

মনে করা হয়এআইইউডিএফ বঙ্গীয় মূলের মুসলিমদের মধ্যে যথেষ্ট প্রভাব রাখে। আর তারা মধ্য এবং নামনী বা নিম্ন অসমে ৩০টি আসনে ফলাফল পালটে দিতে সক্ষম। ছাড়া অসমের বরাক উপত্যাকার ৩টি জেলাতেও বাংলাভাষী মুসলিমরা সংখ্যার বিচারে খুবই প্রভাবশালী। অবশ্য কংগ্রেসের একটি অংশ এআইইউডিএফ-এর সঙ্গে জোট করার বিরোধী ছিল। তাদের বক্তব্য ছিলবদরুদ্দিন আজমলের সঙ্গে জোট হলে তা উজনী অসমে কংগ্রেসের ভোট প্রাপ্তির ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। উজনী বা আপার অসমে ৪৫টি আসন রয়েছে।

কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন জোটটিকে অসমেমহাজোটবলে অভিহিত করা হচ্ছে। এই জোট নতুন করে শক্তিশালী হয়েছে বোড়োল্যান্ড টেরিটোরিয়াল এলাকায়। কারণবোড়োল্যান্ড পিপলস ফ্রন্ট বা বিপিএফ অসমের বিজেপি নেতৃত্বাধীন কোয়ালিশন ছেড়ে কংগ্রেসের মহাজোটে যোগদান করেছে। ছাড়া কংগ্রেস আরও ২টি নতুন আঞ্চলিক দলের সঙ্গেও সমঝোতা করার চেষ্টা করছে। এই দল ২টি হল রাইজর দল (জনগণের দল) এবং অসম জাতীয় পরিষদ। আশা করা হচ্ছেএই দল ২টিও মহাজোটের সঙ্গে একসঙ্গে নির্বাচনে লড়বে।

বিজেপির পার্টনার এজিপি- একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন২০১৬ সালে এআইইউডিএফ ১৩টি আসন পেয়েছিল। আর বিপিএফ পায় ১২টি আসন। এআইইউডিএফ-এর ভোট শেয়ার ছিল ১৩ শতাংশ। আর বিপিএফ ১২ শতাংশ ভোট পেয়েছিল। আর যদি ভোট প্রাপ্তির এই হারকে কংগ্রেসের সঙ্গে যোগ করা হয় তাহলে ৩টি দল মিলে ভোট পাবে প্রায় ৫৭ শতাংশ। যদি এবারও ২০১৬- মতোই এই ৩টি দল ভোট পায়তাহলে কিন্তু বিজেপি- পক্ষে ক্ষমতায় ফেরা একটু মুশকিলই হবে।

অসমে এই ভোটে বিজেপির প্রধান অস্ত্র কিন্তু সাম্প্রদায়িকতা। পশ্চিমবঙ্গে ভোটে অনুপ্রবেশমুসলিম তোষণ এগুলির কথা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি কিংবা সভাপতি অমিত শাহ তুললেও তা তাঁরা করেছেন সাধারণভাবে। একমাত্র শুভেন্দু অধিকারী ছাড়া বিজেপির আর কেউই হিন্দু-মুসলমান বিভাজন সম্প্রদায়িকতাকে প্রধান নির্বাচনী হাতিয়ার এখনও করেননি। শুভেন্দু বলে চলেছেনপশ্চিমবঙ্গে নাকি বেশ কিছুমিনি পাকিস্তানগড়ে উঠেছে। মমতা তাদের উপরই ভরসা করছেন। যারা পাকিস্তান জিতলে আনন্দে বাজি ফাটায়ইত্যাদি ইত্যাদি। এককালে কিন্তু শুভেন্দু নিজেকেধর্মনিরপেক্ষবলেই প্রচার করতেন। অসমে অবশ্য প্রথম থেকেই কেন্দ্র থেকে আসা বিজেপির রথী-মহারথীরা এবং তাঁদের প্রধান সেনাপতি হিমন্তবিশ্ব শর্মা উগ্র সাম্প্রদায়িক তাস খেলতে শুরু করেছেন।

হিমন্তবিশ্ব শর্মা মনে করছেনমুসলিমদের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক প্রচারণা করেই তিনি ভোটযুদ্ধে বাজার মাত করবেন। তাই তিনি এক সম্প্রদায়কে আক্রমণ করে যে সব কথা উচ্চারণ করছেন তা আইনভারতীয় সংবিধান এবং নির্বাচন কমিশনের বাধা-নিষেধের মধ্যে পড়ে। কিন্তু আশ্চর্যের কথাকেউই হিমন্তবিশ্ব শর্মার বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা নেওয়ার কথা ভাবছেন না। আসলে ভোট হচ্ছে পরম ধন। আইনসংবিধাননির্বাচনী সংহিতাকে অনায়াসে কেউ কেউ উপেক্ষা করতে পারেন! অসমে বিজেপি জাতপাতধর্ম ভাষাকে সুদর্শন-চক্র হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করেছে। বিজেপি বলছেকংগ্রেস আজমলের এআইইউডিএফ-এর সঙ্গে জোট করেছে। আর এই অশুভ জোটের ফলে নাকি অসমের সংস্কৃতিধর্মভাষা বিপদাপন্ন হচ্ছে। অথচ অসমের বঙ্গীয় মূলের অধিবাসীরা ১৮৪০-৫০ সাল থেকেই অসমে এসে বসবাস শুরু করছেন। তখন ছিল অখণ্ড বাংলাঅখণ্ড ভারত। আর বঙ্গীয় মূলের মুসলিমরা নিজেদের মাতৃভাষা হিসেবে আদমশুমারিতে অহমীয়কে বেছে নেওয়াতেই কিন্তু অসমের প্রধান ভাষা এখনও অহমীয়া রয়েছে। এই ত্যাগ উদ্যোগের জন্য তাদের ধন্যবাদ দেওয়ার বদলে হিমন্তবিশ্ব শর্মা বিষ ছড়িয়ে কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছেন। হিমন্তবিশ্ব শর্মা আরও বলছেনকংগ্রেস এবং এআইইউডিএফ অসমে নির্বাচন জিতে যদি ক্ষমতা করায়ত্ত করে তাহলে অসম নাকিআর একটি বাংলাদেশহয়ে যাবে।

কংগ্রেসের বর্তমান নেতারা নিজেদের বিভেদ ভুলে নির্বাচনে মুখোমুখি হচ্ছেন। অন্তত পক্ষে জনসভাগুলিতে তাই দেখা যাচ্ছে। অসম কংগ্রেসের রাজ্যসভাপতি রিপুন বরাবিধান পরিষদীয় নেতা দেবব্রত শইকিয়ালোকসভার সদস্য প্রদ্যুৎ বরদলই এবং গৌরব গগৈমহিলা কংগ্রেসের সভানেত্রী সুস্মিতা দেবপ্রাক্তন মন্ত্রী রাকিবুল হুসেন প্রত্যেককেই বিভিন্ন জনসভায় একসঙ্গে উপস্থিত হয়ে ঐক্যের বার্তা দিচ্ছেন। রাহুল প্রিয়াঙ্কা গান্ধিও কংগ্রেসের নির্বাচনী প্রচারে অংশ নিচ্ছেন।

দিকে বিজেপি প্রচার করছেকিছুদিন আগেও সিএএ অসমে বিরাট নির্বাচনী ইস্যু ছিল। এই নিয়ে সিএএ- বিরুদ্ধে আন্দোলনে সারা অসম অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে। কিন্তু এখন নাকি তা আর কোনও ইস্যু নয়। এই সমস্যাটি অসমিয়ারা নাকি সম্পূর্ণ ভুলে গেছে। কিন্তু রাহুল প্রিয়াঙ্কা দুজনেই বলেছেনতারা ক্ষমতায় এলে অসমে সিএএ হবে না। আর অসমের জনগণ অন্যদেশ থেকে ভিন নাগরিকদের এনে অসমকে ডাম্পিং গ্রাউন্ড হতে দেবে না।

অসমে এসে প্রিয়াঙ্কা গান্ধি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেনকংগ্রেস পাঁচ লক্ষ চাকরি দেবেগৃহবধূদের মাসে হাজার টাকা করে ভাতা দেবেচা-বাগান শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি ৩৬৫ টাকা করা হবেপ্রত্যেককে ২০০ ইউনিট করে বিদ্যুৎ ফ্রি দেওয়া হবে। ছাড়া প্রিয়াঙ্কা বলেছেনতাঁরা ক্ষমতায় এলে ৫০ শতাংশ সরকারি চাকরি দেওয়া হবে মহিলাদের।

গৌরব গগৈ বলেছেনবিজেপি ২৫ লাখ চাকরির প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু তারা কোনও কথা রাখেনি।

এআইইউডিএফ-এর পূর্ব বিধায়ক আমিনুল ইসলাম বলেছেনআমাদের জোট কমপক্ষে ৭০টি আসন পাবে। আমরা একাই পাব কমকরে ১৮টি আসন। কাজেই এবার বিজেপি যাচ্ছেমহাজোটই আসছে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only