শুক্রবার, ৫ মার্চ, ২০২১

নারীদের স্বাস্থ্য সমস্যা ও প্রতিকার

সবাইকে সামলাতে, সবাইকে ভালো রাখতে নিজের ভালো থাকা, সচেতন থাকাটা খুবই জরুরি আন্তর্জাতিক নারী দিবসের প্রাক্কালে নারীরা কীভাবে নিজেকে ভালো রাখবেন, বিভিন্ন রোগ সম্বন্ধে কীভাবে সচেতন হবেন সে সম্পর্কে জানাচ্ছেন, ইন্ডিয়ান মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন শ্রীরামপুর শাখার সভাপতি ডা. প্রদীপ কুমার দাস এবং আর জি কর মেডিক্যাল কলেজের শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. ঈশিতা দাস

 


৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস বছরের একটা দিন আলাদা করে নারীদের জন্যই ভাবা হয় অথচ প্রতিদিনই অসহায়ত্বের চিত্র ফুটে ওঠে তাদের কথায় গৃহবধূ বা পেশাজীবী নারী প্রতিদিনই ঘরে বাইরে সামলাতে গিয়ে যে পরিমাণ শ্রম ও সময় দেন তা অস্বাভাবিক রকমের অনেক নারীকে ঘরে-বাইরে দুই জায়গাতেই খাটতে হয় সমান তালে এই ঘরে-বাইরে সামলাতে গিয়েই অনেক নারীই শারীরিক বা মানসিক অসুস্থতায় ভুগতে থাকে অথচ এবিষয়ে তাদের ভাবার সময়ই নেই স্বাস্থ্যসচতেনতা বিষয়টিই তাদের কাছে উহ্য থাকে আর এই সচতেনতার অভাবেই তাদের শরীরে বাসা বাঁধতে থাকে নানারকম ভয়াবহ রোগ ফলস্বরূপ বয়সের সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগতে দেখা যায় তাদের নিজেদের অলক্ষে বেশ কিছু রোগকে ডেকে আনে, যার পরিণতিতে চূড়ান্ত ভোগান্তি ও এমনকি শেষ পর্যন্ত মৃত্যুকে বরণ করে নিতে বাধ্য হয় তাই মহিলাদের ওইসব রোগ সনাক্তকরণে প্রথম থেকে যত্নবান হওয়ার ও নিয়মিত কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা দরকার যার মাধ্যমে রোগগুলিকে সহজে ধরে নিয়ে প্রয়োজনীয় চিকিৎসার মধ্যে রাখা যেতে পারে

মূত্রনালী অথবা মূত্রথলির সংক্রমণ

জল কম খাওয়া, বহুক্ষণ ধরে প্রস্রাব রাখা, ঘামে ভেজা অন্তর্বাস পরে থাকলে, নোংরা বাথরুম ব্যবহার, যৌন সংক্রমণ ও পারিবারিক ইতিহাস এই রোগের কারণ হিসেবে গণ্য করা হয় শতকরা ৫০ শতাংশ মেয়ে জীবনের কোনও না কোনও পরিসরে ইউটিআই-এ ভোগেন

কী করবেন,  যদি দেখেন প্রস্রাব হলুদ হচ্ছে এবং মাঝেমাঝে সঙ্গে রক্ত পড়ছে, তাহলে বুঝবেন সংক্রমণ বড় আকার নিয়েছে যত দ্রুত সম্ভব ডাক্তার দেখাবেন

অস্টিওপোরোসিস ও আর্থারাইটিস

মেনোপজের পরে অনেক মহিলা হাড়ের ক্ষয়রোগ (অস্টিওপরোসিস) ও বাত (আর্থারাইটিস) রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়েন

হাড়ের ঘনত্ব ও ভিটামিন ডি স্বল্পতা

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মহিলাদের হাড়ের ঘনত্ব কমতে থাকেবিশেষ করে ঋতুবন্ধের (মেনোপজ) পরে বেশি দেখা যায় এছাড়া ভিটামিন ডি-এর অভাবে মেনোপসাল মহিলাদের কোমরে ব্যথা ও হাড়ের ক্ষয়রোগ বেশি দেখা যায়

কী করবেন অস্টিওপরোসিস ও আর্থারাইটিস সনাক্তকরণের জন্যে নিয়মিত বিএমডি বা বোন মিনারেল ডেনসিটি  ও রক্তে ভিটামিন ডি-এর পরীক্ষা করা দরকার

ডায়াবেটিস

গর্ভকালীন সময়ে অনেক মহিলা ডায়াবেটিস মেলাইটাসে আক্রান্ত হন সন্তান প্রসবের পরে অনেকে ডায়াবেটিস রোগ থেকে মুক্ত হন ঠিকই কিন্তু বেশ কিছু মহিলা প্রসবের পরেও পাকাপাকি ডায়াবেটিসের শিকার হয়ে পড়েন, বিশেষ করে যাঁদের পারিবারিক ইতিহাসে ডায়াবেটিসের ঘটনা আছে

কী করবেন চল্লিশ পেরোলেই প্রতিটি মহিলার নিয়মিত রক্তের সুগার পরীক্ষা করে দেখা প্রয়োজন তার দেহে টাইপ-টু ডায়াবেটিস হানা দিয়েছে কি না পরিমিত আহার, কায়িক শ্রম ও নিয়মিত শরিরচর্চা এই রোগকে নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে তবে নিয়মিত ওষুধ খাওয়াটা খুব দরকারি

স্তন ক্যানসার

মহিলাদের ক্যানসার জনিত রোগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত হন এর কারণ হিসেবে ভাবা হয়েছে একাধিক পারিবারিক ঘনিষ্ঠজনের আক্রান্তের ইতিহাস,  বিআরসিএ জিন,  মদ্যপান, ধূমপান, বেশি বেশি রেডমিট খেতে অভ্যস্ত হয়ে পড়া, বেশি মাত্রায় সুগন্ধী দ্রব্য ও অত্যাধিক প্রসাধনী দ্রব্য ব্যবহার করাঅবিবাহিত মহিলা ও বেশি বয়সে সন্তানধারণ ইত্যাদি কারণগুলি স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি হিসেবে বিবেচিত হয়

কী করবেন চল্লিশ বয়স পেরিয়ে গেলে বিশেষ করে যাঁদের পারিবারিক ইতিহাস রয়েছে তাদের প্রত্যেককে ম্যামোগ্রাম পরীক্ষা করে স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি আছে কি না যাচাই করে নেওয়া দরকার এছাড়া ঋতুমতী কিশোরী ও মহিলাদের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে হাতের তালু দিয়ে দুটি স্তন পরীক্ষা করে দেখা প্রয়োজন কোন শক্ত নডিউল বা স্তনবৃন্ত দিয়ে রক্তক্ষরণ হচ্ছে কিনা সন্দেহজনক ধরা পড়লেই গোপন না করে চিকিৎসকের পরামর্শ অবশ্যই নেওয়া প্রয়োজন

সার্ভাইকাল ক্যানসার

এদেশে এই ক্যানসারে আক্রান্ত হয় ফি বছর ৩৩ হাজার নারী সারা বিশ্বের নিরীখে ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে নারী মৃত্যুর চতুর্থ কারণ হল সারভাইকাল বা জরায়ু মুখ ক্যানসার এর অন্যতম কারণ হল এইচপিভি ভাইরাস সংক্রমণ এছাড়া অসুরক্ষিত যৌন আচরণের ফলে এইচআইভি সংক্রমণেও জরায়ু মুখ ক্যানসার হতে পারে উপরন্তু অপুষ্টি, বাল্যবিবাহ,  অধিক সন্তান প্রসব এর কারণ হিসেবে ভাবা হয়

কী করবেন বয়স ৩০ পেরোলে সব মেয়েদের বছরে একবার ও ৪০ পেরোলে দুই তিন বছর অন্তর প্যাপ স্মিয়ার টেস্ট করা দরকার এই টেস্ট খুব সহজ যে কোনও ধাতৃ চিকিৎসকের কাছে গেলে জরায়ু মুখ নিঃসৃত রস নিয়ে এই পরীক্ষা করে সারভাইকাল ক্যানসার সনাক্ত করা যায় অন্যদিকে ওভারিয়ান ক্যানসারের নির্ণয়ের ক্ষেত্রে রক্তের সিএ-১২৫ ও সোনোগ্রাফির নির্দিষ্ট ভূমিকা রয়েছে

 একথা সত্যি যে ঋতুমতী মেয়েদের হৃদরোগের আশংকা অনেকটাই কম একই বয়সের ছেলেদের তুলনায় কেননা ওই সময়ে মেয়েদের ক্ষেত্রে অন্তক্ষরা যৌনগ্রন্থির রস রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে কিন্তু ঋতুবন্ধ বা পোস্ট মেনোপোজ সময়ে মেয়েদের ও ছেলেদের হৃদরোগের সম্ভাবনা সমান সমান, কখনও বা একটু বেশি ঋতু বন্ধ হয়ে যাওয়া মহিলাদের বেলায় তাই এই সময়ে সমস্ত মহিলাদের সতর্ক থাকতে হবে যে, কোনও ধরণের বুকের, পেটের উপরিভাগে, পিঠের মাঝখানে, কপালে, বাম দিকের ঘাড়ের কাছে ব্যথা, কামড়ানো, দম বন্ধ হওয়া পরিস্থিতি কিংবা বুকে চাপ বোধ হলে ঘরোয়া টোটকা চিকিৎসায় ব্যস্ত না থেকে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াটা অবশ্যই প্রয়োজন

কী করবেন

বয়স চল্লিশ পেরোলেই নিয়মিত ভাবে রক্তের চাপ মাপা,  রক্তের গ্লুকোজকোলেস্টেরল সহ লিপিড প্রোফাইলরুটিন ইসিজিপরীক্ষা-নিরীক্ষা করিয়ে নিলে হৃদরো  সহ উচ্চ রক্তচাপের মোকাবিলা করাটা খুব একটা কঠিন কাজ বলে মনে হবে না এরসঙ্গে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জীবনশৈলীর পরিবর্তন ও পরিমিত আহারকিছুটা কায়িক শ্রমপ্রাণায়ামযোগাসনফাস্টফুড ও জাঙ্ক ফুড পরিত্যাগ ও ৬-৮ ঘন্টা নিটোল ঘুমই কমাতে পারে হৃদরোগের  সম্ভাবনাকে

অবসাদ

গর্ভধারণের পরে ও মেনোপোজ বা ঋতুমতী সময় পার হওয়া মহিলারা বেশি বেশি করে অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়েন এছাড়া দাম্পত্য জীবনে অশান্তি ও যৌন জীবনে সুসম্পর্কের অভাব মহিলাদের বিষাদগ্রস্ত হয়ে পড়ার অন্যতম কারণ আবার বয়ঃসন্ধিক্ষণে প্রবেশ করা কিশোরীরাও অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়ে কেননা হঠাৎ করে দৈহিক পরিবর্তনসঠিক পরামর্শের অভাববাবা-মায়ের উদাসীন মনোভাবলজ্জা ও কুন্ঠাজনিত নিজের সমস্যাকে গোপন করে রাখাসঠিক কাউন্সেলিং এর অভাবে ওই সময়ে কিশোরীরা বিষাদগ্রস্ত হয়ে পড়ে

অন্যান্য সমস্যা

রক্তচাপ ও চোখের সমস্যা বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মহিলাদের রক্তের চাপ বাড়ার প্রবণতা বাড়ে ও চোখের দৃষ্টি ঝাপসা হয়ছানি পড়েগ্লুকোমা দেখা দেয় এছাড়া নানাবিধ চোখের সমস্যা আসে এই সব সমস্যা প্রতিরোধের জন্যে নিয়মিত রক্তের চাপ মাপা ও চোখ পরীক্ষা করা প্রয়োজন

থাইরয়েড ­ মেয়েরা ছেলেদের তুলনায় থাইরয়েডের অসুখে বেশি ভোগেন থাইরক্সিন হরমোনের অভাবে হাত-পা-মুখ ফুলে যায়রক্তাল্পতা দেখা দেয়গায়ে বিশেষত অস্থিসন্ধিস্থলে প্রচণ্ড ব্যথাঅনিয়মিত ঋতুর লক্ষণ দেখা দেয়যাকে হাপোথাইরয়েডিজম বলে আর থাইরক্সিন হরমোনের ক্ষরণ বেশি হলে রক্তের চাপ বাড়েঅতিরিক্ত ঘাম হয়হাত-পা কাঁপেবুক ধড়পড় করেদেহের ওজন কমে যায়যাকে হাইপারথাইরয়েডিজম বলে এগুলো ধরা পড়ে নিয়মিত রক্তের পরীক্ষাটি ৩টি ৪ ও টিএসএইচ পরীক্ষা করালে

কিডনির অসুখ বেশি বয়সে বিশেষ করে যে সব মহিলারা প্রেসার ও ডায়াবেটিসে ভুগছেন তাঁদের কিডনি সংক্রান্ত অসুখে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে তাই এই রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন কি না জানতে হলে রক্তের ইউরিয়াক্রিয়েটিনিন ও ইউরিনের অ্যালবুমিন-ক্রিয়েটিনিন হার ও সারা দিনে ইউরিনের মাধ্যমে প্রোটিন নিঃস্বরণের মাত্রা পরীক্ষা করলে বোঝা যায় তিনি কিডনির অসুখে আক্রান্ত হয়েছেন কি না

সবাইকে ভালো রাখার অঙ্গীকার যখন আপনারতখন আগে আপনি নিজে খুব খুব ভালো থাকুনস্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন হোননিজের মন ভালো রাখুন দেখবেন আপনিও ভালোও আছেনআপনার পরিবারও ভালো আছে

 

 

 

 

 

 

 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only