বুধবার, ২১ এপ্রিল, ২০২১

এই তো জানু পেতে বসেছি, পশ্চিম


বিদায় শঙ্খ ঘোষ


গোলাম রাশিদ


এই তো জানু পেতে বসেছি, পশ্চিম

আজ বসন্তের শূন্য হাত-

ধ্বংস করে দাও আমাকে যদি চাও

আমার সন্ততি স্বপ্নে থাক৷ 


চলে গেলেন কবি শঙ্খ ঘোষ। ফ্যাসিবাদী শক্তির থাবা যখন জেঁকে বসতে চাইছে আষ্টেপৃষ্টে, তখন চোখে চোখ রেখে শান্তভাবে প্রশ্ন উত্থাপনকারী কবি অসংখ্য গুণমুগ্ধ পাঠক, ভক্তদের রেখে বিদায় নিলেন এই বৈশাখে৷ তিনি যেমন 'বাবরের প্রার্থনা' বা 'সুপুরিবনের সারি' লিখেছেন তেমনই 'সাহসিকতা'র সঙ্গে ইকবালের কবিতার তরজমা করেছেন৷ ১৯৩৮ সালের এই ২১ এপ্রিলেই মহাকবি ইকবালের ইন্তেকাল হয়েছিল৷ দুই মহাকবির চলে যাওয়ার দিনটি কাকতালীয় ভাবে মিলেও গেল৷ শঙ্খ ঘোষ শুধু বাংলা সাহিত্যের দিগন্তবিস্তৃত এক বটবৃক্ষ ছিলেন তা-ই নয়, তিনি ছিলেন বহু কবি, গল্পকার, গদ্যকার, সম্পাদক, পড়ুয়া, গবেষকের আশ্রয়স্থল৷ তিনি এই জউ ঘরের দেশে এক অসাম্প্রদায়িক, বিপ্লবী সত্তার মানুষ ছিলেন বললে ভুল হবে না৷ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পর বাংলা সাহিত্য এত বড় জীবন্ত কিংবদন্তি কবি পায়নি৷ শঙ্খ ঘোষ একটা মাইলস্টোন, যাকে স্পর্শ করা যায় না৷ বুধবার বিকেলে কলকাতার নিমতলা মহাশ্মশানে তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন হয় রাষ্ট্রীয় মর্যাদায়৷ কোভিড-১৯ এর দ্বিতীয় ঢেউ দেশকে যখন ত্রস্ত করে তুলেছে, তখন সেই করোনা ভাইরাসেই কেড়ে নিল এই মহাকবির প্রাণ৷ অবশ্য করোনা উপলক্ষ মাত্র, ৮৯ বছর বয়সি চিত্তপ্রিয় ঘোষের চলে যাওয়া কবিতার মতোই নীরব হয়ে রইল৷ তিনিও তাই চাইতেন৷ তিনি লিখেছিলেন, 'চুপ করো, শব্দহীন হও৷' বুধবার তিনি শব্দহীন হলেন, রেখে গেলেন মূল্যবান সৃষ্টি৷ 


বুধবার সকাল সাড়ে ১১টা নাগাদ কলকাতায় নিজের বাড়িতেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন কবি। বেশ কয়েক দিন ধরে করোনায় আক্রান্ত হয়ে বাড়িতেই আইসোলেশনে ছিলেন তিনি। পাশাপাশি, বার্ধক্যজনিত কারণেও শারীরিক ভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন। মঙ্গলবার রাত থেকেই তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে শুরু করে। বুধবার সকালে কবিকে ভেন্টিলেটরে দেওয়া হলেও শেষরক্ষা হয়নি৷ তাঁর মহাপ্রয়াণে দেশের প্রধানমন্ত্রী, রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী সহ বহু বিশিষ্ট ব্যক্তি শোকপ্রকাশ করেছেন৷ বাড়িতে ফোন করে শোকজ্ঞাপন করেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। শঙ্খ ঘোষের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করে মমতা জানান, শঙ্খবাবুর সঙ্গে আমার অত্যন্ত সুসম্পর্ক ছিল। তাঁর প্রয়াণে সাহিত্য জগতে অপূরণীয় ক্ষতি হল। শঙ্খদার মৃত্যুতে শোকাহত আমরা। গান স্যালুট পছন্দ করতেন না উনি। তেমনটাই জানিয়েছেন কবি-কন্যা। তাই সেটুকু বাদ দিয়ে রাষ্ট্রীয় সম্মানের সঙ্গে তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন করা হবে। মুখ্যসচিবকে তেমন নির্দেশ দিয়েছি। শোক প্রকাশ করে ট্যুইট করেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তিনি লিখেছেন, বাংলা ও ভারতীয় সাহিত্যে তাঁর অবদানের জন্যে শঙ্খ ঘোষ স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। তাঁর রচনা বহুপঠিত এবং শ্রদ্ধেয়। তাঁর মৃত্যুতে শোকাভিভূত। তাঁর পরিবার ও স্বজনদের জানাই সমবেদনা। ওম শান্তি। উল্লেখ্য, বছর দুয়েক আগে ‘মাটি’ নামের একটি কবিতায় কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছিলেন তিনি।


মহাকবির মহাজীবন:


শঙ্খ ঘোষ এমন একজন ব্যক্তিত্ব যাঁকে নিয়ে বহু মানুষ স্মৃতিচারণ করবেন, জীবনীর উপর আলোকপাত করবেন৷ তাঁর সৃষ্টি নিয়ে আরেকপ্রস্থ আলোচনা হবে৷ কিন্তু তাঁকে নিয়ে যা-কিছু লিখে দেওয়া যায় না৷ তাঁর কাব্যবিচারের চেষ্টা অসফলতা ছাড়া কিছুই বয়ে আনবে না৷ নামের আগে মহান মানুষ এবং মহাকবি যোগ করলে অত্যুক্তি হবে না৷ শঙ্খ ঘোষের জন্ম ১৯৩২ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি অধুনা বাংলাদেশের চাঁদপুরে৷ পিতা মণীন্দ্রকুমার ঘোষ, মাতা অমলাবালা ঘোষ৷ পাবনা জেলার পাকশির চন্দ্রপ্রভা বিদ্যাপীঠ থেকে ১৯৪৭ সালে ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করেন৷ ১৯৫৪ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম এ পাশ করেন বাংলা বিভাগে৷ এরপর অধ্যাপনা করেছেন বঙ্গবাসী কলেজ, জঙ্গীপুর কলেজ, বহরমপুর গার্লস কলেজ, সিটি কলেজ, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে৷ 'বাবরের প্রার্থনা' কাব্যগ্রন্থের জন্য পেয়েছেন সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার৷ এছাড়াও নরসিংহ দাস পুরস্কার, রবীন্দ্র পুরস্কার, পদ্মভূষণ ও দেশের সর্বোচ্চ সাহিত্য সম্মান 'জ্ঞানপীঠ' পেয়েছেন তিনি৷ এইসব পুরস্কার দিয়ে তাঁকে অবশ্য মাপা যাবে না৷ কারণ, এসব উচ্চকিত কলরবের মধ্যে তিনি একা এবং অনেক উঁচুতে অধিষ্ঠান করেছেন৷ কিন্তু থেকেছেন মানুষের কাছাকাছি৷ বাংলা কবিতার জগতে শঙ্খ ঘোষের 'দিনগুলি রাতগুলি', 'এখন সময় নয়', 'মূর্খ বড়ো, সামাজিক নয়', 'বাবরের প্রার্থনা', 'পাঁজরে দাঁড়ের শব্দ', 'মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে', গান্ধর্ব কবিতাগুচ্ছ', 'গোটা দেশজোড়া জউ ঘর' কাব্যগ্রন্থগুলি বারবার আলোচিত হবে৷ রবীন্দ্র বিশেষজ্ঞ হিসেবেও তিনি ছিলেন সর্বজনমান্য৷ 'কালের মাত্রা ও রবীন্দ্র নাটক', ' নিঃশব্দের তর্জনী', 'ছন্দের বারান্দা', ' নির্মাণ আর সৃষ্টি' প্রভৃতি প্রবন্ধ গ্রন্থ তাঁর মননের পরিচায়ক৷ অনুবাদ গ্রন্থের মধ্যে 'ওকাম্পোর রবীন্দ্রনাথ', 'নিকোলাস গ্যিয়েন চিড়িয়াখানা ও অন্যান্য কবিতা', 'ইকবাল থেকে', 'ইরাকি কবিতার ছায়ায়' উল্লেখযোগ্য৷ 


কবি-সাহিত্যিকরা যখন 'শিরদাঁড়া' নিয়ে তীব্র বিতর্কে মেতে উঠেছেন, সেই সময়ে দাঁড়িয়ে শঙ্খ ঘোষ চলেছেন স্রোতের বিপরীতে৷ বিনম্রতাকে নিজের ভূষণ বানিয়েছিলেন৷ ২০১২ সালে তাঁর জন্মদিনে প্রকাশ পায় 'ইকবাল থেকে' তরজমা গ্রন্থটি৷ দেশে যখন উগ্র সাম্প্রদায়িকতার বাড়বাড়ন্ত,  পাকিস্তানের নাম উচ্চারণ যেখানে 'দেশদ্রোহিতা'র শামিল, সেই পরিস্থিতিতে তিনি ছিলেন এক মগ্ন বিপ্লবী বীর৷ আল্লামা ইকবালকে এই সময়ে স্মরণ করেছিলেন তিনি৷ প্রশ্ন উঠেছিল, ইকবাল কেন? তিনি বলেছিলেন, 'কালের দূরত্ব বা ভাষার দূরত্ব সত্ত্বেও যদি এখানে কেউ কাফকা নিয়ে রিলকে নিয়ে ভাবেন, তাহলে এ ধরনের কথা ওঠে না বড়ো-একটা৷... নিকট প্রতিবেশীকে জানতে না-চাওয়ার বুঝতে না-চাওয়ার জড়তায় আর আত্মাভিমানে আমাদের টুকরো টুকরো হতে থাকা এই বর্তমান যে কতখানি অপঘাত নিয়ে আসছে, সেটা নিশ্চয় আজ টের পাওয়া যায়৷' শঙ্খ ঘোষ এ ভাবেই সত্যের জয়গান গেয়েছেন৷ কবিতায়, কথায় নির্ভীকভাবে উচ্চারণ করেছেন শাশ্বত শব্দ৷ তাঁর কবিতার বহু লাইন মানুষের মুখে মুখে ফেরে---- 'নিভন্ত এই চুল্লিতে মা/ একটু আগুন দে/ আরেকটু কাল বেঁচেই থাকি/ বাঁচার আনন্দে', 'আরো কত ছোটো হব ঈশ্বর', 'জল কি তোমার কোনো ব্যথা বোঝে?', ' নষ্ট হয়ে যায় প্রভু, নষ্ট হয়ে যায়!', 'সে ছিল একদিন আমাদের যৌবনে কলকাতা', ' মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে'৷ তিনি লিখেছিলেন, অন্ত নিয়ে এতটা ভেবো না/ মৃত্যুপথে যেতে দাও মানুষের মতো মর্যাদায়৷ সেভাবেই তিনি চলে গেলেন এই শহর ছেড়ে, কোলাহল থেকে অনেক দূরে৷ আর মিলিয়ে দিয়ে গেলেন বাবর, ইকবাল, রবীন্দ্রনাথ আর বৈশাখকে৷

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only