শুক্রবার, ২ এপ্রিল, ২০২১

সান স্ট্রোক ­ সতর্কতা ও প্রাথমিক চিকিৎসা

সান স্ট্রোক নিয়ে পুবের কলম প্রতিবেদক ওসিউর রহমানের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিলেন মেদিনীপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের চিকিৎসক ডা. কলিমুজ্জামান মোল্লা



 সান স্ট্রোক বা হিট স্ট্রোক কী কেন হয়?

পরিবেশের তাপমাত্রা বেড়ে গেলেও শরীর চেষ্টা করে নিজের তাপমাত্রা বজায় রাখতে একজন মানুষের শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রা ৯৮. ডিগ্রি ফারেনহাইট যখন প্রচণ্ড তাপমাত্রায় আমাদের শরীরের তাপ নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা নষ্ট হয়ে (থার্মোরেগুলেটরি সেন্টারের ফেলিওরের জন্য) আমাদের শরীরের তাপমাত্রা ১০৪ ডিগ্রির বেশি হলে তাকে সান স্ট্রোক বা হিট স্ট্রোক বলে সান স্ট্রোকে কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের কর্মহীনতার জন্য বিভিন্ন  লক্ষণ দেখা যায় যেমন--- মাথাব্যথামাথাঘোরামাথা ঝিমঝিম করাঅপ্রকৃতিস্থ হয়ে যাওয়াখিঁচুনিএমনকি অজ্ঞানও হয়ে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা যায়

সান স্ট্রোক প্রধানত গ্রীষ্মপ্রধান দেশগুলোতেই বেশি দেখা যায় যদি আক্রান্ত ব্যক্তির অবিলম্বে ব্যবস্থা না নেওয়া হয় তাহলে এটা শরীরের অভ্যন্তরীণ অঙ্গপ্রতঙ্গকে নষ্ট করে দিতে পারে এবং তা থেকে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে সান স্ট্রোকে মৃত্যুর হার প্রায় ১০-৫০ শতাংশ

কাদের বেশি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে?

সান স্ট্রোকের প্রধান কারণ হল সূর্যের তাপের সংস্পর্শে সরাসরি আসা অতিরিক্ত গরমশারীরিক পরিশ্রমদেহে জলের পরিমাণ কমে যাওয়া সূর্য তাপের সরাসরি শরীরে প্রবেশের কারণেই এই স্ট্রোক হয়ে থাকে আর এই সমস্যা তাদেরই দেখা দেয়যারা রোদের মধ্যে পরিশ্রমের কাজ করেন শিশু থেকে বয়স্ক ব্যক্তি সকলেই এই রোগে আক্রান্ত হতে পারেন যারা বেশি মাত্রায় সান স্ট্রোক প্রবণ তারা হল---

যাদের আগে সান স্ট্রোক হয়েছে, স্থুলকায় ব্যক্তি, মদ্যপায়ী, মানসিকভাবে অসুস্থরাতে বেশি ঘুমের ব্যাঘাত ঘটলে বা কেউ নিদ্রাহীনতায় ভুগলে তাদের সান স্ট্রোক হওয়ার প্রবণতা আছে মহিলাদের তুলনায় পুরুষদের এবং শিশু বয়স্কদের সান স্ট্রোক হওয়ার প্রবণতা বেশি যারা জল অথবা পানীয় কম গ্রহণ করেন (এর ফলে ডিহাইড্রেশন বা শরীরে জলের ঘাটতি দেখা দেয়)– *দরোগকিডনির সমস্যাফুসফুসের সমস্যায় যারা ভুগছেনকিংবা বর্তমানে জ্বরে ভুগতে থাকেন তাদের ক্ষেত্রে সান স্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি আবার উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে বা অন্য কোনও রোগের চিকিৎসার জন্য নিয়মিত ডাই ইউরেটিক গোত্রের ওষুধ যেমন ডাইটরল্যাসিক্স ব্যবহার করলে এই ধরনের স্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা দেখা যায়



উপসর্গগুলি কী কী?

 রোদে বেরিয়ে যদি দেখেন শরীরের তাপমাত্রা হঠাৎ অনেকটা বেড়ে গিয়েছে গা গরমে পুড়ে যাচ্ছেসঙ্গে সঙ্গে ছায়ায় যান রোদ এড়ানোর চেষ্টা করুনকারণ এটি সান স্ট্রোকের অন্যতম প্রাথমিক লক্ষণ

সান স্ট্রোক হলে অনেক সময়ে ত্বক লাল হয়ে যায় এবং ত্বক জ্বলতে থাকে এরকম লক্ষণ হঠাৎ করে দেখলে সাবধান হোন এবং চিকিৎসকের কাছে যান সান স্ট্রোকের আগে ত্বক শুষ্ক আর লালচে হয়ে ওঠে

 ঘাম বন্ধ হয়ে যাওয়া সান স্ট্রোকের একটি অন্যতম লক্ষণআবার অনেক সময় সান স্ট্রোক হলে প্রচণ্ড পরিমাণে ঘাম হয়

 সান স্ট্রোকের আগে সবকিছু গুলিয়ে যাওয়াশ্বাসকষ্টখিটখিটে ভাববমি বমি ভাব বা বমি হতে পারে

 কাঠফাটা রোদে হঠাৎ বেরিয়ে যদি দেখেন হঠাৎ মাথাব্যথামাথাঘোরাঅস্থিরতা অনুভব করেন তাহলে সাবধান হোন

 সান স্ট্রোকের আগে ক্লান্তি গ্রাস করেমাথা ঝিমঝিম করাশরীরে খিঁচুনি হওয়াএমনকি অজ্ঞান হয়ে যেতে পারে

 রোদে গরমে চলতে ফিরতে হঠাৎ যদি নিজের শরীরপেশীহাত-পা অবশ হয়ে যেতে থাকে তাহলে সাবধান হোন

 রোদে বেরিয়ে যদি হঠাৎ করে চোখের সামনে সব আবছা দেখতে থাকেন বা চারিদিকে অন্ধকার হয়ে গেলে শীঘ্রই চিকিৎসকের কাছে যান সান স্ট্রোকে এমন হয়েই থাকে

 রোদে বেরিয়ে হঠাৎ করে যদি দেখেন খুব দ্রুত *দস্পন্দন চলছেতাহলে সতর্ক হোন সান স্ট্রোকের শিকার হলে এটা হয়ে থাকে

 সান স্ট্রোকের আগে রক্তচাপ অস্বাভাবিকভাবে কমে যায়

 শরীরের তাপমাত্রা অস্বাভাবিক মাত্রায় বেড়ে যায় সময় শরীরের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে প্রস্রাবের পরিমাণ অনেকটাই কমে যায়

 গ্রীষ্মের তীব্র দাবদাহে সতর্ক থাকুন সান স্ট্রোকের উপসর্গগুলির দিকে নজর দিন উপরের উপসর্গগুলি দেখা দিলেচিকিৎসককে দেখাতে দেরি করবেন না

সান স্ট্রোক বা হিট স্ট্রোক আক্রান্তের প্রাথমিক চিকিৎসা কী হওয়া উচিত?

 গ্রীষ্মের তীব্র দাবদাহে যেকোনও ব্যক্তিযেকোনও সময় সান স্ট্রোকে আক্রান্ত হতে পারে তাই অবশ্যই জেনে রাখা প্রয়োজন এই ধরনের পরিস্থিতিতে কী করবেন

 সান স্ট্রোক হলে আক্রান্তকে যত দ্রুত সম্ভব ঠাণ্ডা পরিবেশে সরিয়ে আনতে হবে এবং অপেক্ষাকৃত ঠান্ডা জায়গায় শুইয়ে দিতে হবে সম্ভব হলে বাতানুকুল (এয়ারকন্ডিশন) ঘরে রাখতে হবে

 যে কোনও উপায়ে সান স্ট্রোকে আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরের তাপমাত্রা কমানোর চেষ্টা করতে হবে আক্রান্ত ব্যক্তির শরীর জলে ভেজানো কাপড় দিয়ে মুছিয়ে দিতে হবে প্রয়োজনে ভেজা কাপড় দিয়ে কিছুক্ষণ জড়িয়ে রাখতে হবে

 রোগীর ঘাড়ের নীচেহাতের তলায়পেটের নীচের অংশে বরফ দিতে হবে যাতে শরীরের তাপমাত্রা কম হয়ে যায় দেহের তাপমাত্রা ১০১-১০২ ডিগ্রি ফারেনহাইটে না পৌঁছানো পর্যন্ত এটি করতে হবে

 ঘরের পাখা চালিয়ে রাখতে হবে পর্যাপ্ত হাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে যাতে রোগীর নিঃশ্বাসে কোনও অসুবিধা না হয়

এই সময় রোগীকে কোনও ধরনের জ্বরের ওষুধ একেবারেই দেওয়া যাবে না

 যদি এতেও দেহের তাপমাত্রা না কমে তবে অবিলম্বে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে

 প্রাথমিক পর্যায়ে সান স্ট্রোকের মোকাবিলা করার পর যত দ্রুত সম্ভব চিকিৎসকের কাছে যান চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলতে হবে

সান স্ট্রোক প্রতিরোধে কী কী সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন?

নিম্নলিখিত পদ্ধতিগুলি মেনে চললে নিজেই নিজেকে সান স্ট্রোক বা হিট স্ট্রোক থেকে রক্ষা করতে পারেন

 হালকা রঙের পাতলা ঢিলেঢালা সুতির পোশাক পরুনযাতে সহজেই বাতাস চলাচল করতে পারে খুব আঁটোসাটো পোশাক না পরাই ভালো

 জলের বোতলছাতা রোদচশমা সঙ্গে অবশ্যই রাখুন টুপি অথবা স্কার্ফ পরার পাশাপাশি ছাতা ব্যবহার করুন এতে কিছুটা হলেও রোদ এড়াতে পারবেন

 ব্যাগে ওয়েট ওয়াইপ রাখুন খুব গরম লাগলে তা দিয়ে মুখঘাড় কানের পিছন মুছে নিন

 রোদ থেকে বাঁচতে সানস্ক্রিন ব্যবহার করুন

 শরীরে জলের মাত্রা ঠিক রাখতেপর্যাপ্ত পরিমাণে জল খান সম্ভব হলে মাঝে মধ্যে ওআরএসডাবের জল বা পাতিলেবুর শরবৎ খেতে পারেন

হালকা তেল মশলাযুক্ত সহজ পাচ্য খাবার খান এমন খাবার খান যাতে জলের পরিমাণ বেশি থাকেএর ফলে আপনার শরীর হাইড্রেটেড থাকবে বেশি বেশি করে শাক সবজি ফলমূল খান রেড মিট যতটা পারেন এড়িয়ে চলুন

 যাঁদের দিনের বেশির ভাগ সময় বাইরে খোলা আকাশের নীচে কাটাতে হয় বা রোদে বেশি ঘোরাঘুরি করতে হয়তাঁদের একটানা বেশিক্ষণ পরিশ্রমের কাজ না করাই ভালো ছোট ছোট বিরতি নিয়ে কাজ করাই উচিত

দুপুর ১২টা থেকে ৩টে পর্যন্ত সূর্যের তাপ প্রখর থাকেএই সময় যতটা সম্ভব রোদ্দুরে কম থাকুন

 রোদের মধ্যে পার্ক করা গাড়িতে বসে থাকবেন না যদি জানালা বন্ধ করে রোদের মধ্যে গাড়ি পার্কিং করা থাকে সেক্ষেত্রে গাড়ির ভিতরের তাপমাত্রা অনেক বেশি বেড়ে যায়তাই রোদের মধ্যে পার্কিং করা গাড়িতে হঠাৎ করে বসবেন নাএতে সান স্ট্রোকে আক্রান্ত হতে পারেন ভুলেও পার্কিং করা গাড়িতে বাচ্চাদের বা বয়স্ক ব্যক্তিদেরকে বসিয়ে রেখে যাবেন না

 যে সমস্ত ব্যক্তি উচ্চ রক্তচাপডায়াবেটিস হার্টের রোগে ভুগছেন বিশেষ করে তাঁদের রোদ এড়িয়ে চলা উচিত খুব প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে রোদে বেরোবেন না বেরতে হলে নিজের প্রয়োজনীয় ওষুধ সঙ্গে নিয়ে বেরোন

গ্রীষ্মের তীব্র দাবদাহে সতর্ক থাকুন সান স্ট্রোকের উপসর্গ দেখা দিলেচিকিৎসককে দেখাতে দেরি করবেন না মনে রাখবেন, আক্রান্ত ব্যক্তির অবিলম্বে চিকিৎসা না হলে শরীরের অভ্যন্তরীণ অঙ্গ প্রতঙ্গ নষ্ট হতে পারে এবং তা থেকে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only