শনিবার, ১৭ এপ্রিল, ২০২১

ধর্মনিরপেক্ষতার প্রতি বাংলার আনুগত্য উল্লেখযোগ্য: অমর্ত্য




কতটা খুঁটিয়ে বাংলার নির্বাচনকে আপনি দেখছেন?

আমি যেখানে থাকি (হার্ভার্ড) তার সঙ্গে কলকাতার সময়ের পার্থক্য অনেক। তাই যতটা খুঁটিয়ে সম্ভব আমি এই নির্বাচনকে খেয়াল রাখার চেষ্টা করছি।

এই নির্বাচনকে বাংলার আত্মার জন্য যুদ্ধ হিসাবে দেখা হচ্ছে এবং সব দলই নিজেদের বাংলার প্রকৃত প্রতিনিধি হিসাবে দাবি করছে। এই নির্বাচনী যুদ্ধ নিয়ে আপনার কী মনে হয়?

বেশ, এটা একটা অনন্যসাধারণ লড়াই এবং কোনও রাজ্যের নির্বাচন এতটা আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে এমনটা হয় না। কেন্দ্র সরকার এই নির্বাচনকে অস্বাভাবিক পরিমাণে গুরুত্ব দিয়েছে। অন্যদিকে, এটা অস্বাভাবিক নয় যে, স্থানীয় বাঙালিরা মনে করে নির্বাচন সত্যিই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। দুজনে মিলে একটা সম্মুখসমর তৈরি করেছে, যা বিশ্বের নির্বাচনের ইতিহাসে বিরল।

বাংলার নির্বাচনের সঙ্গে হিংসা যুক্ত হয়ে থাকে কেন? এই হিংসার ভয়ের কথা নির্বাচন কমিশনও উল্লেখ করে আট দফায় নির্বাচন

আমি মনে করি না যেএর কারণ বাংলা হিংসায় এগিয়ে। আমার মনে হয় নির্বাচন কমিশন একে ভাগ করতে চেয়েছ এবং আপনি যদি দেখেন কীভাবে নির্বাচন হচ্ছেসেখানে প্রধানমন্ত্রী যাচ্ছেন এবং প্রধানমন্ত্রিত্বের ভূমিকার সামান্যই পালন করছেন এবং নির্বাচনের অন্য দফার জন্য নির্দিষ্ট সময়ে তিনি আবার ফিরে আসছেন। এটা যদি এক দিন বা দুদিনের নির্বাচন হত, তাহলে কেন্দ্র সরকার স্পষ্টত যেভাবে অংশগ্রহণ করছে তা সম্ভব হত না। এখন আমি জানি না এই কারণেই নির্বাচন কমিশন এই ফর্ম্যাটে নির্বাচন করছে কি না। যেভাবে আইন-শৃঙ্খলা ব্যাহত হচ্ছে, তাতে বাংলার অনেক মানুষ নির্বাচন কমিশনের সমালোচনা করছে। এমনকী গুলি করে চার বাঙালিকে হত্যা করা হল যারা সবাই মুসলিম। আমি সেই ঘটনায় যাচ্ছি না। কিন্তু ব্যাপারটা এই নয় যে, বাংলায় শুধুমাত্র শান্তির প্রশ্ন শান্তি না থাকার জন্য বাংলায় আট দফায় ভোট করতে হচ্ছে। এর মধ্যে রাজনৈতিক কার্যকারণ সূত্র নিহিত রয়েছে এবং আমরা তা নিয়েও আলোচনা করতে পারি।

আমি জানি না যে, ঐতিহ্যগতভাবে বাংলার নির্বাচনে এত রক্তপাত হয়। যদি আপনি ব্রিটিশ রাজত্বের ইতিহাসের কথা স্মরণ করেন তাহলে দেখবেন বছরের পর বছর ধরে বাংলাকে নিয়ে লড়াই চলেছে। পলাশির যুদ্ধে বাংলায় ব্রিটিশ রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। বাংলার শেষ রাজা সিরাজ-উদ-দৌলার সঙ্গে ব্রিটিশদের লড়াই লেগেই ছিল। তারপর ভারতের জাতীয় আন্দোলনে ব্রিটিশদের উৎখাত করতে বহু হিংসার ঘটনা ঘটে তার শিকড় ছিল বাংলায়। তাই, একটা ঐতিহাসিক ঐতিহ্যও রয়েছে।

হিন্দু মুসলিমের মধ্যে বাংলা ভাগ হয়ে গেল যেটা ঐতিহ্যগতভাবে বড় বিভাজন নয়। বরং আপনি যদি বাংলার সংস্কৃতি  সাহিত্যের সূচনাপর্বে ফিরে যান অর্থাৎ দশম শতকে তাহলে দেখবেন হিন্দু মুসলিমদের পারস্পরিক মিলন সহাবস্থান। রামায়ণ মহাভারত মহাকাব্যের অনুবাদের উদ্যোগ নিয়েছিলেন বাংলার মুসলিম রাজা যিনি ছিলেন এই দুই মহাকাব্যের ভক্ত। নানা সময়ে হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের ঐতিহ্য রয়েছে। হিন্দু মুসলিমদের বিভাজিত করতে ব্রিটিশরা ভীষণ তৎপর ছিল। একে বলা হতডিভাইড অ্যান্ড রুল এই নীতির খানিকটা আজও চলছে যদি আপনি নয়া নাগরিকত্ব আইনের মতো বিষয়কে দেখেনতাহলে বুঝবেন। মুসলিমদের কাছে এটা গ্রহণযোগ্য নয় কারণ এই আইনে হিন্দুদের যে অধিকার দেওয়া হয়েছে তা তাদের নেই। এতে শুধু মুসলিমরা অসন্তুষ্ট হয়নিপাশাপাশি ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে যে হিন্দুরা জোরালোভাবে কাজ করছে তারাও অসন্তুষ্ট হয়েছে।

সর্বোপরি, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর বাংলা এমনভাবে ধর্মনিরপেক্ষতা বজায় রাখতে বদ্ধপরিকর যা বেশ উল্লেখযোগ্য। তাই, কোনও রকম উল্লঙ্ঘন যেখানে বাইরের পুলিশ এসে নির্দিষ্ট একটি ঘটনায় শুধুমাত্র মুসলিমদের গুলি করছে বামুসলিমরা আমাদের ভোট দেবে আমরা তা প্রত্যাশা করি নাবলছে একটি দলের নেতা যার দল নির্বাচনে জেতার চেষ্টা করে যাচ্ছে। কেন নয়? এটাই সব ধরনের প্রশ্ন উত্থাপন করে দিচ্ছে। তাইঅস্থিরতার কারণ রয়েছে যেটা আমাদের ভাবতে হবে। ধর্মনিরপেক্ষতা খুব বড় বিষয় বাংলায়। আমাদের সবচেয়ে বিখ্যাত কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকিন্তু তার পরেই কাজী নজরুল ইসলাম। এবং যে পত্রিকায় তিনি লিখতেন তার মাথায় ১৫ শতকের একটি বাংলা কবিতা থাকত। সেটা এইরকম, ‘সবার উপরে মানুষ সত্যতাহার উপরে নাই এই নির্বাচনে ধর্মনিরপেক্ষতা ভীষণভাবে রয়েছে ময়দানে লড়াইক্ষেত্রে।

 বিজেপি নিঃসন্দেহে মেরুকরণকে ব্যবহার করছে, কিন্তু ভোটকুশলী প্রশান্ত কিশোর জানিয়েছেন যে টিএমসি কংগ্রেস শুধুমাত্র মুসলিম তোষণ করেছিল এবং হিন্দুরা তাদেরই ভোট দিতে চাইছে যারা তাদের স্বার্থ দেখছে। আপনি কি এর সঙ্গে সহমত?

একে আনুমানিক ইতিহাস বলে মনে হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে বাংলা একটি বিভাজিত ক্ষেত্র। ২০ শতকের শুরুতে ব্রিটিশরা যখন ভাগ করেছিল এবং চেয়েছিল মুসলিমদের অংশটুকু আলাদা করে দিতে তখন তারা আশা করেছিল যেএই কাজে বাংলার মুসলিমদের সমর্থন পাবে কারণ সংখ্যাগত আধিপত্য স্বীকৃত হবে। বাঙালিরা কী করেছিল? বাঙালিরাহিন্দু মুসলিম উভয়েইএর সম্পূর্ণ বিরুদ্ধে ছিল। বাংলার ঐক্য নিয়ে একটি কবিতাআমার সোনার বাংলাপরে বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত হয়। বাংলার হিন্দুদের চেয়ে ঐতিহ্যগতভাবে মুসলিমরা অনেক দরিদ্র যা অনেক সমীক্ষা থেকে উঠে এসেছে। এটা মোকাবিলা করতে ন্যায়বিচারের প্রয়োজন আছে, দরিদ্রদের যত্ন নিতেতাদের যত্ন নিতে যারা ন্যায়বিচারের পিরামিডের একেবারে নিচে রয়েছে। এটা গুরুত্বপূর্ণ। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর মতো মানুষেরা সব সময় এই দিকটি তুলে ধরেছিলেন। একটা এলাকায় কারা দরিদ্র এবং তাদের সাহায্যের জন্য কী করা যেতে পারে তা দেখা জরুরি। বাংলার মতুয়ানমঃশূদ্রহিন্দু নিম্নবর্ণ হিন্দুঘেঁষা আদিবাসী জনজাতির জন্য যে কারণে চিন্তা উদ্বেগসেই একই কারণে মুসলিমদের জন্যও এখন উদ্বেগ।

তাই আমার মনে হয়মুসলিমরা এককালে করেছে এবং এখন তাদের শিক্ষা দেওয়ার সময় এসেছে হিন্দুদেরএমন ধারণা কার্যত হিন্দুত্ববাদী আদর্শ দ্বারা উদ্বুদ্ধ একটি দলের প্রোপাগান্ডার অংশ। এবং এমন কথা যেই বলুন তিনি ভুল করছেন কারণ আপনাকে সুবিধাপ্রাপ্ত সুবিধাবিহীন--- এই দৃষ্টিতে মানুষকে দেখতে হবে। ভারত সরকার নিজেই মুসলিমদের সুবিধাবঞ্চিত করে রেখেছে। তাই ভারতের বাইরে আপনার সঙ্গে দুর্ব্যবহার করা হয়হিন্দুরা যেভাবে ভারতে আশ্রয় চাইতে পারেআপনি পারবেন না। এমন পরিস্থিতিতে পূর্ণাঙ্গ চিত্রের দিকে নজর দিতে হবে।

 আপনি নিম্নবর্ণ সুবিধাবিহীনদের সম্পর্কে বললেন। বিজেপি তাদের ভোটার হিসাবে বিচার করে। উত্তরপ্রদেশে ২০১৯ সালের সাধারণ নির্বাচনে তারাই বিজেপিকে ভোট দিয়েছিল। আপনি একে কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?

এটা খুবই আকর্ষণীয় প্রশ্ন কারণ নির্বাচনে যা ঘটেতা কিন্তু একটি নির্দিষ্ট এলাকার ন্যায়বিচারকে প্রকাশ করে না। সাংগঠনিক সুযোগ-সুবিধার উপর এটা অনেকটা নির্ভর করে। বাংলা উত্তরপ্রদেশ থেকে দূরে কেরলের বিষয়টি একটি অন্যতম আকর্ষণীয় ব্যাপার। ভারতের অন্য জায়গার তুলনায় কেরলে অনেক বেশি অস্পৃশ্যতাবর্ণ বিভাজন ছিল। এবং তারপরও চূড়ান্ত সংগঠনের কারণেএক্ষেত্রে বামেদের দ্বারাবর্ণগত পরিস্থিতি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমূল বদলে গেল। এবং সম্ভব হয়েছিল কমিউনিস্ট পার্টির জন্য কারণ তারা সব বর্ণের কাছ থেকে সমর্থন পেতে বর্ণ প্রথাকেই অস্বীকার করে। রাজনৈতিক সংগঠন যে বিপুল ভূমিকা পালন করে তাকে আমাদের উপেক্ষা করলে চলবে না।

হিন্দুত্ব সব সময়ই একটি গতিশীল রাজনৈতিক আন্দোলন। আমি তাদের সঙ্গে সহমত নাও হতে পারিকিন্তু তাদের অনেক সাংগঠনিক বৈশিষ্ট্যকে আমি প্রশংসা করি এবং সব নির্বাচনে তারা সফলও হয় যেমনটা ঘটেছে আদিবাসী এলাকায়। উদাহরণ হিসাবে ত্রিপুরাকে ধরা যাক। আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে বিজেপি দখল করে নিতে পারত এদের সাংগঠিক দিকটির দিকে আমাদের তাকাতে হবে। এই কারণে যদি প্রশ্ন করা হয় যেবাংলা যদি এতই ধর্মনিরপেক্ষ হয় তাহলে একটি হিন্দু দলজিতুক আর না জিতুকসম্ভাবনার দোরগোড়ায় এসে পৌঁছল? এর কারণ হল সংগঠন। আমার মনে হয় নাআমরা এমন কোনও নির্বাচন দেখেছি যেখানে কেন্দ্র এত মনোযোগ দিয়েছে। শুধু প্রধানমন্ত্রী ননকেন্দ্রীয় স্বরাষ্টÉমন্ত্রীভারতের সর্ববৃহৎ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী প্রায় প্রতিদিন আসছেন এবং বিপুল টাকা ঢালছে। ঢালার মতো বিজেপির প্রচুর টাকা রয়েছে এবং তারা তার সদ্ব্যবহার করছে। তাই আমার মনে হয়আমাকে সেইভাবে একে দেখতে হবে। আমাদের কিছু করার নেই বলে আশাহত হওয়ার কোনও কারণ নেই। ধর্মনিরপেক্ষতা নিরপেক্ষ ন্যায়বিচার সহ নিজের আদর্শ-নীতিতে যদি আপনি বিশ্বাস করেনতাহলে এর জন্য আপনাকে কাজ করে যেতে হবে। এমনভাবে আপনাকে কাজ করে যেতে হবে যেমুসলিম বা হিন্দু বা দলিত বা অদলিত যেই হোক তাদের সবার প্রতি আপনার নীতি-আদর্শ বজায় থাকবে।

 আপনি কি মনে করেন রাজ্য সরকার নির্দিষ্ট কয়েকটি মারাত্মক ভুল করেছে?

তা থাকতেই পারেআমি নির্দিষ্টভাবে পর্যবেক্ষণ করিনি। সাফল্যের দিকও রয়েছে। দরিদ্র হওয়া সত্ত্বেও গুজরাতি কৃষকদের চেয়ে বাংলার কৃষকদের স্বাস্থ্যের অবস্থা অনেক ভালো। বিলি ব্যবস্থা নিয়ে কিছু সমস্যা থাকতে পারেকিন্তু বণ্টনের ক্ষেত্রে বেশ ভালো কাজ হয়েছে এবং আরও অনেক কিছু।

ভুল রয়েছে যেমন ভারতে যেভাবে কৃষকদের সঙ্গে আচরণ করা হয়তবে তার মানে এই নয় যে কেন্দ্রের কাছে কৃষকরা চিরদিনের জন্য হেরে গেলেন। কেন্দ্রীয় স্তরে তারা এখনও জয়ী হওয়ার চেষ্টায়। তাই এটা খুব সহজ ব্যাপার নয়কারণ ভুল ধরা খুব সহজকিন্তু যখন রাজনৈতিক বিশ্লেষণ করা হচ্ছেতখন আমাদের সত্য খুঁজতে হবে এবং আমাদের কিছুটা হলেও বিনয় থাকতে হবে। যাকে তাৎক্ষণিকভাবে উত্তর বলে মনে হচ্ছেতা উত্তর নাও হতে পারে।

(সৌজন্য: হিন্দুস্তান টা্ইমস)

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only