বুধবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২১

গণতন্ত্রের উৎসব ও নির্বাচনী উদ্বেগ

ধর্মের ভিত্তিতে ভাগ করে নির্বাচনে ইতিবাচক ফলাফল এক বিপজ্জনক খেলা। ধর্মাশ্রয়ী রাজনৈতিক দল এটা শুরু করেছে। নিজেদের সামনে কোনও ধনাত্মক বিষয় নেই যা তুলে ধরে নির্বাচকমণ্ডলীর মন আদায় করা যায়। ফলে নীতির কোনও বালাই নেই। উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, সমস্ত আক্রমণ গণতন্ত্রের উপর। প্ররোচণামূলক। শালীনতার বাইরে। এমন নির্বাচন আগে দেখা যায়নি। লিখছেন মইনুল হাসান



অনেকগুলো নির্বাচন বাংলায় হতে দেখেছি। আমার মতো অনেকেই তা দেখেছেন। কিন্তু এমন নির্বাচন তথা নির্বাচনী প্রচার হতে দেখিনি। এবার তৃণমূল কংগ্রেসের দুই বারের সরকার আছে। কেন্দ্রে বিজেপির সরকার। বিজেপির এবার মূল লক্ষ্য বাংলা দখল। প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী থেকে শুরু করে ডজন ডজন মন্ত্রী, নেতা পশ্চিমবাংলা আসছেন। প্রতিদিন মিথ্যা ভাষণ দিচ্ছেন, উড়ে যাচ্ছেন। একাজে নেতৃত্ব দিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী নিজে। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীকে এমনভাবে ডাকছেন বা তাঁর নাম উচ্চারণ করছেন যেটা সমস্ত রকম শালীনতার বাইরে। তাছাড়া তিনি একজন মহিলার সম্পর্কে বলছেন এটাও মনে রাখেন না। এমনটা আমরা অতীতে দেখিনি। অবলীলাক্রমে যিনি অমৃত ভাষণ করতে পারেন।

প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনটাকে কোনও নীতির লড়াই বলেই মনে করছেন না। বত্তৃ«তা শুনলে মনে হবে যেনবাংলা দখল তাদের হয়ে গিয়েছে। কোনও বুনিয়াদি প্রশ্ন নিয়ে তিনি আলোচনা করছেন না। এত বিকাশের গল্প শোনান কিন্তু এখন নির্বাচনের সময় নিজেদের ইশ্তেহার দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলোও উচ্চারণ করেন না। অতীতের গুলো খুব বেশি আলোচনা নাই বা করলাম। বেকার যুবকদের কী কাজ হবে? কৃষকদের জন্য, শ্রমিকদের জন্য, সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার কী ব্যবস্থা হবে, সেসব ব্যাপারে কোনও বক্তব্য নেই। দেশের অর্থনীতি অতল গভীর খাদে নেমে গিয়েছে। সেখান থেকে টেনে তোলার কোনও চেষ্টা নেই। কোটি কোটি সাধারণ গরিব মধ্যবিত্ত পেনশনভোগী মানুষ যাতে আরও অন্ধকার রাজত্বে চলে যায় তার জন্য সুদের হার কমানো হচ্ছে। কমিয়ে দিয়েও নির্বাচন মনে পড়েছেএকটু থমকে দাঁড়িয়েছে। একই ব্যাপার কৃষকের সারের ব্যাপারে। যে কোনও সার বস্তা প্রতি ৫০০ টাকা বাড়িয়ে দিয়েছে। দিনদিন রান্নার গ্যাসের দাম বাড়ছে। এসব থেকে সাধারণ মানুষ, যারা দিন আনে দিন খায়তারা কীভাবে রেহাই পেতে পারে তার কোনও রাস্তা দেখানোর দায় প্রধানমন্ত্রী তার নির্বাচনী প্রচার ভাষণে রাখেননি।

বাংলা নাকি বহু পিছিয়ে গেছে। তাকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার রাস্তা কি? শিল্পের উন্নতি, নতুন শিল্প নিয়ে আসাউন্নয়ন তথা বিকাশের রাস্তা উচ্চারণ করা সেসব প্রধানমন্ত্রী বা স্বরাষ্টÉমন্ত্রী কোনওভাবেই বলছেন না। কতকগুলো কুৎসিত বাক্য দিয়ে নিজেদের ভাষণটাকে সাজিয়েছেন। ভারতের রাষ্টÉযন্ত্রের প্রধান মানুষের কাছ থেকে সামান্য সৌজন্য শালীনতা কেবল বাঙালি নয়, সমগ্র দেশবাসী আশা করেছিল। তার কোনও বালাই নেই।

এসবের মধ্যেও একটা বিষয় উত্থাপন করতে বিজেপি ভোলেনি, তা হল নাগরিকপঞ্জী সংক্রান্ত বিষয়গুলি। বিজেপি নাকি বাংলায় ক্ষমতা দখল করবে। আর প্রথম মন্ত্রিসভার বৈঠকেই এনআরসি কার্যকর করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে। যেন সেই গাছে কাঁঠাল দাড়িতে তেলের ব্যাপার হচ্ছে। বিজেপির বাংলা দখলের প্রবল অশ্লীল ইচ্ছার প্রধান কারণটা পরিষ্কার হয়ে গেছে। অসমে নিজেদের সরকার থাকার ফলেও এনআরসি কায়েম করতে পারেনি। কিন্তু গণ্ডগোলটা পাকিয়ে দিয়েছে। লক্ষ লক্ষ অসমীয়া হিন্দু, মুসলিমআদিবাসীকে সন্দেহজনক আখ্যা দিয়ে ভোট দিতে বিরত রাখতে পেরেছে। বাড়ি-ঘর ছেড়ে বহু মানুষকে উদ্বাস্তু শিবিরে থাকতে বাধ্য করেছে। মুসলমানদের জধ করবে বলে মনে করেছিলতবে হিন্দু-মুসলমান সবাই এখন উদ্বাস্তু। বরং হিন্দুদের সংখ্যা বেশি। আবার গণনা করতে হবে বলে বিজেপির মন্ত্রীরা সুপ্রিম কোর্টে মামলা ঠুকে দিয়েছে। বহু মানুষ এবার সেখানে ভোট দিতে পারছেন না।

বাংলায় সেই কাজটাই তারা করবে। এনআরসি- আইন জোর করে পাশ করানো হয়েছে। এরাজ্যে তা কার্যকরী করার নানা চেষ্টা করেছে নানাভাবে। নিয়ে রুখে দাঁড়ান রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বিজেপি নেতাদের বিদ্বেষের এটাও একটা কারণ। দীর্ঘদিন ধরে বিজেপি অনুপ্রবেশ নিয়ে সরব। রাজ্যের সংখ্যালঘুদের বেশির ভাগকে তারা অনুপ্রবেশকারী বলে মনে করে। মঞ্চে মঞ্চে তারা বলেছেন যেএসবকে তারা বাংলা থেকে দুটি সীমান্তের ওপরে পাঠিয়ে দিতে চান। এনআরসি তাদের হাতে আইন নামক অস্ত্র। প্রজন্মের পর প্রজন্ম যারা বাংলায় বাস করছেন তারা সব ছেড়ে কোথায় যাবেন সে ব্যাপারে কোনও বক্তব্য নেই। এখনও স্বরাষ্টÉমন্ত্রীর বক্তব্য থেকে এটা পরিষ্কার যে বাংলাকে তারা হিন্দুত্ববাদীদের বাসস্থান করে ছাড়বেন। যে হিন্দুত্ববাদের সঙ্গে উদার হিন্দু ধর্ম দার্শনিক ভাবনার কোনও মিল নেই।

()

বিজেপির উদ্দেশ্য কি সেটা পরিষ্কার। বাংলার ঐতিহ্যবাহী সংস্টৃñতি সম্পর্কে তাদের ধারণা নেই। কিন্তু নির্বাচনের সময় বাংলার মানুষের মন জয় করার অজুহাতে বাঙালি কবি-সাহিত্যিকদের নাম উচ্চারণ করছে তাদের লেখা থেকেকাব্যাংশ প্রবন্ধ থেকে যুতসই স্থানগুলি বলছে। তাতে ঘোরতর বিপত্তি দেখা যাচ্ছেতাতে কোনও সন্দেহ নেই। রবীন্দ্রনাথের জন্মস্থান কর্মস্থানে গণ্ডগোল করে ফেলেছে। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়-এর নাম ক্রমাগত পাঁচ মিনিট চেষ্টা করেও না পেরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ক্ষান্ত হয়েছেন। কিন্তু কোনও অবস্থাতেই কাজী নজরুল ইসলামের নাম উচ্চারিত হয়নিহবে না। কারণ তিনি মুসলমান।

()

এখন পশ্চিমবাংলায় বিজেপি ভোট ভাগাভাগির খেলাতে মেতেছে। ধর্মের নামে ভোট চাইছে। আমার খুবই আশ্চর্য লেগেছিল যেএকজন নামী বিজেপি নেতা বলেছেনবিজেপিকে ৭০ শতাংশ ভোটের মধ্যে ৫০ শতাংশের বেশি ভোট পেতে হবে। প্রথমে বুঝতে পারিনি। সামান্য চিন্তার পর তার মানে বোঝা গেল। ৩০ শতাংশ মুসলমানের ভোট বিজেপির বাইরে থাকবে সেটা তারা প্রকাশ্যে জানিয়ে দিয়েছে।

এমন প্রকাশ্য বিভাজন বাংলার মানুষকে অতীতে কোনও রাজনৈতিক দল করেছে বা করার সাহস দেখাতে পেরেছে বলে আমার জানা নেই। তৃণমূল কংগ্রেস থেকে বিজেপিতে যাওয়া একজন নেতা এখন খুবই কল্পে পাচ্ছেন। তিনি মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রীর নামের আগে একটি মুসলমানদের সম্ভাষণ বাক্য দিতে শুরু করলেন। কোন লেখাপড়া জানা মানুষ এসব করতে পারে সেটা বাঙালি বোধ হয় এই প্রথম দেখলো। যদিও নির্বাচন কমিশন ব্যাপারে কড়া পদক্ষেপ করে সেটা বন্ধ করেছে।

আসলে বাংলা যা নয় তা করে দেখানো হচ্ছে। বাংলাকে ধর্মের ভিত্তিতেমোটা দাগে বললে হিন্দু-মুসলমানে ভাগ করে ফেলা হচ্ছে। উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী এখানে অনেক সভা করছেন এবং আরও করবেন। তাঁর লম্বা চাওড়া ভাষণ শুনলে অস্থির হয়ে যেতে হয়। যিনি নিজের রাজ্যে কার্যত কুরবানি নিষিদ্ধ করেছেনওয়াকফ সম্পত্তি দখল করলে কোনও ব্যবস্থা নিচ্ছেন নাসংখ্যালঘু মুসলিমরা কার্যত কোণঠাসা অবস্থায় আছেনসমস্ত সরকারি প্রতিষ্ঠান বা গ্রাম-মহল্লা-শহরযার সঙ্গে মুসলমান নাম বা কোনও অনুষঙ্গ জড়িত আছে সেগুলি সব পাল্টে দিচ্ছেন। তিনি পশ্চিমবাংলায় নির্বাচনী প্রচারের মঞ্চে থেকে বাংলায় হিন্দুত্ববাদী দর্শন কিভাবে কার্যকরী করা হবে সেটা উচ্চস্বরে জানান দিচ্ছেন। সমস্ত অসুবিধার মধ্যে এক্ষেত্রে সামান্য সুবিধা হচ্ছে ভদ্রলোকের সভাগুলিতে লোকজনের সংখ্যা খুবই কম। আর তাঁর সংস্টৃñ ঘেঁষা কড়া হিন্দি বোঝার মানুষও খুব কম। কিন্তু অবলীলাক্রমে তিনি গাদা গাদা অসত্য কথা বলে যাচ্ছেন। নিজের রাজ্যে হাথরসের মতো কাণ্ড ঘটিয়ে নারী সুরক্ষায় এই রাজ্য কতখানি পিছিয়ে আছে তারই গল্প শোনাচ্ছেন।

বাঙালি নিজের ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতিকে রক্ষা করার ব্যাপারে বহু পরীক্ষার মুখোমুখি হয়েছে। দেশভাগ, দাঙ্গা, দরিদ্রক্ষুধা ইত্যাদি ক্ষেত্রে বাঙালি জিতেছে। আজ আর একটা সময় মুখে এসে দাঁড়িয়েছে। এবার এই বিপদকে হারাতে হবে। জিততে হবে কেবলমাত্র বাংলার জন্য। সারা দেশের জন্যও তা অত্যন্ত জরুরি। দীর্ঘদিন ধরে যে কৃষকরা দিল্লির সীমান্তে জীবন বাজি রেখে আন্দোলনরত তারাও তাকিয়ে আছে এই নির্বাচনের দিকে। বাংলায় নির্বাচনের ফলাফলের দিকে। বরাবর বাংলা সারা দেশের সামনে উজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে থেকেছে। এবারও তার ব্যতিক্রম হবে না, বিশ্বাস আমরা করছি।

প্রথম দিকের কথাগুলি আবার বলছি। ধর্মের ভিত্তিতে ভাগ করে নির্বাচনে ইতিবাচক ফলাফল এক বিপজ্জনক খেলা। বিজেপি এটা শুরু করেছে। নিজেদের সামনে কোনও ধনাত্মক বিষয় নেই যা তুলে ধরে নির্বাচক মণ্ডলীর মন আদায় করা যায়। ফলে সব চাইতে ঘৃণ্য পদ্ধতিটিকে গ্রহণ করতে তারা পিছুপা হচ্ছে না। ফলে নীতির কোনও বালাই নেই। দেশের প্রধানমন্ত্রী অথবা পাড়ার বিজেপি নেতা তাদের মধ্যে কোনও পার্থক্য নেই। উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, সমস্ত আক্রমণ গণতন্ত্রের উপর। প্ররোচণামূলক। শালীনতার বাইরে। সেই কারণে প্রথমেই বলেছি এমন নির্বাচন আগে দেখা যায়নি।

()

সবচাইতে নগ্ন আক্রমণ দেখা গেল কোচবিহার জেলায় শীতলকুচিতে জন মারা গেলেন। বেশিরভাগই অল্প বয়সের তরুণ। / জন এই প্রথমবার ভোট দিতে যাচ্ছেন। কেউ বাইরের রাজ্য থেকে কাজ করতে করতে নিজের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করতে এসেছিলেন। এরপরই যা হওয়ার তা সবাই জানেন। কেন্দ্রীয় বাহিনী সুস্থ ভোট করানো এবং শান্তি বজায় রাখার জন্য মোতায়েন ছিল। তাদের ছোঁড়া গুলিতেই প্রয়াত জন। কতখানি উত্তেজনা ছিল অথবা কেন্দ্রীয় বাহিনী আক্রান্ত হয়েছিলেনতা বিচার সাপেক্ষ। তবে এই ঘটনা দেখে বিজেপি নেতারা উল্লসিত হয়ে উঠলেন। কেউ বললেন জন কেন জন মারা গেলেও কিছু যেত-আসত না। কেউ বললেন বাংলার আরও অনেক জায়গায় শীতলকুচির মতো ঘটনা ঘটবে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মৃত ব্যক্তিদের ধর্ম পরিচয় উল্লেখ করলেন। নির্বাচন কমিশন মুখ্যমন্ত্রীকে সেখানে যেতে দিলেন না। ৭২ ঘণ্টার নিষেধাজ্ঞা হল সমস্ত রাজনৈতিক দলের উপর। নির্বাচন কমিশনের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই আজ বলতে হচ্ছে, এই প্রতিষ্ঠানের গরিমা আজ ধুলায় লুণ্ঠিত।

()

মানুষের উর্ধ্বে কোনও কিছু নয়। গণতন্ত্রে মানুষ তথা জনগণই সমস্ত কিছুর নিয়ন্তা। দেশে থাকার দেশ চালানোর সবচাইতে বুনিয়াদি তত্ত্ব এটি। সেই জনতা জাগে যখন তখনই সামাজিক বিপ্লব হয়। যা সব সময় আগে থেকে আঁচ করা যায় না। পৃথিবীর ইতিহাসে তার বহু উদাহরণ আছে। আজ বাংলায় সেই পরিস্থিতি বিচার করছে। মানুষকে মানুষ হিসেবে না দেখে ধর্মের ভিত্তিতে গণনা করা যে কত বড় অপরাধ, তার জবাব মানুষই দেবে। আর এটা সব ধর্মের প্রতিও অপমান। কারণসব ধর্মই শান্তি ভ্রাতৃত্বের কথা বলে। বিজেপির ক্লেদাক্ত হিন্দুত্ববাদী দর্শন সব কিছুর মাত্রা ছাড়িয়েছে। শালীনতা ছাড়িয়েছে। যা বাংলার মানুষ মানবে না। রাজ্যে আর একবার সংগ্রাম প্রতিরোধের ইতিহাস রচিত হবে। 

 

 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only