শনিবার, ১৭ এপ্রিল, ২০২১

শীতলকুচি হত্যাযজ্ঞ–৩.... জনতা নয়, ভোটের লাইনে দাঁড়ানোদেরই নিশানা করে বাহিনী

 



ঘটনাস্থল থেকে নিউজলড্রি–র অন্তর্তদন্ত

মনিরুল জামানের বাড়িতেও একই চিত্র দেখা গেল। বাহিনীর গুলিতে নিহত মনিরুল রেখে গেছে তাঁর স্ত্রী এবং শিশুকন্যাকে। মনিরুলের মামার নাম মাজিদুল হক। কিন্তু মিডিয়ার সঙ্গে কথা বলতেই তার আপত্তি। তাঁর বক্তব্য, আমি লাগাতার দিন ধরে বার বার একই কথা বলে যাচ্ছি। কিন্তু কেউই আমার কথা প্রচার করছে না। তারা শুধু বলে যাচ্ছেমুখ্যমন্ত্রী আমার সঙ্গে ভিডিয়ো কনফারেন্সে কথা বলেছেন। দিলীপ ঘোষ যে উগ্র কথা বলছেন, মিডিয়া তা জোরে শোরে প্রচার করছে। আর এসব কথায় আমরা আরও বেশি দুঃখ পাচ্ছি। আমাদের ব্যথা-বেদনাকে মিডিয়া বুঝতেই পারছে না।

২৮ বছরের মনিরুল গ্যাংটকে নির্মাণকর্মী হিসাবে কাজ করতেন। মাজিদুল হক বললেন, মনিরুলের স্ত্রী মাস আগে একটি শিশুকন্যার জন্ম দিয়েছে। মনিরুল তাকে দেখতেও আসতে পারেননি। কারণ কাজ ছেড়ে বাড়িতে আসার মতো পয়সাকড়ি তাঁর ছিল না। গ্যাংটকে যা উপার্জন করছেতাই সে নিয়মিত বাড়িতে পাঠিয়েছে। মিডিয়া বলছে, বুথে নাকি জনতা কেন্দ্রীয় বাহিনীর একজন জওয়ানের রাইফেল কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছে। আপনার কি মনে হয়, আমাদের এত হিম্মত রয়েছে? আমরা হচ্ছি দিনমজুর। আমরা সব সময় রাইফেল উর্দিধারীদের ভয় পাই। তারা তো বলছে যে, জনতা তাদের আক্রমণ করেছিল। তবে প্রমাণ হিসেবে তাদের কাছে কি কোনও ভিডিয়ো রয়েছে?

সিআইএসএফ-এর মুখপাত্র এই প্রতিবেদককে বলেন, এখন নয়। অনুসন্ধান শেষ হয়ে গেলে তারা ভিডিয়ো প্রকাশ করবেন। তবে তিনি বলেনক্যামেরায় যে ছবি ওঠে তার সীমাবদ্ধতা রয়েছে। আপনি হয়তো জানেনভোট কেন্দ্রে ভিডিয়ো ক্যামেরা থাকে। কিন্তু তা থাকে ইভিএম-এর দিকে মুখ করে।

হামিদুল হকের বাড়িতে শোক বিষ]তা যেন ছেয়ে রয়েছে। তার রুগ্ন বাবা আমাদের দিকে তাকিয়ে কাঁদতে শুরু করল। তার শ্যালিকা সপিতান বিবি সেদিন যখন গুলি বর্ষণ শুরু হয় তার আগে সে ভোট দিতে মহিলাদের সারিতে দাঁড়িয়েছিল। তারও একই বক্তব্য, সপিতান বললেনযখন তিনি বুঝতে পারলেন কি হচ্ছে, তিনি লাইন ছেড়ে বাঁচার জন্য দৌড়তে আরম্ভ করেন। হামিদুল মাথাভাঙায় এক রাজমিস্ত্রির কাজ করত। প্রতিদিন তার রোজগার ছিল ৩০০ টাকা। তার স্ত্রী বর্তমানে নয় মাসের গর্ভবতী।

একই ধরনের দৃশ্য দেখতে পেলাম নিহত নূর ইসলামের ঘরেও। তার বাবা-মা আমাদের দিকে শুধু শূন্য চোখে তাকিয়ে থাকলেন। ১৯ বছরের নূর ১২৬ নম্বর বুথের পাশে একটি কৃষিজমিতে কাজ করত। আর তখনই গুলি চলে। তার বাবা-মা অস্পষ্টভাবে বলছিল, তাদের ছেলেই ছিল তাদের আয়ের একমাত্র উৎস। তাদের অন্নের ব্যবস্থা করা ছেলেকে তারা হারিয়েছে। মাথাভাঙা হাসপাতালে ১৪ বছরের জাহিদুল হক (মৃণাল) একটি বেডে পড়েছিল। তার মা ছেলের পাশেই বসেছিলেন। পুলিশের বক্তব্য, এই জাহিদুল বা মৃণালকে প্রহার করার গুজব থেকেই ঘটনার শুরু। আর থেকেই নাকি সহিংসতার সৃষ্টি।

জাহিদুল আমাদেরকে বলেসে হঠাৎ অসুস্থ হয়নি। তাকে উর্দিধারীরা বেদম পিটিয়েছে। আমি দৌড়াচ্ছিলাম না, আমি শুধু ব্যস্ত পায়ে ঘরে ফিরছিলাম। এর মধ্যেই কেন্দ্রীয় বাহিনীর একজন জওয়ান আমাকে ধরে ফেলে। অন্য একজন জওয়ান বলে এক বাচ্চা ছেলে ওকে ছেড়ে দাও। কিন্তু অপরজন আমাকে মারতে থাকে। সে একটি লাঠি দিয়ে আমার পিঠে পায়ে মারতে থাকে। ওরা আমাকে খুব বেশিক্ষণ মেরেছে এটা বলব না, কিন্তু জোরে ধাক্কা দিয়ে মাটিতে ফেলে দেয়। আমি পড়ে গিয়ে জ্ঞান হারাই। আমার যখন জ্ঞান ফিরে তখন দেখতে পাই পুলিশ আমাকে হাসপাতালে নিয়ে এসেছে। এই পুলিশরা কিন্তু আমার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করে। ছেলেটি ছিল ভীত-সন্ত্রস্ত। সে কাঁদতে কাঁদতে আমাদেরকে বলে, আমি আর মার খেতে চাই না।

মাথাভাঙা সাবডিভিশনাল হসপিটালের সুপার বললেন, ‘জাহিদুলকে যখন এখানে আনা হয় তখন সে খুবই বেশি আহত ছিল না। কিন্তু সে ভীত-শঙ্কিত ছিল। সুপার আরও বলেন, যারা মারা গেছে তাদের বুকে কাঁধে বুলেটের জখম ছিল।তিনি আরও বলেন, ময়নাতদন্তে আরও বিস্তারিত বিবরণ উঠে আসবে।

 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only