শুক্রবার, ১৬ এপ্রিল, ২০২১

প্রশ্নের মুখে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা




অধ্যাপক শিবরঞ্জন চট্টোপাধ্যায়: গণতন্ত্রের সাফল্যের অন্যতম শর্ত হচ্ছেঅবাধ শান্তিপূর্ণ নির্বাচনযেটা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক কর্তব্য। কিন্তু অন্তত আমাদের রাজ্যে এই কর্তব্য পালনে নির্বাচন কমিশন অনেকাংশে সফল হতে পারেনি। 

পশ্চিমবঙ্গে আট দফা নির্বাচনের মধ্যে চার দফা নির্বাচন হয়ে গেল। পঞ্চম দফার ভোট আগামীকাল। পশ্চিমবঙ্গে ভোট যাতে অবাধ শান্তিপূর্ণ হয় তার জন্য নির্বাচন কমিশন নজিরবিহীনভাবে এক মাসের বেশি সময় ধরে আট দফায় ভোটের আয়োজন করেছে। করোনা পরিস্থিতিতে এই প্রলম্বিত নির্বাচন বাঞ্ছনীয় নয়। তামিলনাডY এবং কেরলে একদিনেঅসমে তিন দফায় ভোট সম্পন্ন হয়েছে।

কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েনের সমস্ত রেকর্ড ভেঙে গেছে এই রাজ্যের নির্বাচনে। ২০১৬ সালের বিধানসভা ভোটে এই রাজ্যে এসেছিল ৭২০ কোম্পানি কেন্দ্রীয় বাহিনী। ২০১৯ সালের লোকসভা ভোটে এসেছিল ৭৪৭ কোম্পানি বাহিনী। এবারের ভোটে প্রথম দফায় মাত্র ৩০টি বিধানসভা কেন্দ্রের ১০২৮৮টি বুথের জন্য এসেছিল ৭০৫ কোম্পানির বেশি কেন্দ্রীয় বাহিনী। পরবর্তী পর্যায়গুলিতে আরও বেশি সংখ্যায় কেন্দ্রীয় বাহিনী এসেছে। ভোট ঘোষণার আগেই সাধারণ মানুষের আস্থা বাড়ানোর জন্য টহলদারি করতে ১২৫ কোম্পানি কেন্দ্রীয় বাহিনী পাঠানো হয়েছিল।

শুধু কেন্দ্রীয় বাহিনী নয়পর্যবেক্ষকদের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। ২০১৬- বিধানসভা নির্বাচনে ১৬০ জন সাধারণ পর্যবেক্ষক এসেছিলেন। এবার এসেছেন ২০৯ জন সাধারণ পর্যবেক্ষক। পুলিশ পর্যবেক্ষক এসেছিলেন ৩১ জন। এই নির্বাচন ঘোষণার আগে থেকেই যুক্তিগ্রাহ্য কারণ ছাড়া প্রশাসনিক পুলিশ আধিকারিকদের অপসারণ করা হয়েছে। এত কাণ্ড করেও শেষ রক্ষা হল না। চার দফা নির্বাচনে রাজনৈতিক সংঘর্ষভোটারদের এবং প্রার্থীর এজেন্টদের ভীতি প্রদর্শনখুনপ্রহারঅগ্নিসংযোগপ্রার্থীদের উপর আক্রমণ অবাধে চলেছে। দুজন মহিলা প্রার্থী আক্রান্ত হয়েছেন। এমনকি মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় হিংসাত্মক পরিবেশে বুথের মধ্যে প্রায় দুঘণ্টা আটকে ছিলেন। টিভি চ্যানেলে দেখলাম গোঘাট বিধাসভা কেন্দ্রের তৃণমূল কংগ্রেস প্রার্থী সুজাতা মণ্ডল খাঁ ভোটের দিন প্রাণভয়ে ছুটছেন। কয়েকজন মহিলা বাঁশলাঠি নিয়ে প্রার্থীকে ধাওয়া করছেনতাঁর গাড়ি ভাঙচুর হল। কেন্দ্রীয় বাহিনী বা রাজ্য পুলিশ কাউকেই দেখা গেল না। টিভি চ্যানেলের আরও একটি চিত্রের উল্লেখ করছি। নন্দীগ্রাম বিধানসভার ভোটের দিন সকালে এক মহিলা হাতজোড় করে কাঁদছেন। সামনে এক উচ্চপদস্থ পুলিশ আধিকারিক দাঁড়িয়ে আছেন। মহিলা কাঁদতে কাঁদতে বলছেনতিনি কিছুতেই তাঁর ছেলেকে নির্বাচনী এজেন্ট (তৃণমূল কংগ্রেস প্রার্থীর) হিসেবে পাঠাতে পারবেন না। তাঁর সন্তানের এবং পুরো পরিবারের প্রাণসংশয় হবেকারণআগের দিন রাত্রিবেলা একটি দলের পক্ষ থেকে হুমকি দেওয়া হয়েছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের চিঠির উত্তরে নির্বাচন কমিশন জানিয়েছেএজেন্টদের বুথে নিয়ে যাওয়া কমিশনের কাজ নয়। ঠিক কথা। কিন্তু এজেন্টদের এবং ভোটারদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভীতিপ্রদর্শনেক অপচেষ্টা প্রতিহত করা কি কমিশনের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না? তখন কেন্দ্রীয় বাহিনীর সক্রিয়তা কোথায় ছিল?

অবস্থা চরমে পৌঁছল যখন ১০ এপ্রিল চতুর্থ দফার ভোটের দিন কোচবিহারের শীতলকুচি বিধানসভার আমতলি মাধ্যমিক শিক্ষাকেন্দ্রের ১২৬ নম্বর বুথের নিরাপত্তায় থাকা কেন্দ্রীয় বাহিনী (সিআইএসএফ) গুলি চালায় এবং চারজন ভোটারের মৃতু্য হয়। কেন এবং কোন পরিস্থিতিতে গুলি চলেছিলগুলি চালানোর বিকল্প কিছু ছিল কিনা সেটা তদন্ত সাপেক্ষ। নির্বাচনের  দিন পুলিশের গুলি আগেও চলেছিল। ১৯৯২-এর জুন বালিগঞ্জ বিধানসভা কেন্দ্রের উপনির্বাচনে পুলিশের গুলিতে এক ব্যক্তির মৃতু্য হয়েছিল। কিন্তু এই নির্বাচনে শীতলকুচিতে নিরপরাধ চারজনের প্রাণ গেলযারা ভোট দিতে এসেছিলেন। বহু মানুষের প্রশ্নঘটনাস্থলে রাজ্য পুলিশের বাহিনী ছিল না কেন? তাহলে হয়তো পরিস্থিতি এতটা ঘোরাল হত না।

নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকবার জন্য নির্বাচন কমিশন দুটি নজিরবিহীন নির্দেশ জারি করল। প্রথমটি হচ্ছে১০ এপ্রিল থেকে ৭২ ঘণ্টা কোচবিহার জেলাতে কোনও রাজনৈতিক নেতা-নেত্রী ঢুকতে পারবেন না এই নির্দেশের সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারেকারণএই ধরনের নির্দেশ ভারতীয় সংবিধানের ১৯ নম্বর ধারা বিরোধী। দ্বিতীয় নির্দেশ হলপঞ্চম দফা ভোটের প্রচার ৪৮ ঘণ্টার পরিবর্তে ৭২ ঘণ্টা আগে শেষ হবে। ১৯৫২-এর প্রথম সাধারণ নির্বাচন থেকে আজ পর্যন্ত নির্বাচনী প্রচার শেষ হত ভোট শুরু হওয়ার ৪৮ ঘণ্টা আগে। এই অভূতপূর্ব সিদ্ধান্তের ফলে সমস্ত রাজনৈতিক দলের গণতান্ত্রিক অধিকার খর্ব হল।

নির্বাচন কমিশন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান এবং আমাদের মতো সাধারণ মানুষের কাছে অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় প্রতিষ্ঠান। গণতন্ত্রের সাফল্যের অন্যতম শর্ত হচ্ছেঅবাধ শান্তিপূর্ণ নির্বাচনযেটা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক কর্তব্য। কিন্তু অন্তত আমাদের রাজ্যে এই কর্তব্য পালনে নির্বাচন কমিশন অনেকাংশে সফল হতে পারেনি। বামফ্রন্টের দীর্ঘ ৩৪ বছর শাসনে ব্যাপকভাবে রিগিং এবং ছাপ্পা ভোট হয়েছে। বিরোধী দলের এজেন্টদের বুথ থেকে মেরে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। নির্বাচন কমিশন বহু ক্ষেত্রেই ঘুমিয়ে ছিল। ২০০৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের সময় আফজল আমানুল্লা নামে বিহার ক্যাডারের একজন আইএএস আধিকারিককে বিশেষ পর্যবেক্ষকের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। তিনি কঠিন হাতে হাল ধরেছিলেন। রাজ্যের মুখ্যসচিব স্বরাষ্টÉসচিবের সঙ্গে তাঁর প্রকাশ্যে মতভেদ হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত তিনি পারেননি। নির্বাচন কমিশনের কাছ থেকে কোনও মদত না পেয়ে নির্বাচনের দিন হতাশায় তিনি কলকাতা ছাড়েন। নির্বাচন কমিশনকে দেওয়া বিস্ত+ প্রতিবেদনে তিনি তৎকালীন শাসকদলের রিগিং নির্বাচনী কারচুপি সম্পর্কে বহু তথ্য তুলে ধরেছিলেন। যেটি কিছু সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছিল। আজ কোন যাদুবলে নিষ্ক্রিয় নির্বাচন কমিশন হঠাৎ ঘুম ভেঙে সক্রিয় হয়ে উঠল? সক্রিয় হল তো ভালো কথা। কিন্তু নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে পেরেছে কি?

নির্বাচন ঘোষণার আগে উপনির্বাচন কমিশনার সুদীপ জৈন রাজ্যে এসে জেলাশাসক পুলিশ সুপারদের শাস্তির হুমকি দিলেন। জৈন সাহেবের হুমকি থেকে স্বরাষ্টÉসচিবও রক্ষা পেলেন না। তারপর নির্বিচারে আধিকারিকদের বদলি কোনও যুক্তিগ্রাহ্য কারণ ছাড়াই। সাধারণত একটি পদে তিন বছর থাকলে নির্বাচনের আগে বদলি করা হয়। সমস্ত সরকারই এটা করে থাকে। কিন্তু নির্বাচন ঘোষণার এক সপ্তাহের মধ্যে রাজ্য পুলিশের অতিরিক্ত মহানির্দেশক (আইনশৃঙ্খলা) এবং মহানির্দেশককে সরিয়ে দেওয়া হল। প্রথমোক্ত আধিকারিক এক মাস আগে দায়িত্ব নিয়েছেন। বলা হল পর্যবেক্ষকের রিপোর্টের ভিত্তিতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বাইরে থেকে আসা পর্যবেক্ষক এক সপ্তাহের মধ্যেই মূল্যায়ণ করে ফেললেন? তারপর অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ আধিকারিককে অপসারণ করা হয়েছে। অতি সম্প্রতি কলকাতার জন রিটার্নিং অফিসারকে সরানো হল। নির্বাচন প্রক্রিয়া চলাকালীন রিটার্নিং অফিসারকে সরিয়ে দিলে নির্বাচনী কাজ ব্যাহত হতে পারে। অনেকেই মনে করেনকারও অঙ্গুলিহেলনে কমিশন এই কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে।

সবশেষে বলিকোনও আধিকারিককে শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতা নির্বাচন কমিশনের নেই। ভোট প্রক্রিয়া শেষ হলে কমিশনের কোনও ভূমিকা থাকে না। নির্বাচনী গাফিলতি সংক্রান্ত কোনও অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট আধিকারিকের বিরুদ্ধে সেই অভিযোগ উপযুক্ত সরকারি কর্তৃপক্ষকে (কেন্দ্রীয় বা রাজ্য সরকার) জানানো যেতে পারে। নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে যদি সাধারণ মানুষের মনে সংশয়ের সৃষ্টি হয় তাহলে গণতন্ত্রের ভবিষ্যত অন্ধকার হতে বাধ্য।

 

লেখক প্রাক্তন বিভাগীয় প্রধান (রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ)– মৌলানা আজাদ কলেজ

 

 


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only