শুক্রবার, ১৬ এপ্রিল, ২০২১

শীতলকুচি হত্যাযজ্ঞ-২: ভোটারদের তাক করেই গুলি চালায় কেন্দ্রীয় বাহিনী




ঘটনাস্থল থেকে নিউজলড্রি–র অন্তর্তদন্ত

কোন কেন্দ্রীয় বাহিনী ওই দুটি গাড়ি করে এসেছিল এবং ভোটারদের উপর গুলি চালিয়েছিল তা মাকসিদুল বলতে পারল না (কারণ তিনি উর্দি দেখে তাদের চিহ্নিত করতে পারেননি) আমরা যেসব গ্রামবাসীর সঙ্গে কথা বলেছি তাঁরা বলেনবাহিনীর নাম বলতে পারব নাতবে তারা রাজ্য পুলিশ নয়। নির্বাচন কমিশনের বিশেষ পুলিশ পর্যবেক্ষক অবশ্য বলেছেন– ‘সিআইএসএফ- গুলি চালিয়েছিল। অবশ্য সহিংস এক জনতার হাত থেকে বাঁচতেই তারা গুলি চালায়।কিন্তু গ্রামবাসীরা বারবার বলছেওখানে কোনও জনতাই জড়ো হয়নিকাজেই তাদের সহিংস হওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। জামিউল হক (৩১) গুলিতে আহত হয়ে মাথাভাঙা হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে। তার বক্তব্য, আমি দুদিন ধরে মিডিয়াকে একই কথা বলে যাচ্ছিকিন্তু আসলে যা ঘটেছিল তা কেউই তুলে ধরতে রাজি নয়। জামিউল, এর পায়ে লোহার কয়েকটি পিন ঢুকে রয়েছে। প্রায় বছর দশেক আগে একটি ট্রাক দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল জামিউলের পা। তার এক পায়ের হাড়ে লোহার পিন লাগিয়ে মেরামত করার চেষ্টা হয়েছিল। জামিউল আমাদের বলে, আমি আমার জখম পায়ের জন্য খুবই আস্তে আস্তে হাঁটি। সত্যি বলতে কীআমি ঠিকমতো হাঁটতেই পারি না। আপনারা কী মনে করেনআমি ভাঙা পা নিয়ে বুথে গণ্ডগোল করার জন্য যাব? বলতে গেলে আমি ১০ বছর ধরে বাড়িতেই বসে আছি। আমি শুধু ভোট দেওয়ার জন্য অনেক কষ্টে বুথে গিয়েছিলাম। বেরিয়ে আসার সময় দেখি দুটি গাড়ি এসে ভোট কেন্দ্রটির বাইরে থামল। গাড়ি থেকে নেমে জওয়ানরা এগিয়ে এলো এবং লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা ভোটারদের উপর গুলি চালাল। জোড়পাটকিতে বাহিনীর গুলিতে যে চারজন মারা গেছেতার মধ্যে একজন জামিউলের চাচাতো ভাই।

দুষ্টু ছেলেদের কথা

বাংলার বিজেপি প্রধান দিলীপ ঘোষ সিআইএসএফ-এর গুলিতে যারা নিহত হয়েছেতাদেরকেদুষ্টু ছেলেবলে চিহ্নিত করেছেন। তিনি আরও ঘোষণা করেন, বিজেপি যদি এবার ক্ষমতা লাভ করে তবে এই ধরনের খারাপ লোকের অস্তিত্ব আর থাকবে না। আর একজন বিজেপি নেতা রাহুল সিনহার দুঃখসিআইএসএফ কেন চারজনের পরিবর্তে আটজনকে হত্যা করল না।

আমরা নিহতদের পরিবার এবং প্রতিবেশীদের সঙ্গে কথা বলেছি। কিন্তু কেউই বলেননি এইখারাপ ছেলেরা স্থানীয় মাস্তান ছিল। নিহতদের মধ্যে একজন প্রকৃতপক্ষে ছিলেন পরিযায়ী শ্রমিক। সে ঘরে ফিরেছিল তার শিশুকন্যাকে প্রথমবারের মতো দেখতে এবং সেইসঙ্গে ভোট প্রদান করতে। নিহতদের মধ্যে দ্বিতীয়জন ছিলেন একজন চাষি আর তৃতীয়জন রাজমিস্ত্রি। আর লাশ হয়ে যাওয়া চতুর্থজন হলেন স্নাতক কোর্সে পড়া ছাত্র। সাইমুল হক (১৯) স্নাতক হতে চেয়েছিল। কিন্তু পড়ার খরচ বহন করার সামর্থ্য তার ছিল না। সে বুথে গিয়েছিল তার বোন আনজুপা খাতুন এবং ভাই সাইদুল হকের সঙ্গে। গ্রামবাসীরা বলছেনসাইমুলকে বাহিনী গুলি করে যখন সিআইএসএফ জওয়ানরা তার ভাইকে বেদমভাবে মারছিল। সে ভাইকে বাঁচানোর জন্য অনুনয় করছিল। জওয়ানরা সাইমুলকে সরাসরি গুলি করে। সাইদুলকে কোচবিহার হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়। বোন আনজুপার কান্না আহাজারির মধ্যে তার কথা ঠিকভাবে বোঝা যাচ্ছিল না। কিন্তু এটা পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছিলকোনও উত্তেজনা বা অশান্তি ছাড়াই সিআইএসএফ গুলি চালায়। তার কথায়– ‘আমার দুই ভাই আমি সকালে ভোট দিতে গিয়েছিলাম। আর লাইনে দাঁড়িয়ে আমাদের পালা আসার জন্য অপেক্ষা করছিলাম। আর তখনই কেন্দ্রীয় বাহিনী দুই বা তিনটি গাড়িতে এসে পৌঁছল। দু-এক মিনিটের মধ্যেই তারা সরাসরি গুলি চালাতে শুরু করল। কী হচ্ছে আমরা বোঝার আগেই আমি দেখলাম আমার ভাইরা মাটিতে পড়ে আছে। আমার আব্বা বুঝতে পারছিলেন না, কাকে প্রথমে তুলবেন, কাকে সাহায্য করবেন। আপনাদের কাছে আমার আবেদনখুঁজে বের করুন হত্যাকারীদেরযারা এই খুন করল।তাকে আমরা প্রশ্ন করি১২৬ নম্বর বুথে কি জনতা জড়ো হয়েছিল এবং তারা কি সিআইএসএফ জওয়ানদের হুমকি দিচ্ছিল? আনজুপা বলেন, ‘এটা সম্পূর্ণ মিথ্যে কথা। মোটেই এমন কিছু হয়নি।আনজুপার প্রতিবেশী ফজলু রহমানও লাইনে দাঁড়িয়েছিল। ভোট দেওয়ার প্রতীক্ষায় ছিল সে। তাঁর বক্তব্য– ‘বুথে যে চারজন অফিসার ছিলেনতারা ভালো ব্যবহার করছিলেন। তাদের সঙ্গে ভোটদাতাদের কোনও সমস্যা হয়নি। কিন্তু যে জওয়ানরা গাড়িতে করে আসে তারাই আচমকা গুলি চালায়।

আনজুপার দুই ভাইও লাইনে দাঁড়িয়েছিল। প্রথমে জওয়ানরা সাইদুলকে মারেসে মাটিতে পড়ে যায়। তখন সাইমুল সিআইএসএফ জওয়ানকে জিজ্ঞাসা করেকেন তারা তার ভাইকে মারলজবাবে সিাআইএসএফ জওয়ান সরাসরি তাকে গুলি করে। ফজলু বলেএটা ছিল বিজেপি সরকারের একটি চক্রান্ত যাতে তার গ্রাম জোড়পাটকির মানুষরা ভোট দিতে না পারে। কিন্তু সেখানে উপস্থিত গ্রামবাসীরা ফজলুকে বলেএসব কথা না বলে সে যা দেখেছে শুধুমাত্র সেইটুকু বলুক। আনজুপার প্রতিবেশীরা আরও বলেনতার দুই ভাই মোবাইলে সিআইএসএফ জওয়ানদের সহিংসতার ছবি তুলছিল। কিন্তু তাদের ফোনগুলি কেড়ে নেওয়া হয়।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only