সোমবার, ৫ এপ্রিল, ২০২১

বাংলা ভাষা- ঐতিহ্য -সংস্কৃতির উপর শুভেন্দুদের তীব্র আঘাত

বিশেষ প্রতিবেদক: বাংলা ছিল এবং এখনও আছে। হিন্দু-মুসলমানের অবদানে গঠিত মিলিত সংস্কৃতির পীঠস্থান। কিন্তু শুভেন্দুবাবুরা এই নির্বাচনে যেভাবে বিভাজনের কৌশল নিয়েছেন এবং একটি বিশেষ সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে ঘৃণা-বিদ্বেষ প্রচার করে চলেছেন তাতে বাংলার সমাজ-সংস্কৃতি-ঐতিহ্য বেঁচে থাকবে কি না তা নিয়ে ঘোরতর সন্দেহ দেখা দিয়েছে।



উগ্রবাদীরা যেসব কথা উচ্চারণ করে চলেছেন তা আসলে বাংলা বাঙালির অস্তিত্বকেই প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিয়েছে। শুধু তাই নয়ভারতের সংবিধান এবং বিদ্যমান আইনের শাসনের ভবিষ্যৎকেও প্রশ্ন বিদ্ধ করে তুলেছে। নিয়ম ছিলনির্বাচনে কোনও সাম্প্রদায়িক প্রচারণা করা চলবে না। আর এই প্রশ্নে অতীতে আদালত বিদ্বেষ প্রচারকারী প্রার্থী জয়ী হলেও তাঁর জয়কে বাতিল করে দিয়েছে। কিন্তু এখন যেন একটি দলের পক্ষে বিদ্বেষ প্রচার সাম্প্রদায়িক প্ররোচণা দেওয়াই নির্বাচনে প্রধান হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। দেখা যাচ্ছে, নির্বাচনে এই বিদ্বেষের কারবারিদের বিরুদ্ধে কেউই ব্যবস্থা নিচ্ছে না। এই নির্বাচনী ঘৃণা ছড়ানোর প্রতিযোগিতায় বিজেপির যে তিন বড় নেতা একেবারে সামনের সারিতে রয়েছেন তারা হচ্ছেন অসমের হিমন্ত বিশ্ব শর্মা,  উত্তরপ্রদেশের যোগী আদিত্যনাথ এবং পশ্চিমবঙ্গে সদ্য তৃণমূল কংগ্রেস ত্যাগী শুভেন্দু অধিকারী। এই ত্রয়ী বিন্দুমাত্র পরোয়া না করে নির্বাচনে সাম্প্রদায়িক বক্তব্যের প্রতিযোগিতায় একে অপরকে ছাড়িয়ে যাচ্ছেন। আদিত্যনাথ যোগী বাংলায় এসেও বিষোদগার করছেন। হিমন্ত বিশ্ব শর্মা লাগাতার সাম্প্রদায়িক প্ররোচনা চালিয়েও অবাধে ছাড় পেয়ে যাচ্ছেন। শেষপর্যন্ত অসমের আদি অধিবাসী বোড়োদের নেতা এবং বিপিএফ-এর প্রধান হাগ্রামা মহিলারিকে এনআইএ-কে ব্যবহার করে সরাসরি জেলে পাঠানোর হুমকি দেওয়ায় নির্বাচন কমিশন বিষয়টিকে নজরে নিয়েছিল। হিমন্ত বিশ্ব শরমা দুই দিনের জন্য নির্বাচনী প্রচারে অংশ নিতে পারবেন না বলে কমিশন ঘোষণা করে। কিন্তু হা হতোস্মি! ২৪ ঘণ্টা পার না হতেই নির্বাচন কমিশন তাঁর শাস্তি কমিয়ে নিষেধাজ্ঞা মাত্র একদিনের জন্য বলে ঘোষণা করে। কার চাপে নিজেদের সিদ্ধান্ত বদল করতে বাধ্য হল কমিশন তা জানা যায়নি।

বাংলা অসমে নির্বাচনী প্রচারে এসে যোগী আদিত্যনাথ যা ইচ্ছে তাই বলে যাচ্ছেন। অসমে যোগী এক নির্বাচনী সভায় বলেন, অসমের ধর্মীয় মহাপুরুষ শঙ্করদেব নাকি অনুপ্রবেশের তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন। শঙ্করদেব ছিলেন একেশ্বরবাদী এক মহাপুরুষ। শঙ্করদেবের অনুগামীরামূর্তিবিহীন নামঘর’- উপাসনা করে থাকেন। তিনি কখনওই ধর্মীয় উত্তেজনাকে প্রশয় দেননি। বরং সমাজ সংস্কারেও ব্রতী ছিলেন। তাঁর সময়কাল ছিল ১৪৪৯-১৫৬৮।

যোগী নির্বাচনী সভায় বক্তব্যে বলেদিলেন শঙ্করদেন নাকি অনুপ্রবেশের ঘোর বিরোধী ছিলেন। এই নিয়ে অহমীয়রাবুদ্ধিজীবীরা হাসাহাসি করলেও তাতে যোগীজির কিছু এসে যায় না। তাঁর চাই যেনতেন প্রকারে ভোট। মিথ্যা না সত্য তার বিচার কে করে।

তবে মেদিনীপুরের শুভেন্দু কিন্তু বিদ্বেষ প্রচারে সকলকে টপকে যাচ্ছেন। যোগীহিমন্ত তাঁর তুলনায় কিছুই নয়। যেমন তিনি বলছেন, মুসলিম তুষ্টিকরণ মমতার অভ্যাস হয়ে গেছে। মুসলমানদের ঈদ মুবারক বলতে বলতে তিনি এখনহোলি মুবারকবলতে আরম্ভ করেছেন। দিল্লিউত্তরপ্রদেশমধ্যপ্রদেশহরিয়ানায় খোদ হিন্দুরাইহোলি মুবারকবলে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। কিন্তু শুভেন্দুর চোখে তা মহাপাপ। কারণ– ‘মুবারকশধটি আরবি-ফারসি জাত। শুভেন্দুকে কে বলে দেবে খোদ বাংলা ভাষাকে আট হাজারেরও বেশি আরবি-ফারসি শধ রয়েছে। যেগুলিকে বাদ দিলে বাংলা ভাষাবাংলাথাকবে না।

শুভেন্দু বলেছেন, তিনি এবং তাঁর সঙ্গে বিজেপি বাংলার মসনদে বসলে রেড রোডে ঐতিহ্যবাহী ইদের জমায়েত বন্ধ করে দেবেন। শুভেন্দুযিনি বছর দেখা হওয়া মাত্র মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পা ছুঁয়ে প্রণাম করতেনতিনি এখন প্রতিটি সভায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে বেগম বলে আখ্যায়িত করছেন।  ‘বেগমশধটি সাধারণত কোনও  মুসলিম অভিজাত বিবাহিত মহিলার ক্ষেত্রে সম্মানসূচক সম্বোধন হিসেবে ব্যবহৃত হয়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কুমারী। তাঁকে শুধু মুসলিমদের সঙ্গে সংযুক্ত করার জন্য শুভেন্দুবেগমশধটি ব্যবহার করে মমতাকে অপমানের চেষ্টা করছেন। আর বাংলার মুসলিমদেরপাকিস্তানিবলে সম্বোধন করে তাঁদের দেশদ্রোহী ভারত বিরোধী প্রমাণ করার চেষ্টা করছেন।

শুভেন্দুরাএকই বৃন্তে দুটি কুসুমবাংলার হিন্দু-মুসলমান এবং রবীন্দ্রনাথ-নজরুলে ভাগ করে বাংলাকে যে উগ্র হিন্দুত্ববাদী রাষ্ট্রের অংশ হিসেবে প্রমাণ করার চেষ্টা করছেন, দুই সম্প্রদায়ের মানুষের মনকে পরস্পরের প্রতি বিষিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছেনতা আখেরে বাংলা ভাষাবাঙালী এবং বাংলার ঐতিহ্য সংস্কৃতিকে বিনাশ করার নামান্তর। ক্ষমতায় না এসেই যদি শুভেন্দুরা এই পর্যায়ে চলে যেতে পারেনতাহলে ক্ষমতা হাসিল করলে তাঁরা তো এই বাংলাকে হিন্দির কলোনীতে পরিণত করবেন।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only