শনিবার, ১৭ এপ্রিল, ২০২১

বক্তা সম্রাট ও ঐতিহাসিক গোলাম মোর্তজা



সদ্য ইন্তেকাল করা মরহুম গোলাম আহমাদ মোর্তজা এপার বাংলার জনসমাজে একজন বাগ্মী অনুসন্ধানী ঐতিহাসিক হিসেবে বিশেষ জনপ্রিয়। কলম-এর ২০১৬ ঈদ সংখ্যায় এই বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের একান্ত সাক্ষাৎকারটি নিয়েছিলেন আহমদ হাসান ইমরান। সঙ্গে ছিলেন ইবাদুল ইসলাম

আপনার জন্ম শিক্ষা পারিবারিক পরিচয় সংক্ষেপে বলুন।

বর্ধমান জেলার বর্ধমান সদর থানার অন্তর্গত মীরের ডাঙা গ্রামে ১৯৩৫ সালে এক সম্ভ্রান্ত জমিদার পরিবারে আমার জন্ম। আমার দাদু কাজী মুহাম্মদ ইশা হক ছিলেন একজন বুযুর্গ ব্যক্তি। আমার আব্বা মাওলানা কাজী আবদুল আজিজ এবং মাতা সৈয়দা নাসিফা খাতুন। আমরা দুই ভাই। আমার বড় ভাই কাজী মুহাম্মদ গোলাম মইনুদ্দিন পেশায় চিকিৎসক। বর্তমানে তিনি আমাদের পৈতৃক বাড়িতে বসবাস করছেন।

আমার আব্বা মাওলানা আবদুল আজিজ কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসায় পড়াশোনা করতে এসে স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েন। তিনি ছিলেন আলিয়া মাদ্রাসার ছাত্রনেতা। ফলে ব্রিটিশের রোষানলে পড়ে মাদ্রাসা থেকে বহিষ্কৃত হয়েছিলেন। এই নিয়ে তীব্র ছাত্র আন্দোলন সংঘটিত হয়েছিল। আলিয়ার অধিকাংশ ছাত্র ক্লাস-বয়কট শুরু করে। শেষ পর্যন্ত মুচলেকা দিয়ে সব ছাত্রকে আলিয়া কর্তৃপক্ষ ফিরিয়ে নিলেও আমার আব্বাকে ফিরিয়ে নেওয়া হয়নি।

আমার পরিবারের সবাইকাজীপদবি ব্যবহার করেন। এমনকি আমার ছেলেরাও নামের সঙ্গে কাজী শব্দটি ব্যবহার করে থাকেন। কিন্তু আমি তা করি না। কারণ কাজী বলতে বিচারক বা বিচারপতি বোঝায়। আমরা বর্তমানে এই কাজ করি না। তাই আমি ব্যক্তিগতভাবে কাজী পদবি ব্যবহার করি না। আমরা প্রথাগত পড়াশোনা করার সুযোগ পাইনি। কারণ সেই সময় অভিজাত সম্ভ্রান্ত পরিবারে ছেলেমেয়েরা স্কুলে বা মাদ্রাসায় গিয়ে পড়াশোনা করত না। তারা সবাই বাড়িতে বসেই গৃহশিক্ষকের কাছে  লেখাপড়া তালিম নিত।

আমার পরিবারের প্রথামতোই আমি বাড়ির গৃহশিক্ষকের কাছেই পড়াশোনা করেছি। এমনকি আমার ছেলেমেয়েরাও বাড়িতেই পড়াশোনা করেছে। তবে আমাদের পরিবারের এই ট্র্যাডিশন আমি এূন ভেঙে দিয়েছি। আমার নাতি-নাতনিরা সবাই এূন স্কুল-কলেজে পড়াশোনা করে। আমার ছয় সন্তান।

আমার প্রথমা স্ত্রীর সন্তান চারজন। প্রথমা স্ত্রীর মৃত্যুর পর আমি দ্বিতীয় বিয়ে করি। তাঁর দুটি সন্তান। প্রথম চারজন হল কাজী মুহাম্মদ ইয়াসীন, কাজী মুহাম্মদ তওসিন, কাজী মুহাম্মদ মহসিন, কাজী মুহাম্মদ  হাসিন, একমাত্র কন্যা কাজী কামরুন্নেসা। আর দ্বিতীয়  পক্ষের দুই পুত্র  কাজী মুহাম্মদ হাসসান কাজী মুহাম্মদ ত্বহা।    

স্বাধীনতার পরে দেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থা আপনি সামনে থেকে প্রত্যক্ষ করেছেন। একইভাবে প্রত্যক্ষ করেছেন দেশভাগমুসলিম সমাজের বঞ্চনা। সেই সময় মুসলিমদের সামাজিকদ্বীনি অর্থনৈতিক অবস্থা কেমন ছিল?

মুসলিমদের অবস্থা খুবই করুণ ছিল। ব্রিটিশরা কায়দা করে এদেশের মুসলিমদের ঋণের দায়ে জড়িয়ে দিয়েছিল। এর ফলে সম্ভ্রান্তঅভিজাত জমিদার মুসলিম পরিবারগুলি ঋণের দায়ে জর্জরিত হয়ে পড়েছিল। এই সুযোগে ব্রিটিশরা অত্যাচারের  মাত্রা তীব্র করেছিল। ঠিক সেই সময় বাস্তব পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে অবিভক্ত বাংলার প্রথম প্রধানমন্ত্রী শের--বাংলা কে ফজলুল হক ঋণ সালিশি বোর্ড তৈরি করেন। এর ফলে অনেক মুসলিম জমিদার পরিবারের সুবিধা হয়েছিল। প্রায় ১০-১৫ বছর ঋণ পরিশোধ করার সময় পাওয়ায় মুসলিম সমাজের মধ্যবিত্ত শ্রেণি যূন ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে, ঠিক তূনই এল দেশভাগ। দেশভাগে সব থেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এপার বাংলার মুসলিমরা। কারণ শিক্ষিত, বিত্তশালী, সম্ভ্রান্ত-অভিজাত মুসলিম সমাজের একটা বৃহৎ অংশ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে চলে যায়। এপারে পড়ে রয়ে গেল কয়েকটি অভিজাত মুসলিম পরিবার আর গরিব মুসলিমরা।

দেশভাগের প্রথম প্রতিক্রিয়া হল দাঙ্গা। এই দাঙ্গায় দুই সম্প্রদায়ের হাজার হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। আমাদের গ্রামেও দাঙ্গা সংঘটিত হয়। তবে পার্শ্ববর্তী দাসপুর বারাসতী গ্রামের হিন্দুরা আমাদের পাশে দাঁড়িয়ে নিরাপত্তা দিয়েছিল। এমনকি আমাদের বাড়ির বাজার পর্যন্ত ওই গ্রামের হিন্দুরা করে দিত। কারণ সেই সময় রাস্তাঘাটে বের হলেই মুসলিম হওয়ার কারণে ওই এলাকায় আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। এই থেকে প্রমাণিত সাধারণ মানুষ কোনোদিনও দাঙ্গা চায় না। ব্রিটিশ সরকারের চক্রান্তে দুই সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে বিভেদ তৈরি হয়েছিল। যার অনিবার্য পরিণতি দেশভাগ। দগদগে ঘায়ের মতো আজও আমাদের শরীরে বিদ্যমান।



আপনি কিভাবে ইসলামি প্রচার জলসার জগতে এলেন?

আমার জলসা জগতে আসার কাহিনি বড়ই অদ্ভূত। আমি ভালো করে কথা বলতে পারতাম না। তোতলামি ছিল। কিন্তু সেই সময় ইসলামি জলসা ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলিতে ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে যে ধরনের প্রচার বক্তব্য রাখা হত, তা আমাকে প্রতিনিয়ত কষ্ট দিত। পশ্চিমবাংলার যিনি সব থেকে থেকে বড় পীর বলে দাবি করেন, তাঁর বক্তব্য শুনতে গেলাম। তিনি ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে যেসব তথ্য শ্রোতাদের কাছে পরিবেশন করলেন তা ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে এবং রাসূল সা.-এর সুন্নাত মোতাবেক হয়নি বলে আমার মনে হয়েছিল। এরপর যিনি পশ্চিমবাংলার সবচেয়ে ভালো বক্তা, তাঁর বক্তব্য শুনতে গেলাম। তিনিও যা বললেন, তা শরীয়াহ্ মোতাবেক হয়নি বলে আমার মনে হয়েছিল। তাই বাংলার মুসলিম সমাজকে পবিত্র কুরআন হাদীসের তথ্যগুলি তুলে বিপথগামিতা থেকে বাঁচানোর লক্ষেই জালসায় বক্তব্য রাখার সিদ্ধান্ত নিলাম। সুন্নাহ্ শরীয়তের বাইরে গিয়ে আমি কোনও সময় বক্তব্য রাখিনি। ইসলাম ধর্ম মুসলমান সমাজকে আল্লাহ্র নির্দেশ মতো সঠিক পথের দিশা দেওয়ার লক্ষ্যে এূনও আমি কাজ করে চলেছি। আল্লাহ্তায়ালা চাইলে আমার জীবনের শেষদিন পর্যন্ত ইসলাম মুসলমানের স্বার্থে নবী সা.-এর পয়গামকে পৌঁছে দেওয়ার কাজে রত থাকব।



আপনি প্রথম কোন্ গ্রামে জলসা করেছেন?

আমি আগেই বলেছি, কথা বলতে গিয়ে তোতলামি করতাম। তাই ইচ্ছা থাকলেও বক্তা হিসাবে প্রথমে ইতস্তত করতাম। পবিত্র আল্ কুরআনে এক জায়গায় দেখলাম হযরত মুসা . প্রথম জীবনে ভালোভাবে কথা বলতে পারতেন না। তিনি আল্লাহ্র কাছে দোয়া চাইলেন যেন মানুষকে হেদায়েত করার মতো তওফিক আল্লাহ্ তাকে দেন। আল্লাহ্তায়ালা তাঁর দোয়া কবুল করেছেন। পবিত্র কুরআনের এই আয়াত পড়ে আমিও আল্লাহ্র কাছে দোয়া চাইলাম। হযরত মুসা .-কে আল্লাহ্তায়ালা যেভাবে সুবক্তা করেছিলেন, তিনি যেন আমাকেও সেইভাবে সুবক্তা করেন। আল্লাহ্তায়ালা দোয়া কবুল করলেন। কয়েকদিনের মধ্যে আমার জিহ্বার  আড়ষ্টতা কেটে গেল। প্রথম জলসা হিসেবে বেছে নিয়েছিলাম আমার এক আত্মীয়ের বাড়ি  বীরভূমের সেখেরডাক গ্রাম।  সেখানেই জনৈক আবদুস সামাদের উৎসাহে মাওলানা বড়পীর হযরত আবদুল কাদির জিলানী রহ.-এর উপর বক্তব্য রাখি। এই বক্তব্যের জোশে দুজন ব্যক্তি জ্ঞান হারায়। 


আপনি কিছুদিনের জন্য তাবলিগ জামাতের সংস্পর্শে এসেছিলেন?

অবশ্যই এসেছিলাম। তাবলিগ জামাতের দক্ষিণ ২৪ পরগনার মগরাহাটের আমীর মাওলানা আবদুল হক (রহ.) ছিলেন পীর। তাঁর সংস্পর্শে এসে আমার জীবনের অনেকটাই পরিবর্তন এসেছিল। শুধু তাই নয়, বাংলার মুসলমান সমাজে যে বে–শরীয়তি ধ্যান-ধারণা ছিল, তার আমূল পরিবর্তনের পিছনে তাবলিগ জামাতের অবদান অস্বীকার করা যাবে না। তাবলিগ জামাতের মধ্যে কোনও র্শিক বা বিদায়াত নেই। তাবলিগ এসে এই বাংলায় প্রকৃত অর্থে ইসলামের শিক্ষা তরিকার প্রসার ঘটেছে বলে আমি মনে করি।

পশ্চিমবঙ্গের প্রত্যন্ত অঞ্চলে আপনি গিয়ে বক্তৃতা দিয়েছেন। কোন কোন প্রত্যন্ত অঞ্চল? সেখানকার কোনও স্মৃতিচারণা যদি করেন।

শুধু পশ্চিমবঙ্গেই নয়, ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে আমি বক্তব্য রাখতে গিয়েছি। পশ্চিমবঙ্গের প্রতিটি জেলার প্রত্যন্ত এলাকায় আমার যাওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিল। দেখার সৌভাগ্য হয়েছে অনেক কিছুই। যেমন গরিবি দেখেছি, তেমনই দেখেছি আমীর ব্যক্তিকেও। স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে একটি ঘটনার কথা মনে পড়ছে। সেই প্রথম জলসায় বক্তব্য রাখতে শুরু করেছি। এমন একটা গ্রামে গিয়েছি, যেখানে কারও পাকাবাড়ি নেই। সবারই ছিটেবেড়ার বাড়ি। বক্তব্য শেষ হওয়ার পর শীতের রাত ঘুমোতে হবে।

আয়োজকদের বললাম, আমার শোবার ব্যবস্থা করুন। তাঁরা বললেন, বাড়ির দাওয়ায় শুতে হবে। প্রথমে বললাম ঘরের ভিতরে হবে না? তাঁরা জানালেন অনেক আত্মীয়স্বজন এসেছে তাই ঘরের ভিতরে হবে না। বাইরেই শুতে হবে। যাতে ঠান্ডা না লাগে তার জন্য কাপড় দিয়ে জায়গা ঘিরে দেওয়া হল। এরপর আমি ঘুমালাম বাড়ি থেকে নিয়ে যাওয়া দামি চাদরটি গায়ে দিয়ে। ভোররাতে দেখি আমার চাদরের ভিতরে অন্য কেউ শুয়ে রয়েছে! বাড়ির বাইরে আমার পাশে কে শুয়ে রয়েছে তা নিয়ে আমি ধন্দে পড়ি। একবার ভাবছি  পালিয়ে যাবআবার পরক্ষণেই ভাবছি পালিয়ে গেলে দামি চাদরটি আর পাওয়া যাবে না। তখন আস্তে আস্তে চাদরটি টানতে শুরু করলাম। দেখি একটি সারমেয় শুয়ে রয়েছে। অর্থাৎ ঠান্ডায়  থাকতে না পেরে সারমেয়টি চাদরের ভিতরে ঢুকে পড়েছে। 



বই লেখার জগতে কীভাবে এলেন? আপনার লেখারইতিহাসের ইতিহাসবইটি কেন নিষিদ্ধ হয়েছিল এবং কীভাবে নিষিদ্ধ হয়েছিল?

আমি বক্তৃতা করতে মুর্শিদাবাদের লালবাগ থানার বুধিয়া গ্রামে গিয়েছিলাম। পবিত্র কুরআনের ব্যা্যূা দেওয়ার পাশাপাশি শূন্যজ্যামিতি, ঘড়ি সহ বিভিন্ন জ্ঞান-বিজ্ঞানের  বিভিন্ন ক্ষেত্রে মুসলিমদের অবদান নিয়ে কথা বলছিলাম। ঠিক সেই সময় ওই এলাকার প্রধান শিক্ষক উঠে দাঁড়িয়ে আমাকে প্রশ্ন করেন– ‘আপনি যা বললেন  তার প্রমাণ কি?’ তখন বিভিন্ন বইয়ের কথা বলি। তিনি তূন পরামর্শ দিয়েছিলেনআপনি একটা বই লিখুন। তাঁর অনুপ্রেরণায় আমি প্রথম বইপুস্তক সম্রাটলিখি। এইভাবে লেখালেখি জগতে প্রবেশ করি।ইতিহাসের ইতিহাসগ্রন্থটি ১৯৭৮ সালে প্রকাশিত হয়। এই বইটি নিষিদ্ধ হয় ১৯৮২ সালে। সেই সময় তৎকালীন প্রয়াত মু্খ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু দেশের বাইরে ছিলেন। আরএসএস-বিশ্বহিন্দু পরিষদের পক্ষ থেকে বিধানসভার তৎকালীন ডেপুটি স্পীকার কলিমুদ্দিন শামসের কাছে দাবি করা হয় এই বইটি নিষিদ্ধ করার। বইটি ভালো করে না পড়েই অর্ডিন্যান্স জারি করে নিষিদ্ধ করা হয়। একবারের জন্য তৎকালীন বাম সরকারের পক্ষ থেকে বইটি নিষিদ্ধ করা হবে কিনা তা নিয়ে আমার মতামত জানতে চাওয়া হয়নি। এমনকি নিষিদ্ধ হওয়ার পরও রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে আমাকে জানানো হয়নি। সংবাদমাধ্যমের কাছ থেকে আমরা প্রথম খবর পাই। পরে গোয়েন্দা দফতরের লোকেরা আমার বাড়িতে আসেন বইটির খোঁজখবর করতে।



কোন্ বইটি লিখে বেশি আনন্দ পেয়েছেন?

স্বভাবতই প্রথম বইপুস্তক সম্রাটলিখে বেশি আনন্দ পেয়েছি। তারপরচেপে রাখা ইতিহাস

আপনার বেশির ভাগ বই ইতিহাসের পর্যালোচনা। বিশেষ করে ভারতীয় মুসলিমদের সম্পর্কে ইতিহাসে যে ভুল তথ্য রয়েছে, সেই তথ্য দূর করতে চেয়েছেন। ইতিহাসের ওপর আপনার এই গুরুত্ব কেন?

ব্রিটিশরা যে ভুল ইতিহাস তৈরি করে গেছে, এটা সংশোধন হওয়া জরুরি। যেমন ব্রিটিশদের চোখে ঔরঙ্গজেব সবচেয়ে খারাপ বাদশাহ্ ছিলেন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ঔরঙ্গজেবের মতো ঈমানদারসৎ নিষ্ঠাবান সম্রাট সমগ্র বিশ্বে খুবই কমই ছিল। তিনি টুপি সেলাই করে, হাতে পবিত্র কুরআন লিখে দিন গুজরান করতেন। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি নাকি হিন্দুদের ওপরে জিজিয়া-কর আরোপ করেছিলেন। হিন্দুদের ওপর যেমন জিজিয়া কর ছিল, একইভাবে মুসলিমদের ওপর যাকাত, ফিতরা, সাদকা ছিল। এগুলোও তো একপ্রকার কর। শুধু তাই নয়, ঔরঙ্গজেব এতটাই সৎ ছিলেন যেতাঁর কবর গোপন জায়গায় দেওয়ার নির্দেশ দিয়ে গিয়েছিলেন। যেন কবরকে কেন্দ্র করে কোনও শরীয়াহ্-বিরোধী কাজকর্ম না হয়। অধিকাংশই মানুষই জানেন না ঔরঙ্গজেবকে কোথায় দাফন করা হয়েছে।

 অন্যদিকে দেখুনজেবুন্নেসা সম্পর্কে নানা কুরুচিকর মন্তব্য ইতিহাসে করা হয়েছে। প্রকৃত অর্থে জেবুন্নেসা একজন ঈমানদার আল্লাহ্র নেককার বান্দি ছিলেন। এসব মিথ্যা ইতিহাসের বিরুদ্ধে কলম ধরা দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। আর ইতিহাসের সংশোধন না হলে হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতি আসবে না।

বিশ্বাস জন্মাবে না দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে। তাই প্রকৃত সত্য ইতিহাস তুলে ধরার প্রথম প্রধান কাজ হওয়া উচিত বলে আমি মনে করি। একটা কথাই বলব, কলম-এর সঙ্গে কলমের লড়াইয়ে মুসলমানরা সমকক্ষতা অর্জন করতে না পারলে অস্তিত্ব বিপন্ন হবে।

বর্তমানে সংখ্যালঘু পরিচালিত মিশন বা আবাসিক স্কুলগুলি রমরমিয়ে চলছে। এতে মুসলিম সমাজের শিক্ষা প্রসারে বিস্তর লাভ হচ্ছে। আপনি ইংরেজি মাধ্যম স্কুল প্রথম শুরু করেছিলেন। এটা বন্ধ হয়ে গেল কেন? সেই সময়ের পরিবেশ একটু তুলে ধরুন। 

মুসলিম সমাজের শিক্ষার সার্বিক উন্নয়নের লক্ষ্যে ইংরেজি মাধ্যম স্কুল তৈরি করেছিলাম ১৯৮৩ সালে। কারণ ভালো ইঞ্জিনিয়ার, চিকিৎসকসাংবাদিকপ্রশাসক হতে গেলে ইংরেজি জানা অত্যন্ত জরুরি। সেই লক্ষ্যেই এই প্রতিষ্ঠানটি তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু দুঃখের বিষয় হল, তৎকালীন বাম-সরকারের আমলে শাসক দলের মদদে স্কুলের ভিতর শিক্ষকদের ইউনিয়ন তৈরি করা হয় এবং যার মাধ্যমে প্রতিনিয়ত অশান্তির বাতাবরণ সৃষ্টি হয় বিদ্যালয়ের মধ্যে। শেষ পর্যন্ত ১১ বছর চলার পর (১৯৯৪) বিদ্যালয়টিকে বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছিলাম। বন্ধের সময় স্কুলের ছাত্র সংখ্যা ছিল ৩৫০ জন। নার্সারী থেকে  অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত এূানে পড়াশোনা হত। বামেদের একগুয়েমিতে একটা সম্ভাবনাময় সংখ্যালঘুদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শেষ হয়ে গেল।



বর্তমানে আপনার উদ্যোগে কি কি ধরনের শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান চলছে?

ইংরেজি মাধ্যম স্কুল তৈরির আগেই আমি মাদ্রাসা তৈরি করেছিলাম। যার প্রথম নাম ছিলইসলামিয়া মাদ্রাসা কারিগরি শিক্ষাকেন্দ্র আমার উদ্দেশ্য ছিল, মাদ্রাসায় পড়াশোনার পাশাপাশি স্বনির্ভর করে ছাত্রদের গড়ে তোলা। সেই উদ্দেশ্যে অনেকটাই আমরা সফল হয়েছিলাম। ব্যাগ এবং তেল তৈরিও হত এূান থেকে এবং তা বাজারে বিক্রি করা হতো। কিন্তু কিছু বিশিষ্ট ব্যক্তির পরামর্শে মাদ্রাসার নাম পাল্টেজামিয়া ইসলামিয়া মদিনাতুল উলূম মেমারিকরা হয়। এখানে হাফেজ, আলেম, মুফতি, ক্বারী, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, আরবি সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি দেওয়া হয়।

প্রসঙ্গত বলি, এই মাদ্রাসা  তৈরির পিছনে আমার একটা লক্ষ্য ছিল, তা হল সে সময় রাজ্যে কোনও ভালো  মাদ্রাসা ছিল না। মাওলানা কিংবা ক্বারী হতে গেলে অন্য রাজ্যে পড়াশোনা করতে যেতে হত। সেজন্য এমন এক মাদ্রাসা তৈরি করতে চেয়েছিলাম যেখানে ইসলামি বিষয় পড়াশোনা করা এবং উচ্চ ডিগ্রি দেওয়ার ব্যবস্থা থাকবে। সেই উদ্দেশ্যেই জামিয়া-ইসলামিয়া মদিনাতুল উলূম তৈরি করা হয়।

এরপর ১৯৮০ সালে হাইমাদ্রাসা তৈরি করি। যেূানে বর্তমানে উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত পড়ানো হয়। এটি সরকার-কর্তৃক অনুমোদিত মাদ্রাসা। বর্তমান এর নামমেমারি হাইমাদ্রাসা

অন্ধদের জন্য ব্লাইন্ড স্কুল তৈরি করেছি। যার নামযোহরা ব্লাইন্ড স্কুল এখানে ব্রেইল পদ্ধতিতে বাংলা, ইংরেজি, অঙ্ক এবং আরবি শিক্ষা দেওয়া হয়।

সম্প্রতি ছাত্রদের জন্য তৈরি হয়েছে আবাসিক উচ্চ মাধ্যমিক স্কুল নামমামূন ন্যাশনাল স্কুল রয়েছে জয়েন্ট এন্ট্রান্স কোচিং ব্যবস্থা। মেয়েদের জন্য বর্ধমানের পানাগড়ে তৈরি করা হয়েছেমামূন ন্যাশনাল গার্লস স্কুল আর সমাজসেবামূলক অন্যান্য কাজ করার জন্য তৈরি করা হয়েছেআল্ মদিনা এডুকেশনাল ওয়েলফেয়ার সোসাইটি  

আপনি সব সময় বাঙালি মুসলিমদের মিডিয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা বলতেন। প্রসঙ্গেকলম’-এর ভূমিকা কিভাবে মূল্যায়ন করবেন?

আমি মিডিয়ার ভূমিকার কথা দীর্ঘদিন বলে আসছি। সংখ্যালঘু সমাজের বলিষ্ঠ নির্ভীক মুখপত্রের প্রয়োজন। আমি নিজেও ১৯৮৪ সালেসাপ্তাহিক শুভশক্তিনামে একটি সংবাদপত্র বের করেছিলাম। নিজস্ব প্রেস কিনেছিলাম।

তবেকলম  প্রসঙ্গে আমি বলি– ‘কলমপত্রিকা আমাদের যা দিয়েছে, তা মাওলানা আকরাম খানের পর আর কেউ দিতে পেরেছে কিনা এভাবে তা আমার জানা নেই। প্রসঙ্গত স্বাধীনতা-পূর্ব আকরাম খানমোহাম্মদীনামে একটি মাসিক পত্রিকা দৈনিক আজাদ সম্পাদনা করতেন।



মুসলিম নারীশিক্ষার উপর কিছু বলুন?

মেয়েদের শিক্ষার পক্ষে ছিলেন খোদ হযরত মুহাম্মদ সা. আজকের দিনে মেয়েদের লেখাপড়া করা খুবই জরুরি। নারীশিক্ষার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।

ইসলাম বলেছে, ‘জ্ঞান অর্জন করা প্রত্যেক নর-নারীর জন্য ফরয।তাই নারীরা ব্যতিক্রম হবে কেন। তবে হিজাব প্রসঙ্গে বলি, নারীদের হিজাব থাকবে, অবরোধ থাকবে না, শালীনতা থাকবে।



বর্তমান মুসলিম সমাজ তরুণ প্রজন্মের কাছে আপনার পয়গাম কি?

বর্তমান সমাজকে আমি একটা কথাই বলতে চাইআমি যা বলেছি তা নবী সা.-এর কথা বলেছি। আল্লাহ্ আমাদের সৃষ্টি করেছেনআল্লাহ্কে নিয়ে দ্বন্দ্ব করার প্রয়োজন  নেই। যে বলবে, ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ্সে জান্নাতে যাবে। আল্লাহ্তায়ালার নির্দেশ মতো চললে আমাদের উন্নতি হবে। নবী সা.-এর  নির্দেশিত পথে চলে ইসলাম ধর্ম  মুসলমানদের যে অভাবনীয় উন্নতি হয়েছিল, সেই পথে আজ আমরা চললে আমাদেরও উন্নয়ন কেউ ঠেকিয়ে রাখতে পারবে না ইনশা আল্লাহ্। ইসলামি  জ্ঞানের প্রসার ঘটাতে হবে এরজন্য চাই, পড়াশোনা, আধুনিক শিক্ষা, গবেষণা আর কলমকে হাতিয়ার হিসাবে গ্রহণ করা। আর কবর যিয়ারত সুন্নত। কবর পুজো ইসলাম অনুমোদন করে না।

মোট কথা, পবিত্র কুরআনের নির্দেশ, হযরত মুহাম্মদ সা.-এর নির্দেশিত পথে আমরা একনিষ্ঠভাবে চলতে পারলে সবদিক থেকেই আমরা কামিয়াব হব ইনশাআল্লাহ্। একদিন যে ইসলাম অন্ধকারাচ্ছন্ন আরব ভূমিকে আলোর দিশা দিয়েছিল আর সেই আলোয় আলোকিত হয়েছিল ইউরোপআমেরিকা। আজও সম্ভব একইভাবে ইসলামের গৌবব ফিরিয়ে আনা।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only