শনিবার, ২৯ মে, ২০২১

মুকুল রায়ের তৃণমূলে ফেরার জল্পনা উসকে, বিজেপি নিয়ে বিস্ফোরক সদ্য দলত্যাগী কাশেম আলি

২০১৭ সালে একসময় তৃণমূলের প্রভাবশালী নেতা, বর্তমান বিজেপি নেতা মুকুল রায়ের হাত ধরে তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে যোগদান করেন কাশেম আলি। এবার সেই বিজেপিও ছাড়লেন তিনি। কিন্তু কেন মাত্র চার বছরেই তাঁর এই মোহভঙ্গ, কি বলছেন সদ্য বিজেপিতে ইস্তফা দেওয়া কাশেম আলি। পুবের কলমের প্রতিবেদককে দেওয়া সাক্ষাৎকারে উঠে এল কাশেম আলির সেই আলাপচারিতা। 

পুবের কলম প্রতিবেদক: একসময় তৃণমূলের নেতা, তার পর ২০১৭ তে বিজেপিতে যোগদান। এখন আবার বিজেপি ত্যাগ করলেন। হঠাৎ এই মোহভঙ্গের কারণ?

কাশেম আলি: আমি বিজেপিতে যোগদান করে নিষ্ঠার সঙ্গে দলটা করতাম। একজন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ছেলে হিসেবে, পাঁচ বছর সময় দিয়েছি, কাজ করেছি। কিন্তু কাজ করতে গিয়ে আমি উপলব্ধি করেছিলাম, ভারতীয় জনতা পার্টি যে স্লোগান দেয় ‘সবকা সাথ সবকা বিকাশ’, কিন্তু কাজ করে তার ঠিক উল্টো। এদের কাজ মুসলিম বিদ্বেষ, সংখ্যালঘুদের দমিয়ে রাখা। 
এই বাংলা, পরম্পরা, সৌহার্দ্যে, ভ্রাতৃত্ববোধের মাটি। এই বাংলার মাটিতে, রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব, স্বামী বিবেকানন্দ, নজরুল ইসলামের মতো মণীষীরা এসেছেন। সেই বাংলার মানুষ কখনই বিভাজনের রাজনীতিতে বিশ্বাস করে না। 

আইএসএফ- নামে একটি সংগঠন তৈরি হয়েছে। মুসলিমদের মসিহা ওঠার চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু সেই মুসলিমরাই কিন্তু তাকে প্রত্যাখ্যান করেছে। হিন্দুত্ববাদীদের পার্টিতে গিয়ে এবারে হিন্দুরাও কিন্তু ভারতীয় জনতা পার্টিকে প্রত্যাখ্যান করেছে। এবারে নির্বাচনে বাংলার মানুষ সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যে বাংলার উন্নয়নের প্রতীক হিসেবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন, আছেন ও থাকবেন। সেই সংকল্প নিয়েই বাংলার মানুষ ভোট দিয়েছে তৃণমূল কংগ্রেসকে।
তৃণমূলের এই জয়লাভের পরে ভারতীয় জনতা পার্টি দিশাহীন ভাবে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা পরায়ণ হয়েছে। নারদা কেসে ফিরহাদ হাকিম, মদন মিত্র থেকে শুরু করে সুব্রত মুখোপাধ্যায়, শোভন দা’র (শোভন চট্টোপাধ্যায়) মতো  নেতৃত্বকে জেলে পোরা হল। কিন্তু সম অপরাধে, সমদোষী শুভেন্দু অধিকারী হাত পেতে টাকা নিয়েছিল। অথচ তার কিছু হল না। কারণ শুভেন্দু বিজেপি করেন, আর কেন্দ্রের তোতাপাখি হচ্ছে সিবিআই। তাই প্রতিহিংসা পরায়ণ রাজনীতির বাতাবরণ তৈরি করা হয়েছে। আমরা এই প্রতিহিংসা পরায়ণ রাজনীতির মধ্যে থাকতে চাই না। আমরা সৌভ্রাতৃত্ব, ভালোবাসার বন্ধনে আমরা থাকতে চাই। আমি ভারতীয় জনতা পার্টির সংখ্যালঘু মোর্চার সহকারি সভাপতি ছিলাম। আমি সেই পদ থেকে নিজের ইচ্ছায় ইস্তফা দিয়েছি। বিজেপি দল আমার সেই ইস্তফাপত্র গ্রহণ করেছে। 

প্রতিবেদক: ২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূলের জয়ের পরেই কেন বিজেপি ছাড়লেন?

কাশেম আলি: আমি বিভাজনের রাজনীতি থেকে দূরে থাকতে চাই। আর পশ্চিমবঙ্গে একটা সম্প্রদায়কে বাদ দিয়ে কোনও রাজনৈতিক দল প্রত্যাশিতভাবে ক্ষমতায় আসতে পারবে না। এটাই হচ্ছে সব থেকে বড় সত্যি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে তৃতীয়বারের জন্য বাংলার মানুষ নির্বাচিত করেছে। এখানেই স্পষ্ট বাংলার মানুষের কাছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ে গ্রহণযোগ্যতা আছে।
আমফানের সময় থেকে ইয়াসের ত্রাণ বন্টন নিয়ে সব সময় সব কিছুতেই বিজেপি দুর্নীতির অভিযোগ তুলে আসছে। এটা একটা মিথ্যাচারের দল ছাড়া আর কিছুই নয়। ভুল করেছি বিজেপিতে যোগদান করে, এখন প্রায়শ্চিত্ত করতে চাই। বিজেপিতে যোগদান করে নিজের সম্প্রদায়ের সঙ্গে বেইমানি করেছি। সম্প্রদায়ের সঙ্গে ‘গদ্দারি’ করেছি বলতেও কোনও দ্বিধা নেই। এখন আমি এই পাপ থেকে মুক্ত হতে চাই।

প্রতিবেদক: তৃণমূল থেকে ছেড়ে আসার কারণ কি ছিল তাহলে। আপনিও অন্যান্য দলত্যাগীদের মতো বলবেন দলে আপনাকে কাজ করতে দেওয়া হয়নি বলে বিজেপিতে যোগদান?

কাশেম আলি: না, একদমই না। তৃণমূলে আমার অবস্থান ঠিকই ছিল। কিন্তু সেই সময় মুকুল রায় বিজেপিতে যোগদান করেন। রাজনীতিতে মুকুল রায়ের মতো বর্ষীয়ান নেতাকে দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে আমার বিজেপিতে যোগদান। কিন্তু বিজেপিতে এসে বুঝলাম, এই দল কি করতে চাইছে। কখনও বলছে মুসলিমদের রাজ্য থেকে তাড়িয়ে দেবে, আবার কখনও মাটিতে পুঁতে দেবে। বিজেপির রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষের কি মুখের ভাষা! বাংলায় বিজেপির ভরাডুবির পিছনেই রয়েছে দিলীপ ঘোষের এই ধরনের অশালীন আচরণ। এই মাটিতে অশান্তির বীজ বপণ করেছেন, এই দিলীপ ঘোষ। তবে তৃণমূল কংগ্রেস আমাকে গ্রহণ করবে কি করবে না, সেটা তাদের দলীয় সিদ্ধান্ত। কিন্তু এটি সত্য ভারতীয় জনতা পার্টি কোনও রাজনৈতিক দল নয়। এরা শুধু বাংলায় দাঙ্গা, হাঙ্গামা বাঁধিয়ে নির্বাচনী বৈতরণী পার করতে চায়। কিন্তু বাংলার মানুষ তাদের সেই আশা পূরণ করতে দেয়নি। 

প্রতিবেদক: অশালীন কথা বলতেও আপনাকে শোনা গেছে। এখানে দলের চাপ কাজ করেছে। কি বলবেন?

কাশেম আলি: যতটা সম্ভব শালীনতা বজায় রেখে আমি কথা বলেছি। তবে আমার কথায় কেউ যদি কোনও আঘাত পেয়ে থাকে, আমি নিঃশর্তভাবে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি।

প্রতিবেদক: আপনি মুকুল রায়ের হাত ধরে বিজেপি এসেছিলেন। মুকুল রায়ের কি আবার তৃণমূলে ফিরে যাওয়ার কোনও সম্ভাবনা আছে?

কাশেম আলি: মুকুল রায় আমার রাজনীতি অভিভাভক। মুকুল রায় আবার তৃণমূলে আসবেন কিনা, সময় বলবে কি হবে আগামীদিনে। তবে রাজনীতিতে কোনও কিছুই অসম্ভব নয়।
 
প্রতিবেদক: আবার যদি পুনরায় তৃণমূলে যোগদান করেন, তাহলে মুসলিম সমাজের কাছে কি আপনি আপনার সেই পুরনো গ্রহণযোগ্যতা ফিরে পাবেন?

কাশেম আলি: তৃণমূল যদি আমাকে আবার, গ্রহণ করে দলের সৈনিক হিসেবে তাহলে গর্ববোধ করব। আর একজন বাঙালি হিসেবে ২০২৪ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে প্রধানমন্ত্রীকে হিসেবে দেখতে চাইব।

প্রতিবেদন: বিজেপিতে যোগদান করে দল আপনাকে যে দায়িত্ব দিয়েছিল, সেখানে আপনি কতটা সতঃস্ফূর্তভাবে কাজ করতে পেরেছেন?

কাশেম আলি: সেখানে মুসলিমদের সামনে রাখা হয়। কিন্তু মুসলিম বিদ্বেষী কার্যকলাপ সেখানে প্রাধান্য পায়। দেশ থেকে ইংরেজদের তাড়াতে স্বাধীনতা আন্দোলনে হিন্দু ও মুসলিম একসঙ্গে লড়াই করছিল। এটাই আমাদের ভারত। যারা এই দেশকে ভাগ করতে চায়, চক্রান্ত করতে চায়, তাদের বিরুদ্ধে সমস্ত মানুষকে সংকল্প নিয়ে ঐক্যবদ্ধ হওয়া উচিৎ। সারা দেশে মানুষ যখন করোনার বিরুদ্ধে লড়াই করছে, তখন নারদ, ইডি, সিবিআই দেখিয়ে বাংলার মানুষকে আরও বিভ্রান্ত করছে বিজেপি।
 
প্রতিবেদন: আপনার আগামীদিনের লক্ষ্য কি, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উন্নয়নের জন্য আপনি কি করতে চাইছেন?

কাশেম আলি: নতুন দিশা, লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যাব। সম্প্রদায়ের জন্য ভাবতে হবে। এই সম্প্রদায় অনেক অবহেলা, বঞ্চনা সহ্য করেছে। সিপিএম ৩৪ বছরের রাজত্বেও এই সম্প্রদায়কে শুধু ব্যবহার করেছিল। বাংলার সংখ্যালঘু সম্প্রদায় যখন দুই হাত তুলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ভোট দিয়েছেন, তখন আমরা চাইব এই পিছিয়ে পড়া সমাজটিকে নিয়ে উনিও ভাববেন এটাই আপনাদের মাধ্যমে আমার অনুরোধ। 

প্রতিবেদন: ২০২৪ এর নির্বাচন নিয়ে কিছু বলতে চান?
কাশেম আলি: ২০২৪ –এর নির্বাচনে ভারতীয় জনতা পার্টি মুখ থুবড়ে পড়বে। আর আমাদের দিদি, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রধানমন্ত্রী হবেন। দিদি যদি দিল্লির মসনদে বসেন, সেক্ষেত্রে আমাদের পূর্ণ সমর্থন থাকবে। আমরাই একজন নাগরিক হিসেবে একজন যোগ্যতম ব্যক্তি হিসেবে সকলের কাছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে সমর্থনের কথা বলব।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only