সোমবার, ১৭ মে, ২০২১

নক্ষত্র পতন আল-আমীন পরিবারে, না ফেরার দেশে মিশনের ‘মা’ হাসেম স্যার, স্মৃতিচারণা শোকার্ত নুরুল ইসলামের

পুবের কলম প্রতিবেদক : এক দুর্বিষহ, অসহনীয় মূহূর্তের মধ্যে দিয়ে চলেছি আমরা। প্রতিটি সময়ই আমাদের সেই বার্তা দিয়ে চলেছে। এরই মধ্যে আমরা এমন এক ব্যক্তিত্বকে হারালাম যিনি সমাজের প্রতিটি মানুষকে নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছিলেন। চির ঘুমের দেশে যাত্রা করলেন আল-আমীন মিশনের‌ সুপারিনটেনডেন্ট আবদুল হাসেম মল্লিক। স্নেহ, মমতা, আর দক্ষতার সঙ্গে মিশনের প্রতিটি কাজ আমৃত্যু সামলে গেছেন তিনি। তাঁরই সহযোগীদের কথায় তিনি ছিলেন মিশনের ‘মা’। মাত্র ৫৯ বছর বয়সেই দিকশূন্যপুরের দিকে যাত্রা করলেন আবদুল হাসেম মল্লিক। আল-আমীন মিশন হারাল তাঁদের প্রিয় অভিভাবককে, আর সমাজ হারাল একজন ভালো মানুষকে। 

তাঁর মৃত্যুতে শোকস্তব্ধ গোটা আল-আমীন মিশনের শিক্ষক থেকে অভিভাবক ও ছাত্র-ছাত্রীরা। কিছুদিন ধরেই অসুস্থ ছিলেন আবদুল হাসেম মল্লিক। অসুস্থতা বাড়তে থাকায় তাঁকে প্রথমে কলকাতার একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।রবিবার ১.৪৫ নাগাদ ইন্তেকাল হয় আবদুল হাসেম মল্লিকের। এখন রাজ্যে লকডাউন চলছে, বিপর্যয় মোকাবিলা আইন বলবৎ আছে, আর তাই সরকারি নির্দেশিকা মেনেই সোমবার সকালে তাঁর দাফন কাজ সম্পন্ন হয়।

আবদুল হাসেম মল্লিকের মৃত্যুতে গভীরভাবে শোকাহত তাঁর অন্যতম সহযোগী আল-আমীন মিশনের সাধারণ সম্পাদক এম নুরুল ইসলাম। তাঁর স্মৃতিচারণায় নুরুল সাহেব জানিয়েছেন, আমি আমার অন্যতম সহযোগী, বন্ধুকে হারালাম। যার অভাব কোনওদিন পূরণ হবে না। এই পরিস্থিতিতে তাঁর জানাযায় মিশন পরিবারের সকলে উপস্থিত থাকতে পারেনি। তাঁর আত্মার শান্তি কামনা করি।

নুরুল সাহব বলেন, আল-আমীন মিশন একটি পরিবার। খুব ছোট করেই শুরু হয়েছিল।এখন আমাদের এই পরিবার অনেক বড় হয়েছে। ১৯৮৪-৮৫ সালের দিকে এখানে ডেপুটেশন ভ্যাকেন্সিতে যোগদান করেন হাসেম স্যার। বলতে গেলে তখন তিনি সদ্য কলেজ থেকে পাশ করেছেন। এরপর মিশনে হস্টেল শুরু হয় ১৯৮৬ সালের দিকে।  এইসময় হাসেম‌ স্যার সুপারের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে কাজ করে গেছেন তিনি। আমি তো মজা করে তাঁকে মিশনের ‘মা’ বলতাম। তখন তো মিশন খুব ছোট ছিল। পড়ুয়াদের বলতাম হাসেম স্যার তোমাদের মায়ের মতো। আমি তখন মিশন চালাতে অর্থ যোগানে ব্যস্ত ছিলাম। খুব অভাবের সংসার ছিল তখন। এই সব কাজের মধ্য দিয়ে আল-আমীন মিশন এগিয়ে চলল। পরবর্তীতে যখন হাই মাদ্রাসা হল, মানে নবম-দশম হল, তখন হাসেম স্যারের নাম অর্গানাইজিং টিচারের তালিকায় অনুমোদন পেল। ওঁর নাম তখন শিক্ষকের নামের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হল। ৯৫-৯৬ সাল থেকে শিক্ষকের দায়িত্ব পেলেন তিনি। 


২০০৫ সালে কমিশন বেশকিছু হাই মাদ্রাসায় প্রধানশিক্ষক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি জারি করে। কিন্তু মুশকিল হল, খলতপুর হাইমাদ্রাসায় প্রধান শিক্ষকের পদ খালি থাকা সত্ত্বেও কমিশনের বিজ্ঞপ্তিতে সেটা উল্লেখ ছিল না। আমি তখন ডাঃ আব্দুস সাত্তার সাহেবকে জানালে‌ তিনি সাথে সাথেই বিষয়টি মাদ্রাসা কমিশনের চেয়ারম্যানের নজরে আনেন। চেয়ারম্যান জানালেন, পাঁচটার মধ্যে এই তালিকা দিতে পারলে, তাহলে তার মধ্যে খলতপুরের নাম অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব। আমি তৎক্ষণাৎ হাসেম স্যারকে ফোন করে বিষয়টি জানালাম। উনি তখনি সমস্ত কাগজপত্র নিয়ে উলুবেড়িয়া এডিআই অফিসে রওনা দেন। গিয়ে অনুমোদন করান। সেই নথি নিয়ে তিনি আবার গাড়ি নিয়ে বর্ধমানে জোনে যান। অবশেষে বিকেল ৪.৩০ নাগাদ জমা দিতে পারেন। পা্ঁচটার মধ্যে অনুমোদন হয়। এই গোটা দিনটাই তাঁর কিছু খাওয়া হয়নি। পরের দিন অ্যাপ্রুভাল হয়ে খলতপুর হাই মাদ্রাসার নাম যোগ হল এবং ২০০৫ সালেই আমি ইন্টারভিউয়ের মধ্য দিয়ে খলতপুর হাই মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষক পদে যোগদান করি।

কাজের শুরুর দিন থেকেই হাসেমকে আমার অন্যতম সহযোগী হিসেবে পাশে পাই। আমায় কিছু বলতেই হত না, হাসেম স্বেচ্ছায় সব কাজ সুন্দরভাবে গুছিয়ে সামলে দিত। আমি খালি স্বাক্ষরটা করতাম। মাদ্রাসায় সব কাজ একদম ঠিক সময়ে হত। কোনও কাজ পড়ে থাকত না। খলতপুর মাদ্রাসা মানেই একদম ঠিক সময় সব কাজ সম্পূর্ণ। আর এই সবের পিছনে হাসেম সব দায়িত্ব সামলে গেছেন। 

আমি অবসর নিই ২০১৯-এ। কাজের শুরুর দিন ২০০৫ থেকে ২০১৯ পর্যন্ত সমস্ত কিছু কাজ ব-কলমে সামলে গেছেন হাসেম। একদিকে  ব্যক্তিগত কাজে, যেমন তাঁর সহযোগিতা পেয়েছি তেমনি মিশনের সমস্ত কাজে পাশে পেয়েছি তাঁকে। না হলে মিশনকে এভাবেই এগিয়ে নিয়ে মাওয়া সম্ভব ছিল না। মিশনের এক অন্যতম কারিগর হিসেবে হাসেম স্যারের অবদান উল্লেখযোগ্য। এমনকী আমার পিএফ, পেনশনের সমস্ত পেপার রেডি করা, সমস্ত জটিলতা হাসেম নিজেই সামলেছেন। আমাকে ফিরেও তাকাতে হয়নি। একদিকে যেমন খুব নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করেছেন মিশনের জন্য, অপরদিকে কমিউনিটির জন্য লড়াই করে গেছেন। 

স্বভাবের দিক দিয়ে হাসেম স্যার ছিলেন খুব নরম মনের মানুষ।আমাদের মধ্যে দাদা ভাইয়ের সম্পর্ক ছিল। আমার ওপর কোনদিন জোর গলায় কথা বলেনি। সব সময় সব কাজে  আমার ওপর বিশ্বাস, আস্থা রেখে চলেছেন। আমাদের মধ্যে এক সুন্দর বোঝাপড়া ছিল। জীবনে এক সুন্দর সহকর্মী হিসেবে হাসেম স্যারকে পেয়েছিলাম। অনেক সময় হয়তো মিশনের জন্য অনেক কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে হাসেমকে, কিন্তু মনের দিক থেকে তিনি একজন উদার মনের মানুষ ছিলেন।

আল-আমীন মিশন পরিবারের সকলের উদ্দেশে আমি বলব, আল্লাহ নির্দিষ্ট কাজ করার লক্ষ্য নিয়ে আমাদের সকলকে এখানে পাঠিয়েছেন। জীবদ্দশায় হাসেম স্যার নিষ্ঠার সঙ্গে তাঁর কাজ করে গেছেন। কাজের সময় ভুল ভ্রান্তি হয়ে থাকে প্রতি মানুষের। আজকের দিনে আল-আমীন মিশনের পক্ষ থেকে আমার সকলের কাছে আবেদন আমরা যেন তাঁকে মাফ করে দিই। আল্লাহ তাঁকে জান্নাতবাসী করুন। সকলকেই একদিন পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে হবে। হাসেম স্যারের চলে যাওয়াটা আমাদের কাছে এক অপূরণীয় ক্ষতি। কিন্তু যে কাজ তিনি শুরু করেছিলেন, সেই কাজ আমাদের চালিয়ে যেতে হবে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only