শনিবার, ৫ জুন, ২০২১

চিকিৎসক নিগ্রহ, অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মার প্ররোচনা মূলক ফেসবুক পোস্ট



পুবের  কলম ওয়েবডেস্কঃ  অসম প্রদেশে বহু ধর্মাবলম্বী– ভাষাভাষী এবং জাতি-উপজাতির বাস। মাঝেমধ্যে বিচ্ছিন্ন সংঘাত ঘটলেও অধিবাসীরা সম্প্রীতির মধ্যে বাস করেন। বিশেষ করে সব রাজনৈতিক দলের নেতারাই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির জন্য অসমে সচেষ্ট থাকেন। কিন্তু এরই মধ্যে একদা আলফা ঘনিষ্ঠ ও পরে কংগ্রেস এবং বর্তমানে বিজেপি নেতা তথা এখনকার মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা ব্যতিক্রম হয়ে দাঁড়িয়েছেন। 



বিগত বছরগুলিতে অসমের সবথেকে ক্ষমতাশীল মন্ত্রী হিসেবে হিমন্ত বিশ্ব শর্মার  মুসলিমদের বিরুদ্ধে নানা সাম্প্রদায়িক ও বিদ্বেষমূলক উচ্চারণ দেশের সংবিধান– গণতন্ত্র ও আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েছে। মুসলিমদের প্রতি বিদ্বেষ প্রচারই ছিল তাঁর প্রধান রাজনৈতিক হাতিয়ার। অনেকে মনে করেছিলেন– মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর হিমন্ত বিশ্ব শর্মার দায়িত্ববোধ বাড়বে এবং তিনি একটু সংযত হবেন। কিন্তু ভবি ভোলার নয়। 


সম্প্রতি এই কোভিড আবহে অসমের হোজাই জেলার উদালিতে একটি দুঃখজনক ও নিন্দাযোগ্য ঘটনা ঘটেছে। পিপাল পুখুরি গ্রামের এক রোগী গিয়াসউদ্দিনকে তার আত্মীয়রা উদালির কোভিড কেয়ার সেন্টারে নিয়ে আসে। প্রায় ৪ ঘণ্টা পর রোগীটি মারা যায়। 


আর এরপরই সেই নিন্দনীয় ও লজ্জাজনক ঘটনাটি ঘটে। আর তাহল– রোগীর আত্মীয়-স্বজনরা একজন ডাক্তার ও নার্সের উপর হামলা চালিয়ে তাদের মারাত্মকভাবে জখম করে। বিশেষ করে এক তরুণ ডাক্তার সেউজ সেনাপতিকে এত নির্দয়ভাবে প্রহার করা হয় যে তাঁকে গুয়াহাটি মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি করতে হয়। তাঁর মাথা ও মুখে মারাত্মক চোট লেগেছে। 

স্বাভাবিকভাবে এই ঘটনার নিন্দায় মুখর হয়েছেন সকলেই। পুলিশ এই ঘটনার দায়ে ২৪ জনকে গ্রেফতার করেছে। তাঁদের মধ্যে মিসবাহ বেগম নামে একজন মহিলাও রয়েছেন।  সকলেই বলেছেন– প্রকৃত দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া প্রয়োজন। 
কিন্তু বিষয়টিকে সম্পূর্ণ সাম্প্রদায়িক রূপ দিয়েছেন বিজেপি শাসিত অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা। 


রাজ্যের প্রধান প্রশাসক হিসেবে যেখানে তাঁর বিষয়টিকে সমাধান করা প্রয়োজন– সেখানে তিনি সমগ্র রাজ্যকে খেপিয়ে তুলেছেন। 
হিমন্ত বিশ্ব শর্মা।


 এই নিয়ে একটি ফেসবুক পোস্ট করেছেন। সেই পোস্টে যথাযথভাবে তিনি ঘটনাটিকে ‘বর্বরোচিত হামলা’ বলে অভিহিত করেছেন। কিন্তু সেইসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রীর মর্যাদা থেকে অনেক নিচে নেমে হিমন্ত বিশ্ব শর্মাএই ঘটনার জন্য যাদের পুলিশ গ্রেফতার করেছে– সেই ২৪টি নাম তাঁর ফেসবুকে দিয়ে দিয়েছেন। 

আর এই নামগুলি সবই হচ্ছে মুসলিম। হিমন্ত বিশ্ব শরমার এই পোস্টটি পড়ে বিজেপির কেন্দ্রীয় মুখপাত্র সম্বিত পাত্র একটি টু্ইট করেছেন। তাতে তিনি বলেছেন– এই লোকগুলিকে ‘নেম অ্যান্ড শেম’ করতে হবে। অর্থাৎ এদের নাম প্রকাশ করতে হবে এবং তাদের সমাজে লাঞ্ছিত করতে হবে।


ভারতে ডাক্তার ও নার্সদের উপর এই ধরনের অন্যায় আক্রমণ প্রায়ই ঘটে বিভিন্ন শহরে– বিভিন্ন প্রদেশে। এই আক্রমণকারীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য ডাক্তারদের সংস্থা থেকে শুরু করে সকলেই সরব হয়েছেন। কিন্তু কেউই এইসব ঘটনাকে সাম্প্রদায়িক রূপ দেওয়ার চেষ্টা করেননি। হিমন্ত বিশ্ব শর্মাকে  গ্রেফতারকৃতদের নাম প্রকাশ করে দেওয়ার পর সারা অসমে মুসলিমদের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার এক লহর বয়ে যায়।

 টিভি চ্যানেল এবং সংবাদপত্রগুলি এমন ভূমিকা পালন করে যাতে উত্তেজনা তুঙ্গে ওঠে। এক্ষেত্রে অবশ্য সোশ্যাল মিডিয়া নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করে। তারা মৃত রোগীর আত্মীয়-স্বজনদের বক্তব্য প্রকাশ করে। আত্মীয়রা বলে– বহু আশা করে ২৫ বছরের গিয়াসউদ্দিকে বাঁচাবার জন্য কোভিড কেয়ার সেন্টারে নিয়ে এসেছিলাম। কিন্তু এখানে তাকে আনার প্রায় ৪ ঘণ্টার পরও একজনও ডাক্তার বা নার্স এসে গিয়াসকে দেখেননি। সে কোভিড সেন্টারের মাটিতেই পড়ে থাকে। 

আমরা বহু ডাকাডাকি করে কোনও চিকিৎসককে রোগীর কাছে আনতে পারিনি। কেউ তাকে অক্সিজেন কিংবা অন্য কোনও চিকিৎসা দেয়নি। সে মারা যাওয়ার পর একজন ডাক্তার (সেউজ সেনাপতি) রোগীর কাছে আসেন। ওই অবস্থায় উত্তেজনার বশে আমাদের দু-একজন তাঁর উপর বর্বর হামলা চালায়। যেটা অন্যায় হয়েছে। কিন্তু আমাদের মানসিক অবস্থাও বুঝতে হবে।


 যদি একজন ডাক্তারও অসুস্থ গিয়াসের কাছে আসত– চিকিৎসা করত তাহলে হয়তো সে মারা যেত না। আমাদের উচিত ছিল– যে ডাক্তার ডিউটিতে ছিলেন তাঁর কাছে কৈফিয়ত দাবি করা। কিন্তু রোগী মারা গেছে শুনেই তিনি সেখান থেকে সরে পড়েন। পরিবর্তে আসেন ডাক্তার সেউজ সেনাপতি। ক্ষোভের বশে তাঁর উপরই হামলা চালানো হয়। কোভিড সেন্টার তো চিকিৎসার জন্য। রোগী এখানে অপেক্ষা করে করে মারা যাক তার জন্য নয়। ডাক্তারকে এভাবে প্রহার করা অবশ্যই খুব অন্যায় হয়েছে। কিন্তু রোগীকে অবহেলা করে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়াও কি কম অপরাধ?’


সোশ্যাল মিডিয়ায় এই কথাগুলি প্রকাশ হওয়ার পর অসমে উত্তেজনা খানিকটা কমেছে। লোকেরা বলছেন– এই ধরনের ঘটনা দিল্লি– কর্নাটক বহু জায়গায় হয়েছে। কিন্তু কোথাও আক্রমণকারীদের নাম প্রকাশ করা হয়নি। ঘটনাক্রমে ডাক্তার ও রোগীর ধর্ম আলাদা হওয়ায় এক দল মানুষ এই ঘটনাকে সাম্প্রদায়িক রূপ দিতে পেরেছে। 

দুর্ভাগ্যজনকভাবে তার মধ্যে অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শরমাও রয়েছেন। মাত্র তিন-চার দিন আগে অসমের কাছার জেলাতে এক দল মানুষ স্বাস্থ্যকর্মীদের উপর হামলা চালিয়ে ছিল। পুলিশ এই অভিযোগে বাবুল ওরাং– মধু তেলি– দীপন তেলি– অজয় মিধ্যা প্রমুখকে গ্রেফতার করে। কিন্তু কোথাও ফেসবুক বা টু্যইটারে তাদের নাম দেওয়া হয়নি। 


অসমের হোজাই-এর ঘটনাটিকে দেশ জুড়ে উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ছড়ানোর কাজে ব্যবহার করছে। আর এই কাজে প্ররোচনা দিয়েছেন হিমন্ত বিশ্ব শরমা ও বিজেপির জাতীয় মুখপাত্র সম্বিত পাত্র।


চিকিৎসকের উপর হামলার নিন্দা করেছেন অসমের ইমাম সংগঠন থেকে শুরু করে সমস্ত মুসলিম সামাজিক ও বুদ্ধিজীবী সংগঠন। তবে অনেকেই বলছেন– পুলিশ অনেক সময় ভিড়ের মধ্য থেকে অনেককেই গ্রেফতার করে। তার মধ্যে সবাই জড়িত থাকে না। গ্রেফতারকৃত মহিলাও হয়তো ডাক্তারের উপর বর্বর আক্রমণে সামিল ছিলেন না। 

আর বিষয়টি মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত নিজেই বলেছেন– ত্বরিত তদন্ত করে পুলিশ ও আদালত সর্বোচ্চ শাস্তির ব্যবস্থা করবে। তাহলে আদালতই ঠিক করবে কে কতটা দোষী– কে সরাসরি জড়িত– কে ছিল দর্শক মাত্র। সেখানে হিমন্ত বিশ্ব শরমা আদালতকে এড়িয়ে নিজেই ২৪ জনকে অপরাধী ঘোষণা করে দিয়েছেন। এটা কতটা যুক্তিযুক্ত– তা হিমন্ত না ভাবলেও সুশীল সমাজের কিন্তু ভেবে দেখা উচিত। 

অসমে নানা ধরনের অনেক বড় বড় অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। হিমন্ত মন্ত্রী বা মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে তাদের কয়জনের নাম ফেসবুকে দিয়েছেন– তা অবশ্যই জানা দরকার। 


আর যে ডাক্তার মরণাপন্ন একজন রোগীকে চিকিৎসা দূরে থাকুক– একবার চোখের দেখাও দেখলেন না– তার বিরুদ্ধেও কিন্তু ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। পালিয়া যাওয়া সেই ডাক্তারের এই গাফিলতির পিছনে কি রহস্য রয়েছে– তারও তদন্ত হওয়া উচিত।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only