শনিবার, ৫ জুন, ২০২১

ইয়াস বিদ্ধস্ত ঘোড়ামারা দ্বীপ,আতঙ্কে বসত ভিটে ছাড়ছেন অনেকেই


সামিম আহমেদ– ঘোড়ামারাঃ ঘূর্ণিঝড় ইয়াস আর পূর্ণিমার ভরা কোটালে জলোচ্ছ্বাসে নদীবাঁধ ভেঙে জলমগ্ন হয় দেশের সবথেকে ছোট দ্বীপ ঘোড়ামারা। এখানে প্রায় ১–২০০ পরিবারের বাস। বেশিরভাগ মানুষ দিনমজুর। এ ছাড়াও নদীতে মাছ ধরে অনেকেই সংসার চালায়। এবারের জলোচ্ছ্বাসে ভেঙে পড়েছে ঘর– নষ্ট হয়েছে সবজি ক্ষেত– মাছের পুকুর– ধ্বংস হয়েছে পানের বরজ। এককথায় ধ্বংসের মুখে ঘোড়ামারা দ্বীপ।

একসপ্তাহ কেটে গেলেও অবস্থার কোনও বদল হয়নি। জমা জল দূষিত হওয়ার ফলে নানা অসুখের সংখ্যা বাড়ছে। দু’বেলা খাবার জোগাড় করাটাই এখন তাদের কাছে সব থেকে বড় সমস্যা। দু’মুঠো খাবারের আশায় প্রতিদিন সকাল থেকেই মানুষ দলে দলে বাঁধের উপর জড়ো হয়ে অপেক্ষা করতে থাকে কখন ত্রাণের নৌকা খাবার নিয়ে নদীর পাড়ে আসবে। এরকম করে আর কতদিন চলবে। 


এখানকার মূল সমস্যা হল নদী বাঁধের। সামনে আবার কোটাল। তাই সর্বস্বান্ত হয়ে যাওয়া বেশিরভাগ মানুষ জিনিসপত্র গুছিয়ে ভিটেমাটি ছেড়ে আশ্রয়ের খোঁজে পাড়ি দিচ্ছেন অন্যত্র। কেউ যাচ্ছেন আত্মীয়- স্বজনদের বাড়ি– আবার কেউ বা বেরিয়ে পড়েছেন অজানার উদ্দেশ্যে। সরকারি তরফে ত্রাণশিবির করে খাদ্যসামগ্রী দেওয়ার কাজ চলছে। আবার পুলিশ-প্রশাসনের পক্ষ থেকে কমিউনিটি কিচেন করে রান্না করা খাবার দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।


শুক্রবার সকাল ৯টা নাগাদ কাকদ্বীপের লট ৮ জেটি ঘাটে পৌঁছে দেখা গেল ঘোড়ামারা দ্বীপে যাওয়ার জন্য ভুটভুটি ঘাটে দাঁড়িয়ে আছে। ভুটভুটির ভিতরে– ডেকে ও ছাদে প্রচুর যাত্রী উঠেছে। তোলা হয়েছে প্রচুর জিনিসপত্র ও খাদ্যসামগ্রী। কেউ বা কাকদ্বীপ থেকে বাজার করে নিয়ে যাচ্ছেন। কেউ বা নিয়ে যাচ্ছেন ত্রাণসামগ্রী। সকাল সাড়ে ৯টা নাগাদ লট ৮ জেটি ঘাট থেকে ছাড়ে ভুটভুটি। তখন নদীতে ছিল পুরো ভাটা। 


দূরে নদীর মাঝেই চর দেখা যাচ্ছে। জলের স্তর কম থাকায় সারেঙ্গ নদীর সুতি ধরে কায়দাকানুন করে ভুটভুটি চালাতে থাকে। নদীর ঢেউয়ে ভুটভুটি ধীরে ধীরে হেলতে দুলতে ঘোড়ামারার দিকে এগোতে থাকে। প্রায় ঘণ্টাখানেক পর আমরা পৌঁছে যাই ঘোড়ামারা দ্বীপের নদীর কিনারায়। সেখানে দেখা গেল নদীর পারে প্রচুর পুরুষ ও মহিলা সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে। প্রত্যেকের হাতে ব্যাগ। তারা খাদ্যসামগ্রী পাওয়ার আশায় দাঁড়িয়ে আছেন। 


কয়েক পা এগোতেই দেখা গেল নদীর পাড়ে বাড়ির আসবাবপত্র পিছমোড়া করে বাঁধা। পাশে দাঁড়িয়ে আছে গবাদি পশু। ভ্যানে করে আসবাবপত্র পাড়ে নিয়ে আসা হচ্ছে। পাড় থেকে একে একে সমস্ত আসবাবপত্র-সহ গবাদি পশুদের ভুটভুটিতে তোলা হচ্ছে। হাটখোলা– মন্দিরতলা হয়ে– চুনপুড়ি– খাসিমাড়া– রায়পাড়া– বাগপাড়া নদীবাঁধ এলাকা ঘুরে দেখা গিয়েছে এই জলোচ্ছ্বাসের জেরে নদীবাঁধ ভেঙে নোনাজল ঢুকে একাকার হয়ে গিয়েছে। একের পর এক ঘর যেন মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। পানের বরজ ধ্বংস হয়ে গেছে। ঝড়ের ধাক্কা সামলাতে না পেরে গাছগুলো হেলে পড়েছে। নোনাজল ঢুকে পুকুরের মাছ মরে জল থেকে দুর্গন্ধ বের হচ্ছে। স্বাস্থ্য দফতরের তরফ থেকে পর্যাপ্ত ব্লিচিং পাউডার ছড়ানো হয়েছে।


 প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। নোনাজলের ঝাপটায় গাছগুলো যেন ‘ঝলসে’ গিয়েছে। কেউবা শেষ সম্বলটুকু খোঁজার চেষ্টা করছে। উঁচু রাস্তার উপর ত্রিপল পেতে তাতে শুকানোর জন্য মেলে রাখা হয়েছে ধান। সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েছে দ্বীপের বাসিন্দারা। 


পর্যাপ্ত পরিমাণ ত্রিপল পৌঁছয়নি বলে জানা গিয়েছে। ত্রাণসামগ্রী যা আসছেন তা ঘাটের কাছেই হাটখোলা– মন্দিরতলা– নিমতলায় শেষ হয়ে যাচ্ছে। খাসিমারা– রায়পাড়া– বাগপাড়ার বাসিন্দারা পাচ্ছেন না বলে তারা জানিয়েছেন। ঘূর্ণিঝড় ইয়াস আর পূর্ণিমার ভরা কোটালের জলোচ্ছ্বাস যেন ঘোড়ামারা দ্বীপজুড়ে ধ্বংসলীলা চালিয়েছে।

 এলাকা ঘুরে দেখা গেল– ইয়াস-এর দগদগে ঘা এই দ্বীপের প্রতিটি কোনায় কোনায়। তাই নিরুপায় হয়ে তাদের শেষ সম্বলটুকু আর শখের গবাদি পশুদের নিয়ে বাঁচার আশায় ভিটেমাটি ছাড়ছেন তারা। কিন্তু কার মন চায় ভিটেমাটি ছাড়ার!


এক রাশ কান্না বুকে চেপে হাটখোলার বাসিন্দা কৃষ্ণেন্দু মণ্ডল– ঘোড়ামারা সুরজিৎ কর– মন্দিরতলার কালীদাসী জানা– খসিমারার সরস্বতী কর ও রিনা দাস জানান– আমরা খুব গরিব। আমাদের জমি জায়গা নেই।


 দিনমজুরি ও নদীতে মাছ ধরে কোনোক্রমে সংসার চালাই। প্রতিবারই জলোচ্ছাসে নদীবাঁধ ভেঙে নোনা জল ঢুকে আমাদের ঘরবাড়ি শেষ করে দেয়। কষ্ট করে প্রতিবারেই ঘরবাড়ি মেরামত করি। প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করতে করতে আমরা ক্লান্ত। এবারেও জলোচ্ছ্বাসে আমাদের ঘরবাড়ি পড়ে গিয়েছে। থাকার জায়গাটুকুও নেই। 


জলের তোড়ে গবাদি পশু ভেসে যাচ্ছিল। গাছের ডাল ধরে কোনোক্রমে প্রাণে বাঁচি। এই জলোচ্ছ্বাস যদি রাতের বেলা হত তাহলে আমরা কেউ প্রাণে বাঁচতাম না। এরকমভাবে কতদিন আর সহ্য করব– আর পেরে উঠছি না। ত্রাণশিবির থেকে কিছু খাদ্যসামগ্রী পাওয়া যাচ্ছে। বাইরে থেকে ত্রাণসামগ্রী দিতে আসছে। এভাবে আর কতদিন চলবে বলুন। 


সরকারও নদী বাঁধের দিকে গুরুত্ব দিচ্ছে না। নদীবাঁধ ভেঙে নোনাজল ঢুকে আমাদের সর্বস্বান্ত করে দিয়েছে। সামনে আবার কোটাল তাই নিরুপায় হয়েই আমরা ভিটেমাটি ছেড়ে চলে যাচ্ছি। চোখের জল ফেলতে ফেলতে তারা বলেন– কে বা চায় বলুন– নিজের জন্ম ভিটে ছেড়ে চলে যেতে। কিন্তু এখানে থাকলে আমরা আর বাঁচতে পারব না।
মন্দিরতলার বাসিন্দা শেখ আরশাদ– পূর্ব পাড়ার বাসিন্দা শেখ কবির উদ্দিন– চুনপুড়ির বাসিন্দা শেখ রফিক শাহ– খাসিমারার বাসিন্দা শেখ সইদুলরা জানান– ঘূর্ণিঝড় ইয়াস আর পূর্ণিমার ভরা কোটালে জলোচ্ছ্বাসের নদীবাঁধ ভেঙে জলমগ্ন হয়েছে আমাদের এলাকা। 


ভেঙেছে এলাকার সমস্ত ঘরবাড়ি– ধসে পড়েছে পানের বরজ– ডুবেছে মাছের পুকুর। আশ্রয়হীন বাসিন্দারা প্রাণ বাঁচানোর তাগিদে তাদের গবাদি পশু নিয়ে আশ্রয় নিয়েছে ত্রাণ শিবিরে। আমাদের এলাকায় চুনপুড়ির মন্দিরতলা জামে মসজিদ– পূর্বপাড়া জামে মসজিদ– খাসিমারা জামে মসজিদ– চুনপুড়ির উক্তিয়া মসজিদ ও মাদ্রাসা আছে। জলোচ্ছ্বাসের হাত থেকে আমাদের মাদ্রাসা ও মসজিদগুলো রেহাই পায়নি। জলোচ্ছ্বাসে নোনাজল মসজিদ ও মাদ্রাসায় ঢুকে বিধ্বস্ত করে দিয়েছে। ভেঙে পড়ার মতো অবস্থায় সেগুলো। ফলে নামায পড়তে গিয়ে সমস্যা দেখা দিয়েছে। মাদ্রাসায় যাদের পড়াশোনা শেখানো হত সেগুলোও বন্ধ হয়ে গিয়েছে।

 সমস্যায় পড়েছেন নামাজি ও পডুয়ারা। বাইরে থেকে যারা ত্রাণসামগ্রী নিয়ে আসছেন আমরা মসজিদের কাছ থেকেও দুর্গতদের হাতে তুলে দিচ্ছি। আবার সামনে কোটাল সেই আতঙ্কে এলাকার বাসিন্দারা আস্তে আস্তে ঘরের জিনিসপত্র গুটিয়ে এলাকা ছাড়তে শুরু করেছে। যদি এখানে পাকাপোক্তভাবে নদী বাঁধগুলো মেরামত করা না হয়– তাহলে আগামী দিনে ঘোড়ামারা দ্বীপ নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে বলে তাদের আশঙ্কা।  


মন্দিরতলার বাসিন্দা এক সিভিক ভলান্টিয়ার কৃষ্ণেন্দুু জানা জানান– শিবির করে মানুষকে খাবার– জল বিলি করা হচ্ছে। কিন্তু নদীবাঁধ সংস্কার করার কাজ করতে না পারলে এলাকা ছেড়ে যাওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। সাগর ব্লক প্রশাসন সূত্রে জানা যায়– যত দ্রুত সম্ভব ভেঙে যাওয়া নদী বাঁধ মেরামতের কাজ শুরু করা হবে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only