রবিবার, ৬ জুন, ২০২১

ইসলামিয়াঃ কেন এই ভিত্তিহীন বিদ্বেষ!





আহমদ হাসান ইমরান: 
ভারতে এতদিন সব সম্প্রদায়ের মানুষদের মিলে মিশে থাকার যে আবহ ছিল– তা খুব দ্রুত পাল্টে গেছে। আশা জাগিয়ে শেষ যে দ্বীপটি জেগে ছিল– তা হল পশ্চিমবঙ্গ। পশ্চিমবাংলাকেও দখল করার যে জবরদস্ত প্রচেষ্টা হয়েছিল, কয়েকটি কারণে তা বাস্তবে পরিণত হতে পারেনি। কিন্তু নির্বাচনে যে ধরনের প্রচারনা চলে তাতে বাংলায় নানা ধর্মের মানুষদের মধ্যে সম্পর্ক বিষিয়ে দেওয়ার কাজটি খানিকটা হলেও সফল হয়েছে। আর এই কাজে বড় ভূমিকা পালন করেছে বিজেপির আইটি সেল। 

পশ্চিমবাংলায় নির্বাচনের ফলাফল উগ্র সাম্প্রদায়িকপন্থীদের হতাশ করেছে। কিন্তু এটা বলতেই হবে, এরা অবশ্যই বাংলার মাটিতে বীজ বপন করতে পেরেছে তাদের উগ্র মতাদর্শের। যাদের মগজ ধোলাই করা সম্ভব হয়েছে তারা একটি সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে যেকোনও অভিযোগ তুললেই তা মনে প্রাণে বিশ্বাস করতে আরম্ভ করেছে অনেকেই। ফেসবুক–ট্যুইটার- হোয়াটসঅ্যাপেও এই মহলটি মহাসক্রিয়। ফলে মানবতাসম্পন্ন কিছু ভাল কাজকেও এরা গেরুয়া বিষ প্রয়োগ করে তাকে বিদ্বেষ প্রচারের হাতিয়ার করে তুলছে। হিটলার এবং গোয়েবেলসও কি একই কাজ করতেন?  মনে হয়– তাঁরা হিটলার– গোয়েবেলসকেও ছাড়িয়ে গেছেন। 

এদের সাম্প্রতিক একটি অপপ্রচার নিয়ে এখন আলোচনা চলছে। দোষের মধ্যে কলকাতার প্রায় শতাব্দী প্রাচীন ইসলামিয়া হাসপাতাল পুননির্মাণের পর তাকে পূর্ণাঙ্গ এক কোভিড হাসপাতাল হিসেবে উদ্বোধন করা হয়েছে। উদ্বোধন করেন ইসলামিয়া হাসপাতালের প্রেসিডেন্ট এবং রাজ্য সরকারের মন্ত্রী ফিরহাদ হাকিম। এই হাসপাতালে করোনা রোগীদের চিকিৎসার জন্য অক্সিজেন– আইসিইউ বেড থেকে শুরু করে ভেন্টিলেটর এবং অন্য যা কিছু প্রয়োজন তার সবই রয়েছে। আপাতত চেরিং ক্রস নার্সিংহোমের প্রশিক্ষিত ডাক্তার– নার্সরা এই কোভিড ইউনিটটি পরিচালনার দায়িত্বভার গ্রহণ করেছেন। এই খবরে পশ্চিমবঙ্গবাসী মাত্রই খুশি হওয়ার কথা। কিন্তু না– এই ধরনের ভাল সংবাদকেও মিথ্যা প্রচারনা ও বিদ্বেষ প্রচারের হাতিয়ার করেছে গেরুয়া চশমা লাগানো কিছু ব্যক্তি।

 ইসলামিয়া হাসপাতালের কোভিড সেন্টার সম্পর্কে ফেসবুকে একজন লিখেছেন– ‘গতকাল– কলকাতার চিত্তরঞ্জন অ্যাভিনিউ-এ রাজ্যে প্রথম ইসলামিক হসপিটালের উদ্বোধন হলো যেখানে শুধু মুসলিম চিকিৎসক মুসলিম রোগীদের চিকিৎসা করবেন। মাননীয় জনাব ফিরহাদ হাকিমের অনুপ্রেরণায়। খুব কি দরকার ছিল স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে এরকমভাবে হিন্দু মুসলিম ভাগ করার। এটাই যদি হিন্দু হসপিটাল হতো তাহলে সেটা হতো সাম্প্রদায়িক– কিছু লোক সেকু্যলারিজম এর বুলি আওড়াতো... এখন রাজ্যের মানুষ যখন এটাই চায় তাই হোক!’

ইসলামিয়া হাসপাতালের কর্মকর্তাদের নাম লেখা যে বোর্ডটি লাগানো ছিল একইসঙ্গে তারও ছবি পোস্ট করা হয়েছে। ফেসবুক পোস্টে ছবিটি দিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে– ‘এখানে একজনও হিন্দু ডাক্তারের নাম নেই!’ আসলে মানুষকে প্রতারিত ও প্রভাবিত করার জন্য এইসব লেখা। কারণ– ওই সাইন বোর্ডে হিন্দু বা মুসলিম কোনও চিকিৎসকেরই নাম নেই। বোর্ডটিতে শুধু কর্মকর্তাদের নাম রয়েছে। 

টাটার তৈরি হাসপাতালেও কর্মকর্তাদের নামের বোর্ড লাগানো থাকে। তাতে কেউ ধর্ম খুঁজতে যায় না। মাড়োয়াড়ি হাসপাতালে যদি বোর্ড থাকে তাহলে সেখানে মাড়োয়াড়ি কর্মকর্তাদের নাম থাকলেও সেক্যুলারিজম নষ্ট হয়ে গেল– এমন অভিযোগ তোলা হাস্যকর। 

ভারতীয় সংবিধান ভারতের প্রতিটি ধর্ম-সম্প্রদায়– জাতি-উপজাতিকে নিজস্ব বৈশিষ্ট্য ও সংস্টৃñতি রক্ষা করার স্বাধীনতা দিয়েছে। যারা এগুলি হরণ করার চেষ্টা করছেন তারাই বরং ফ্যাসিবাদী ও সাম্প্রদায়িক আচরণ করছে। 

এখন ইসলামিয়া হাসপাতালের বিরুদ্ধে অপপ্রচারের দিকে একবার নজর ফেরানো যাক। ইসলামিয়া হাসপাতালের নতুন কোনও উদ্বোধন হয়নি। উদ্বোধন হয়েছে পুনর্নির্মিত ভবনের কোভিড ইউনিটের। ইসলামিয়া হাসপাতাল প্রতিষ্ঠিত হয় প্রায় ১০০ বছর আগে ১৯২৬ সালে। ভোলা মিয়া নামে একজন বাঙালি মুসলমান কলকাতার জাকারিয়া স্ট্রীটের ছোট একটি ঘরে রোগীদের সেবা দেওয়ার জন্য এই সংস্থাটির পত্তন করেছিলেন। ইসলামিয়া হাসপাতালের প্রথমদিন থেকেই কোনও জাতি-বিদ্বেষের প্রমাণ কেউ দিতে পারবে না। এখানে ভর্তি ও চিকিৎসার মাপকাঠি হল কোনও জাত বা ধর্ম নয়। মাপকাঠি হল ওই ব্যক্তি অসুস্থ কি না। এই হাসপাতালে হিন্দু– মুসলিম– দলিত সবারই চিকিৎসা হয়ে আসছে। কোনও ভেদভাব ছাড়াই। আর ফেসবুকে লেখা হয়েছে যে–ইসলামিয়ায় শুধু মুসলিম চিকিৎসকরা মুসলিম রোগীদের চিকিৎসা করবেন– তা কখনই ইসলামিয়ার কর্মকর্তারা কেউ বলেননি। এটা ওই ফেসবুক পোস্টকারীর সাম্প্রদায়িক কষ্টকল্পনা প্রসূত। তিনি মনের মাধুরি মিশিয়ে শতাব্দী প্রাচীন এই হাসপাতালটিকে সাজিয়েছেন। সাজিয়েছেন নিজের বা নিজেদের বিদ্বেষ প্রচারের ছক করে। 

আরও একটি কথা মনে রাখা দরকার– প্রথম থেকে ইসলামিয়া হাসপাতালের ডাক্তার ও নার্সদের মধ্যে হিন্দু ও মুসলমান আছেন প্রায় সমানুপাতে অর্থাৎ ফিফটি ফিফটি। কর্মচারিদের মধ্যেও রয়েছেন প্রচুর অমুসলিম। সবথেকে উচ্চপদস্থ কর্মচারি হচ্ছেন শক্তিবাবু যিনি একজন ধার্মিক হিন্দু। 

চেরিং ক্রস নার্সিংহোমকে ইসলামিয়া হাসপাতাল তাদের কোভিড ইউনিটকে চালানোর দায়িত্ব দিয়েছে। তার মালিক রাহুল গোদিয়া বলেছেন– এটা সম্পূর্ণ মিথ্যা প্রচার। আমরাও মুসলিম নই– আমাদের ডাক্তার ও নার্সদের মধ্যে কোনও মুসলিম নেই। আমরা সব ধর্মের লোকদেরই ভর্তি করছি। 

সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে ফিরহাদ হাকিম স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন– ইসলামিয়া হাসপাতাল মানুষের জন্য– ইনসানের জন্য। আর আমরা ইনসান বা মানবতাকে দেখি। কেউ যখন চিকিৎসা করে সে ইনসানকে দেখে– হিন্দু-মুসলিম দেখে না। রামকৃষ্ণ মিশন– অ্যাসেম্বলি অফ গডচার্চ হাসপাতাল তারাও জাতি– ধর্ম নির্বিশেষে মানুষের চিকিৎসা করে। ইসলামিয়াও মানুষের সেবা করার জন্য বদ্ধপরিকর। যারা এই ধরনের মিথ্যা প্রচার করছেন তারা খুবই নিচ প্রকৃতির– নিচ মানুষ।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only