০৫ মার্চ ২০২৬, বৃহস্পতিবার, ২০ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

নিজস্ব ইন্টারনেট ও সোশ্যাল মিডিয়ার পথে ইরান

 

যোগাযোগমাধ্যম চালুর মাধ্যমে ইরানকে কার্যত বৈশ্বিক ইন্টারনেট ব্যবস্থা থেকে স্থায়ীভাবে বিচ্ছিন্ন করার পথে হাঁটছে দেশটির সরকার—এমন আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন ডিজিটাল অধিকারকর্মীরা। তাঁদের মতে, নতুন এই ব্যবস্থায় আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট সাধারণ নাগরিকের অধিকার হিসেবে আর স্বীকৃত থাকবে না; বরং সরকারের অনুমোদনপ্রাপ্ত সীমিত একটি গোষ্ঠীই নিয়ন্ত্রিতভাবে বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক ব্যবহারের সুযোগ পাবে।

ইন্টারনেট সেন্সরশিপ পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ফিল্টারওয়াচের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানে ইন্টারনেট ব্যবহারের ধারণাটিই আমূল বদলে দেওয়া হচ্ছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, সরকার যাচাই–বাছাই করে যাদের ‘বিশেষ ছাড়পত্র’ দেবে, কেবল তারাই ফিল্টার করা আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পারবেন। সাধারণ নাগরিকদের জন্য চালু থাকবে একটি সম্পূর্ণ দেশীয় ‘জাতীয় ইন্টারনেট’, যা বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক থেকে আলাদা ও বিচ্ছিন্ন।
ফিল্টারওয়াচের প্রধান আমির রাশিদি জানান, এই জাতীয় ইন্টারনেট আসলে সরকার-নিয়ন্ত্রিত একটি সমান্তরাল নেটওয়ার্ক। এতে কেবল সরকার অনুমোদিত সার্চ ইঞ্জিন, মেসেজিং অ্যাপ এবং দেশীয় স্ট্রিমিং পরিষেবা থাকবে। আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্ম কিংবা উন্মুক্ত তথ্যভান্ডারে প্রবেশের সুযোগ এতে কার্যত থাকবে না।
ডিজিটাল অধিকারকর্মীদের অভিযোগ, এই নজরদারি ও সেন্সরশিপ অবকাঠামো গড়ে তুলতে চীনা প্রযুক্তি এবং হুয়াওয়ের উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন সরঞ্জাম ব্যবহার করা হয়েছে। এসব প্রযুক্তির মাধ্যমে ইন্টারনেট ট্রাফিক পর্যবেক্ষণ, নিয়ন্ত্রণ এবং প্রয়োজনে নির্দিষ্ট ওয়েবসাইট বা পরিষেবা সম্পূর্ণভাবে ব্লক করা সম্ভব।

এদিকে ৮ জানুয়ারি থেকে ইরানে যে ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট শুরু হয়েছে, তা ইতিমধ্যেই দেশটির ইতিহাসে দীর্ঘতমগুলোর একটি হয়ে উঠেছে। নেটব্লকসের তথ্য অনুযায়ী, ২০০ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে কার্যত ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই ব্ল্যাকআউট ২০১১ সালে মিসরের তাহরির স্কয়ার আন্দোলনের সময়কার শাটডাউনকেও ছাড়িয়ে গেছে।
সরকারি মুখপাত্র ফাতেমেহ মোহাজেরানি ইঙ্গিত দিয়েছেন, ইরানি নববর্ষ নওরোজ উপলক্ষে ২০ মার্চ পর্যন্ত এই ইন্টারনেট পরিস্থিতি অব্যাহত থাকতে পারে। ফলে দেশটিতে ডিজিটাল অধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ আরও গভীর হচ্ছে।
ইন্টারনেট সেন্সরশিপ নিয়ে কাজ করা মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের এক সাবেক কর্মকর্তা দ্য গার্ডিয়ানকে বলেন, ‘ইরান স্থায়ীভাবে বৈশ্বিক ইন্টারনেট ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারে—এটা ভীতিকর হলেও একেবারে অসম্ভব নয়।’ বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি কোনো হঠাৎ সিদ্ধান্ত নয়; বরং গত দেড় দশক ধরে নেওয়া পরিকল্পনারই চূড়ান্ত বাস্তবায়ন।
২০০৯ সালে সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদের পুনর্নির্বাচনের পর দেশজুড়ে বিক্ষোভের সময় ইন্টারনেট বন্ধ করে সরকার বুঝেছিল, পূর্ণাঙ্গ ব্ল্যাকআউট অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত ব্যয়বহুল। এরপর কৌশল বদলে ২০১২ সালে গঠন করা হয় সুপ্রিম কাউন্সিল অব সাইবারস্পেস এবং শুরু হয় দেশীয় ইন্টারনেট অবকাঠামো নির্মাণ।
পরবর্তীতে চালু হয় ‘হোয়াইটলিস্টিং’ ব্যবস্থা, যেখানে ফেসবুক, টুইটার ও গুগলের মতো প্ল্যাটফর্ম বন্ধ থাকলেও অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ কিছু পরিষেবা সীমিতভাবে চালু রাখা হয়। গবেষকদের ধারণা, এই ব্যবস্থাটিও চীনা প্রযুক্তির সহায়তায় গড়ে তোলা।
এই পুরো ব্যবস্থার কেন্দ্রে রয়েছে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ‘মিডলবক্স’ প্রযুক্তি, যা ইন্টারনেট ট্রাফিক নজরদারি, নিয়ন্ত্রণ এবং ভিপিএনসহ নির্দিষ্ট টুল ব্লক করতে সক্ষম। এর মাধ্যমে ব্যবহারকারীদের ওপর নজরদারি ও গুপ্তচরবৃত্তি আরও সহজ হয়েছে।
২০১৫ সালে কিছু গবেষক পরীক্ষামূলকভাবে বিটকয়েন ব্যবহার করে ইরানি সার্ভার ভাড়া নিয়ে দেখতে পান, সেখানে করপোরেট নেটওয়ার্কের মতো একটি অভ্যন্তরীণ ইন্টারনেট ব্যবস্থা তৈরি করা হয়েছে, যা বাইরের বিশ্বের সঙ্গে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন।
এই পরিস্থিতিতে বিক্ষোভকারীদের শেষ ভরসা হয়ে উঠেছিল ইলন মাস্কের স্টারলিংক। তবে ২০২৫ সালে পাস হওয়া এক আইনে ইরানে স্টারলিংক টার্মিনাল রাখা ‘ইসরায়েলের জন্য গুপ্তচরবৃত্তি’ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে, যার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে। একই সঙ্গে তেহরানের আকাশসীমায় রুশ ও চীনা প্রযুক্তির জ্যামার ব্যবহার করে স্টারলিংকের সিগন্যাল ব্যাহত করার চেষ্টাও চালাচ্ছে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী।

ট্যাগ :
সর্বধিক পাঠিত

বসন্তে এসেছে গাছে গাছে আমের মুকুল রাউ ডন স্ট্রিটে

Copyright © Puber Kalom All rights reserved.| Developed by eTech Builder

নিজস্ব ইন্টারনেট ও সোশ্যাল মিডিয়ার পথে ইরান

আপডেট : ১৮ জানুয়ারী ২০২৬, রবিবার

 

যোগাযোগমাধ্যম চালুর মাধ্যমে ইরানকে কার্যত বৈশ্বিক ইন্টারনেট ব্যবস্থা থেকে স্থায়ীভাবে বিচ্ছিন্ন করার পথে হাঁটছে দেশটির সরকার—এমন আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন ডিজিটাল অধিকারকর্মীরা। তাঁদের মতে, নতুন এই ব্যবস্থায় আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট সাধারণ নাগরিকের অধিকার হিসেবে আর স্বীকৃত থাকবে না; বরং সরকারের অনুমোদনপ্রাপ্ত সীমিত একটি গোষ্ঠীই নিয়ন্ত্রিতভাবে বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক ব্যবহারের সুযোগ পাবে।

ইন্টারনেট সেন্সরশিপ পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ফিল্টারওয়াচের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানে ইন্টারনেট ব্যবহারের ধারণাটিই আমূল বদলে দেওয়া হচ্ছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, সরকার যাচাই–বাছাই করে যাদের ‘বিশেষ ছাড়পত্র’ দেবে, কেবল তারাই ফিল্টার করা আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পারবেন। সাধারণ নাগরিকদের জন্য চালু থাকবে একটি সম্পূর্ণ দেশীয় ‘জাতীয় ইন্টারনেট’, যা বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক থেকে আলাদা ও বিচ্ছিন্ন।
ফিল্টারওয়াচের প্রধান আমির রাশিদি জানান, এই জাতীয় ইন্টারনেট আসলে সরকার-নিয়ন্ত্রিত একটি সমান্তরাল নেটওয়ার্ক। এতে কেবল সরকার অনুমোদিত সার্চ ইঞ্জিন, মেসেজিং অ্যাপ এবং দেশীয় স্ট্রিমিং পরিষেবা থাকবে। আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্ম কিংবা উন্মুক্ত তথ্যভান্ডারে প্রবেশের সুযোগ এতে কার্যত থাকবে না।
ডিজিটাল অধিকারকর্মীদের অভিযোগ, এই নজরদারি ও সেন্সরশিপ অবকাঠামো গড়ে তুলতে চীনা প্রযুক্তি এবং হুয়াওয়ের উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন সরঞ্জাম ব্যবহার করা হয়েছে। এসব প্রযুক্তির মাধ্যমে ইন্টারনেট ট্রাফিক পর্যবেক্ষণ, নিয়ন্ত্রণ এবং প্রয়োজনে নির্দিষ্ট ওয়েবসাইট বা পরিষেবা সম্পূর্ণভাবে ব্লক করা সম্ভব।

এদিকে ৮ জানুয়ারি থেকে ইরানে যে ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট শুরু হয়েছে, তা ইতিমধ্যেই দেশটির ইতিহাসে দীর্ঘতমগুলোর একটি হয়ে উঠেছে। নেটব্লকসের তথ্য অনুযায়ী, ২০০ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে কার্যত ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই ব্ল্যাকআউট ২০১১ সালে মিসরের তাহরির স্কয়ার আন্দোলনের সময়কার শাটডাউনকেও ছাড়িয়ে গেছে।
সরকারি মুখপাত্র ফাতেমেহ মোহাজেরানি ইঙ্গিত দিয়েছেন, ইরানি নববর্ষ নওরোজ উপলক্ষে ২০ মার্চ পর্যন্ত এই ইন্টারনেট পরিস্থিতি অব্যাহত থাকতে পারে। ফলে দেশটিতে ডিজিটাল অধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ আরও গভীর হচ্ছে।
ইন্টারনেট সেন্সরশিপ নিয়ে কাজ করা মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের এক সাবেক কর্মকর্তা দ্য গার্ডিয়ানকে বলেন, ‘ইরান স্থায়ীভাবে বৈশ্বিক ইন্টারনেট ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারে—এটা ভীতিকর হলেও একেবারে অসম্ভব নয়।’ বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি কোনো হঠাৎ সিদ্ধান্ত নয়; বরং গত দেড় দশক ধরে নেওয়া পরিকল্পনারই চূড়ান্ত বাস্তবায়ন।
২০০৯ সালে সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদের পুনর্নির্বাচনের পর দেশজুড়ে বিক্ষোভের সময় ইন্টারনেট বন্ধ করে সরকার বুঝেছিল, পূর্ণাঙ্গ ব্ল্যাকআউট অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত ব্যয়বহুল। এরপর কৌশল বদলে ২০১২ সালে গঠন করা হয় সুপ্রিম কাউন্সিল অব সাইবারস্পেস এবং শুরু হয় দেশীয় ইন্টারনেট অবকাঠামো নির্মাণ।
পরবর্তীতে চালু হয় ‘হোয়াইটলিস্টিং’ ব্যবস্থা, যেখানে ফেসবুক, টুইটার ও গুগলের মতো প্ল্যাটফর্ম বন্ধ থাকলেও অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ কিছু পরিষেবা সীমিতভাবে চালু রাখা হয়। গবেষকদের ধারণা, এই ব্যবস্থাটিও চীনা প্রযুক্তির সহায়তায় গড়ে তোলা।
এই পুরো ব্যবস্থার কেন্দ্রে রয়েছে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ‘মিডলবক্স’ প্রযুক্তি, যা ইন্টারনেট ট্রাফিক নজরদারি, নিয়ন্ত্রণ এবং ভিপিএনসহ নির্দিষ্ট টুল ব্লক করতে সক্ষম। এর মাধ্যমে ব্যবহারকারীদের ওপর নজরদারি ও গুপ্তচরবৃত্তি আরও সহজ হয়েছে।
২০১৫ সালে কিছু গবেষক পরীক্ষামূলকভাবে বিটকয়েন ব্যবহার করে ইরানি সার্ভার ভাড়া নিয়ে দেখতে পান, সেখানে করপোরেট নেটওয়ার্কের মতো একটি অভ্যন্তরীণ ইন্টারনেট ব্যবস্থা তৈরি করা হয়েছে, যা বাইরের বিশ্বের সঙ্গে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন।
এই পরিস্থিতিতে বিক্ষোভকারীদের শেষ ভরসা হয়ে উঠেছিল ইলন মাস্কের স্টারলিংক। তবে ২০২৫ সালে পাস হওয়া এক আইনে ইরানে স্টারলিংক টার্মিনাল রাখা ‘ইসরায়েলের জন্য গুপ্তচরবৃত্তি’ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে, যার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে। একই সঙ্গে তেহরানের আকাশসীমায় রুশ ও চীনা প্রযুক্তির জ্যামার ব্যবহার করে স্টারলিংকের সিগন্যাল ব্যাহত করার চেষ্টাও চালাচ্ছে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী।