০১ জানুয়ারী ২০২৬, বৃহস্পতিবার, ১৬ পৌষ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

কেন অসমের মুখ্যমন্ত্রীর ঘৃণাময় অপপ্রচারকে চ্যালেঞ্জ করতে হয় এক মুসলিম সাংসদকেই?

অপূর্বানন্দ ও সূরজ গগৈ

অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা মুসলিমদের বিরুদ্ধে আপত্তিকর ও ঘৃণ্য সাম্প্রদায়িক মন্তব্য করেন। তাঁর নামে এফআইআর দায়ের করতে পুলিশের কাছে আবেদন জানান বড়পেটার কংগ্রেস সাংসদ আব্দুল খালেক এবং এরপরই ভারতীয় জনতা পার্টির আক্রমণের মুখে পড়েন তিনি। এক বিবৃতি জারি করে বিজেপি অভিযোগ তুলেছে যে, অসম ও ভারতকে ইসলামি দেশে পরিণত করার চক্রান্ত করছেন খালেক। তিনি কার্যত পাকিস্তানের স্থপতি মুহম্মদ আলি জিন্নাহর স্বপ্ন পূরণ করছেন। ‘অবৈধ অভিবাসী’দের হাত থেকে মুক্ত করে অসমকে উন্নয়নের শীর্ষে নিয়ে যেতে চান যে শর্মা, সেই শর্মার পথের বড় বাধা হিসাবে চিত্রিত করা হয়েছে খালেককে। অসমিয়া জাতীয়তাবাদের নয়া নায়ক হিসাবে শর্মাকে তুলে ধরেছে বিজেপি ও স্থানীয় মিডিয়া। সমস্ত মুখোশ, ভান, ভণিতার মোড়ক খুলে দিয়ে তারা অসমিয়া জাতীয়তাবাদকে ব্যাখ্যা করছে হিন্দু বয়ানে।

মুসলিমদের ব্যঙ্গ করতে বা তাদের অপরাধী সাব্যস্ত করতে কোনও সুযোগ হাতছাড়া করেন না শর্মা। যেমন, যদি কোনও অপরাধীকে পুলিশ আটক করে এবং সেই অপরাধী ঘটনাচক্রে মুসলিম হয় তাহলে শর্মা তৎক্ষণাৎ এই ঘটনায় জোর দিয়ে ট্যুইট করেন। ২০২০ সালে কোভিড-১৯-এর প্রাদুর্ভাবের সময়ও তিনি এমনটা করেছিলেন। অসম থেকে যাঁরা দিল্লিতে তাবলিগি জামাতের সমাবেশে গিয়েছিলেন তাঁদের চিহ্নিত করেন। শর্মার হয়ে তাঁর সমর্থকরা দাবি করে যে, তিনি শুধু অপরাধীদের নাম বলেছেন, মুসলিমদের ব্যাপারে কথা বলেননি। কিন্তু শর্মার বিবৃতি বা ট্যুইটে হিন্দু অপরাধীদের নাম উল্লেখ করা হয় না।

যাইহোক, শর্মার যে বক্তব্যের বিরুদ্ধে খালেক হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন তা মানের দিক থেকেও কুরুচিকর। ১০ ডিসেম্বর এক ভাষণে শর্মা বলেন, নেলিতে ১৯৮৩ সালের ম্যাসাকারের প্রতিশোধ ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে নিয়েছে অসমিয়া যুবক। ‘অবৈধ দখলকারী’ তকমা দিয়ে উচ্ছেদ অভিযান চালানোর সময় পুলিশ গুলি করে দুই মুসলিমকে হত্যা করে। সেটাই তাঁর কাছে প্রতিশোধ। শর্মা বলেন,”গরুখুটি একসময় অসমিয়াদের ছিল। কারণ এই জায়গায় ৪ হাজার বছরের পুরনো শিব মন্দির ছিল। সেই মন্দিরের পুরোহিতকে ছুরি দিয়ে আঘাত করে হত্যা করা হয় এবং তাঁর স্ত্রীকে জোর করে ধর্মান্তরিত করানো হয়। যাদের বিরুদ্ধে আমাদের আন্দোলন তারা খিলোঞ্জিয়া মহিলাদের ধর্ষণ করেছিল।” ১৯৮০ সালের অসমিয়া আন্দোলনের প্রসঙ্গ টেনে আনেন তিনি। শর্মা আরও বলেন,”১৯৮৩ সালে গরুখুটির অসমিয়া যুবকদের নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। আজ আমি গর্ব বোধ করি যে, ২০২১ সালে অসমিয়ারা সেই নৃশংস হত্যার প্রতিশোধ নিতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু এটাই যথেষ্ট নয়।” শর্মা কী বলতে চাইছেন তা বুঝতে অসমিয়াদের বেশি কাঠখড় পোড়াতে হয় না।

২৩ সেপ্টেম্বর পুলিশের গুলিতে নিহত মইনুল হকের বুকের উপর ফটোগ্রাফারের নাচ এখনও আমাদের স্মৃতিতে জীবন্ত। মুখ্যমন্ত্রী শর্মা এই হত্যার মধ্যে ভুল কিছু দেখেননি। তাঁকে এই বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে রোষের সঙ্গে জানতে চান, ‘অবৈধ বাসিন্দা’দের উচ্ছেদ অভিযানে নিরাপত্তা বাহিনীদের বাধা দেওয়ার সাহস কীভাবে হয় কারও? গরুখুটিতে যা হয়েছে তার পথ প্রশস্ত করে দিয়েছে বাসিন্দারাই। এমনটাই জানান শর্মা। এই ঘটনার কয়েক সপ্তাহ পর অসমের বাইরে থেকে যাওয়া সত্যানুসন্ধানী দল ও সাংবাদিকরা জানতে পারেন যে, গরুখুটিতে শুধুমাত্র মুসলিমদের উৎখাত করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, এই প্রক্রিয়া চলছে গোটা রাজ্যজুড়েই। প্রাক্তন সিনিয়র পুলিশ আধিকারিক বলেন যে, বিক্ষোভকারীদের উপর গুলি ছোঁড়া গ্রহণযোগ্য নয়। এদিকে, শর্মা জানান যে, এই বর্বরোচিত কাজ অবশ্যই গ্রহণযোগ্য। মুসলিমবিরোধী অপপ্রচারকে অন্য স্তরে নিয়ে গিয়েছেন শর্মা। তিনি লাগাতার হিন্দু বয়ানে অসমিয়া জাতীয়তাবাদের কথা বলেন এবং এটা স্পষ্ট করে দেন যে, এই জাতীয়তাবাদ সম্পূর্ণত মুসলিম-বিরোধী। আর অসমের মিডিয়া সানন্দে তাঁর ঘৃণা-ক্যাম্পেনকে রং চড়িয়ে বড় করে প্রচার করে।

শর্মাকে বিচারের আওতায় আনতে আব্দুল খালেক উদ্যোগ নিয়েছেন। এই প্রথম শর্মার মিথ্যার প্রাসাদে কেউ ধাক্কা মারলেন। একজন মুসলিম সাংসদকে এই দায়িত্ব নিতে হল আর এ থেকে আমাদের সমাজের অবস্থা ও গতি-প্রকৃতি স্পষ্টতর হল। আগ্রাসী অসমিয়া জাতীয়তাবাদ সমস্ত রাজনৈতিক দলকে রক্ষণশীলতার দিকে ঠেলে দিয়েছে। এমনকি এথনিক অধিকার ও নিরাপত্তাহীনতা নিয়ে যারা লড়াই করে তাদের পক্ষেও এই সাম্প্রদায়িক ও মুসলিমবিরোধী প্রোপাগান্ডার সমালোচনা করা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ এগুলি অসমিয়া জাতীয়তাবাদের নামে করা হয়ে থাকে। মুসলিম সম্পর্কিত যে-কোনও বিষয়কেই অসমিয়া আত্মপরিচয়ের জন্য বেখাপ্পা ও বেমানান হিসাবে তুলে ধরা হয়। তা সে মিয়া কবিতা হোক বা মিয়া মিউজিয়াম। শর্মার নেতৃত্বাধীন বিজেপি ও তাঁর পেটোয়া মিডিয়া এগুলিকে ষড়যন্ত্র ও আক্রমণ হিসাবে প্রচার করে। অসমিয়া আইডেন্টেটিকে পর্যুদস্ত করতে নাকি এগুলি করা হচ্ছে। অসমিয়া জাতীয়তাবাদীদের চোখে বাংলাদেশী বংশোদ্ভূতদের শিকড় ও আনুগত্য জড়িয়ে রয়েছে অন্য দেশের সঙ্গে, অন্য সংস্কৃতি ও ধর্মের সঙ্গে। এই ঘৃণা আগেও ছিল, কিন্তু বিজেপি পুনরায় ক্ষমতায় আসার পর এবং মুখ্যমন্ত্রী লাগাতার লাগামছাড়া কুমন্ত্রণা দেওয়ার ফলে মুসলিমদের প্রতি এই ঘৃণা এখন আরও খোলামেলা, আরও অহরহ হয়ে গিয়েছে। অসমে কোনও মুসলিম কিছু করলে তা অনুবীক্ষণ যন্ত্রের তলায় ফেলে পরীক্ষা করা হয়। অসম বা অসমিয়াদের কোনও ক্ষতি করবে না তো তারা? এই থাকে উদ্বেগ। ধর্মনিরপেক্ষতা ও গণ পরিসরে সহিষ্ণুতার এই সংকীর্ণ জায়গায় খালেকের এই সাহস এক বিরল দৃষ্টান্ত।

২০২০ সালের অক্টোবর মাসে অসমের বাঘবর কেন্দ্রের এমএলএ শেরমান আলি মিয়া সম্প্রদায়ের জন্য একটি মিয়া মিউজিয়াম প্রস্তাব দিয়েছিলেন। এরপর তাঁকে নিয়ে শুরু হয় ট্রোল। গণ-হেনস্থার শিকার হন তিনি। এমনকি তাঁর নিজের দল কংগ্রেস তাঁকে বরখাস্ত করে। অসম প্রদেশ কংগ্রেস কমিটির সভাপতি ঋপুন বোরা আলিকে এই ধরনের মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকতে বলেন এবং সতর্ক করে দেন যে, বিজেপি এগুলির সুযোগ নেবে। প্রসঙ্গত, মিয়াদের সম্পর্কে সোশ্যাল মিডিয়াতে যে ধরনের বক্তব্য ও মানসিকতা দেখা যায় তা ভীষণ ব্যঙ্গাত্মক ও নেতিবাচক। তাদের বলা হয়–ছেঁড়া লুঙ্গি, জটপাকানো তার, মুড়ি, ইতর ইত্যাদি। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী সর্বানন্দ সোনোয়াল ২০২০ সালের অক্টোবরে বড়োল্যান্ডের এক সভায় দাবি করেছিলেন, ‘মুঘল’ হামলা এখনও চলছে অসমে এবং খুব তাড়াতাড়ি অসমের মাতৃভাষা হয়ে যাবে আরবি। এই মন্তব্য কখন করা হয়েছিল? মাদ্রাসায় সরকারি অর্থ দেওয়া বন্ধ করার প্রেক্ষিতে। বিজেপির হাত ধরে মুসলিমদের প্রতি ঘৃণা ও তাদের অনুভূতিতে আঘাত দেওয়ার ঘটনা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু এটা ভুলে গেলে চলবে না, সংখ্যালঘুদের প্রতি ঘৃণা ও অসহিষ্ণুতা দীর্ঘদিন ধরে অসমের সংস্কৃতির একটা অংশ। অসমিয়া জাতীয়তাবাদের অন্তঃস্থল থেকে উৎসারিত হয়েছে এই ঘৃণা ও বিদ্বেষ। এটা বর্তমানে আরও ভয়াবহ দিকে মোড় নিয়েছে এবং এর জন্য কংগ্রেস ও বিজেপি উভয়ই দায়ী, অপরাধী। গরুখুটি যদি অসমিয়া সমাজের ত্রাতা হয় তাহলে এর সারা শরীরে মুদ্রিত রয়েছে ধ্বংস, হিংসা ও ঘৃণা।

তরজমা : জিয়াউল হক

ট্যাগ :
সর্বধিক পাঠিত

উত্তরপ্রদেশের স্কুল অনুষ্ঠানে বোরখা পরে উদ্যম নাচ, বিতর্কে তদন্তের নির্দেশ পুলিশের

Copyright © Puber Kalom All rights reserved.| Developed by eTech Builder

কেন অসমের মুখ্যমন্ত্রীর ঘৃণাময় অপপ্রচারকে চ্যালেঞ্জ করতে হয় এক মুসলিম সাংসদকেই?

আপডেট : ৮ জানুয়ারী ২০২২, শনিবার

অপূর্বানন্দ ও সূরজ গগৈ

অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা মুসলিমদের বিরুদ্ধে আপত্তিকর ও ঘৃণ্য সাম্প্রদায়িক মন্তব্য করেন। তাঁর নামে এফআইআর দায়ের করতে পুলিশের কাছে আবেদন জানান বড়পেটার কংগ্রেস সাংসদ আব্দুল খালেক এবং এরপরই ভারতীয় জনতা পার্টির আক্রমণের মুখে পড়েন তিনি। এক বিবৃতি জারি করে বিজেপি অভিযোগ তুলেছে যে, অসম ও ভারতকে ইসলামি দেশে পরিণত করার চক্রান্ত করছেন খালেক। তিনি কার্যত পাকিস্তানের স্থপতি মুহম্মদ আলি জিন্নাহর স্বপ্ন পূরণ করছেন। ‘অবৈধ অভিবাসী’দের হাত থেকে মুক্ত করে অসমকে উন্নয়নের শীর্ষে নিয়ে যেতে চান যে শর্মা, সেই শর্মার পথের বড় বাধা হিসাবে চিত্রিত করা হয়েছে খালেককে। অসমিয়া জাতীয়তাবাদের নয়া নায়ক হিসাবে শর্মাকে তুলে ধরেছে বিজেপি ও স্থানীয় মিডিয়া। সমস্ত মুখোশ, ভান, ভণিতার মোড়ক খুলে দিয়ে তারা অসমিয়া জাতীয়তাবাদকে ব্যাখ্যা করছে হিন্দু বয়ানে।

মুসলিমদের ব্যঙ্গ করতে বা তাদের অপরাধী সাব্যস্ত করতে কোনও সুযোগ হাতছাড়া করেন না শর্মা। যেমন, যদি কোনও অপরাধীকে পুলিশ আটক করে এবং সেই অপরাধী ঘটনাচক্রে মুসলিম হয় তাহলে শর্মা তৎক্ষণাৎ এই ঘটনায় জোর দিয়ে ট্যুইট করেন। ২০২০ সালে কোভিড-১৯-এর প্রাদুর্ভাবের সময়ও তিনি এমনটা করেছিলেন। অসম থেকে যাঁরা দিল্লিতে তাবলিগি জামাতের সমাবেশে গিয়েছিলেন তাঁদের চিহ্নিত করেন। শর্মার হয়ে তাঁর সমর্থকরা দাবি করে যে, তিনি শুধু অপরাধীদের নাম বলেছেন, মুসলিমদের ব্যাপারে কথা বলেননি। কিন্তু শর্মার বিবৃতি বা ট্যুইটে হিন্দু অপরাধীদের নাম উল্লেখ করা হয় না।

যাইহোক, শর্মার যে বক্তব্যের বিরুদ্ধে খালেক হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন তা মানের দিক থেকেও কুরুচিকর। ১০ ডিসেম্বর এক ভাষণে শর্মা বলেন, নেলিতে ১৯৮৩ সালের ম্যাসাকারের প্রতিশোধ ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে নিয়েছে অসমিয়া যুবক। ‘অবৈধ দখলকারী’ তকমা দিয়ে উচ্ছেদ অভিযান চালানোর সময় পুলিশ গুলি করে দুই মুসলিমকে হত্যা করে। সেটাই তাঁর কাছে প্রতিশোধ। শর্মা বলেন,”গরুখুটি একসময় অসমিয়াদের ছিল। কারণ এই জায়গায় ৪ হাজার বছরের পুরনো শিব মন্দির ছিল। সেই মন্দিরের পুরোহিতকে ছুরি দিয়ে আঘাত করে হত্যা করা হয় এবং তাঁর স্ত্রীকে জোর করে ধর্মান্তরিত করানো হয়। যাদের বিরুদ্ধে আমাদের আন্দোলন তারা খিলোঞ্জিয়া মহিলাদের ধর্ষণ করেছিল।” ১৯৮০ সালের অসমিয়া আন্দোলনের প্রসঙ্গ টেনে আনেন তিনি। শর্মা আরও বলেন,”১৯৮৩ সালে গরুখুটির অসমিয়া যুবকদের নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। আজ আমি গর্ব বোধ করি যে, ২০২১ সালে অসমিয়ারা সেই নৃশংস হত্যার প্রতিশোধ নিতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু এটাই যথেষ্ট নয়।” শর্মা কী বলতে চাইছেন তা বুঝতে অসমিয়াদের বেশি কাঠখড় পোড়াতে হয় না।

২৩ সেপ্টেম্বর পুলিশের গুলিতে নিহত মইনুল হকের বুকের উপর ফটোগ্রাফারের নাচ এখনও আমাদের স্মৃতিতে জীবন্ত। মুখ্যমন্ত্রী শর্মা এই হত্যার মধ্যে ভুল কিছু দেখেননি। তাঁকে এই বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে রোষের সঙ্গে জানতে চান, ‘অবৈধ বাসিন্দা’দের উচ্ছেদ অভিযানে নিরাপত্তা বাহিনীদের বাধা দেওয়ার সাহস কীভাবে হয় কারও? গরুখুটিতে যা হয়েছে তার পথ প্রশস্ত করে দিয়েছে বাসিন্দারাই। এমনটাই জানান শর্মা। এই ঘটনার কয়েক সপ্তাহ পর অসমের বাইরে থেকে যাওয়া সত্যানুসন্ধানী দল ও সাংবাদিকরা জানতে পারেন যে, গরুখুটিতে শুধুমাত্র মুসলিমদের উৎখাত করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, এই প্রক্রিয়া চলছে গোটা রাজ্যজুড়েই। প্রাক্তন সিনিয়র পুলিশ আধিকারিক বলেন যে, বিক্ষোভকারীদের উপর গুলি ছোঁড়া গ্রহণযোগ্য নয়। এদিকে, শর্মা জানান যে, এই বর্বরোচিত কাজ অবশ্যই গ্রহণযোগ্য। মুসলিমবিরোধী অপপ্রচারকে অন্য স্তরে নিয়ে গিয়েছেন শর্মা। তিনি লাগাতার হিন্দু বয়ানে অসমিয়া জাতীয়তাবাদের কথা বলেন এবং এটা স্পষ্ট করে দেন যে, এই জাতীয়তাবাদ সম্পূর্ণত মুসলিম-বিরোধী। আর অসমের মিডিয়া সানন্দে তাঁর ঘৃণা-ক্যাম্পেনকে রং চড়িয়ে বড় করে প্রচার করে।

শর্মাকে বিচারের আওতায় আনতে আব্দুল খালেক উদ্যোগ নিয়েছেন। এই প্রথম শর্মার মিথ্যার প্রাসাদে কেউ ধাক্কা মারলেন। একজন মুসলিম সাংসদকে এই দায়িত্ব নিতে হল আর এ থেকে আমাদের সমাজের অবস্থা ও গতি-প্রকৃতি স্পষ্টতর হল। আগ্রাসী অসমিয়া জাতীয়তাবাদ সমস্ত রাজনৈতিক দলকে রক্ষণশীলতার দিকে ঠেলে দিয়েছে। এমনকি এথনিক অধিকার ও নিরাপত্তাহীনতা নিয়ে যারা লড়াই করে তাদের পক্ষেও এই সাম্প্রদায়িক ও মুসলিমবিরোধী প্রোপাগান্ডার সমালোচনা করা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ এগুলি অসমিয়া জাতীয়তাবাদের নামে করা হয়ে থাকে। মুসলিম সম্পর্কিত যে-কোনও বিষয়কেই অসমিয়া আত্মপরিচয়ের জন্য বেখাপ্পা ও বেমানান হিসাবে তুলে ধরা হয়। তা সে মিয়া কবিতা হোক বা মিয়া মিউজিয়াম। শর্মার নেতৃত্বাধীন বিজেপি ও তাঁর পেটোয়া মিডিয়া এগুলিকে ষড়যন্ত্র ও আক্রমণ হিসাবে প্রচার করে। অসমিয়া আইডেন্টেটিকে পর্যুদস্ত করতে নাকি এগুলি করা হচ্ছে। অসমিয়া জাতীয়তাবাদীদের চোখে বাংলাদেশী বংশোদ্ভূতদের শিকড় ও আনুগত্য জড়িয়ে রয়েছে অন্য দেশের সঙ্গে, অন্য সংস্কৃতি ও ধর্মের সঙ্গে। এই ঘৃণা আগেও ছিল, কিন্তু বিজেপি পুনরায় ক্ষমতায় আসার পর এবং মুখ্যমন্ত্রী লাগাতার লাগামছাড়া কুমন্ত্রণা দেওয়ার ফলে মুসলিমদের প্রতি এই ঘৃণা এখন আরও খোলামেলা, আরও অহরহ হয়ে গিয়েছে। অসমে কোনও মুসলিম কিছু করলে তা অনুবীক্ষণ যন্ত্রের তলায় ফেলে পরীক্ষা করা হয়। অসম বা অসমিয়াদের কোনও ক্ষতি করবে না তো তারা? এই থাকে উদ্বেগ। ধর্মনিরপেক্ষতা ও গণ পরিসরে সহিষ্ণুতার এই সংকীর্ণ জায়গায় খালেকের এই সাহস এক বিরল দৃষ্টান্ত।

২০২০ সালের অক্টোবর মাসে অসমের বাঘবর কেন্দ্রের এমএলএ শেরমান আলি মিয়া সম্প্রদায়ের জন্য একটি মিয়া মিউজিয়াম প্রস্তাব দিয়েছিলেন। এরপর তাঁকে নিয়ে শুরু হয় ট্রোল। গণ-হেনস্থার শিকার হন তিনি। এমনকি তাঁর নিজের দল কংগ্রেস তাঁকে বরখাস্ত করে। অসম প্রদেশ কংগ্রেস কমিটির সভাপতি ঋপুন বোরা আলিকে এই ধরনের মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকতে বলেন এবং সতর্ক করে দেন যে, বিজেপি এগুলির সুযোগ নেবে। প্রসঙ্গত, মিয়াদের সম্পর্কে সোশ্যাল মিডিয়াতে যে ধরনের বক্তব্য ও মানসিকতা দেখা যায় তা ভীষণ ব্যঙ্গাত্মক ও নেতিবাচক। তাদের বলা হয়–ছেঁড়া লুঙ্গি, জটপাকানো তার, মুড়ি, ইতর ইত্যাদি। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী সর্বানন্দ সোনোয়াল ২০২০ সালের অক্টোবরে বড়োল্যান্ডের এক সভায় দাবি করেছিলেন, ‘মুঘল’ হামলা এখনও চলছে অসমে এবং খুব তাড়াতাড়ি অসমের মাতৃভাষা হয়ে যাবে আরবি। এই মন্তব্য কখন করা হয়েছিল? মাদ্রাসায় সরকারি অর্থ দেওয়া বন্ধ করার প্রেক্ষিতে। বিজেপির হাত ধরে মুসলিমদের প্রতি ঘৃণা ও তাদের অনুভূতিতে আঘাত দেওয়ার ঘটনা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু এটা ভুলে গেলে চলবে না, সংখ্যালঘুদের প্রতি ঘৃণা ও অসহিষ্ণুতা দীর্ঘদিন ধরে অসমের সংস্কৃতির একটা অংশ। অসমিয়া জাতীয়তাবাদের অন্তঃস্থল থেকে উৎসারিত হয়েছে এই ঘৃণা ও বিদ্বেষ। এটা বর্তমানে আরও ভয়াবহ দিকে মোড় নিয়েছে এবং এর জন্য কংগ্রেস ও বিজেপি উভয়ই দায়ী, অপরাধী। গরুখুটি যদি অসমিয়া সমাজের ত্রাতা হয় তাহলে এর সারা শরীরে মুদ্রিত রয়েছে ধ্বংস, হিংসা ও ঘৃণা।

তরজমা : জিয়াউল হক