০৭ মার্চ ২০২৬, শনিবার, ২২ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

আল আকসা দখল ও দুই রাষ্ট্র  সমাধানে ইতি টানাই লক্ষ্য

আহমদ হাসান ইমরান: গাজাকে নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইলের নীল নকশার মূল কথা হচ্ছে, প্রথমে গাজার অধিবাসী ২৩ লক্ষ শরণার্থীকে পুনরায় উদ্বাস্তু করে (যে কাজ তারা ইতিমধ্যে ধ্বংসযজ্ঞের মাধ্যমে অনেকটাই করে ফেলেছে) মিশরের সিনাই বা অন্য আরব দেশের মরুভূমিতে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। আর তারপরে ওয়েস্ট ব্যাঙ্কে বসবাসরত ২৭ লক্ষ ফিলিস্তিনি শরণার্থীর ভাগ্যেও আসবে একই পরিনাম। তাদেরও ঠিকানা হবে মরুভূমিতে। ইসরাইলের বাঘা বাঘা নেতা-মন্ত্রীরা বলছেন, ফিলিস্তিনিদের জন্য হোক না একটা বা দু’টো তাঁবু শহর।

আগেই বলা হয়েছে, ইসরাইল সরকার এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে একটি ‘যুদ্ধকালীন প্রস্তাব’ তৈরি করেছে। ফিলিস্তিনরা বলছেন, এই প্রস্তাব ‘যুদ্ধকালীন নয়’, বহু বছর আগেই তৈরি করে রাখা হয়েছে ‘গ্রেটার ইসরাইল’ বা ‘ইরেজ ইসরাইল’-এর নীল নকশা। আর বর্তমান গাজার যুদ্ধে তাকেই রূপায়ণ করার জন্য ইসরাইল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পরিকল্পনা করেছে। আর গাজা যুদ্ধের বিভিন্ন ঘটনাবলী তারই সাক্ষ্য দিচ্ছে। এখন যদি এই ৫০-৫৫ লক্ষ মানুষকে মিশরে ঠেলে দেওয়া হয়, তাহলে তা এল সিসি সরকারের জন্য বড় সমস্যা তৈরি করবে। সে জন্য মিশর এই পরিকল্পনা বিরুদ্ধে রয়েছে। কিন্তু ইসরাইল ও মার্কিন যুদ্ধবাজরা মনে করছেন, এটা বিশ্বের বর্তমান আবহে খুবই সম্ভব। তাদের বক্তব্য, এই কাজ তো আমরা একবার আরও ভালোভাবে করেছি। আর তা খুব বেশিদিনের কথা নয়। ১৯৪৮ সালের আগে ১০-১৫ বছর ধরে আমরা ফিলিস্তিনের পবিত্র ভূমিতে বিশ্বের বিভিন্ন জায়গা থেকে এনে ইহুদিদের বসিয়েছি। আর ১৯৪৮ সালে ১২-১৩ লক্ষ ভূমিপুত্র আরবকে ফিলিস্তিন থেকে বিতাড়িত করে ইসরাইল রাষ্ট্র সৃষ্টি করেছি। তাহলে এখন কেন সেই তুলনায় অনেক ক্ষুদ্র পর্যায়ে  ফিলিস্তিনিদের গাজা ও পশ্চিম তীর থেকে বিতাড়িত করা যাবে না? আর আরব দেশগুলির শাসকরা তো এখন বেশির ভাগই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের চাপে ‘বন্ধুরাষ্ট্রে’ পরিণত হয়েছে। প্রথমে একটু গাঁইগুঁই করলেও শেষ পর্যন্ত আরব রাজা-বাদশাহরা, সামরিক একনায়করা এটা মেনে নেবেন। ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীরের প্রেসিডেন্ট মাহামুদ আব্বাসের মুখপাত্র বলেছেন, যা ১৯৪৮ সালে হয়েছিল আমরা এবারও তার পুনরাবৃত্তি হতে দেব না।

ইসরাইলি সরকারের নতুন ফিলিস্তিনি বিতাড়নের এই দলিলটি তেলআবিবের (SICHA MEKOMIT)-এ প্রথম প্রকাশিত হয়। ইসরাইলের গোয়েন্দা মন্ত্রক এই পরিকল্পনার সঙ্গে রয়েছে।

তারা বলছেন, ইসরাইলের নিরাপত্তার জন্য এটা করতেই হবে। নীল নকশার ওই দলিলে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, প্রথমে গাজার বেসামরিক নারী-পুরুষদের উত্তর সিনাইয়ের কিছু তাঁবু শহরে পাঠানো হবে। পরবর্তীতে সেখানে স্থায়ী শহর তৈরি করা সম্ভব। সেখানে থাকবে একটি মানবিক করিডর। আর ইসরাইলের ভিতর একটি সিকিউরিটি জোন তৈরি করা হবে যাতে এই ঘর থেকে উচ্ছেদ হওয়া ফিলিস্তিনিরা আর কোনও মতেই ইসরাইলে প্রবেশ করতে না পারে। এই রিপোর্টে অবশ্য বলা হয়নি, দখল করার পর মনুষ্যশূন্য গাজায় তারা কি করবে।

নেতানিয়াহু সরকার এই নীল নকশার অস্তিত্ব অস্বীকার করছেন না। তারা বলছেন, এটা একটা ‘কনসেপ্ট পেপার’। অর্থাৎ এখানে একটি ধারণা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এই পরিকল্পনা পিছনে যে ইসরাইল সরকারের প্রতিরক্ষা, গোয়েন্দা, পররাষ্ট্র বিভাগ বা বিদেশ বিভাগ সবাই কাজ করেছে, তাতে সন্দেহ নেই।

আর বর্তমানে দেখা যাচ্ছে ইসরাইল সেইভাবে গাজার বেসামরিক বাসিন্দাদের গরুর পালের মতো  খেদিয়ে নিয়ে যাচ্ছে রাফাহ সীমান্তে। বরং বলা যায়, তাদের সেখানে উপস্থিত হতে বাধ্য করা হচ্ছে। শেষ পর্যন্ত ইসরাইল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নীল নকশা কতটা বাস্তবায়িত হবে তার দিকে আন্তর্জাতিক মহল নজর রাখছে। আর দ্বিতীয় কোনও বিকল্পও কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরাইল বিশ্বের কাছে পেশ করছে না। ১৯৪৮ সালের মতোই কি ফিলিস্তিনিদের জানমাল ও স্বাভাবিক জীবনের বিরাট বিপর্যয়ের মাধ্যমে বাস্তুচ্যুত করে মসজিদুল আকসা থেকে মুসলিমদের বহু দূরে  সরিয়ে দিয়ে সেখানে নিজেদের টেম্পল তৈরির করার লক্ষ্যকে পূরণ করবে? আর তা করা গেলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চুক্তিতে ও রাষ্ট্রসংঘের প্রস্তাবে যে টু নেশন সলিউশন বা দুই রাষ্ট্রের সমাধানের কথা বলা হয়েছে, তার ইতি ঘটবে। যায়নবাদী, ইহুদি ও পশ্চিমা খ্রিস্টানদের আর কি চাই!

ট্যাগ :
প্রতিবেদক

ইমামা খাতুন

২০২২ সাল থেকে সংবাদ জগতের সঙ্গে যুক্ত। আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাংবাদিকতাতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছে। ডিজিটাল প্লাটফর্মে রিপোর্টার হিসেবে হাতেখড়ি। ২০২২ সালের শেষান্তে পুবের কলম-এর সঙ্গে যুক্ত হয়। ইমামার ভাষ্যে, The First Law of Journalism: to confirm existing prejudice, rather than contradict it.
সর্বধিক পাঠিত

ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আতঙ্কে আশ্রয়কেন্দ্রে লাখ লাখ ইসরায়েলি

Copyright © Puber Kalom All rights reserved.| Developed by eTech Builder

আল আকসা দখল ও দুই রাষ্ট্র  সমাধানে ইতি টানাই লক্ষ্য

আপডেট : ৪ নভেম্বর ২০২৩, শনিবার

আহমদ হাসান ইমরান: গাজাকে নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইলের নীল নকশার মূল কথা হচ্ছে, প্রথমে গাজার অধিবাসী ২৩ লক্ষ শরণার্থীকে পুনরায় উদ্বাস্তু করে (যে কাজ তারা ইতিমধ্যে ধ্বংসযজ্ঞের মাধ্যমে অনেকটাই করে ফেলেছে) মিশরের সিনাই বা অন্য আরব দেশের মরুভূমিতে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। আর তারপরে ওয়েস্ট ব্যাঙ্কে বসবাসরত ২৭ লক্ষ ফিলিস্তিনি শরণার্থীর ভাগ্যেও আসবে একই পরিনাম। তাদেরও ঠিকানা হবে মরুভূমিতে। ইসরাইলের বাঘা বাঘা নেতা-মন্ত্রীরা বলছেন, ফিলিস্তিনিদের জন্য হোক না একটা বা দু’টো তাঁবু শহর।

আগেই বলা হয়েছে, ইসরাইল সরকার এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে একটি ‘যুদ্ধকালীন প্রস্তাব’ তৈরি করেছে। ফিলিস্তিনরা বলছেন, এই প্রস্তাব ‘যুদ্ধকালীন নয়’, বহু বছর আগেই তৈরি করে রাখা হয়েছে ‘গ্রেটার ইসরাইল’ বা ‘ইরেজ ইসরাইল’-এর নীল নকশা। আর বর্তমান গাজার যুদ্ধে তাকেই রূপায়ণ করার জন্য ইসরাইল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পরিকল্পনা করেছে। আর গাজা যুদ্ধের বিভিন্ন ঘটনাবলী তারই সাক্ষ্য দিচ্ছে। এখন যদি এই ৫০-৫৫ লক্ষ মানুষকে মিশরে ঠেলে দেওয়া হয়, তাহলে তা এল সিসি সরকারের জন্য বড় সমস্যা তৈরি করবে। সে জন্য মিশর এই পরিকল্পনা বিরুদ্ধে রয়েছে। কিন্তু ইসরাইল ও মার্কিন যুদ্ধবাজরা মনে করছেন, এটা বিশ্বের বর্তমান আবহে খুবই সম্ভব। তাদের বক্তব্য, এই কাজ তো আমরা একবার আরও ভালোভাবে করেছি। আর তা খুব বেশিদিনের কথা নয়। ১৯৪৮ সালের আগে ১০-১৫ বছর ধরে আমরা ফিলিস্তিনের পবিত্র ভূমিতে বিশ্বের বিভিন্ন জায়গা থেকে এনে ইহুদিদের বসিয়েছি। আর ১৯৪৮ সালে ১২-১৩ লক্ষ ভূমিপুত্র আরবকে ফিলিস্তিন থেকে বিতাড়িত করে ইসরাইল রাষ্ট্র সৃষ্টি করেছি। তাহলে এখন কেন সেই তুলনায় অনেক ক্ষুদ্র পর্যায়ে  ফিলিস্তিনিদের গাজা ও পশ্চিম তীর থেকে বিতাড়িত করা যাবে না? আর আরব দেশগুলির শাসকরা তো এখন বেশির ভাগই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের চাপে ‘বন্ধুরাষ্ট্রে’ পরিণত হয়েছে। প্রথমে একটু গাঁইগুঁই করলেও শেষ পর্যন্ত আরব রাজা-বাদশাহরা, সামরিক একনায়করা এটা মেনে নেবেন। ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীরের প্রেসিডেন্ট মাহামুদ আব্বাসের মুখপাত্র বলেছেন, যা ১৯৪৮ সালে হয়েছিল আমরা এবারও তার পুনরাবৃত্তি হতে দেব না।

ইসরাইলি সরকারের নতুন ফিলিস্তিনি বিতাড়নের এই দলিলটি তেলআবিবের (SICHA MEKOMIT)-এ প্রথম প্রকাশিত হয়। ইসরাইলের গোয়েন্দা মন্ত্রক এই পরিকল্পনার সঙ্গে রয়েছে।

তারা বলছেন, ইসরাইলের নিরাপত্তার জন্য এটা করতেই হবে। নীল নকশার ওই দলিলে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, প্রথমে গাজার বেসামরিক নারী-পুরুষদের উত্তর সিনাইয়ের কিছু তাঁবু শহরে পাঠানো হবে। পরবর্তীতে সেখানে স্থায়ী শহর তৈরি করা সম্ভব। সেখানে থাকবে একটি মানবিক করিডর। আর ইসরাইলের ভিতর একটি সিকিউরিটি জোন তৈরি করা হবে যাতে এই ঘর থেকে উচ্ছেদ হওয়া ফিলিস্তিনিরা আর কোনও মতেই ইসরাইলে প্রবেশ করতে না পারে। এই রিপোর্টে অবশ্য বলা হয়নি, দখল করার পর মনুষ্যশূন্য গাজায় তারা কি করবে।

নেতানিয়াহু সরকার এই নীল নকশার অস্তিত্ব অস্বীকার করছেন না। তারা বলছেন, এটা একটা ‘কনসেপ্ট পেপার’। অর্থাৎ এখানে একটি ধারণা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এই পরিকল্পনা পিছনে যে ইসরাইল সরকারের প্রতিরক্ষা, গোয়েন্দা, পররাষ্ট্র বিভাগ বা বিদেশ বিভাগ সবাই কাজ করেছে, তাতে সন্দেহ নেই।

আর বর্তমানে দেখা যাচ্ছে ইসরাইল সেইভাবে গাজার বেসামরিক বাসিন্দাদের গরুর পালের মতো  খেদিয়ে নিয়ে যাচ্ছে রাফাহ সীমান্তে। বরং বলা যায়, তাদের সেখানে উপস্থিত হতে বাধ্য করা হচ্ছে। শেষ পর্যন্ত ইসরাইল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নীল নকশা কতটা বাস্তবায়িত হবে তার দিকে আন্তর্জাতিক মহল নজর রাখছে। আর দ্বিতীয় কোনও বিকল্পও কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরাইল বিশ্বের কাছে পেশ করছে না। ১৯৪৮ সালের মতোই কি ফিলিস্তিনিদের জানমাল ও স্বাভাবিক জীবনের বিরাট বিপর্যয়ের মাধ্যমে বাস্তুচ্যুত করে মসজিদুল আকসা থেকে মুসলিমদের বহু দূরে  সরিয়ে দিয়ে সেখানে নিজেদের টেম্পল তৈরির করার লক্ষ্যকে পূরণ করবে? আর তা করা গেলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চুক্তিতে ও রাষ্ট্রসংঘের প্রস্তাবে যে টু নেশন সলিউশন বা দুই রাষ্ট্রের সমাধানের কথা বলা হয়েছে, তার ইতি ঘটবে। যায়নবাদী, ইহুদি ও পশ্চিমা খ্রিস্টানদের আর কি চাই!