বিরোধীদের কণ্ঠরোধে কেন্দ্রীয় এজেন্সিগুলিকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে—এই অভিযোগে আগেও একাধিকবার মোদি সরকারের বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। শনিবার সেই অভিযোগ আরও তীব্র ভাষায় সামনে আনলেন তিনি, তাও আবার দেশের প্রধান বিচারপতির উপস্থিতিতে।
কলকাতা হাইকোর্টের নবনির্মিত উত্তরবঙ্গ সার্কিট বেঞ্চের স্থায়ী ভবনের উদ্বোধন উপলক্ষে জলপাইগুড়িতে আয়োজিত অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী অভিযোগ করেন, ‘ইচ্ছাকৃতভাবে এজেন্সি দিয়ে বদনাম করানো হচ্ছে। সম্মানহানি করা হচ্ছে। এজেন্সির মাধ্যমে অপমান করাটা এখন ট্রেন্ড হয়ে দাঁড়িয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, রাজ্যের কোনও ঘটনা ঘটলেই যেভাবে মিডিয়া ট্রায়াল শুরু হয়, তা অবিলম্বে বন্ধ হওয়া উচিত।
মমতার স্পষ্ট বক্তব্য, উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তদন্তকারী সংস্থাগুলিকে কাজে লাগিয়ে ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে হেনস্থা করা গণতন্ত্রের পক্ষে মারাত্মক বিপজ্জনক। এই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘দেশের গণতন্ত্র ও সংবিধান আজ বিপন্ন। সাধারণ মানুষ বিচারব্যবস্থার উপর ভরসা রাখে। বিচারব্যবস্থাই আমাদের সংবিধানের রক্ষাকর্তা, দেশের মানুষকে রক্ষা করাও তাদের দায়িত্ব।’
রাজনৈতিক মহলের মতে, গত ৮ জানুয়ারি তৃণমূলের নীতি নির্ধারক পরামর্শদাতা সংস্থা আইপ্যাকের কর্তা প্রতীক জৈনের বাড়ি ও দপ্তরে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেটের (ইডি) তল্লাশি অভিযান নিয়েই কার্যত প্রধান বিচারপতির কাছে নালিশ জানালেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি আগেই অভিযোগ করেছিলেন, তল্লাশির নামে দলের সম্ভাব্য প্রার্থী তালিকা ও নির্বাচনী রণকৌশল-সহ একাধিক গোপন তথ্য হাতানোর চেষ্টা করা হয়েছে।
তবে মমতা স্পষ্ট করে দেন, এই অভিযোগ কেবল তাঁর বা তাঁর দলের জন্য নয়। তিনি বলেন, ‘আমি নিজের জন্য বলছি না। দেশের মানুষের হয়ে বলছি—সংবিধান বাঁচান, গণতন্ত্র রক্ষা করুন, জনগণকে রক্ষা করুন। দেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে বিপর্যয়ের হাত থেকে বাঁচান।’
মঞ্চে উপস্থিত দেশের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত-সহ বিচারপতিদের উদ্দেশে মুখ্যমন্ত্রীর বার্তা ছিল স্পষ্ট—সংবিধান ও গণতন্ত্র রক্ষার ক্ষেত্রে বিচারব্যবস্থার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে নিশানা করে এজেন্সির অপব্যবহার যে গণতন্ত্রের ভিত দুর্বল করে, সেটাই ছিল তাঁর বক্তব্যের মূল সুর। একই সঙ্গে তিনি সকলকে ঐক্যের পক্ষে থাকার এবং ধর্ম বা জাতপাতের ভিত্তিতে বিভাজন না করার আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানের মঞ্চে উপস্থিত কেন্দ্রীয় আইনমন্ত্রী অর্জুন রাম মেঘওয়ালকেও অস্বস্তিতে ফেলেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘কেন্দ্র বরাদ্দ বন্ধ করে দিলেও আমরা থেমে যাইনি। কাজ চালিয়ে যাচ্ছি।’ বিচারব্যবস্থার পরিকাঠামো নির্মাণে রাজ্য সরকারের ভূমিকার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
মমতার দাবি, ৪০ একর জমির উপর জলপাইগুড়িতে কলকাতা হাইকোর্টের সার্কিট বেঞ্চের স্থায়ী ভবন নির্মাণে রাজ্য সরকার ৫০০ কোটিরও বেশি টাকা ব্যয় করেছে। এছাড়া রাজ্যজুড়ে বিচারব্যবস্থার পরিকাঠামো গড়তে ইতিমধ্যেই ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা খরচ করা হয়েছে। তাঁর কথায়, ‘এই উদ্বোধন জলপাইগুড়ি ও উত্তরবঙ্গবাসীর কাছে এক ঐতিহাসিক দিন।’
অনুষ্ঠান শেষে এক প্রশ্নের উত্তরে কেন্দ্রীয় আইনমন্ত্রী জানান, জলপাইগুড়ির স্থায়ী সার্কিট বেঞ্চে উত্তরবঙ্গের সব জেলার মামলার শুনানি নিশ্চিত করার আবেদন এসেছে এবং বিষয়টি বিবেচনাধীন রয়েছে।






























