পুবের কলম ওয়েবডেস্কঃ ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং রাষ্ট্র গঠনে শিখ সম্প্রদায়ের অবদান স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি শনিবার মন্তব্য করেছেন– আওরঙ্গজেবের বিরুদ্ধে গুরু তেগ বাহাদুরের সাহসিকতা ও বলিদান দেশকে সন্ত্রাস ও ধর্মীয় উগ্রবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করার প্রেরণা জোগাবে। গুজরাতের কচ্ছ জেলায় গুরপূরব অনুষ্ঠানে এ দিন ভার্চুয়াল বক্তব্য রাখেন প্রধানমন্ত্রী।
আরও পড়ুন:
এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল কচ্ছ জেলার লাখপত সাহিব গুরুদ্বারে। মোদি এ দিন বলেন– আমাদের গুরুদের অবদান শুধু আধ্যাত্মিকতায় সীমাবদ্ধ নয়। শিখ গুরুদের আত্মত্যাগ আমাদের ধর্মীয় বিশ্বাস এবং দেশের অখণ্ডতাকে সুরক্ষিত করেছে। গুরুনানকজি এবং আমাদের অন্যান্য শিখগুরু ভারতের আত্মচেতনাকে এবং তারা ভারতকে সুরক্ষিত রাখার পথকে মজবুত করেছিলেন। যার ফলে ভারত আজ নিরাপদ।
মোদি বলেন– দশম গুরু গুরু গোবিন্দ সিং সাহিবও আত্মবলিদানের আদর্শের প্রতীক। ভারত তাঁকে ‘হিন্দ কি চাদর’ আখ্যায় ভূষিত করেছে। এটাই প্রমাণ করে শিখ ঐহিত্যের প্রতি প্রত্যেক ভারতীয় কতটা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। প্রধানমন্ত্রী বলেন– তাঁর সাম্প্রতিক আমেরিকা সফরে গিয়ে তিনি সেখান থেকে ১৫০টি ঐতিহাসিক বস্তু ভারতে নিয়ে এসেছেন। তাদের মধ্যে ছিল একটি ‘পেশকব্জা’ (ছোট তলোয়ার)।
তাতে ফারসি ভাষায় খোদাই করা ছিল ‘গুরু হরগোবিন্দ জি।’আরও পড়ুন:
মোদি বলেন– সম্প্রতি আফগানিস্তান থেকে গুরুগ্রন্থ সাহিবের একটি কপি ভারতে নিয়ে এসেছি। গুরু নানকের বাণী বিশ্বের সমস্ত মানুষের কাছে এক নতুন শক্তি বহন করে আনে। করতারপুর সাহিব করিডর আমাদের শাসনকালেই সম্পূর্ণ হয়েছে। গুজরাতে খালসাপন্থ প্রতিষ্ঠিত করতে চতুর্থ শিখগুরু ভাই মোখম সিংজির অবদান কেউ ভুলতে পারবে না।
আরও পড়ুন:
কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী– কচ্ছ থেকে কোহিমা গোটা ভারতবর্ষ আজ স্বপ্ন দেখছে ‘এক ভারত– শ্রেষ্ঠ ভারত’ গড়ার। আজকে দেশের নীতি হল– প্রত্যেক গরিবকে পরিষেবা দেওয়ার এবং প্রত্যেক বঞ্চিতকে তার অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া। ২৫ ডিসেম্বর প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারী বাজপেয়ীর জন্মদিন। তাঁকে স্মরণ করে মোদি বলেন– গুজরাতের উন্নয়নের পিছনে অটলজির অবদান অনস্বীকার্য। প্রত্যেক বছর ১৩ থেকে ২৫ ডিসেম্বর গুজরাতের শিখ সংগত লাখপত সাহিবের গুরুদ্বারে গুরুনানক দেবজির গুরপূরব অনুষ্ঠান সাড়ম্বরে পালিত হয়। এই উপলক্ষে দিল্লি থেকে ভার্চুয়াল মোডে এ দিন নিজের বক্তব্য রাখেন প্রধানমন্ত্রী মোদি।
আরও পড়ুন:
পুবের কলম-এর অভিমত
আরও পড়ুন:
ইদানীং মোদি সুযোগ পেলেই সম্রাট আওরঙ্গজেবের নাম উচ্চারণ করছেন।
২৫ ডিসেম্বরও গুজরাতের লাখপত সাহিব শিখ গুরদোয়ারায় ভার্চুয়ালি বক্তব্য রাখতে গিয়ে আওরঙ্গজেবকে তিনি টেনে এনেছেন এবং বলেছেন– আওরঙ্গজেব ছিলেন আতঙ্কবাদ ও ধর্মীয় চরমপন্থার প্রতীক। অবশ্য আওরঙ্গজেব গুরু তেগ বাহাদুরকে হত্যা করেছিলেন এ কথা ঠিক। তেমননি আওরঙ্গজেব শাসক হিসেবে মুসলিম সুফি সারমাদ কাসানিকেও হত্যা করেছিলেন। কিন্তু বাদশাহ আওরঙ্গজেবের এই কাজের মধ্যে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ কতটা ছিল– তা নিয়ে অবশ্যই প্রশ্ন উঠতে পারে। তবে এ বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই– গুরু তেগ বাহাদুর নিজের বিশ্বাস ও নীতিমালায় অবিচল ছিলেন। নতিস্বীকার করেননি।আরও পড়ুন:
কিন্তু মোদিজির বক্তব্যে ইঙ্গিত পাওয়া যায়– তিনি আওরঙ্গজেবের নামে শিখদের মধ্যে মুসলিম বিদ্বেষ চাগিয়ে তোলার চেষ্টা করেছেন। তাই আধুনিক টার্মে তিনি ‘সন্ত্রাস’ ও ‘ধর্মীয় চরমপন্থা’র কথা বলেছেন। সেইসময় রাজায় রাজায় যুদ্ধ হলেও আওরঙ্গজেব-সহ কোনও মুঘল শাসকই কিন্তু জেনোসাইড বা গণহত্যা করেননি বা তাঁদের আমলে সাধারণ মানুষের উপর গণহত্যা হয়নি।
আরও পড়ুন:
তবে হ্যাঁ– ভারতে শিখ গণহত্যা হয়েছে। ১৯৮৪ সালে ইন্দিরা গান্ধির হত্যার পর দিল্লি ও ভারতের বিভিন্ন স্থানে শিখদের উপর গণহত্যা সংঘটিত হয়। নির্ভরযোগ্য সূত্র বলছে– শুধু দিল্লিতেই ৩০০০ শিখকে হত্যা করা হয়।
আর ভারতের বিভিন্ন শহরে ৮০০০-১৭০০০ শিখ হত্যাযজ্ঞের সম্মুখীন হন। শিখদের বিরুদ্ধে এই জেনোসাইড বা গণহত্যা যারা করেছিল– তারা কিন্তু মুসলিম ছিল না। তবে এই গণহত্যা শিখদের মনে স্থায়ী ক্ষত রেখে গেছে। কাজেই ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে অতীতকে দেখতে গেলে একপেশে ও পূর্ব নির্ধারিত মনোভাব নিয়ে বিচার করা ঠিক নয়। গুজরাতেও গণহত্যা হয়েছে। শেষ জেনোসাইড হয়েছে এই সেদিন মাত্র। ২০০২ সালে। মোদিজি তখন গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী।আরও পড়ুন:
তবে আমরা মোদিজির একটি বক্তব্যের সঙ্গে একমত। ভারতীয় উপমহাদেশে শিখদের আধ্যাত্মিক এবং ঐতিহাসিক অবদান অনবদ্য ও নজিরবিহীন। গুরুনানকজি-সহ সব শিখ গুরুর অবদান আমাদের উপমহাদেশ এবং সারাবিশ্বকে সমৃদ্ধ করেছে। কাজেই তাঁদের ব্যবহার করে সাম্প্রদায়িকতা প্রচার সঠিক পথ নয়। তবে হ্যাঁ– ভোট ঘনিয়ে আসলে ছোট-বড়-বিশাল অনেক রাজনীতিবিদই সাম্প্রদায়িকতা প্রচারে নানা কূটকৌশলকে হাতিয়ার করেন। আর এটা নতুন নয়।
আরও পড়ুন: