আহমদ হাসান ইমরানঃ খড়গপুর আইআইটি-র ছাত্র ফায়জান আহমেদ-এর নৃশংস ও মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের কথা এখন মিডিয়ার কল্যাণে অনেকেই জানে। এই হত্যাকাণ্ড চাপা দেওয়ার জন্য পুলিশ এবং আইআইটি কর্তৃপক্ষ যে চক্রান্ত তৈরি করেছিল, তা হয়তো সফল হত, যদি না কলকাতা হাইকোর্টের মাননীয় বিচারপতিরা পুলিশের রিপোর্ট এবং আইআইটি কর্তৃপক্ষের বক্তব্যে অসংগতি ধরে না ফেলতেন।
পুত্রহারা ফায়জানের মা রেহানা আহমেদ ‘পুবের কলম’ প্রতিবেদককে বলেন, হাইকোর্টের আইনজীবী রণজিৎ চ্যাটার্জি, অনিরুদ্ধবাবু এবং নীলাদ্রী শেখর ঘোষ যদি এগিয়ে না আসতেন, তা হলে হয়তো তাঁদের মৃত পুত্রের জন্য ইনসাফ পাওয়ার সম্ভাবনা শেষ হয়ে যেত। কারণ, ফায়জানের মৃত্যুর কেসটিকে সেভাবেই সাজানো হয়েছিল।
ফায়জানের বাড়ি উজনী অসমের তিনসুকিয়াতে। বড় আশা নিয়ে মেধাবী ছাত্র ফায়জান বাংলার খড়গপুরে অবস্থিত আইআইটি-তে ভর্তি হয়েছিল। খড়গপুরেও সে এক উজ্জ্বল প্রতিভা হিসেবে সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। কিন্তু ফায়জানের মাকে দেখতে হল, তাঁর পুত্রের খুন করা লাশ।
সবথেকে বড় কথা, পুলিশ এবং আইআইটি কর্তৃপক্ষ একমাত্র পুত্রের অকস্মাৎ মৃত্যুতে শোকগ্রস্ত পরিবারের সঙ্গে খুবই অমানবিক ও অভদ্র আচরণ করে।
পরে হাইকোর্টের নির্দেশে ফায়জানের কবরস্থ লাশ তুলে আনা হয় কলকাতায় দ্বিতীয়বার ময়নাতদন্তের জন্য। লাশের সঙ্গে আসে তার মা। পুলিশ মায়ের (রেহানা আহমেদ) থাকার কোনও ব্যবস্থা করেনি। আর দ্বিতীয়বার ময়নাতদন্ত হয়ে যাওয়ার পরও ফায়জানের লাশ ডিব্রুগড়ে ফিরিয়ে নিয়ে পুনরায় দাফন করার কোনও ইন্তেজাম করেনি, ব্যবস্থা করেনি শোকার্ত মা রেহানা আহমেদ-কে ডিব্রুগড় বা তিনসুকিয়া ফেরত পাঠানোর।
অবশ্য এ কথা না বললে সত্যের অপলাপ হবে যে, খড়গপুর পুলিশ ফায়জানের মা-কে বলেছিল, আপনি ডিব্রুগড় চলে যান। আমরা বিমানে টিকিট কেটে দেব। পরে ফায়জানের দেহাবশেষ আমরা পাঠিয়ে দেওয়ার বন্দোবস্ত করব। কিন্তু রেহানা আহমেদ পুত্রের লাশ কলকাতায় রেখে যেতে রাজি হননি। বলেছিলেন, আমার ছেলের লাশ সঙ্গে নিয়ে আমি যাব। সংশ্লিষ্ট পুলিশও অনড় হয়ে বসে থাকে। তাদের হয়তো ধারণা ছিল, কয়দিন একাকী মা কলকাতায় পড়ে থাকবে!
শেষপর্যন্ত বিষয়টি কলকাতা হাইকোর্টের জাস্টিস রাজাশেখর মান্থা-র সামনে আসে। তিনি নির্দেশ দেন, তিনদিনের মধ্যে ফায়জানের দেহাবশেষ-সহ তার মা রেহানা আহমেদ-কে ডিব্রুগড়ে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করতে হবে। কবে ফায়জানের মা-কে পাঠানো হবে সে-সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলেও পুলিশ কোনও কথা জানায়নি। শুক্রবার হঠাৎই সকাল ১০টা ৩০ মিনিট নাগাদ ফোন করে খড়গপুর পুলিশ বলে, আপনার ছেলের দেহ যে মর্গে আছে সেখানে আপনাকে আসতে হবে। অসহায় মা আর কী করবেন! একজনকে সঙ্গে নিয়ে তিনি মর্গে ছুটলেন। মা ভেবেছিলেন হয়তো তার পুত্রের দেহ তাকে আবার শনাক্ত করতে হবে। কিন্তু না, মর্গের দরজা বন্ধ। তাঁকে খড়গপুর পুলিশ শুধু বলে, এই নিন আপনার টিকিট। দেখা গেল, শুক্রবার কামরূপ এক্সপ্রেসে সন্ধে ৬টা ৩০ মিনিটে পুলিশ তার টিকিট কেটে দিয়েছে। আসার সময় তিনি পুত্রের দেহ নিয়ে বিমানে এসেছিলেন। এবার পুলিশ তাঁকে কেন হাওড়া থেকে ডিব্রুগড় পর্যন্ত লম্বা সফরে ট্রেনে পাঠাচ্ছে, তার কোনও উত্তর পুলিশ অফিসার দিতে পারেনি। আর কেনই বা তাঁকে মর্গে ডাকা হল, তারও কোনও জবাব পুলিশের কাছে ছিল না।
মা রেহানা আহমেদ পুলিশ অফিসারকে জিজ্ঞাসা করেন, আপনারা আমাকে কেন ট্রেনে পাঠাচ্ছেন? ট্রেনে তো আমার ছেলের দেহাবশেষ এই গরমে আরও খারাপ হয়ে যাবে। পুলিশ অফিসার বলেন, আমার কিছু করার নেই। আমার সিনিয়র পুলিশ অফিসাররা যা নির্দেশ দিয়েছেন, আমি তাই করছি মাত্র। পুলিশ রেহানা আহমেদ-কে হাওড়া স্টেশনেও নিয়ে যায়নি। দয়াপরবশ হয়ে এক ব্যক্তি তাঁকে হাওড়া স্টেশনে কামরূপে তুলে দিতে যান। তিনি পুবের কলম-কে বলেন, ফায়জানের লাশকে একটি একটি সাধারণ লাগেজ বহনের কামরায় পুলিশ তুলে দেয়। সেটা ঠিকভাবে যাবে কি না, তারও কোনও গ্যারেন্টি কিন্তু নেই।
স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে, ফায়জানকে হত্যায় পুলিশের রিপোর্ট, ময়নাতদন্ত রিপোর্ট প্রভৃতিতে পুলিশের ইনভলভমেন্টের কথা সামনে এসেছে। তারা বিভিন্ন সময় ফায়জানের মায়ের উপর চাপ সৃষ্টি করেছে। শুক্রবারও ফায়জানের মাকে হয়রান করতেই শুধু শুধু মর্গে ডেকে পাঠানো হয়। এ ছাড়া বিমানে না পাঠিয়ে কেন কামরূপ এক্সপ্রেসে দীর্ঘ সফরের জন্য একজন অসহায় মা-কে তুলে দেওয়া হল, তা বুঝতে কষ্ট-কল্পনার দরকার হয় না। বোঝা যায়, ফায়জানের মা-কে হয়রান করে দমিয়ে দেওয়াই হচ্ছে পুলিশের লক্ষ্য। পুলিশ হলেই যে অমানবিক হতে হবে, এমন কোনও আইন নেই। খড়গপুর পুলিশের কর্তাব্যক্তিরা একবারও ভাবলেন না, পাশে ছেলের লাশ এসি বিহীন লাগেজ কামরায় পড়ে রয়েছে। তার মা দীর্ঘ সফর করবেন ট্রেনে। কিভাবে ছেলের জন্য যে বেদনা, তা যে তাঁকে কুরেকুরে খাবে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। ফায়জানের মা পুলিশ অফিসারকে বলেছিলেন, দফতরে যদি টাকা না থাকে তাহলে আমি কোনও আত্মীয়-স্বজনের কাছ থেকে টাকা ধার করে দিয়ে দিতাম। আমাকে বিমানেই পাঠালে তো ভালো হত।
পুলিশের উত্তর ছিল, আপনাকে বিমানে পাঠানোর হুকুম নেই। তাই ছেলের লাশ নিয়ে শোকগ্রস্ত মা রেহানা আহমেদ ট্রেনেই ডিব্রুগড়ে উদ্দেশে রওনা হয়েছেন। তাঁর চোখে অশ্রু, তাঁর একমাত্র ছেলের লাশ পাশেই লাগেজ কামরায় রয়েছে। এটাই হয়তো তাঁর একমাত্র সান্ত্বনা। ডিব্রুগড়ে নেমে চোখের পানি নিয়ে মা রেহানা আহমেদ হয়তো আত্মীয়দের বলবেন, তোমরা দেখো আমার ছেলের লাশটি ঠিক আছে তো?





























