পুবের কলম প্রতিবেদক, কলকাতা: ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচন শিয়রে। আর তার ঠিক আগেই পাহাড়ের রাজনীতিতে বড়সড় রদবদল ঘটিয়ে ভারতীয় জনতা পার্টিকে বড় ধাক্কা দিলেন কার্শিয়ংয়ের বিধায়ক বিষ্ণুপ্রসাদ শর্মা। বৃহস্পতিবার কলকাতায় তৃণমূল ভবনে রাজ্যের দুই মন্ত্রী ব্রাত্য বসু এবং শশী পাঁজার উপস্থিতিতে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘাসফুল শিবিরে যোগ দিলেন তিনি। দীর্ঘদিন ধরে পৃথক গোর্খাল্যান্ড রাজ্যের দাবিতে সরব থাকলেও, এদিন সেই অবস্থান থেকে সরে এসে পাহাড়ের সার্বিক উন্নয়নের স্বার্থেই শাসকদলে নাম লেখানোর কথা স্পষ্ট করেছেন এই বিধায়ক। নির্বাচনের প্রাক্কালে এই হাই-প্রোফাইল দলবদলের ঘটনা রাজ্যের রাজনৈতিক মহলে, বিশেষ করে পাহাড়ের সমীকরণে নতুন জল্পনার জন্ম দিয়েছে।
বিষ্ণুপ্রসাদ শর্মার রাজনৈতিক যাত্রাপথ বেশ বৈচিত্র্যময়। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে কার্শিয়ং কেন্দ্র থেকে তিনি নির্দল প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। সেই লড়াইয়ে গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার (তামাং গোষ্ঠী) প্রার্থী শেরিং লামা দহলকে ১৫ হাজার ৫১৫ ভোটের বড় ব্যবধানে পরাজিত করে জয়লাভ করেন বিষ্ণুপ্রসাদ। এরপর তিনি বিজেপিতে যোগদান করেন এবং রাজ্য বিধানসভায় এতদিন গেরুয়া শিবিরের প্রতিনিধি হিসেবেই সরব ছিলেন। তবে সম্প্রতি বিধানসভা অধিবেশনে তাঁর একটি মন্তব্য ঘিরেই জল্পনার সূত্রপাত হয়েছিল। অধিবেশনে তিনি নিজেকে ‘শৃঙ্খলমুক্ত ও মুক্ত পাখি’ বলে দাবি করে জানিয়েছিলেন যে, তিনি আর রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত নেই। সেই মন্তব্যের কয়েকদিনের মাথাতেই সমস্ত জল্পনার অবসান ঘটিয়ে তাঁর এই তৃণমূলে যোগদান পাহাড়ের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
তৃণমূলে যোগ দেওয়ার পর নিজের পুরনো দল বিজেপির বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ শানান কার্শিয়ংয়ের এই বিধায়ক। দলবদলের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি জানান, কার্শিয়ংয়ের মানুষ তাঁর ওপর বিশ্বাস রেখে যে রায় দিয়েছিলেন, তার মর্যাদা তিনি এতদিন রক্ষা করেছেন। এখন পাহাড়ের মানুষের স্বপ্নপূরণ এবং একটি উন্নত সমাজ ও উন্নত ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার লক্ষ্যেই তাঁর এই পদক্ষেপ। একইসঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, বিজেপি সরকার রাজ্যকে প্রাপ্য টাকা দিচ্ছে না। তাঁর কথায়, বিগত সতেরো বছর ধরে গোর্খা সম্প্রদায়কে কার্যত অন্ধকারে রেখেছে গেরুয়া শিবির। বিজেপিতে থেকে তিনি অত্যন্ত কুণ্ঠাবোধ করছিলেন বলেও এদিন দাবি করেছেন বিষ্ণুপ্রসাদ। তাঁর মতে, মানুষের জন্য কাজ করতেই এখন শাসকদলের হাত ধরেছেন তিনি।
সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছে পৃথক গোর্খাল্যান্ড ইস্যু নিয়ে বিষ্ণুপ্রসাদের পরিবর্তিত অবস্থান। এর আগে বিমল গুরুংয়ের সহযোগী হিসেবে এবং পরে বিজেপির বিধায়ক থাকাকালীন গোর্খাল্যান্ডের দাবিতে প্রবলভাবে সরব হয়েছিলেন তিনি। অন্যদিকে, রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পাহাড়ের উন্নয়নের পক্ষে থাকলেও বঙ্গভঙ্গ বা বিচ্ছিন্নতার দাবি কখনোই মেনে নেননি। এই পরিস্থিতিতে সাংবাদিকরা তাঁর কাছে গোর্খাল্যান্ডের দাবি নিয়ে প্রশ্ন রাখলে তিনি স্পষ্ট জানান যে, ওই দাবি মূলত বিজেপির ইস্তাহারের বিষয় ছিল। সুষমা স্বরাজ এবং অরুণ জেটলির মতো শীর্ষ বিজেপি নেতৃত্ব এই বিষয়ে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। সেই প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতেই তিনি এতদিন ওই দাবিকে সমর্থন করে এসেছেন। তিনি জানান, মাত্র এক বছর গোর্খা জনমুক্তি মোর্চায় ছিলেন তিনি। এখন থেকে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রকাশিত ইস্তাহার ও নীতি মেনেই তিনি রাজনীতির ময়দানে চলবেন বলে পরিষ্কার করে দিয়েছেন বিষ্ণুপ্রসাদ।
অন্যদিকে, বিষ্ণুপ্রসাদ শর্মার এই দলবদলকে বিশেষ আমল দিতে নারাজ বঙ্গ বিজেপি নেতৃত্ব। দলের শিলিগুড়ির বিধায়ক শঙ্কর ঘোষ এই যোগদান প্রসঙ্গে তীব্র কটাক্ষ করেছেন। তাঁর দাবি, বিষ্ণুপ্রসাদ দীর্ঘ সময় ধরেই দলের মূল স্রোত এবং পরিষদীয় দল থেকে কার্যত বিচ্ছিন্ন ছিলেন। শঙ্কর ঘোষ মনে করিয়ে দেন, ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির প্রার্থী রাজু বিস্তার বিরুদ্ধে নির্দল হিসেবে লড়াই করে সাতটি বিধানসভা মিলিয়ে সাত হাজার ভোটও জোগাড় করতে পারেননি বিষ্ণুপ্রসাদ। যাঁর জনভিত্তি এতটা তলানিতে, তাঁকে দলে টেনে তৃণমূল ঠিক কী রাজনৈতিক বার্তা দিতে চাইছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি। বিজেপি বিধায়কের কটাক্ষ, তৃণমূল ও বিষ্ণুপ্রসাদ এই দু’পক্ষই ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে একসঙ্গে ডুববে। সব মিলিয়ে ভোটের আগে পাহাড়ের এই রাজনৈতিক পালাবদল নিয়ে শাসক ও বিরোধীর তরজায় রাজ্য রাজনীতি এখন সরগরম।

































