২২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, রবিবার, ৯ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

রোহিঙ্গাদের মারধর করে তাড়াবেন না, ভারতকে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ

পুবের কলম, ওয়েব ডেস্ক: নিউইয়র্কে যার সদর দফতর, সেই হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ভারত সরকার যেভাবে হাজার হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থীকে বাংলাদেশ এবং মিয়ানমারে ফেরত পাঠিয়েছে তার তীব্র নিন্দা করেছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এক বিবৃতিতে বলেছে, শরণার্থীদের অধিকার অমান্য করে তাঁদের বন্দিশিবিরে আটকে রেখে, তাঁদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করে ভারত কার্যত আন্তর্জাতিক আইন অমান্য করেছে।

 

বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে বেছে বেছে রোহিঙ্গা এবং বাংলাভাষায় কথা বলা মুসলমানদের উপর নির্যাতন চালানো হয়েছে। তাঁদের অবৈধ অনুপ্রবেশকারী বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। বলা হয়েছে, ১৯২ জন রোহিঙ্গা, যাদের নাম শরণার্থী হিসেবে নথিবদ্ধ করা রয়েছে, বাংলাদেশে ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছেন।

 

আরও ৪০ জন রোহিঙ্গা শরণার্থীকে মিয়ানমারের উপকুল এলাকায় ভারতীয় জাহাজে করে নিয়ে গিয়ে ঠেলে জাহাজ থেকে সমুদ্রে ফেলে দেওয়া হয়। তাঁরা সাঁতরে ভূমিতে উঠতে বাধ্য হন। বহু রোহিঙ্গা শরণার্থী ভয়ে ভারত থেকে পালিয়েছেন। যেভাবে রোহিঙ্গাদের সঙ্গে ব্যবহার করেছে ভারত সরকার তা মানবাধিকারের লজ্জাস্বরূপ।

 

বলেছেন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এর এশিয়া বিভাগের অধিকর্তা এলিনা পিয়ারসন। একদিকে মিয়ানমার সরকারের নির্যাতন সহ্য করে ভারতে পালিয়ে এসে আবার এখানে আর এক দফা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন রোহিঙ্গারা।

 

সদ্য ভারত থেকে বিতাড়িত কয়েকজন রোহিঙ্গার সঙ্গে বাংলাদেশের কক্সবাজারে শরণার্থী শিবিরে দেখা করেন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এর লোকজন। তাঁরা অভিযোগ করেছেন, তাঁদের টাকা,মোবাইল, রাষ্ট্রসংঘের দেওয়া পরিচয়পত্র, সবকিছু ভারতে কেড়ে নেওয়া হয়েছে। জম্মু-কাশ্মীর, অন্ধ্রপ্রদেশ এবং দিল্লি থেকে আরও তিনজন প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে পালিয়ে এসেছেন বাংলাদেশে।

 

মে মাসে এক মহিলাকে স্বামী এবং তিন সন্তান সহ অসম থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়। সেই মহিলা অভিযোগ করলেন, বিএসএফের এক অফিসার তাঁর স্বামীকে এত জোরে থাপ্পড় মেরেছিল যে সেই থেকে ও শুনতেই পারছে না। আর একজন অভিযোগ করেছেন, ত্রিপুরা পুলিশ তাঁদের ৪ বছরের মেয়েকে পর্যন্ত মারধর করেছে এবং তাদের শেষ সম্বল ২০ হাজার টাকা ছিনিয়ে নিয়েছে। ৪০ রোহিঙ্গার এক দল দিল্লি থেকে বিমানে আন্দামানে গিয়ে আশ্রয় নেয়।

 

সেখানে নৌবাহিনীর অফিসাররা তাঁদের পিটিয়ে একটি জাহাজে তুলে মিয়ানমারের কাছে মাঝসাগরে ফেলে দেয় সবাইকে। আমাদের অপরাধীর মতো ব্যবহার করা হয়েছে, কাঁদতে কাঁদতে বললেন।

ভারতে প্রায় ৪০ হাজার রোহিঙ্গা আশ্রিত ছিলেন। এঁদের অর্ধেক রাষ্ট্রসংঘের পরিচয়পত্র পেয়েছেন। অবশ্য ১৯৫১ সালের রিফিউজি কনভেনশনের শরিক ছিল না ভারত। শরিক না হলেও আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী শরণার্থীদের জোর করে নিজ দেশে ফিরিয়ে দেওয়া যায় না।

 

এখনও ভারতে যে রোহিঙ্গারা রয়েছেন তাঁরা ভয়ে আতঙ্কের মধ্যে জীবন কাটাচ্ছেন। গত মে মাসে জম্মুতে ৩০ জন রোহিঙ্গার ঘরবাড়ি ভাঙচুর করে পুলিশ তাঁদের গ্রেফতার করে। আরও কিছুজনের রাষ্ট্রসংঘের দেওয়া পরিচয়পত্র কেড়ে নিয়ে নষ্ট করে তাঁদের বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছে। রোহিঙ্গাদের শরণার্থী হিসেবে গণ্য করা হবে, না অবৈধ অনুপ্রবেশকারী হিসেবে গণ্য করা হবে, এই বিষয়ে একটি মামলা এখন সুপ্রিম কোর্টের বিচারাধীন।

 

সেপ্টেম্বরে মামলার শুনানি রয়েছে। এর আগে অবশ্য কোর্ট রোহিঙ্গাদের নিজের দেশে ফেরত পাঠানোর বিরোধিতা করেনি। মাঝসমুদ্রে তাঁদের জাহাজ থেকে ফেলে দেওয়ার কথাকে মিডিয়ার বানানো গল্প বলে অভিহিত করেছিল। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ভারত সরকারকে রোহিঙ্গাদের এভাবে বহিষ্কার করা বন্ধ রাখার আবেদন করেছে এবং তাঁদের উপর নির্যাতন বন্ধ করার আবেদন করেছে।

ট্যাগ :
প্রতিবেদক

ইমামা খাতুন

২০২২ সাল থেকে সংবাদ জগতের সঙ্গে যুক্ত। আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাংবাদিকতাতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছে। ডিজিটাল প্লাটফর্মে রিপোর্টার হিসেবে হাতেখড়ি। ২০২২ সালের শেষান্তে পুবের কলম-এর সঙ্গে যুক্ত হয়। ইমামার ভাষ্যে, The First Law of Journalism: to confirm existing prejudice, rather than contradict it.
সর্বধিক পাঠিত

আরএসএস মানহানি মামলা: নতুন জামিনদার দিতে থানে আদালতে সশরীরে হাজিরা দিলেন রাহুল গান্ধী

Copyright © Puber Kalom All rights reserved.| Developed by eTech Builder

রোহিঙ্গাদের মারধর করে তাড়াবেন না, ভারতকে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ

আপডেট : ৩০ অগাস্ট ২০২৫, শনিবার

পুবের কলম, ওয়েব ডেস্ক: নিউইয়র্কে যার সদর দফতর, সেই হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ভারত সরকার যেভাবে হাজার হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থীকে বাংলাদেশ এবং মিয়ানমারে ফেরত পাঠিয়েছে তার তীব্র নিন্দা করেছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এক বিবৃতিতে বলেছে, শরণার্থীদের অধিকার অমান্য করে তাঁদের বন্দিশিবিরে আটকে রেখে, তাঁদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করে ভারত কার্যত আন্তর্জাতিক আইন অমান্য করেছে।

 

বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে বেছে বেছে রোহিঙ্গা এবং বাংলাভাষায় কথা বলা মুসলমানদের উপর নির্যাতন চালানো হয়েছে। তাঁদের অবৈধ অনুপ্রবেশকারী বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। বলা হয়েছে, ১৯২ জন রোহিঙ্গা, যাদের নাম শরণার্থী হিসেবে নথিবদ্ধ করা রয়েছে, বাংলাদেশে ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছেন।

 

আরও ৪০ জন রোহিঙ্গা শরণার্থীকে মিয়ানমারের উপকুল এলাকায় ভারতীয় জাহাজে করে নিয়ে গিয়ে ঠেলে জাহাজ থেকে সমুদ্রে ফেলে দেওয়া হয়। তাঁরা সাঁতরে ভূমিতে উঠতে বাধ্য হন। বহু রোহিঙ্গা শরণার্থী ভয়ে ভারত থেকে পালিয়েছেন। যেভাবে রোহিঙ্গাদের সঙ্গে ব্যবহার করেছে ভারত সরকার তা মানবাধিকারের লজ্জাস্বরূপ।

 

বলেছেন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এর এশিয়া বিভাগের অধিকর্তা এলিনা পিয়ারসন। একদিকে মিয়ানমার সরকারের নির্যাতন সহ্য করে ভারতে পালিয়ে এসে আবার এখানে আর এক দফা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন রোহিঙ্গারা।

 

সদ্য ভারত থেকে বিতাড়িত কয়েকজন রোহিঙ্গার সঙ্গে বাংলাদেশের কক্সবাজারে শরণার্থী শিবিরে দেখা করেন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এর লোকজন। তাঁরা অভিযোগ করেছেন, তাঁদের টাকা,মোবাইল, রাষ্ট্রসংঘের দেওয়া পরিচয়পত্র, সবকিছু ভারতে কেড়ে নেওয়া হয়েছে। জম্মু-কাশ্মীর, অন্ধ্রপ্রদেশ এবং দিল্লি থেকে আরও তিনজন প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে পালিয়ে এসেছেন বাংলাদেশে।

 

মে মাসে এক মহিলাকে স্বামী এবং তিন সন্তান সহ অসম থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়। সেই মহিলা অভিযোগ করলেন, বিএসএফের এক অফিসার তাঁর স্বামীকে এত জোরে থাপ্পড় মেরেছিল যে সেই থেকে ও শুনতেই পারছে না। আর একজন অভিযোগ করেছেন, ত্রিপুরা পুলিশ তাঁদের ৪ বছরের মেয়েকে পর্যন্ত মারধর করেছে এবং তাদের শেষ সম্বল ২০ হাজার টাকা ছিনিয়ে নিয়েছে। ৪০ রোহিঙ্গার এক দল দিল্লি থেকে বিমানে আন্দামানে গিয়ে আশ্রয় নেয়।

 

সেখানে নৌবাহিনীর অফিসাররা তাঁদের পিটিয়ে একটি জাহাজে তুলে মিয়ানমারের কাছে মাঝসাগরে ফেলে দেয় সবাইকে। আমাদের অপরাধীর মতো ব্যবহার করা হয়েছে, কাঁদতে কাঁদতে বললেন।

ভারতে প্রায় ৪০ হাজার রোহিঙ্গা আশ্রিত ছিলেন। এঁদের অর্ধেক রাষ্ট্রসংঘের পরিচয়পত্র পেয়েছেন। অবশ্য ১৯৫১ সালের রিফিউজি কনভেনশনের শরিক ছিল না ভারত। শরিক না হলেও আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী শরণার্থীদের জোর করে নিজ দেশে ফিরিয়ে দেওয়া যায় না।

 

এখনও ভারতে যে রোহিঙ্গারা রয়েছেন তাঁরা ভয়ে আতঙ্কের মধ্যে জীবন কাটাচ্ছেন। গত মে মাসে জম্মুতে ৩০ জন রোহিঙ্গার ঘরবাড়ি ভাঙচুর করে পুলিশ তাঁদের গ্রেফতার করে। আরও কিছুজনের রাষ্ট্রসংঘের দেওয়া পরিচয়পত্র কেড়ে নিয়ে নষ্ট করে তাঁদের বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছে। রোহিঙ্গাদের শরণার্থী হিসেবে গণ্য করা হবে, না অবৈধ অনুপ্রবেশকারী হিসেবে গণ্য করা হবে, এই বিষয়ে একটি মামলা এখন সুপ্রিম কোর্টের বিচারাধীন।

 

সেপ্টেম্বরে মামলার শুনানি রয়েছে। এর আগে অবশ্য কোর্ট রোহিঙ্গাদের নিজের দেশে ফেরত পাঠানোর বিরোধিতা করেনি। মাঝসমুদ্রে তাঁদের জাহাজ থেকে ফেলে দেওয়ার কথাকে মিডিয়ার বানানো গল্প বলে অভিহিত করেছিল। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ভারত সরকারকে রোহিঙ্গাদের এভাবে বহিষ্কার করা বন্ধ রাখার আবেদন করেছে এবং তাঁদের উপর নির্যাতন বন্ধ করার আবেদন করেছে।