পুবের কলম ওয়েবডেস্ক : স্বাধীনতার পর থেকে এপর্যন্ত মাত্র ১৮ জন মুসলিম মহিলা সাংসদ পেয়েছে লোক সভা। 'মিসিং ফ্রম দ্য হাউস-- মুসলিম উমেন ইন লোকসভা' নামে এক সদ্যপ্রকাশিতব্য গ্রন্থে এই তথ্য উঠে এসেছে। তাও ১৮ জনের মধ্যে ১৩ জন প্রকৃতই রাজনীতি করে উঠে আসা ব্যক্তিত্ব ছিলেন। বাকি ৫ জন পারিবারিক রাজনীতির পরম্পরায় সাংসদ হতে পেরেছিলেন।
আরও পড়ুন:
এই ১৮ জনের মধ্যে যেমন রাজ পরিবারের সদস্যাও ছিলেন তেমন চা বিক্রেতা থেকে রাজনীতির আলোকবর্তিকায় উঠে আসা মহিলাও ছিলেন। আবার একজন ছিলেন রাষ্ট্রপতির স্ত্রী, অন্যজন বাঙালি অভিনেত্রী। এই যে ১৮ মুসলিম মহিলা সংসদের অলিন্দে দাপিয়ে বেড়ানোর সুযোগ পেয়েছিলেন এঁরা ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপট থেকে উঠে এলেও একটি বিষয়ে এঁদের সকলের হৃদয় একসূত্রে বাঁধা ছিল, তা হল প্রত্যেককেই কঠিন সংগ্রাম করে উঠে আসতে হয়েছিল।
আরও পড়ুন:
প্রকাশিতব্য গ্রন্থের লেখক হলেন রাশিদ কিদওয়াই এবং অম্বর কুমার ঘোষ। কিদওয়াই বলেছেন, তিনি ২০ জন মুসলিম মহিলার কথা লিখতে চেয়েছিলেন, যাঁরা লোকসভায় নির্বাচিত হয়েছিলেন। কিন্তু এঁদের মধ্যে সুহাসিনী আলি এবং আফরিন আলি সরাসরি বলে দিয়েছেন যে, তাঁরা ইসলামের অনুগামী নন। তাই তাঁদের নাম বাদ দিতে হয়েছে।
আরও পড়ুন:
ভারতের ১৪৬ কোটি জনসংখ্যার নিরিখে মাত্র ৭.১ শতাংশ মুসলিম মহিলা লোকসভার সদস্য হওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। এই চিত্র খুবই দুর্ভাগ্যজনক, বলেছেন লেখক। ২০২৫ সাল পর্যন্ত ১৮ বার লোকসভা গঠিত হয়েছে। তার মধ্যে ৫ বার লোকসভায় কোনও মুসলিম মহিলা সাংসদই ছিলেন না।
এমনই দুর্ভাগ্যজনক আর এক তথ্য, তা হল স্বাধীনতার পর থেকে কোনও লোকসভাতেই ৫৪৩ জন সাংসদের মধ্যে ৪ জনের বেশি মুসলিম সাংসদ ছিলেন না। কেরল, তামিলনাড়ু, কর্নাটক, অন্ধ্রপ্রদেশ এবং তেলেঙ্গানাকে উত্তর ভারতের থেকে শিক্ষাদীক্ষায় উন্নত বলে গণ্য করা হয়। অথচ এই পাঁচ রাজ্য থেকে আজ পর্যন্ত কোনও মুসলিম মহিলা সংসদে প্রতিনিধি হওয়ার সুযোগ পাননি।আরও পড়ুন:
যে ১৮ মুসলিম মহিলা সাংসদ হয়েছিলেন, তাঁরা হলেন, মফিদা আহমেদ ( কংগ্রেস, ১৯৫৭), জোহরাবেন আকবরভাই চাওরা( কংগ্রেস, ১৯৬২), মায়মুনা সুলতান (কংগ্রেস ১৯৫৭-৬৭), বেগম আকবর জাহান আবদুল্লাহ (ন্যাশনাল কনফারেন্স, ১৯৭৭-৭৯, ১৯৮৪-৮৯), রাশিদা হক( কংগ্রেস, ১৯৭৭-৭৯), মহসিনা কিদওয়াই ( কংগ্রেস, ১৯৭৭-৮৯), আবিদা আহমেদ ( কংগ্রেস, ১৯৮১-৮৯), নূর বানু ( কংগ্রেস, ১৯৯৬, ১৯৯৯-২০০৪), রুবাব সাঈদা ( সমাজবাদী পার্টি, ২০০৪-২০০৯), মেহবুবা মুফতি ( পিডিপি, ২০০৪-০৯, ২০১৪-১৯), তবসুম হাসান( সমাজবাদী পার্টি, লোকদল, বহুজন সমাজ পার্টি, ২০০৯-১৪), মৌসুম নূর( তৃণমূল কংগ্রেস, ২০০৯-১৯), কাইসার জাহান( বিএস পি, ২০০৯-১৪), মমতাজ সংঘমিতা( তৃণমূল কংগ্রেস, ২০১৪-১৯), সাজদা আহমেদ ( তৃণমূল কংগ্রেস, ২০১৪-২৪ এখনও সাংসদ ), রনি নারাহ( কংগ্রেস, ১৯৯৮-২০০৪, ২০০৯-১৪), নূসরত জাহান রুহি( তৃণমূল কংগ্রেস, ২০১৯-২৪) এবং ইকরা হাসান ( সমাজবাদী পার্টি, ২০২৪-)।
আরও পড়ুন:
এঁদের মধ্যে মহসিনা কিদওয়াই সবচেয়ে বেশিকাল ধরে সাংসদ ছিলেন। তিনি কেন্দ্রীয় মন্ত্রীও হন। শ্রম, স্বাস্থ্য, পরিবার কল্যাণ, গ্রামোন্নয়ন, পরিবহন এবং নগরোন্নয়ন মন্ত্রকের তিনি ভারপ্রাপ্ত মন্ত্রী ছিলেন বিভিন্ন সময়ে। এই গ্রন্থে আর যে বৈচিত্র্যময় চরিত্র সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে তিনি হলেন কায়সার জাহান। তাঁর স্বামী মুহাম্মদ জসমির আনসারি চা বিক্রি করে সংসার চালাতেন। কায়সারও স্বামীকে ওই কাজে সাহায্য করতেন। ২০০৯ সালের নির্বাচনে চতুর্মুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় কায়সার জয়ী হন। জসমির বিধায়ক হয়েছিলেন বিএস পির টিকিটে।
২০০৯ সালে লোকসভা ভোটের আগে তখন উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী মায়াবতী, তিনি জসমির এবং কায়সারকে লখনউ সচিবালয়ে ডেকে পাঠান। জসমির লখনউ যাওয়ার আগে হজরতগঞ্জে নিজের চায়ের দোকানে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে লখনউ রওনা হন। তিনি অনুমান করেছিলেন তাঁকে মন্ত্রী করা হবে।
মায়াবতী সেসব কথা না বলে জসমিরকে বললেন, লোকসভায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হবে। জসমির চায়ের দোকানের কথা মাথায় রেখে স্ত্রীর দিকে তাকালেন। ইঙ্গিত মায়াবতীর বুঝতে দেরি হয়নি। তিনি কায়সারকে জিজ্ঞেস করলেন, ' তু লড়েগি?' তৎক্ষনাৎ স্বামী-স্ত্রী দুজনই উত্তর দিলেন, ' হ্যাঁ'।আরও পড়ুন:
এই ১৮ জনের মধ্যে একজন ছিলেন রাষ্ট্রপতির স্ত্রী। অসমের বিশাল উচ্চবিত্ত পরিবারের ঘরনি। বেগম আবিদা আহমেদ। দেশের পঞ্চম রাষ্ট্রপতি ফখরুদ্দিন আলি আহমেদ এর স্ত্রী। ফখরুদ্দিন এর মৃত্যুর চার বছর পর বেগম আবিদা আহমেদ উত্তর প্রদেশের বেরিলি থেকে উপনির্বাচনে জয়ী হয়ে লোকসভার সদস্য হন। তিনিই একমাত্র মহিলা সাংসদ , যিনি রাষ্ট্রপতির স্ত্রী ছিলেন। তিনি একই কেন্দ্র থেকে পরপর দুবার জয়ী হন।
আরও পড়ুন:
বেগম নূর বানুর পুরো নাম ছিল মহতাব জামানি। তিনি ছিলেন রামপুরের প্রাক্তন রাজার স্ত্রী। তিনি আজম খান এবং জয়া প্রদার সঙ্গে লড়াই করেন।
তবে ২০০৪ এবং ২০০৯ সালে তিনি দুবার জয়া প্রদার কাছে পরাজিত হন। তাঁর স্বামী নবাব সৈয়দ জুলফিকার আলি খান ছিলেন রোহিল্লা রাজবংশের উত্তরসূরী। তিনি মিকি মিঞা নামে জনপ্রিয় ছিলেন। ১৯৯২ সালে পথ দুর্ঘটনায় তাঁর মৃত্যু হয়। বর্তমান লোকসভায় কৈরানার সমাজবাদী পার্টির প্রার্থী ইকরা হাসান চৌধুরি অন্যতম মুসলিম মহিলা মুখ। তিনি লন্ডনে পড়াশোনা করেছেন। এছাড়া উলুবেড়িয়া কেন্দ্র থেকে বিজয়ী তৃণমূল কংগ্রেস এর সাংসদ সাজদা আহমেদও বর্তমান লোকসভার সদস্য।আরও পড়ুন:
এই গ্রন্থের ভূমিকা লিখেছেন সাংসদ শশী তারুর। তিনি লিখেছেন, ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট মধ্যরাতে প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু নিয়তির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সাযুজ্য দেখেছিলেন স্বাধীনতা প্রাপ্তির সঙ্গে। তারপর ৭৮বছর কেটে গেল। কিন্তু লজ্জাজনক বাস্তবতা স্বীকারে বাধা নেই। তা হল, আজও আমরা প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা থেকে দূরে অবস্থান করছি। বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র, এমন কী গণতন্ত্রের ধাত্রীভূমিও বলা হয় ভারতকে। সত্য হল, আমাদের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে আমরা নিরবচ্ছিন্ন ভাবে আমাদের মহিলা নাগরিকদের উপেক্ষা করে চলেছি। তাঁদের দেশের মর্যাদাপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত করতে ব্যর্থ হয়েছি। এই ধারাবাহিকতা আজও বহমান'।