২১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, শনিবার, ৮ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস: ‘ভাষার ওপর আক্রমণ এলে রুখে দাঁড়াব’, একুশের সকালে সম্প্রীতির বার্তা মমতার

পুবের কলম, কলকাতা: আজ ২১শে ফেব্রুয়ারি, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। ১৯৫২ সালের এই দিনেই মাতৃভাষা বাংলার অধিকার রক্ষায় ঢাকার রাজপথে প্রাণ দিয়েছিলেন সালাম, বরকত, রফিক, জব্বাররা। ভাষা আন্দোলনের সেই শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের এই বিশেষ দিনে বিশ্বের সমস্ত ভাষা ও ভাষাভাষী মানুষকে সম্মান জানালেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। শনিবার সকালে নিজের সোশ্যাল মিডিয়া হ্যান্ডেলে একটি আবেগঘন বার্তার মাধ্যমে তিনি স্পষ্ট করে দেন, বাংলা ভাষার পাশাপাশি অন্যান্য সমস্ত আঞ্চলিক ভাষাকেও সমান গুরুত্ব দেয় তাঁর সরকার। একইসঙ্গে, দেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে কোনও নির্দিষ্ট ভাষার ওপর আঘাত নেমে এলে তার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে রুখে দাঁড়ানোর কড়া বার্তাও দিয়েছেন তৃণমূল নেত্রী।

সোশ্যাল মিডিয়ায় দেওয়া ওই পোস্টে মুখ্যমন্ত্রী লিখেছেন, বিশ্বের সকল দেশের সকল ভাষা-শহিদ এবং ভাষা-সংগ্রামীদের তিনি অন্তরের শ্রদ্ধা ও প্রণাম জানাচ্ছেন। তিনি আরও লেখেন, বিশ্ববরেণ্য কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, সুকান্ত ভট্টাচার্য বা জীবনানন্দ দাশের বাংলা ভাষাকে তাঁরা যেমন ভালোবাসেন ও সম্মান করেন, তেমনই অন্য সব ভাষাকেও সমান মর্যাদা দেন। রাজ্যে তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায় আসার পর থেকে বিভিন্ন ভাষাগোষ্ঠীর মানুষের অধিকার রক্ষায় রাজ্য প্রশাসন কী কী পদক্ষেপ করেছে, তার একটি সামগ্রিক খতিয়ানও এদিন তুলে ধরেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি অত্যন্ত গর্বের সঙ্গে জানান, তাঁর সরকারের আমলেই রাজ্যে হিন্দি, সাঁওতালি, কুরুখ, কুড়মালি, নেপালি, উর্দু, রাজবংশী, কামতাপুরী, পাঞ্জাবি এবং তেলুগু ভাষাকে সরকারি ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।

আরও পড়ুন: ‘সঠিক পথেই হচ্ছে SIR, কমিশনের পাশেই আমরা’ — ব্যারাকপুরে অমিত শাহ

কেবল সরকারি স্বীকৃতি দেওয়াই নয়, বিভিন্ন প্রান্তিক ভাষার চর্চা ও প্রসারের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগের কথাও মুখ্যমন্ত্রী তাঁর বার্তায় বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, সাদরি ভাষার মানোন্নয়নের জন্য রাজ্য সরকার নিরন্তর সচেষ্ট রয়েছে। এর পাশাপাশি রাজ্যে বসবাসকারী বিভিন্ন ভাষাভাষী মানুষ যাতে নিজেদের মাতৃভাষায় পঠনপাঠনের সুযোগ পান, প্রশাসন তা সুনিশ্চিত করেছে বলে মুখ্যমন্ত্রী দাবি করেছেন। এই প্রসঙ্গে তিনি হিন্দি আকাদেমি, রাজবংশী ভাষা আকাদেমি, কামতাপুরী ভাষা আকাদেমি এবং সাঁওতালি আকাদেমির মতো একাধিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার কথা স্মরণ করিয়ে দেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা জনজাতি ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে আশ্বস্ত করতেই মুখ্যমন্ত্রী এই পরিসংখ্যানগুলি তুলে ধরেছেন। বিশেষ করে উত্তরবঙ্গ ও জঙ্গলমহলের মতো এলাকাগুলিতে, যেখানে এই ভাষাগুলির ব্যাপক প্রচলন রয়েছে, সেখানে রাজ্য সরকারের এই উদ্যোগগুলির কথা মনে করিয়ে দেওয়া যথেষ্ট রাজনৈতিক তাৎপর্য বহন করে।

আরও পড়ুন: ‘রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে সংগ্রাম চলবে’, তৃণমূলের প্রতিষ্ঠা দিবসে বার্তা মমতার

মাতৃভাষা দিবসের এই পুণ্যলগ্নে মুখ্যমন্ত্রী তাঁর বার্তার শেষে একটি বিশেষ অঙ্গীকার করেছেন। তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে জানিয়েছেন, আগামী দিনে যে-কোনও ভাষার ওপর যদি কোনওরকম আক্রমণ নেমে আসে, তবে সকলে মিলে তার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবেন। তাঁর কথায়, “সকল ভাষা সমান ভাবে সম্মাননীয়।” ওয়াকিবহাল মহলের মতে, মুখ্যমন্ত্রীর এই মন্তব্যের প্রচ্ছন্ন নিশানায় রয়েছে কেন্দ্রের নীতি। কারণ, সাম্প্রতিক অতীতে একাধিকবার কেন্দ্রের বিরুদ্ধে অবিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে জোর করে নির্দিষ্ট একটি ভাষা চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টার অভিযোগ তুলে সরব হয়েছে এ রাজ্যের শাসক দল। সেই আবহে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে সব ভাষাকে সমান মর্যাদা দেওয়ার কথা বলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আসলে বহুত্ববাদ ও ভারতের বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যের বার্তাই তুলে ধরতে চাইলেন। একুশের সকালে ভাষা-শহিদদের প্রতি তাঁর এই শ্রদ্ধা নিবেদন এবং ভাষার অধিকার রক্ষার ডাক তাই স্বাভাবিকভাবেই রাজ্য রাজনীতিতে এক বিশেষ মাত্রা যোগ করল।

আরও পড়ুন: ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে আন্তর্জাতিক ‘এনবিএ’ স্বীকৃতিতে যাদবপুরে আসছে প্রতিনিধি দল

প্রতিবেদক

কিবরিয়া আনসারি

Kibria obtained a master's degree in journalism from Aliah University. He has been in journalism since 2018, gaining work experience in multiple organizations. Focused and sincere about his work, Kibria is currently employed at the desk of Purber Kalom.
সর্বধিক পাঠিত

ভোটের নির্ঘণ্ট ঘোষণার আগেই বাংলায় আসছে ৪৮০ কোম্পানি কেন্দ্রীয় বাহিনী, নির্দেশিকা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের

Copyright © Puber Kalom All rights reserved.| Developed by eTech Builder

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস: ‘ভাষার ওপর আক্রমণ এলে রুখে দাঁড়াব’, একুশের সকালে সম্প্রীতির বার্তা মমতার

আপডেট : ২১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, শনিবার

পুবের কলম, কলকাতা: আজ ২১শে ফেব্রুয়ারি, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। ১৯৫২ সালের এই দিনেই মাতৃভাষা বাংলার অধিকার রক্ষায় ঢাকার রাজপথে প্রাণ দিয়েছিলেন সালাম, বরকত, রফিক, জব্বাররা। ভাষা আন্দোলনের সেই শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের এই বিশেষ দিনে বিশ্বের সমস্ত ভাষা ও ভাষাভাষী মানুষকে সম্মান জানালেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। শনিবার সকালে নিজের সোশ্যাল মিডিয়া হ্যান্ডেলে একটি আবেগঘন বার্তার মাধ্যমে তিনি স্পষ্ট করে দেন, বাংলা ভাষার পাশাপাশি অন্যান্য সমস্ত আঞ্চলিক ভাষাকেও সমান গুরুত্ব দেয় তাঁর সরকার। একইসঙ্গে, দেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে কোনও নির্দিষ্ট ভাষার ওপর আঘাত নেমে এলে তার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে রুখে দাঁড়ানোর কড়া বার্তাও দিয়েছেন তৃণমূল নেত্রী।

সোশ্যাল মিডিয়ায় দেওয়া ওই পোস্টে মুখ্যমন্ত্রী লিখেছেন, বিশ্বের সকল দেশের সকল ভাষা-শহিদ এবং ভাষা-সংগ্রামীদের তিনি অন্তরের শ্রদ্ধা ও প্রণাম জানাচ্ছেন। তিনি আরও লেখেন, বিশ্ববরেণ্য কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, সুকান্ত ভট্টাচার্য বা জীবনানন্দ দাশের বাংলা ভাষাকে তাঁরা যেমন ভালোবাসেন ও সম্মান করেন, তেমনই অন্য সব ভাষাকেও সমান মর্যাদা দেন। রাজ্যে তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায় আসার পর থেকে বিভিন্ন ভাষাগোষ্ঠীর মানুষের অধিকার রক্ষায় রাজ্য প্রশাসন কী কী পদক্ষেপ করেছে, তার একটি সামগ্রিক খতিয়ানও এদিন তুলে ধরেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি অত্যন্ত গর্বের সঙ্গে জানান, তাঁর সরকারের আমলেই রাজ্যে হিন্দি, সাঁওতালি, কুরুখ, কুড়মালি, নেপালি, উর্দু, রাজবংশী, কামতাপুরী, পাঞ্জাবি এবং তেলুগু ভাষাকে সরকারি ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।

আরও পড়ুন: ‘সঠিক পথেই হচ্ছে SIR, কমিশনের পাশেই আমরা’ — ব্যারাকপুরে অমিত শাহ

কেবল সরকারি স্বীকৃতি দেওয়াই নয়, বিভিন্ন প্রান্তিক ভাষার চর্চা ও প্রসারের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগের কথাও মুখ্যমন্ত্রী তাঁর বার্তায় বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, সাদরি ভাষার মানোন্নয়নের জন্য রাজ্য সরকার নিরন্তর সচেষ্ট রয়েছে। এর পাশাপাশি রাজ্যে বসবাসকারী বিভিন্ন ভাষাভাষী মানুষ যাতে নিজেদের মাতৃভাষায় পঠনপাঠনের সুযোগ পান, প্রশাসন তা সুনিশ্চিত করেছে বলে মুখ্যমন্ত্রী দাবি করেছেন। এই প্রসঙ্গে তিনি হিন্দি আকাদেমি, রাজবংশী ভাষা আকাদেমি, কামতাপুরী ভাষা আকাদেমি এবং সাঁওতালি আকাদেমির মতো একাধিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার কথা স্মরণ করিয়ে দেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা জনজাতি ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে আশ্বস্ত করতেই মুখ্যমন্ত্রী এই পরিসংখ্যানগুলি তুলে ধরেছেন। বিশেষ করে উত্তরবঙ্গ ও জঙ্গলমহলের মতো এলাকাগুলিতে, যেখানে এই ভাষাগুলির ব্যাপক প্রচলন রয়েছে, সেখানে রাজ্য সরকারের এই উদ্যোগগুলির কথা মনে করিয়ে দেওয়া যথেষ্ট রাজনৈতিক তাৎপর্য বহন করে।

আরও পড়ুন: ‘রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে সংগ্রাম চলবে’, তৃণমূলের প্রতিষ্ঠা দিবসে বার্তা মমতার

মাতৃভাষা দিবসের এই পুণ্যলগ্নে মুখ্যমন্ত্রী তাঁর বার্তার শেষে একটি বিশেষ অঙ্গীকার করেছেন। তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে জানিয়েছেন, আগামী দিনে যে-কোনও ভাষার ওপর যদি কোনওরকম আক্রমণ নেমে আসে, তবে সকলে মিলে তার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবেন। তাঁর কথায়, “সকল ভাষা সমান ভাবে সম্মাননীয়।” ওয়াকিবহাল মহলের মতে, মুখ্যমন্ত্রীর এই মন্তব্যের প্রচ্ছন্ন নিশানায় রয়েছে কেন্দ্রের নীতি। কারণ, সাম্প্রতিক অতীতে একাধিকবার কেন্দ্রের বিরুদ্ধে অবিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে জোর করে নির্দিষ্ট একটি ভাষা চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টার অভিযোগ তুলে সরব হয়েছে এ রাজ্যের শাসক দল। সেই আবহে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে সব ভাষাকে সমান মর্যাদা দেওয়ার কথা বলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আসলে বহুত্ববাদ ও ভারতের বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যের বার্তাই তুলে ধরতে চাইলেন। একুশের সকালে ভাষা-শহিদদের প্রতি তাঁর এই শ্রদ্ধা নিবেদন এবং ভাষার অধিকার রক্ষার ডাক তাই স্বাভাবিকভাবেই রাজ্য রাজনীতিতে এক বিশেষ মাত্রা যোগ করল।

আরও পড়ুন: ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে আন্তর্জাতিক ‘এনবিএ’ স্বীকৃতিতে যাদবপুরে আসছে প্রতিনিধি দল