০৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, মঙ্গলবার, ২০ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

নিউমোনিয়া: নীরব ঘাতক থেকে সুরক্ষা — কারণ, লক্ষণ, চিকিৎসা ও প্রতিরোধের পূর্ণাঙ্গ গাইড

নিউমোনিয়া হল ফুসফুসের একটি মারাত্মক সংক্রমণ, যেখানে ফুসফুসের বায়ুথলি তরল বা পুঁজে ভরে যায়। এর ফলে শ্বাস নিতে কষ্ট হয়, শরীরে অক্সিজেনের মাত্রা কমে যেতে পারে এবং গুরুতর ক্ষেত্রে জীবনহানির আশঙ্কাও তৈরি হয়। বিশেষ করে ৫ বছরের কম বয়সি শিশু, ৬৫ বছরের ঊর্ধ্বে বয়স্ক মানুষ এবং রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকা ব্যক্তিদের জন্য নিউমোনিয়া অত্যন্ত বিপজ্জনক।

ভারতের মতো জনবহুল দেশে নিউমোনিয়া আজও শিশু ও বয়স্কদের মৃত্যুর অন্যতম বড় কারণ। তবে আশার কথা, সময়মতো সঠিক চিকিৎসা ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিলে এই রোগকে অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
নিউমোনিয়ার কারণ কী?
নিউমোনিয়া মূলত বিভিন্ন ধরনের জীবাণুর সংক্রমণে হয়ে থাকে—
১) ব্যাকটেরিয়া
Streptococcus pneumoniae (সবচেয়ে সাধারণ)
Haemophilus influenzae
Staphylococcus aureus
২) ভাইরাস
ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস
RSV
SARS-CoV-2 (কোভিড-১৯)
৩) ফাঙ্গাস
Pneumocystis jirovecii (বিশেষ করে HIV বা রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে)

সংক্রমণের পথ ও ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তি
হাঁচি-কাশির মাধ্যমে বাতাসে ছড়ানো ড্রপলেট
আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শ
মুখ ও নাকের জীবাণু ফুসফুসে প্রবেশ
ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠী:
৫ বছরের নিচের শিশু
৬৫ বছরের বেশি বয়সি মানুষ
ডায়াবেটিস, COPD, হৃদরোগে আক্রান্ত
ধূমপায়ী
অপুষ্ট শিশু
নিউমোনিয়ার লক্ষণ কী কী?
সাধারণ লক্ষণ
উচ্চ জ্বর ও কাঁপুনি
কাশি (কফসহ বা কফ ছাড়া)
বুকে ব্যথা
শ্বাসকষ্ট
দ্রুত শ্বাস নেওয়া
শিশুদের ক্ষেত্রে
বুক দেবে যাওয়া
খাওয়া কমে যাওয়া
অস্বাভাবিক দুর্বলতা
গুরুতর লক্ষণ (অবিলম্বে চিকিৎসা জরুরি)
ঠোঁট নীল হয়ে যাওয়া
অচেতনতা
শরীরে অক্সিজেনের মাত্রা বিপজ্জনকভাবে কমে যাওয়া
কীভাবে রোগ নির্ণয় করা হয়?
রক্ত পরীক্ষা: CBC, CRP
বুকের এক্স-রে (Chest X-ray)
প্রয়োজনে কফ পরীক্ষা (Sputum culture)
নিউমোনিয়ার চিকিৎসা কীভাবে হয়?
১) ওষুধ
ব্যাকটেরিয়াল নিউমোনিয়া: উপযুক্ত অ্যান্টিবায়োটিক
ভাইরাল নিউমোনিয়া: সাপোর্টিভ কেয়ার, প্রয়োজনে অ্যান্টিভাইরাল
ফাঙ্গাল নিউমোনিয়া: অ্যান্টিফাঙ্গাল ওষুধ
২) সহায়ক চিকিৎসা
অক্সিজেন থেরাপি
পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ
জ্বরের জন্য প্যারাসিটামল
গুরুতর ক্ষেত্রে হাসপাতালে ভর্তি
সম্ভাব্য জটিলতা
চিকিৎসা দেরি হলে দেখা দিতে পারে—
তীব্র শ্বাসকষ্ট
ফুসফুসে পুঁজ জমা (Empyema)
সেপসিস
শ্বাসযন্ত্র বিকল হয়ে যাওয়া
নিউমোনিয়া প্রতিরোধের উপায়
নিয়মিত টিকাদান: Pneumococcal vaccine ও Influenza vaccine
ধূমপান পরিহার
হাত ধোয়ার অভ্যাস ও পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা
পুষ্টিকর ও সুষম খাদ্য গ্রহণ
ভারতে জাতীয় টিকাকরণ কর্মসূচির আওতায় শিশুদের নিউমোনিয়া প্রতিরোধে টিকাদান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে, যার ফলে শিশু মৃত্যুর হার ধীরে ধীরে কমছে।
সচেতনতা ও সময়মতো চিকিৎসাই জীবন বাঁচাতে পারে।

নিউমোনিয়া একটি গুরুতর হলেও সম্পূর্ণ প্রতিরোধযোগ্য ও চিকিৎসাযোগ্য রোগ। সময়মতো লক্ষণ চিহ্নিত করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই রোগী সুস্থ হয়ে ওঠেন। তাই শ্বাসকষ্ট, উচ্চ জ্বর ও কাশি অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।

ট্যাগ :
সর্বধিক পাঠিত

উত্তরাখণ্ডে ভয়াবহ পথ দুর্ঘটনা: নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ল বাস, দুই মহিলাসহ মৃত ৩

Copyright © Puber Kalom All rights reserved.| Developed by eTech Builder

নিউমোনিয়া: নীরব ঘাতক থেকে সুরক্ষা — কারণ, লক্ষণ, চিকিৎসা ও প্রতিরোধের পূর্ণাঙ্গ গাইড

আপডেট : ৩০ জানুয়ারী ২০২৬, শুক্রবার

নিউমোনিয়া হল ফুসফুসের একটি মারাত্মক সংক্রমণ, যেখানে ফুসফুসের বায়ুথলি তরল বা পুঁজে ভরে যায়। এর ফলে শ্বাস নিতে কষ্ট হয়, শরীরে অক্সিজেনের মাত্রা কমে যেতে পারে এবং গুরুতর ক্ষেত্রে জীবনহানির আশঙ্কাও তৈরি হয়। বিশেষ করে ৫ বছরের কম বয়সি শিশু, ৬৫ বছরের ঊর্ধ্বে বয়স্ক মানুষ এবং রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকা ব্যক্তিদের জন্য নিউমোনিয়া অত্যন্ত বিপজ্জনক।

ভারতের মতো জনবহুল দেশে নিউমোনিয়া আজও শিশু ও বয়স্কদের মৃত্যুর অন্যতম বড় কারণ। তবে আশার কথা, সময়মতো সঠিক চিকিৎসা ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিলে এই রোগকে অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
নিউমোনিয়ার কারণ কী?
নিউমোনিয়া মূলত বিভিন্ন ধরনের জীবাণুর সংক্রমণে হয়ে থাকে—
১) ব্যাকটেরিয়া
Streptococcus pneumoniae (সবচেয়ে সাধারণ)
Haemophilus influenzae
Staphylococcus aureus
২) ভাইরাস
ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস
RSV
SARS-CoV-2 (কোভিড-১৯)
৩) ফাঙ্গাস
Pneumocystis jirovecii (বিশেষ করে HIV বা রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে)

সংক্রমণের পথ ও ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তি
হাঁচি-কাশির মাধ্যমে বাতাসে ছড়ানো ড্রপলেট
আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শ
মুখ ও নাকের জীবাণু ফুসফুসে প্রবেশ
ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠী:
৫ বছরের নিচের শিশু
৬৫ বছরের বেশি বয়সি মানুষ
ডায়াবেটিস, COPD, হৃদরোগে আক্রান্ত
ধূমপায়ী
অপুষ্ট শিশু
নিউমোনিয়ার লক্ষণ কী কী?
সাধারণ লক্ষণ
উচ্চ জ্বর ও কাঁপুনি
কাশি (কফসহ বা কফ ছাড়া)
বুকে ব্যথা
শ্বাসকষ্ট
দ্রুত শ্বাস নেওয়া
শিশুদের ক্ষেত্রে
বুক দেবে যাওয়া
খাওয়া কমে যাওয়া
অস্বাভাবিক দুর্বলতা
গুরুতর লক্ষণ (অবিলম্বে চিকিৎসা জরুরি)
ঠোঁট নীল হয়ে যাওয়া
অচেতনতা
শরীরে অক্সিজেনের মাত্রা বিপজ্জনকভাবে কমে যাওয়া
কীভাবে রোগ নির্ণয় করা হয়?
রক্ত পরীক্ষা: CBC, CRP
বুকের এক্স-রে (Chest X-ray)
প্রয়োজনে কফ পরীক্ষা (Sputum culture)
নিউমোনিয়ার চিকিৎসা কীভাবে হয়?
১) ওষুধ
ব্যাকটেরিয়াল নিউমোনিয়া: উপযুক্ত অ্যান্টিবায়োটিক
ভাইরাল নিউমোনিয়া: সাপোর্টিভ কেয়ার, প্রয়োজনে অ্যান্টিভাইরাল
ফাঙ্গাল নিউমোনিয়া: অ্যান্টিফাঙ্গাল ওষুধ
২) সহায়ক চিকিৎসা
অক্সিজেন থেরাপি
পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ
জ্বরের জন্য প্যারাসিটামল
গুরুতর ক্ষেত্রে হাসপাতালে ভর্তি
সম্ভাব্য জটিলতা
চিকিৎসা দেরি হলে দেখা দিতে পারে—
তীব্র শ্বাসকষ্ট
ফুসফুসে পুঁজ জমা (Empyema)
সেপসিস
শ্বাসযন্ত্র বিকল হয়ে যাওয়া
নিউমোনিয়া প্রতিরোধের উপায়
নিয়মিত টিকাদান: Pneumococcal vaccine ও Influenza vaccine
ধূমপান পরিহার
হাত ধোয়ার অভ্যাস ও পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা
পুষ্টিকর ও সুষম খাদ্য গ্রহণ
ভারতে জাতীয় টিকাকরণ কর্মসূচির আওতায় শিশুদের নিউমোনিয়া প্রতিরোধে টিকাদান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে, যার ফলে শিশু মৃত্যুর হার ধীরে ধীরে কমছে।
সচেতনতা ও সময়মতো চিকিৎসাই জীবন বাঁচাতে পারে।

নিউমোনিয়া একটি গুরুতর হলেও সম্পূর্ণ প্রতিরোধযোগ্য ও চিকিৎসাযোগ্য রোগ। সময়মতো লক্ষণ চিহ্নিত করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই রোগী সুস্থ হয়ে ওঠেন। তাই শ্বাসকষ্ট, উচ্চ জ্বর ও কাশি অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।