পুবের কলম,দ্বীন দুনিয়া ওয়েবডেস্ক: বিশ্বে আল্লাহ্ রাব্বুল আলামিনের যত বিস্ময়কর নিদর্শন রয়েছে জমজম কূপ তাদের মধ্য অন্যতম। মসজিদুল হারামের ভেতর পবিত্র কাবাঘরের ২০ মিটার পূর্বে এই কূপের অবস্থান। প্রায় ৪ হাজার বছরেরও পূর্বে এই মহা বরকতময় কূপটির আত্মপ্রকাশ ঘটে। হযরত ইব্রাহীম আ.-এর ছেলে হযরত ইসমাঈল আ.-এর স্মৃতিবিজড়িত কূপ এই জমজম। পাঁচ হাজার বছর ধরে এখান থেকে একটানা পানি পাওয়া যাচ্ছে, এই কারণে জমজমের কূপকে বিশ্বের প্রাচীনতম সক্রিয় কূপ বলে ধারণা করা হয়।
আরও পড়ুন:
জমজম কূপের ইতিহাস?
♦ হযরত ইব্রাহীম আ. মহান আল্লাহ্পাকের নির্দেশে তাঁর স্ত্রী হাজেরা আ. এবং ছেলে হযরত ইসমাঈল আ.-কে মক্কার কাবা ঘরের কাছে নিয়ে যান। তখন মক্কা অনাবাদী মরুভূমি ছিল। সেখানে কোনও মানুষ ছিল না, এমনকি পানির ব্যবস্থাও ছিল না। আল্লাহর নির্দেশ মোতাবেক তাঁর উপর বিশ্বাস রেখে তাদের কিছু খেজুর ও পানি দিয়ে সাফা ও মারওয়া পাহাড়ের মাঝে রেখে চলে যান হযরত ইব্রাহীম আ.। তবে কয়েকদিনের মধ্যে তাঁদের এই খাবার শেষ হয়ে যায়। শিশু ইসমাঈল পানির তৃষ্ণায় কান্না শুরু করে। তাঁর মা হাজেরা আ.পানির খোঁজে এদিক-সেদিক ছোটাছুটি শুরু করেন এবং একইসঙ্গে আল্লাহ্র সাহায্য প্রার্থনা করেন। তিনি পানির খোঁজে মরীয়া হয়ে দুই পাহাড় সাফা এবং মারওয়ায় দৌড়াতে থাকেন দূরে কোনও কাফেলা দেখা যায় কিনা-যাদের কাছে পানি থাকতে পারে। এই সময় হযরত ইসমাঈল আ. পায়ের আঘাতে ভূমি থেকে পানি বের হয়ে আসে।আরও পড়ুন:
অন্য একটি বর্ণনানুসারে, আল্লাহ্ হযরত জিবরাঈল আ.-কে সেখানে প্রেরণ করেন, হযরত জিবরাঈল আ.-এর পায়ের আঘাতে মাটি ফেটে পানির ধারা বেরিয়ে আসে। ফিরে এসে এই দৃশ্য দেখে হাজেরা আ. পাথর দিয়ে পানির ধারা আবদ্ধ করলে তা কূপে রূপ নেয়। এই সময় হাজেরা রা. উদ্গত পানির ধারাকে জমজম তথা থামো বলায় এর নাম ‘জমজম’ হয়েছে। পরবর্তীতে নবী ইব্রাহীম আ. জমজমের পাশে কাবা পুনর্র্নির্মাণ করেন। পূর্বে হযরত আদম আ.-এর সময় এটি নির্মিত হলেও পরবর্তীকালে বিনষ্ট হয়ে গিয়েছিল। হজ ও ওমরাহ আদায়কারীর জন্য বিশেষভাবে এবং পৃথিবীর সব মুসলমানের জন্য সাধারণভাবে জমজমের পানি পান করা মুস্তাহাব। সহিহ্ হাদিসে বর্ণিত হয়েছে n ‘নবী সা. নিজে জমজম থেকে পানি পান করেছেন।’ (সহিহ্ বুখারী, হাদিস : ১৫৫৬)
‘জমজম’ নাম কীভাবে এলো?
♦ জমজম কূপের নামকরণের ইতিহাস নিয়ে নানা মত রয়েছে। কারও কারও মতে, হিব্রু ভাষায় ‘জমজম’ অর্থ থাম-থাম। মা হাজেরা আ. পানির প্রবাহ রোধ করার জন্য বাঁধ নির্মাণের সময় বলেছিলেন, ‘জমজম’- থাম-থাম। আল্লাহর ইচ্ছায় তা নির্দিষ্ট স্থানে থেমে গেল। আরব্য ঐতিহাসিকদের মতে, ‘জমজম’ (Zamzam Water) অর্থ অধিক হওয়া। এখানে পানির আধিক্যের কারণেই এর নামকরণ করা হয়েছে ‘জমজম’।’
পানির বিশুদ্ধতা
♦ হযরত ইবনে আব্বাস রা. কর্তৃক বর্ণিত, মহানবী সা. ইরশাদ করেছেন, ‘পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ পানি হল জমজমের পানি।
তাতে রয়েছে তৃপ্তির খাদ্য এবং ব্যাধির আরোগ্য।’ (আল মুজামুল আউসাত, হাদিস : ৩৯১২)আরও পড়ুন:
বিজ্ঞানীদের দৃষ্টিতে জমজম
♦ জাপানের বিখ্যাত গবেষক মাসরু এমোটো জমজমের পানি নিয়ে গবেষণা করেছেন। তাঁর মতে, সাধারণ পানির এক হাজার ফোঁটার সঙ্গে যদি জমজমের পানির একফোঁটা মেশানো হয়, তাহলে সেই মিশ্রণও জমজমের পানির মতো বিশুদ্ধ হয়। জমজমের পানির মতো বিশুদ্ধ পানি পৃথিবীর অন্য কোথাও পাওয়া যাবে না।
আরও পড়ুন:
জমজম কূপের বর্তমান চিত্র
♦ বাদশাহ আবদুল আজিজ বিন সৌদের হাতে বর্তমানে জমজম কূপ আধুনিক রূপ নিয়েছে। কূপের পূর্ব ও দক্ষিণে পানি পান করানোর জন্য দুইটি স্থান নির্মাণ করেন তিনি। দক্ষিণ দিকে ছয়টি এবং পূর্বদিকে তিনটি ট্যাপ লাগান। কাবাঘরের ২১ মিটার দূরে অবস্থিত কূপটি থেকে ২০ লক্ষাধিক ব্যারেল পানি প্রতিদিন উত্তোলিত হয়। কূপটি বর্তমানে আন্ডারগ্রাউন্ডে রয়েছে। কূপের পানিবণ্টনের জন্য ১৪০৩ হিজরিতে সউদি বাদশাহর এক রাজকীয় ফরমান অনুযায়ী হজ মন্ত্রণালয়ের সরাসরি তত্ত্বাবধানে ইউনিফায়েড ‘জামাজেমা দফতর’ গঠিত হয়। এই দফতরে একজন প্রেসিডেন্ট, একজন ভাইস প্রেসিডেন্ট-সহ মোট ১১ জন সদস্য ও পাঁচ শতাধিক শ্রমিক-কর্মচারী নিয়োজিত আছেন।
আরও পড়ুন:
জমজমের পানির ফজিলত
♦ জমজমের পানি সর্বোত্তম পানি : হযরত ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সা. বলেন, ‘জমিনের বুকে জমজমের পানি সর্বোত্তম পানি। ‘
♦ জমজমের পানি বরকতময় : হযরত আবু জর গিফারি রা. বলেন, রাসূল সা. বলেন, ‘নিশ্চয়ই তা বরকতময়।’ (মুসলিম, হাদিস : ২৪৭৩)
আরও পড়ুন:
♦ জমজমের পানিতে আছে খাদ্যের উপাদান : রাসূল সা. বলেন, ‘নিশ্চয়ই তা বরকতময়, আর খাবারের উপাদানসমৃদ্ধ।’
আরও পড়ুন:
♦ রোগের শিফা : হযরত ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সা. বলেন, ‘নিশ্চয়ই তা সুখাদ্য খাবার এবং রোগের শিফা।
’ (মুসলিম, হাদিস : ২৪৭৩)আরও পড়ুন:
♦ জমজমের পানি যে উদ্দেশ্যে পান করবেন তা পূর্ণ হয় : হযরত জাবের ইবনে আবদুল্লাহ রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সা. বলেন, ‘জমজমের পানি যে উদ্দেশ্যেই পান করা হয় তা সাধিত হবে।’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৩০৬২)
আরও পড়ুন:
♦ জমজমের পানি উৎকৃষ্ট হাদিয়া : প্রাচীন যুগ থেকে হজযাত্রীরা জমজমের পানি বহন করে নিয়ে যেতেন।
আরও পড়ুন:
জমজমের পানি পানের নিয়ম
♦ জমজম থেকে পানি পানকারী ব্যক্তির জন্য সুন্নত হল পুরোপুরিভাবে পরিতৃপ্ত হয়ে পান করা। ফকিহগণ জমজমের পানি পানের কিছু আদব উল্লেখ করেছেন। যেমন- কিব্লামুখী হওয়া, ‘বিসমিল্লাহ’ বলা, তিন শ্বাসে পান করা, পরিতৃপ্ত হওয়া, শেষে ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলা ইত্যাদি।
জমজম পানি পানের দোয়া
♦ ‘আল্লাহুম্মা ইন্নি আস’আলুকা ইলমান নাফি’আ, ওয়ারিজকান ওয়াসিয়া, ওয়াশিফা’আন মিন কুল্লি দায়িন।’ অর্থ : ‘হে আল্লাহ্! আমি আপনার কাছে উপকারী জ্ঞান, প্রশস্থ রিযিক এবং যাবতীয় রোগ থেকে আরোগ্য কামনা করছি।’ (দারা কুতনী, আবদুর রাজ্জাক ও হাকেম)
আরও পড়ুন:
জমজম পানিতে স্নান বৈধ কিনা?
♦ জমজম সম্পর্কে নবীজি সা. বলেছেন, ‘এটি বরকতময় এবং পুষ্টিকর খাদ্য।’ এর পবিত্র প্রকৃতির কারণে কিছু পণ্ডিত জমজম পানিকে গোসলের জন্য ব্যবহার করাকে মাকরূহ তকমা দিয়েছে। তবে অনেকে বলেছেন, জলাভাব দেখা দিলে স্নানে বাধা নেই।হায়েজ চলাকালীন জমজম পানির পান জায়েয কিনা?
♦ হ্যাঁ, মহিলাদের মাসিকের সময় জমজমের পানি পান করা জায়েয। শুধু তাই নয়, মহিলারা এটি দিয়ে মুখ ধুতেও পারেন।
https://www.puberkalom.in/shab-e-barat-how-to-celebrate-this-night-in-the-light-of-hadith/