মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যে এবার নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছে তুরস্ক। ইসরায়েলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী Naftali Bennett তুরস্ককে আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি বলে উল্লেখ করে দেশটিকে “নতুন ইরান” হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তাঁর এই মন্তব্য ঘিরেই আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে জল্পনা তৈরি হয়েছে।
গত ১৭ ফেব্রুয়ারি এক সম্মেলনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে বেনেট বলেন, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেব এরদোগান অত্যন্ত কৌশলী ও বিপজ্জনক নেতা এবং তিনি ইসরায়েলকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলার চেষ্টা করছেন। বেনেটের এই মন্তব্য এমন এক সময়ে সামনে এসেছে যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নিচ্ছে এবং পুরো পশ্চিম এশিয়াজুড়ে উত্তেজনা তুঙ্গে।


রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, ইরানকে দুর্বল করার পর ভবিষ্যতে তুরস্ককে নতুন কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা শুরু হয়েছে। তাঁদের মতে, পশ্চিমা সংবাদমাধ্যম ও বিভিন্ন থিংক-ট্যাংকে তুরস্কবিরোধী আলোচনা ও সমালোচনা বাড়ার ঘটনাও সেই ইঙ্গিতই দিচ্ছে।
নিজের বক্তব্যে বেনেট তুরস্কের বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি গুরুতর অভিযোগও আনেন। তাঁর দাবি, আঙ্কারা নাকি সৌদি আরবকে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে উসকে দেওয়ার চেষ্টা করছে এবং পারমাণবিক শক্তিধর পাকিস্তানের সঙ্গে মিলিত হয়ে একটি বৈরী সুন্নি জোট গঠনের পরিকল্পনাও করছে। পাশাপাশি সিরিয়া ও গাজাকে ব্যবহার করে ইসরায়েলের চারপাশে এক ধরনের শ্বাসরোধকারী বলয় তৈরির চেষ্টাও চলছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

বিশ্লেষক Mandy Turner মনে করেন, তুরস্ককে ঘিরে এই ধরনের বক্তব্য নতুন কিছু নয়। তাঁর মতে, দীর্ঘদিন ধরেই যে দেশ ইসরায়েলের নীতির বিরোধিতা করে বা তাদের প্রভাব স্বীকার করতে চায় না, তাকে নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে তুলে ধরার প্রবণতা ইসরায়েলি রাজনীতিতে দেখা যায়।
অন্যদিকে ইসরায়েলের সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী Yoav Gallant-ও তুরস্কের সমালোচনায় সরব হয়েছেন। তিনি পশ্চিমা দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, ন্যাটো সদস্য হওয়া সত্ত্বেও তুরস্কের কাছে অস্ত্র বিক্রির বিষয়টি নতুন করে পর্যালোচনা করা উচিত।
বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে সিরিয়ায় প্রেসিডেন্ট Bashar al-Assad-এর সরকারের পতনের পর সেখানে তুরস্কের ক্রমবর্ধমান প্রভাব ইসরায়েলের জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
একই সঙ্গে সিরিয়ার ভৌগোলিক অখণ্ডতা বজায় রাখার বিষয়ে আঙ্কারার কঠোর অবস্থান ইসরায়েলের কৌশলগত পরিকল্পনার পথে বাধা হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
এছাড়া Qatar ও Pakistan-এর সঙ্গে তুরস্কের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কও ইসরায়েলের দৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা ইস্যু হয়ে উঠেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ডানপন্থী কিছু সংবাদমাধ্যম ও থিংক-ট্যাংকও তুরস্ককে ঘিরে সমালোচনামূলক অবস্থান নিতে শুরু করেছে। American Enterprise Institute-এর বিশ্লেষক Michael Rubin মন্তব্য করেছেন, ভবিষ্যতে আঙ্কারাও বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়তে পারে।
এমনকি প্রভাবশালী মার্কিন সংবাদমাধ্যম The Wall Street Journal-এও তুরস্কের ন্যাটো সদস্যপদ নিয়ে প্রশ্ন তোলার মতো আলোচনা দেখা যাচ্ছে। ফলে তুরস্কের গণমাধ্যম ও বিশ্লেষকদের একাংশের আশঙ্কা, ইরাক, লিবিয়া বা ইরানের মতোই তুরস্ককেও ভবিষ্যতে অস্থিতিশীল করার কৌশল নেওয়া হতে পারে।
সব মিলিয়ে পশ্চিম এশিয়ার উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যেই নতুন করে তুরস্ককে ঘিরে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়ার সম্ভাবনা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে।