আবদুল ওদুদ: মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থাকে আধুনিক, উন্নত ও বিজ্ঞানসম্মত করে তোলার লক্ষ্যে একগুচ্ছ যুগান্তকারী ও সুদূরপ্রসারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন পশ্চিমবঙ্গ সরকার। ২০১২ সালে মুখ্যমন্ত্রীর ঐকান্তিক ঘোষণার পর ২০১৩-১৪ সালে প্রথম পর্যায়ে ২৩৫টি অনুদানহীন মাদ্রাসাকে স্বীকৃতি প্রদান করেছিল রাজ্য সরকার এবং ২০২১ সাল থেকে সেই সমস্ত মাদ্রাসাগুলিতে কর্মরত ১০ জন করে শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীকে নিয়মিত মাসিক সাম্মানিক প্রদান করা হচ্ছে। এই শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীরা ৬০ বছর বয়স পর্যন্ত মাদ্রাসাগুলিতে নিরবচ্ছিন্ন শিক্ষা পরিষেবা দিতে পারেন এবং রাজ্য সরকার প্রদত্ত সাম্মানিক লাভ করে থাকেন। এই মাদ্রাসাগুলিতে উন্নত পরিকাঠামো গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে রাজ্য সরকার এ যাবৎ ৩১ কোটি টাকা ব্যয় করেছে এবং ছাত্রছাত্রীরা নিয়মিতভাবে বিনামূল্যে বই, খাতা ও ঐক্যশ্রী স্কলারশিপের যাবতীয় সুবিধা ভোগ করছে। দ্বিতীয় পর্যায়ে আরও ৭০০টি মাদ্রাসাকে স্বীকৃতি প্রদানের লক্ষে আবেদনপত্রগুলি গুরুত্ব সহকারে যাচাই করে এবং যাবতীয় আইনগত শর্তাবলী মান্যতা দিয়ে ৬৮০টি অনুদানহীন মাদ্রাসাকে প্রাথমিক তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

পরবর্তীকালে জেলা পর্যায়ের সমীক্ষা ও প্রয়োজনীয় শুনানির ভিত্তিতে আরও ৩৬৬টি অনুদানহীন মাদ্রাসাকে চূড়ান্তভাবে স্বীকৃতি দিয়েছে পশ্চিমবঙ্গ মাদ্রাসা শিক্ষা পর্ষদ। নতুন এই মাদ্রাসাগুলির শিক্ষক ও অশিক্ষক কর্মচারীদের যোগ্যতামান যাচাইয়ের কাজ বর্তমানে জেলাস্তরে দ্রুতগতিতে চলছে এবং ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাস থেকে তাঁদের নিয়মিত মাসিক সাম্মানিক প্রদান শুরু হবে।

উল্লেখ্য, এই সমস্ত শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীরা ২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত তিন মাসের বকেয়া সাম্মানিকও এরিয়ার হিসেবে লাভ করবেন। নূতন অনুমোদন প্রাপ্ত এই মাদ্রাসাগুলির সাম্মানিক প্রদানের জন্য আগামী এক বছরের জন্য ইতিম্যেদই ৩৪ কোটি ৪৭ লক্ষ ৭২ হাজার টাকা মঞ্জুর করেছে রাজ্য অর্থ দপ্তর। অবশিষ্ট ৩১৪টি মাদ্রাসার মধ্যে ১০১টি অযোগ্য বিবেচিত হলেও বাকি ২১৩টি মাদ্রাসার যোগ্যতামান খতিয়ে দেখে পুনরায় বিবেচনার প্রক্রিয়া চালু রয়েছে।
সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পঠনপাঠনকে প্রযুক্তিনির্ভর ও অত্যাধুনিক করতে রাজ্যের ৬০০টি মাদ্রাসায় ১২০০ স্মার্ট ক্লাসের সুব্যবস্থা করা হয়েছে এবং শিক্ষার্থীরা ই-বইয়ের সুবিধাও পাচ্ছে। ১১৫টি মাদ্রাসায় কম্পিউটার ল্যাবরেটরি স্থাপনের পাশাপাশি মাদ্রাসার গ্রন্থাগারগুলিকে সমৃদ্ধ করতে ২০২৫ সালে ৪ কোটি ৭১ লক্ষ ২০ হাজার ৪২৫ টাকা মূল্যের লাইব্রেরি পুস্তক বিতরণ করা হয়েছে এবং ২০২৬ শিক্ষাবর্ষের জন্য আরও ৫ কোটি ২০ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে বই ক্রয়ের জন্য। বিজ্ঞান শিক্ষার বিশেষ প্রসারে ৭৬টি মাদ্রাসার বিজ্ঞানাগার বা সায়েন্স ল্যাবের আধুনিকীকরণে ৪ কোটি ১০ লক্ষ টাকা বরাদ্দ করেছে রাজ্য সরকার এবং শীঘ্রই প্রয়োজনীয় ল্যাব সামগ্রী মাদ্রাসাগুলিতে পৌঁছে দেওয়া হবে। মাদ্রাসাগুলিতে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রেও ব্যাপক গতি এনেছে প্রশাসন যার ফলে মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশনের মাধ্যমে এ যাবৎ ৯৮৯০ জন শিক্ষক ও ৭৭৪ জন অশিক্ষক কর্মচারী নিয়োগ করা হয়েছে। সম্প্রতি সপ্তম এসএলএসটির মাধ্যমে ১০৩৫ জন সহকারী শিক্ষক নিয়োগ করা হয়েছে এবং আইনি জটিলতা কাটিয়ে গ্রুপ-ডি পদে ২৯৫ জনকে নতুনভাবে নিয়োগপত্র প্রদান করা হয়েছে। এছাড়া সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত ও অনুদানহীন মাদ্রাসার শিক্ষকদের মানোন্নয়নে কলকাতার মহাজাতি সদন ও শিলিগুড়ির দীনবন্ধু মঞ্চের মতো স্থানে বিশেষ কর্মশালার আয়োজন করে মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থার সামগ্রিক উত্তরণে পশ্চিমবঙ্গ সরকার তার দৃঢ় প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে চলেছে।