পুবের কলম, ওয়েবডেস্ক: ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের অবসান এখনই ঘটবে—এমন আশা করার সময় এখনও আসেনি। আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতায় দ্রুত সমাধানের সম্ভাবনাও স্পষ্ট নয়। পরিস্থিতি এখনও অস্থির এবং ইরানের সহনশীলতা ও প্রতিরোধক্ষমতার কঠিন পরীক্ষা চলছে। তবে সংঘাতের এই প্রাথমিক পর্যায়েই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে—বিশ্বরাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা ভবিষ্যতে কী হবে। অনেকে যুক্তরাষ্ট্রের পতনের কথা বললেও বাস্তবে দেশটি বিশ্বমঞ্চ থেকে হঠাৎ হারিয়ে যাবে—এমন সম্ভাবনা আপাতত খুব কম। বরং বড় শক্তিগুলোর কাছে এখন মূল প্রশ্ন হলো, দ্রুত বদলে যাওয়া বিশ্বব্যবস্থার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে কীভাবে মানিয়ে নেবে।
রাশিয়ার জন্য বিষয়টি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ পশ্চিমা বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্র হলো যুক্তরাষ্ট্র, আর রাশিয়ার সঙ্গে তার সম্পর্ক ঐতিহাসিকভাবে যেমন ঘনিষ্ঠ, তেমনি সংঘাতপূর্ণও। ভৌগোলিক অবস্থান ও ইতিহাসের কারণে রাশিয়ার কৌশলগত ভাবনায় ইউরোপ ও আমেরিকা সব সময়ই গুরুত্বপূর্ণ। তাই ভবিষ্যতের শক্তির ভারসাম্যে যুক্তরাষ্ট্রকে কীভাবে অন্তর্ভুক্ত করা যায়, তা নিয়ে মস্কোকে এখন গভীরভাবে ভাবতে হচ্ছে।
ইরানে সাম্প্রতিক হামলাকে অনেকেই একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে দেখছেন। কারণ এটি এমন এক বিশ্ব বাস্তবতার ইঙ্গিত দিচ্ছে, যেখানে আর কোনো দেশ যুক্তরাষ্ট্রের একক আধিপত্য মেনে নিতে প্রস্তুত নয়। ইরান কত দিন এই সামরিক চাপ সহ্য করতে পারবে, তার মিত্ররা কতটা সহায়তা করবে, আর ওয়াশিংটন নিজেই কত দিন এই অভিযান চালিয়ে যেতে পারবে—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনও পরিষ্কার নয়।
বর্তমান সংঘাতে একটি পরস্পরবিরোধী চিত্রও দেখা যাচ্ছে। একদিকে ইসরায়েলি নেতৃত্ব তাদের লক্ষ্য পূরণে শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যেতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। অন্যদিকে ইরানের অপ্রত্যাশিত প্রতিরোধ দেখে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট Donald Trump এবং তাঁর প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মধ্যেও বিস্ময় দেখা যাচ্ছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অনেক মিত্র দেশও এই সংঘাতের সম্ভাব্য পরিণতি নিয়ে উদ্বিগ্ন। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাব ইতিমধ্যেই বিশ্ব অর্থনীতিতে পড়তে শুরু করেছে। জ্বালানি সরবরাহ, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ—সব ক্ষেত্রেই অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
এই অর্থনৈতিক চাপের কারণেই এমন গুঞ্জনও শোনা যাচ্ছে যে তেহরানের সঙ্গে আলোচনার পথ খুলতে ওয়াশিংটন হয়তো গোপনে মধ্যস্থতাকারী খুঁজছে। এই পরিস্থিতিতে রাশিয়া প্রকাশ্যে ইরানের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। মস্কোর মতে, ইরান বিনা উসকানিতে হামলার শিকার হয়েছে। একই সঙ্গে রাশিয়া আন্তর্জাতিক শক্তির ভারসাম্যের দিকটিও বিবেচনায় রাখছে। বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বরাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান বোঝাতে একটি উপমা ব্যবহার করা যায়। অনেকটা এমন এক সত্তার মতো, যা পুরো ব্যবস্থাকে ধ্বংস না করে বরং সেই ব্যবস্থার ভেতরেই নিজস্ব প্রভাব বিস্তার করে টিকে থাকে। আজকের বাস্তবতা হলো, যুক্তরাষ্ট্রের সেই ঐতিহাসিক সুবিধাজনক অবস্থার অনেকটাই বদলে গেছে। এখন অন্য শক্তিগুলো আর আগের মতো পিছিয়ে নেই। ফলে ভবিষ্যতের বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্র একক আধিপত্যকারী শক্তি হিসেবে নয়, বরং একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবেই ভূমিকা পালন করতে পারে।
ইরান সংকট এই পরিবর্তনেরই প্রতিফলন। বিপুল সামরিক শক্তি থাকা সত্ত্বেও পরমাণু যুদ্ধের ঝুঁকি না নিয়ে ইরানের মতো একটি বড় রাষ্ট্রকে সহজে দমিয়ে রাখা যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে সম্ভব নয়। আর পরমাণু যুদ্ধের পথ যে সব পক্ষের জন্যই ভয়াবহ, তা সবারই জানা। তবে অনেকের মতে, মার্কিন আধিপত্য কমে গেলে বিশ্বে অবশ্যম্ভাবী বিশৃঙ্খলা নেমে আসবে—এই ধারণা পুরোপুরি সত্য নয়। বরং একটি সুষম আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা গড়ে ওঠার সম্ভাবনাও রয়েছে, যেখানে কোনো একক শক্তি অন্যদের ওপর সম্পূর্ণ আধিপত্য বিস্তার করতে পারবে না। এই নতুন বিশ্বব্যবস্থা আগের তুলনায় অনেক বেশি জটিল ও বৈচিত্র্যময় হতে পারে। পথে নানা সংকট ও সংঘাত দেখা দিতেই পারে। তবে বড় ধরনের বিপর্যয় এড়াতে পারলে ভবিষ্যতের বিশ্বরাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্র গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবেই থাকবে—তবে আগের মতো একক আধিপত্যের অবস্থানে নয়।