০১ জানুয়ারী ২০২৬, বৃহস্পতিবার, ১৬ পৌষ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

বিয়ের বয়স বৃদ্ধির বিলে ত্রস্ত তেলেঙ্গানায় গরিব পরিবারে নিকাহ–র ধুম লেগেছে

হায়দরাবাদঃ  ছেলে এবং মেয়েদের বিয়ের ন্যূনতম বয়স বাড়ানোর বিল সংসদে পেশ হওয়ার পর থেকেই তেলেঙ্গানায় গরিব মুসলিমদের ঘরে ঘরে আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে।যাদের বছরখানেক বাদে জাঁকজমক করে বিয়ে হওয়ার কথা ছিল তারা রাতারাতি সব আয়োজন করে সাধারণভাবে বিয়ে দিয়ে দিয়েছে মেয়ের।তাছাড়া গ্রামে গরিব পরিবারে ১৮ বছর হলেই মেয়েদের বিয়ে দিয়ে দেওয়াই রীতি। কারণ তারা বেশিকাল সন্তানের ভরণপোষণের দায়িত্ব নিতে পারে না। ছেলেরা যা হোক কাজ জোগাড় করে নেয়, আর মেয়েদের ১৮ ছুঁইছুঁই হলেই বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয়।তারা এই আইনের কথা শুনে সাততাড়াতাড়ি বিয়ের ব্যবস্থা করতে ওয়াকফ পর্ষদে লাইন দিচ্ছেন। তেলেঙ্গানার রাজ্য ওয়াকফ পর্ষদই স্বীকৃত কাজিদের মারফত বিয়ের সার্টিফিকেট দেয়। সচরাচর যেখানে দৈনিক ১০০ বিয়ের আবেদন জমা পড়ত এখন সেখানে প্রতিদিন ৩০০ আবেদন জমা পড়ছে।

কেন্দ্রীয় সরকার সংসদে যে বিল পেশ করেছে, তাতে ছেলে এবং মেয়ে উভয়ের বিয়ের ন্যূনতম বয়স ২১ করার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ এই বিল আইন হলে ২১ বছরের কমে বিয়ে করা বেআইনি কাজ হবে।তেলেঙ্গানা ওয়াকফ বোর্ডের চেয়ারম্যান মুহাম্মদ সালিম বললেন, ‘ওই বিল পেশ হওয়ার পর ২ সপ্তাহে ১০০০ এর বেশি বিয়ের আবেদনপত্র জমা পড়েছিল।এখন যারা আসছে বলছি, বিল এখনও পাস হয়নি, হাতে সময় আছে, তাড়াহুড়ো করার কোনও কারণ নেই।তাতে ভিড় কমেছে।আমরা ইমামদেরও বলে দিয়েছি, জুম্মার নামাযের ভাষণে বিষয়টি সকলকে বুঝিয়ে বলতে যাতে আতঙ্ক না ছড়ায়’। সালিম বললেন, ‘এই অআতঙ্ক শুধু হায়দরাবাদেই ছড়ায়নি, সারা রাজ্যেই ছড়িয়েছে’। হায়দরাবাদের সাংসদ আসাদুদ্দিন ওয়াইসি এই বিলের বিরোধিতা করে বলেছেন, ‘সংবিধানে ১৯ ধারায় যে স্বাধীনতা সব নাগরিককে দেওয়া হয়েছে, এই বিল তাকেই উপেক্ষা করছে। ১৮ বছর বয়সের ছেলেমেয়ে ভোট দিয়ে প্রধানমন্ত্রী কে হবেন তা ঠিক করতে পারে, লিভ–ইন করতে পারে, যৌন সম্পর্ক করলেও পসকো আইনের আওতায় পড়বে না, আর বিয়ে করলেই দোষ? ১৮ বছরের ছেলেমেয়েদের জন্য সরকার কী করেছে? ভারতে শ্রমিকের কাজে মেয়েদের অংশগ্রহন সোমালিয়ার চেয়েও কম। মোদির বেটি বাঁচাও, বেটি পড়াও কর্মসূচির ৮৯ ভাগ টাকা তো প্রচারের জন্য খরচ করা হয়’।

তেলেঙ্গানায় সরকার স্বীকৃত ২০০–র মতো কাজি রয়েছেন, যারা নিকাহ পরিচালনা করেন। তাঁরা বলছেন, দম ফেলার ফুরসত নেই। যেখানে সাধারণ সময়ে দিনে ৮টা করে নিকাহ করতে হয়, এখন দিনে ২০টি করে নিকাহ করতে হচ্ছে। কাদের পাশা স্বীকৃত কাজি। তিনি বললেন, ‘সারাদিন আমার মোবাইলে কল আসছে। মেয়েদের আব্বারা ফোন করছেন।আমরা যেন জেরবার হয়ে গিয়েছি।এমন সব মেয়েরও বিয়ে দিতে চাইছেন আব্বারা, যাদের এখনও ১৭ হয়নি।আমরা বারণ করছি। ওরা নাছোড়বান্দা’। কাদের জানালেন, ‘পরিবার থেকে সকালে ফোন করছে, সন্ধ্যায় আমরা যাচ্ছি, মামুলি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আইনি নিকাহ সেরে নিচ্ছে।বলছে, মেয়ে এখন বাড়িতেই থাকবে। আসল অনুষ্ঠান হলে মেয়ে স্বামীর ঘরে যাবে।পাছে অআইন বদলে গেলে বিয়ের ৩ বছর দেরি হয়ে যায়, তাই নিকাহ সেরে রাখার ধুম পড়ে গিয়েছে রাজ্যজুড়ে।আপনি গিয়ে দেখুন এমন কোনও পাড়া পাবেন না যেখানে নিকাহ হচ্ছে না’।

এভাবেই হায়দরাবাদের তালাব কাট্টা মহল্লায় ৪৫ বছরের অটোচালক হাসানের মেয়ে নাজমার নিকাহ হয়ে গেল। পড়া শেষ করে ১ বছর পর নাজমার নিকাহ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ওই আইনের ভয়ে তা এগিয়ে আনল পরিবার।হাসান বললেন, ‘আমার আরও তিন মেয়ে রয়েছে। ৩ বছর অপেক্ষা করতে পারব না।রিশতা আগেই ঠিক ছিল’।

হায়দরাবাদের আমুমত সোসাইটির সম্পাদিকা খালিদা পারভিন কেন্দ্রের বিরুদ্ধে তোপ দেগে বললেন, ‘বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে ওদের কোনও ধারণা নেই।মধ্যবিত্ত এবং ধনী পরিবারের কথা আলাদা। কিন্তু গরিব পরিবারে ১৮ বছরের মধ্যে মেয়েদের বিয়ে দেওয়া ছাড়া উপায় নেই। স্বাভাবিকভাবেই ওইসব পরিবারে আতঙ্ক ছড়িয়েছে’।

ট্যাগ :
সর্বধিক পাঠিত

এসআইআর-এর শুনানির নোটিস পেয়ে ছিলেন আতঙ্কে, হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু বৃদ্ধার

Copyright © Puber Kalom All rights reserved.| Developed by eTech Builder

বিয়ের বয়স বৃদ্ধির বিলে ত্রস্ত তেলেঙ্গানায় গরিব পরিবারে নিকাহ–র ধুম লেগেছে

আপডেট : ৮ জানুয়ারী ২০২২, শনিবার

হায়দরাবাদঃ  ছেলে এবং মেয়েদের বিয়ের ন্যূনতম বয়স বাড়ানোর বিল সংসদে পেশ হওয়ার পর থেকেই তেলেঙ্গানায় গরিব মুসলিমদের ঘরে ঘরে আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে।যাদের বছরখানেক বাদে জাঁকজমক করে বিয়ে হওয়ার কথা ছিল তারা রাতারাতি সব আয়োজন করে সাধারণভাবে বিয়ে দিয়ে দিয়েছে মেয়ের।তাছাড়া গ্রামে গরিব পরিবারে ১৮ বছর হলেই মেয়েদের বিয়ে দিয়ে দেওয়াই রীতি। কারণ তারা বেশিকাল সন্তানের ভরণপোষণের দায়িত্ব নিতে পারে না। ছেলেরা যা হোক কাজ জোগাড় করে নেয়, আর মেয়েদের ১৮ ছুঁইছুঁই হলেই বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয়।তারা এই আইনের কথা শুনে সাততাড়াতাড়ি বিয়ের ব্যবস্থা করতে ওয়াকফ পর্ষদে লাইন দিচ্ছেন। তেলেঙ্গানার রাজ্য ওয়াকফ পর্ষদই স্বীকৃত কাজিদের মারফত বিয়ের সার্টিফিকেট দেয়। সচরাচর যেখানে দৈনিক ১০০ বিয়ের আবেদন জমা পড়ত এখন সেখানে প্রতিদিন ৩০০ আবেদন জমা পড়ছে।

কেন্দ্রীয় সরকার সংসদে যে বিল পেশ করেছে, তাতে ছেলে এবং মেয়ে উভয়ের বিয়ের ন্যূনতম বয়স ২১ করার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ এই বিল আইন হলে ২১ বছরের কমে বিয়ে করা বেআইনি কাজ হবে।তেলেঙ্গানা ওয়াকফ বোর্ডের চেয়ারম্যান মুহাম্মদ সালিম বললেন, ‘ওই বিল পেশ হওয়ার পর ২ সপ্তাহে ১০০০ এর বেশি বিয়ের আবেদনপত্র জমা পড়েছিল।এখন যারা আসছে বলছি, বিল এখনও পাস হয়নি, হাতে সময় আছে, তাড়াহুড়ো করার কোনও কারণ নেই।তাতে ভিড় কমেছে।আমরা ইমামদেরও বলে দিয়েছি, জুম্মার নামাযের ভাষণে বিষয়টি সকলকে বুঝিয়ে বলতে যাতে আতঙ্ক না ছড়ায়’। সালিম বললেন, ‘এই অআতঙ্ক শুধু হায়দরাবাদেই ছড়ায়নি, সারা রাজ্যেই ছড়িয়েছে’। হায়দরাবাদের সাংসদ আসাদুদ্দিন ওয়াইসি এই বিলের বিরোধিতা করে বলেছেন, ‘সংবিধানে ১৯ ধারায় যে স্বাধীনতা সব নাগরিককে দেওয়া হয়েছে, এই বিল তাকেই উপেক্ষা করছে। ১৮ বছর বয়সের ছেলেমেয়ে ভোট দিয়ে প্রধানমন্ত্রী কে হবেন তা ঠিক করতে পারে, লিভ–ইন করতে পারে, যৌন সম্পর্ক করলেও পসকো আইনের আওতায় পড়বে না, আর বিয়ে করলেই দোষ? ১৮ বছরের ছেলেমেয়েদের জন্য সরকার কী করেছে? ভারতে শ্রমিকের কাজে মেয়েদের অংশগ্রহন সোমালিয়ার চেয়েও কম। মোদির বেটি বাঁচাও, বেটি পড়াও কর্মসূচির ৮৯ ভাগ টাকা তো প্রচারের জন্য খরচ করা হয়’।

তেলেঙ্গানায় সরকার স্বীকৃত ২০০–র মতো কাজি রয়েছেন, যারা নিকাহ পরিচালনা করেন। তাঁরা বলছেন, দম ফেলার ফুরসত নেই। যেখানে সাধারণ সময়ে দিনে ৮টা করে নিকাহ করতে হয়, এখন দিনে ২০টি করে নিকাহ করতে হচ্ছে। কাদের পাশা স্বীকৃত কাজি। তিনি বললেন, ‘সারাদিন আমার মোবাইলে কল আসছে। মেয়েদের আব্বারা ফোন করছেন।আমরা যেন জেরবার হয়ে গিয়েছি।এমন সব মেয়েরও বিয়ে দিতে চাইছেন আব্বারা, যাদের এখনও ১৭ হয়নি।আমরা বারণ করছি। ওরা নাছোড়বান্দা’। কাদের জানালেন, ‘পরিবার থেকে সকালে ফোন করছে, সন্ধ্যায় আমরা যাচ্ছি, মামুলি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আইনি নিকাহ সেরে নিচ্ছে।বলছে, মেয়ে এখন বাড়িতেই থাকবে। আসল অনুষ্ঠান হলে মেয়ে স্বামীর ঘরে যাবে।পাছে অআইন বদলে গেলে বিয়ের ৩ বছর দেরি হয়ে যায়, তাই নিকাহ সেরে রাখার ধুম পড়ে গিয়েছে রাজ্যজুড়ে।আপনি গিয়ে দেখুন এমন কোনও পাড়া পাবেন না যেখানে নিকাহ হচ্ছে না’।

এভাবেই হায়দরাবাদের তালাব কাট্টা মহল্লায় ৪৫ বছরের অটোচালক হাসানের মেয়ে নাজমার নিকাহ হয়ে গেল। পড়া শেষ করে ১ বছর পর নাজমার নিকাহ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ওই আইনের ভয়ে তা এগিয়ে আনল পরিবার।হাসান বললেন, ‘আমার আরও তিন মেয়ে রয়েছে। ৩ বছর অপেক্ষা করতে পারব না।রিশতা আগেই ঠিক ছিল’।

হায়দরাবাদের আমুমত সোসাইটির সম্পাদিকা খালিদা পারভিন কেন্দ্রের বিরুদ্ধে তোপ দেগে বললেন, ‘বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে ওদের কোনও ধারণা নেই।মধ্যবিত্ত এবং ধনী পরিবারের কথা আলাদা। কিন্তু গরিব পরিবারে ১৮ বছরের মধ্যে মেয়েদের বিয়ে দেওয়া ছাড়া উপায় নেই। স্বাভাবিকভাবেই ওইসব পরিবারে আতঙ্ক ছড়িয়েছে’।