বিশেষ প্রতিবেদক, বহরমপুর: কেন্দ্রের ওয়াকফ আইনের বিরুদ্ধে ফের তপ্ত মুর্শিদাবাদের বিভিন্ন এলাকা। এর আগে জঙ্গিপুরে সংঘর্ষের খবর মিলেছিল। আর এবার সামশেরগঞ্জের ডাকবাংলা মোড়, ধূলিয়ান, সুতির সাজুমোড়, অরঙ্গাবাদ প্রভৃতি এলাকায় অশান্তির খবর মিলেছে। এমনকী জঙ্গিপুরের সাংসদ খলিলুর রহমানের বাড়িতেও ভাঙচুর হয়েছে বলে অভিযোগ। তাঁর বাড়ির সিসি ক্যামেরা, লাইট ও অন্যান্য আসবাবপত্র ভাঙচুর করা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। রাজ্য হজ কমিটির চেয়ারম্যান তথা জঙ্গিপুর সাংগঠনিক জেলা তৃণমূল সভাপতি খলিলুর রহমানকে অশ্রাব্য ভাষায় গালমন্দ করা হয় এবং তাঁর উপর হামলার চেষ্টা হয় বলেও অভিযোগ।
আরও পড়ুন:
যদিও স্থানীয়দের অনেকে দাবি করছেন, বিজেপি আশ্রিত দুষ্কৃতীরা বিক্ষোভের ভিড়ে মিশে গিয়ে ‘পরিকল্পিত হামলা’ চালিয়েছে। আগুন লাগিয়ে পরিস্থিতি অগ্নিগর্ভ করার চেষ্টা করেছে। সাম্প্রদায়িক অশান্তি তৈরির চেষ্টা করেছে, যেটা বাংলায় গেরুয়া শিবির দীর্ঘকাল ধরে ছক করে আসছে যাতে ধর্মীয় মেরুকরণ করে ক্ষমতা দখল করা যায়। বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও এই নিয়ে একাধিকবার সতর্ক করেছেন রাজ্যবাসীকে।
আরও পড়ুন:
ঘটনার সূত্রপাত শুক্রবার দুপুরে। ডাকবাংলা মোড়, সাজুর মোড় প্রভৃতি এলাকায় জড়ো হতে থাকে বিক্ষোভকারীরা। একটা সময় তারা ১২ নং জাতীয় সড়ক অবরোধ করে।
এভাবে রাস্তা অবরোধের কারণে ফরাক্কা-জঙ্গিপুরমুখী জাতীয় সড়কে ব্যাপক যানজটের সৃষ্টি হয়। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে আসে সামশেরগঞ্জ থানার একদল পুলিশকর্মী। সেখানেই দু’পক্ষের মধ্যে বচসা হয়। বিক্ষোভকারীদের দাবি, তাদের উপর পুলিশ ব্যাপক লাঠি চার্জ করেছে। তাতে আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এলাকা। স্থানীয়দের অভিযোগ, বিক্ষোভকারীদের মধ্যে মিশে গিয়েছিল অন্য রাজনৈতিক দলের দুষ্কৃতীরা। তারাই পুলিশের উপর প্রথম হামলা চালায়। পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করা হয়। তাতে আহত হন বেশ কয়েকজন পুলিশকর্মী। অন্যদিকে, পুলিশের লাঠি চার্জের ঘটনায় বেশ কয়েকজন বিক্ষোভকারী জখম হয়েছে। তবে, এখানেই শেষ নয়। একটা সময় পর একটি সরকারি বাস, একটি বেসরকারি বাস এবং ২টি অ্যাম্বুলেন্সেও আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। বিজেপি আশ্রিত একদল দুষ্কৃতী এই অপকর্মের সঙ্গে যুক্ত বলে অভিযোগ। এদিন ডাকবাংলা মোড়ে অশান্তির খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে যান জঙ্গিপুরের সাংসদ খলিলুর রহমান ও ফরাক্কার বিধায়ক মনিরুল ইসলাম। তাঁরা জনতাকে শান্ত হওয়ার জন্য বারংবার অনুরোধ করতে থাকেন। অভিযোগ, সে সময় একদল দুষ্কৃতী তাঁদের লক্ষ্য করে ব্যাপক গালিগালাজ ও অশ্লীল কটূক্তি করতে থাকে। এরপরেই খলিলুরের বাসভবনে হামলা হয় বলে অভিযোগ। যদিও খলিলুর, মনিরুলরা জনতাকে কোনও প্ররোচণায় পা না দিতে বারবার আহ্বান জানান। তাঁরা বলেন,বাংলার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির যে চিরকালের ঐতিহ্য রয়েছে তাকে রক্ষা করতেই হবে। হিন্দু-মুসলিম, জাতি-ধর্র্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাইকে সেটা করতে হবে। খলিলুর জনতার উদ্দেশ্যে বলেন, কেন্দ্রের ওয়াকফ আইনের বিরুদ্ধে লড়াই করছেন খোদ তৃণমূল সুপ্রিমো তথা রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। মুখ্যমন্ত্রীর উপর আস্থা রাখুন। শান্তিপূর্ণ উপায়ে প্রতিবাদ করুন। এদিকে, প্রশাসন সূত্রে জানানো হয়েছে, পরিস্থিতি এখন নিয়ন্ত্রণে। এলাকা জুড়ে পুলিশি টহলদারি বাড়ানো হয়েছে। অন্যদিকে, মুর্শিদাবাদের বিশিষ্টজনেরাও বিজেপির পাতা ফাঁদে পা না ফেলার জন্য সর্বস্তরের মানুষের কাছে আহ্বান জানিয়েছেন। এছাড়াও এদিন জেলার হরিহরপাড়ার শ্রীপুর জুম্মা মসজিদ, স্বরুপপুর জুম্মা মসজিদ, কান্দিপাড়া, দস্তুরপাড়া-সহ একাধিক জুম্মা মসজিদে জুম্মার নামাজ শেষে প্রতিবাদ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। নওদার গঙ্গাধারী ব্রীজ এলাকায় জমায়েত হন আশেপাশের এলাকার বহু মানুষ। ওয়াকফ আইন প্রত্যাহারের দাবিতে আয়োজিত প্রতিবাদ মিছিলটি গজনীপুর এলাকায় শেষ হয়।আরও পড়ুন:
তবে শুধু মুর্শিদাবাদ নয়, জেলায়-জেলায় চলছে ওয়াকফ বিরোধী বিক্ষোভ। দক্ষিন ২৪ পরগনার বিষ্ণুপুর থানার আমতলায় এদিন তুমুল বিক্ষোভ হয়। সেখানেও পুলিশের গাড়িতে ভাঙচুরের অভিযোগ উঠেছে। আমতলা চৌরাস্তা অবরোধ করে চলে বিক্ষোভ। অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে ১১৭ জাতীয় সড়ক। ব্যাপক যানজটও তৈরি হয় এলাকায়। পরে পুলিশের বিরাট টিম এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। ওয়াকফ ইস্যুতে উত্তেজনার ছবি দেখা যায় হুগলির চাঁপদানিতেও। এছাড়াও বীরভূমের সিউড়িতে এদিন জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রায় ৫০ হাজার মানুষ উপস্থিত হয়ে শহরের ঈদগাহ ময়দানে জুম্মার নামায আদায় করেন। জুম্মার নামায শেষে উপস্থিত মানুষজন সুশৃঙ্খলভাবে মিছিল করে জেলাশাসকের কাছে কালাকানুন নয়া ওয়াকফ আইন বাতিলের দাবি জানিয়ে স্মারকলিপি দেন। নলহাটির বাসস্ট্যাণ্ড সংলগ্ন এলাকায় এসডিপিআইয়ের নেতৃত্বে সাধারণ মানুষ এই আইন বাতিলের দাবিতে সোচ্চার হন। উত্তর দিনাজপুরের চাকুলিয়ার শিরশি মাদ্রাসা ময়দানেও বিক্ষুদ্ধ জনতা বিশাল প্রতিবাদ জমায়েত করেন।