জিশান আলি মিঞা– ডোমকল প্রায় এক দশক আগেও এলাকার অধিকাংশ মেয়ের লেখাপড়ায় ছেদ পড়ত হাইস্কুলের গণ্ডী পেরোনোর আগেই। বাল্যবিবাহের মত ঘটনা ছিল ওই এলাকার চেনা ছবি। কিন্তু গত এক দশকেই একটি মাদ্রাসা বদলে দিয়েছে সেই ছবি। এলাকার অধিকাংশ বাড়ির মেয়েরা এখন স্কুলমুখী হয়েছে। করোনা আবহেও কমেছে স্কুলছুটের সংখ্যা। বন্ধ হয়েছে বাল্যবিবাহের মত সামাজিক ব্যাধিও।
শুধু মুর্শিদাবাদ নয় গোটা রাজ্যকে পথ দেখাচ্ছে মুর্শিদাবাদের বেলডাঙা থানার দেবকুন্ড শেখ আব্দুর রাজ্জাক মেমোরিয়াল গালর্স হাই মাদ্রাসা। মেয়েদের এই মাদ্রাসা এখন রাজ্যের সামনে রোল মডেল।
স্থানীয় সূত্রে খবর– ২০১০ সালে এলাকার মাত্র ৭৮ জন কিশোরীকে নিয়ে শুরু হয়েছিল মাদ্রাসার পথচলা। ওই পড়ুয়াদের অধিকাংশই ছিল স্কুলছুট বা অন্য স্কুলে পাশ করতে না পারা পড়ুয়া। কিন্তু বলা বাহুল্য! গত এক দশকে অনেকটাই প্রায় বদলেছে স্কুলের মানচিত্র। সেই থেকে বর্তমানে ছাত্রীর সংখ্যা বেড়ে এখন এগারোশো ছুঁইছুঁই। তবে শিক্ষিকার সংখ্যা মাত্র ১১।
এক অংশের অভিজ্ঞ মহলের মতে শুধু পড়ুয়ার সংখ্যা বৃদ্ধিই নয়– বেড়েছে মাদ্রাসার পঠনপাঠনের যথাযথ মানও। এবছর মাদ্রাসা পর্ষদের পরীক্ষায় মাধ্যমিকে রাজ্যে যুগ্মভাবে দ্বিতীয় হয়েছে এই মাদ্রাসারই পড়ুয়া আনিসা সুলতানা। সে আবার এই মাদ্রাসার ‘চাইল্ড ক্যাবিনেট’ এর প্রধানমন্ত্রী। স্কুলের পরিষ্কার– পরিচ্ছন্নতা– মিড-ডে-মিল থেকে শুরু করে ছাত্রীদের যেকোনো সুবিধা অসুবিধায় ভরসা ‘চাইল্ড ক্যাবিনেট’ ও ‘মীনা মঞ্চ’। কথায় কথায় আনিসা জানালেন এক দীর্ঘ সময় ধরে মাদ্রাসা বন্ধ থাকলেও আমরা চারজন নাবালিকার বিয়ে রদ করেছি।
প্রসঙ্গত– করোনা আবহে জেরে প্রায় দেড় বছরের বেশি সময় ধরে বন্ধ রয়েছে রাজ্যের সমস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। তবে বন্ধ থেকেও একপ্রকার খোলা রয়েছে এই মাদ্রাসা। নিয়মিত পড়াশোনার খোঁজ নেওয়ার পাশাপাশি পড়ুয়াদের পারিপার্শ্বিক– অর্থনৈতিক অবস্থার দিকেও নজর দিয়েছেন মাদ্রাসার শিক্ষিকারা। অনলাইনে ক্লাস বা মোবাইলে পড়া বুঝিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি অনেক শিক্ষিকা অধিকাংশ পড়ুয়াদের বাড়ি গিয়েও দেখিয়ে দিয়ে এসেছেন অঙ্ক– ইংরেজি– ভূগোল– বিজ্ঞানের মত বিষয়। করোনা আবহে চার পড়ুয়াদের বিয়েও রদ করেছে শিশু মন্ত্রীসভার সদস্যরা। যা এলাকার বাসিন্দাদের কাছে এক অনন্য নজিরই বলা যায়। স্থানীয় বাসিন্দা কবিরুল ইসলাম বলেন– আগে এলাকায় মেয়েদের হাইস্কুলের গণ্ডী পেরোনোর আগেই বিয়ে দেওয়া অর্থাৎ বাল্যবিবাহ দেওয়ার প্রবণতা ছিল। এই মাদ্রাসা হওয়ার পর সেটা অনেকটাই কমেছে। চুপিসাড়ে ছাত্রীদের নাবালিকা অবস্থায় বিয়ের তোড়জোড় শুরু হলেও তা বন্ধ হচ্ছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই কমছে স্কুলছুটের মতো ঘটনাও। মাদ্রাসার পঠনপাঠন– খেলাধূলার মান প্রশংসনীয়।
মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষিকা মুর্শিদা খাতুন বলেন এলাকার শুভবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষ ও শিক্ষিকারা মিলে সর্বোতভাবে আমরা চেষ্টা করছি যাতে আরও বেশি করে এলাকার মেয়েদের শিক্ষার আঙিনায় নিয়ে আসা যায়। পড়াশোনা– খেলাধূলায় মেয়েরা যেভাবে ভালো ফল করছে তাতে আমরা আশার আলো দেখতে পাচ্ছি।
অন্যদিকে– মাদ্রাসারই আর এক ছাত্রী নাজিয়া সুলতানা বললেন– আব্বা বাইরে রাজমিস্ত্রির কাজ করতো। গত বছরের লক ডাউনের জেরে সেই কাজ চলে যায়– আর সেখানে ফিরতে পারেনি। মাদ্রাসার শিক্ষিকারা যদি এভাবে পাশে এসে না দাঁড়াতো তাহলে আমার পড়াশোনা আজ কবেই লাটে উঠে যেত!

























