চলমান আঞ্চলিক উত্তেজনা ও আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির সুযোগে ইরানের তেল রপ্তানি আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, গত এক মাসে তেল বিক্রি থেকে দেশটির আয় প্রায় ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে, যা ইরানের অর্থনীতিতে নতুন গতি সঞ্চার করেছে। বিশেষ করে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং রপ্তানি কৌশলের পরিবর্তনের কারণে এই প্রবৃদ্ধি সম্ভব হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, মার্চ ২০২৬-এ ইরান প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৩৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় করেছে, যেখানে ফেব্রুয়ারিতে এই আয় ছিল প্রায় ১১৫ মিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ মাত্র এক মাসের ব্যবধানে দৈনিক আয়ে প্রায় ২১ শতাংশ বৃদ্ধি হয়েছে। তবে কিছু আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, বাজার পরিস্থিতি ও রপ্তানির বাস্তব হিসাব ধরলে ইরানের মোট তেল আয় বৃদ্ধির হার প্রায় ৪০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে।


বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রবৃদ্ধির সবচেয়ে বড় কারণ হলো বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের মূল্যবৃদ্ধি। সাম্প্রতিক আঞ্চলিক অস্থিরতার কারণে ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। এর ফলে ইরান আগের তুলনায় অনেক বেশি দামে তেল বিক্রি করতে পারছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানকে ঘিরে উত্তেজনা বিশ্ববাজারে জ্বালানির দামে চাপ সৃষ্টি করেছে, যা ইরানের জন্য অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক হয়েছে।
শুধু দাম বৃদ্ধি নয়, ইরানি তেলে ডিসকাউন্ট কমে আসাও আয়ের বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে এতদিন ইরানকে বড় অঙ্কের ছাড় দিয়ে তেল বিক্রি করতে হতো।
কিন্তু বর্তমানে বিশ্ববাজারে সরবরাহ সংকট দেখা দেওয়ায় ক্রেতারা তুলনামূলক কম ছাড়ে ইরানি তেল কিনতে রাজি হচ্ছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারমূল্যের কাছাকাছি দামে তেল বিক্রি করে বেশি রাজস্ব আয় করতে পারছে তেহরান।
এছাড়া রপ্তানি ব্যবস্থাপনায় কৌশলগত সুবিধাও কাজে লাগিয়েছে ইরান। হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি রুট হওয়ায় এই অঞ্চলে ইরানের ভৌগোলিক অবস্থান তাকে বাড়তি সুবিধা দিচ্ছে। পাশাপাশি, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে ‘শ্যাডো ফ্লিট’ বা গোপন ট্যাংকার নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে ইরান তেল রপ্তানি অব্যাহত রেখেছে। এই পদ্ধতির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক নজরদারি এড়িয়ে তেল পরিবহন সম্ভব হওয়ায় রপ্তানি আয় ধরে রাখা গেছে।

ইরানি তেলের প্রধান ক্রেতা হিসেবে চীনের শোধনাগারগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও চীনের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ইরান থেকে নিয়মিত তেল কিনছে, যা দেশটির জ্বালানি আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস হয়ে উঠেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, চীনের এই চাহিদা বজায় থাকলে ইরানের তেল আয় আরও বাড়তে পারে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞা ও নৌ-অবরোধের চাপ থাকলেও ইরান বিকল্প রুট ও গোপন পরিবহন ব্যবস্থার মাধ্যমে তেল বিক্রি সচল রেখেছে। এতে বোঝা যাচ্ছে, আন্তর্জাতিক চাপ সত্ত্বেও দেশটি তার জ্বালানি খাতকে সচল রাখতে সক্ষম হয়েছে। বরং বৈশ্বিক অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে তারা রাজস্ব আয় বাড়াতে পেরেছে।

সব মিলিয়ে, বিশ্ববাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি, রপ্তানিতে ছাড় কমে আসা, কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান এবং বিকল্প রপ্তানি ব্যবস্থার কারণে গত এক মাসে ইরানের তেল বিক্রি থেকে আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে আগামী মাসগুলোতেও দেশটির জ্বালানি খাত আরও শক্তিশালী হতে পারে। তবে আঞ্চলিক উত্তেজনা ও আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার ভবিষ্যৎ গতিপ্রকৃতি ইরানের এই প্রবৃদ্ধির ধারাকে কতটা স্থায়ী করবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।