পুবের কলম ওয়েবডেস্ক :
‘শনাক্ত কর, বাদ দাও ও নির্বাসন’ অভিযান শুরুর অংশ হিসেবে বিজেপি-শাসিত পশ্চিমবঙ্গ সরকার সোমবার মালদায় অবৈধ বিদেশি নাগরিকদের জন্য প্রথম আটক কেন্দ্র খুলেছে, যেখানে নয়জন সন্দেহভাজন বাংলাদেশি নাগরিককে রাখা হয়েছে।
এক কর্মকর্তার মতে, কেন্দ্রটিতে সার্বক্ষণিক সিসিটিভি নজরদারি এবং পুলিশ, বেসামরিক প্রতিরক্ষা কর্মী ও নাগরিক স্বেচ্ছাসেবকদের মোতায়েনসহ ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। পাশাপাশি, আটককৃতদের খাবার ও ভরণপোষণেরও ব্যবস্থা করা হয়েছে।
বাংলায় বর্তমানে বিদ্যমান একমাত্র আশ্রয়কেন্দ্রটি ইংলিশ বাজারের চন্দন পার্কে স্থাপন করা হয়েছে, যেখানে কড়া নিরাপত্তার মধ্যে রবিবার গাজোলের পান্ডুয়া এলাকা থেকে আনা তিনজন মহিলা ও ছয়জন নাবালকসহ নয়জন ব্যক্তি আশ্রয় নিয়েছেন বলে জেলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
মালদহর আরেকজন পুলিশ কর্মকর্তা বলেছেন, অবৈধভাবে প্রবেশ বা বৈধ কাগজপত্র না থাকার অভিযোগে আটক বিদেশি নাগরিকদের সাময়িকভাবে রাখার জন্য এই কেন্দ্রটি তৈরি করা হয়েছে। ওই কর্মকর্তা সংবাদ সংস্থা পিটিআইকে জানান, বর্তমানে সেখানে নয়জন বাংলাদেশি নাগরিককে রাখা হয়েছে। প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই ও আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হচ্ছে। আটককৃতদের নির্ধারিত আইনি বিধান অনুযায়ীই আচরণ করা হচ্ছে ।
রাজ্য স্বরাষ্ট্র ও পার্বত্য বিষয়ক দপ্তরের বিদেশি শাখা সমস্ত জেলা প্রশাসনকে 'আটককৃত বিদেশী' এবং 'নির্বাসন বা প্রত্যাবর্তনের অপেক্ষায় থাকা মুক্তিপ্রাপ্ত বিদেশী বন্দীদের' জন্য 'আশ্রয়কেন্দ্র' স্থাপনের নির্দেশ দেওয়ার ঠিক দুদিন পরেই এই ঘটনাটি ঘটল, যা বাংলায় বিজেপি অন্যতম রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী একটি বিষয়কে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে।
অবৈধ বাংলাদেশি অভিবাসীদের খুঁজে বের করে বিএসএফ-এর কাছে ফেরত পাঠানোর জন্য তাদের হাতে তুলে দিতে গত বছর জারি করা একটি কেন্দ্রীয় আদেশ রাজ্য সরকার কার্যকর করবে বলে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানানোর পর এই নির্দেশনাটি শাসনব্যবস্থায় প্রবেশ করে।
বিএসএফের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক বৈঠকে বাংলাদেশ সীমান্তের বিভিন্ন অংশে বেড়া দেওয়ার কাজের জন্য জমি হস্তান্তর করার সময় অধিকারী ইঙ্গিত দেন যে, রাজ্যের অনুপ্রবেশ বিরোধী কর্মসূচি বাস্তবায়ন পর্যায়ে প্রবেশ করেছে।
তিনি দাবি করেছিলেন যে, নাগরিকত্ব (সংশোধন) আইনের আওতার বাইরে থাকা ব্যক্তিদের অবৈধ প্রবেশকারী হিসেবে গণ্য করা হবে।
শুভেন্দু অধিকারী বলেছিলেন,"যারা সিএএ-এর আওতার বাইরে, তারা অনুপ্রবেশকারী এবং রাজ্য পুলিশ তাদের গ্রেপ্তার করে বিএসএফ-এর হাতে তুলে দেবে। "
নতুন রাজ্য আদেশে, বৈধ অনুমতি ছাড়া দেশে বসবাসকারী বাংলাদেশি নাগরিক ও রোহিঙ্গাদের বিষয়ে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জারি করা নির্দেশিকার উল্লেখ করা হয়েছে।
এই নিয়ম অনুযায়ী, কর্মকর্তারা তাদের পরিচয়, জাতীয়তা এবং নথিপত্র সংক্রান্ত যাচাই সম্পন্ন না করা পর্যন্ত এই ধরনের ব্যক্তিদের সর্বোচ্চ ৩০ দিনের জন্য নির্ধারিত আটক কেন্দ্রে রাখা যেতে পারে।
প্রস্তাবিত ব্যবস্থার অধীনে, নির্বাসনের আনুষ্ঠানিকতার জন্য বিএসএফ বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সঙ্গে সমন্বয় করবে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
সেই কাঠামোর অধীনে প্রথম দৃশ্যমান প্রশাসনিক কাঠামো হিসেবে এখন হোল্ডিং সেন্টারগুলো আবির্ভূত হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে।
এই ব্যবস্থাটি গত বছর সংসদে প্রণীত ‘অভিবাসন ও বিদেশি আইন, ২০২৫’-এর সঙ্গেও সংযুক্ত বলে মনে হয়েছে। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই আইনটি অভিবাসন, নিবন্ধন এবং বিদেশী নাগরিকদের নিয়ন্ত্রণকারী পূর্ববর্তী একাধিক আইন প্রতিস্থাপন করেছে এবং নজরদারি, আটক ও নির্বাসনের জন্য আরও প্রযুক্তি-চালিত একটি কাঠামো চালু করেছে।
এই আইনটি হেড কনস্টেবল ও তার উপরের পদমর্যাদার পুলিশ সদস্যদেরকে অভিবাসন সংক্রান্ত শর্তাবলী লঙ্ঘনের সন্দেহে ব্যক্তিদেরকে ওয়ারেন্ট ছাড়াই গ্রেপ্তার করার ক্ষমতাও দেওয়া হয়েছে ।
নাগরিকত্ব নির্ধারণের বিষয়ে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট বা সমতুল্য পদমর্যাদার কর্মকর্তারা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন।
এই প্রক্রিয়ার আওতায় বায়োমেট্রিক তথ্য সংগ্রহ, কেন্দ্রীয় ডেটাবেসে রেকর্ড আপলোড এবং অবশেষে শনাক্তকৃত অবৈধ অভিবাসীদের প্রত্যাবাসনের জন্য সীমান্ত নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করার বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
তবে, কেন্দ্রীয় সরকারের জারি করা পরবর্তী একটি অব্যাহতি আদেশ আফগানিস্তান, বাংলাদেশ এবং পাকিস্তানের কিছু সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে—হিন্দু, শিখ, জৈন, বৌদ্ধ, পার্সি এবং খ্রিস্টান—বিচারের হাত থেকে সুরক্ষা দিয়েছে, যদি তারা ধর্মীয় নিপীড়নের কারণ দেখিয়ে ৩১ ডিসেম্বর, ২০২৪-এর আগে ভারতে প্রবেশ করে থাকে।
উত্তর মালদার বিজেপি সাংসদ খগেন মুর্মু এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, যাঁরা ভারতীয় নাগরিক নন এবং সিএএ-র আওতাভুক্ত নন, তাঁদের নিজ দেশে ফিরে যাওয়া উচিত।
তিনি অভিযোগ করেন,"আমাদের দেশ ও রাজ্যের সুরক্ষা প্রয়োজন। বাংলা রোহিঙ্গা, সন্ত্রাসী ও 'জিহাদি' শক্তিদের করিডোরে পরিণত হয়েছে।"
এই ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় তৃণমূল কংগ্রেসের প্রবীণ নেতা কৃষ্ণেন্দু নারায়ণ চৌধুরী বলেছেন, সরকার নিশ্চয়ই সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতেই পদক্ষেপ নিয়েছে।
তিনি বলেন,"সরকার যদি অবৈধ বাংলাদেশি নাগরিকদের আটক করে, তাতে আমাদের কোন সমস্যা নেই। আমরা এই পদক্ষেপকে সমর্থন করি। কিন্তু কোনো বৈধ ভারতীয় নাগরিককে হয়রানি করা উচিত নয়," ।
বাংলার রাজনীতিতে অনুপ্রবেশ দীর্ঘদিন ধরেই শুধু একটি সীমান্ত সমস্যার চেয়েও বেশি কিছু হিসেবে ছিল । বছরের পর বছর ধরে এটি পূর্ববর্তী সরকারগুলোর বিরুদ্ধে বিজেপির অন্যতম তীক্ষ্ণ নির্বাচনী ইস্যু ছিল, বিশেষ করে সীমান্ত জেলা এবং উদ্বাস্তু-অধ্যুষিত নির্বাচনী এলাকাগুলোতে, যেখানে অভিবাসন, নাগরিকত্ব এবং পরিচয়ের প্রশ্নগুলো প্রায়শই রাজনৈতিক আলোচনার মোড় ঘুরিয়ে দিত।
যদিও বেশিরভাগ বিজেপি-শাসিত রাজ্য দ্রুত এই নির্দেশটি কার্যকর করেছিল, বিধানসভা নির্বাচনে শোচনীয় পরাজয়ের আগে প্রাক্তন তৃণমূল সরকার এই “অত্যাচারের” বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছিল এবং আদেশটি কার্যকর করতে অস্বীকার করেছিল। তাদের যুক্তি ছিল যে এর ফলেই পশ্চিমবঙ্গ থেকে আসা বেশ কিছু পরিযায়ী শ্রমিক পুলিশের হয়রানির শিকার হয়েছিলেন।
যে রাজ্যে সীমান্ত রাজনীতি প্রায়শই স্লোগান ও বক্তৃতার মাধ্যমে পরিচালিত হতো, সেখানে এখন সুরক্ষিত আটক কেন্দ্রগুলো এই ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, যুদ্ধক্ষেত্র ক্রমশ সরকারি বিজ্ঞপ্তি এবং প্রশাসনিক কাঠামোর দিকে সরে যেতে পারে।