২৬ বছর বয়সী হাসান আলি জীবনের প্রায় সবকিছুই দেখেছেন। প্রায় দুই বছর আগে এক উচ্ছেদ অভিযানে তিনি তার বাড়ি ও দোকানপাট হারান। উচ্ছেদ অভিযান চালানো সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথিত সংঘর্ষে লিপ্ত বিক্ষোভকারীদের ওপর পুলিশের গুলিতে তার ১৯ বছর বয়সী ছোট ভাই হায়দার আলি  নিহত হন। দুঃস্বপ্নের মতো চারটি দিনে তার দশজনের পরিবারটির জীবন এমনভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে, যা তারা কখনো কল্পনাও করতে পারেনি।
হাসানের দুর্ভোগ বেড়েই চলেছে — তিনি ও তাঁর পরিবার, যাঁরা ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে ভোট দিয়েছিলেন, তাঁদের নাম এখন অসমে ৯ এপ্রিলের এক দফার বিধানসভা নির্বাচনের ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।হাসান একা নন।
২০২৪ সালের ৯ই সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হওয়া উচ্ছেদ অভিযানের ফলে গুয়াহাটির নিকটবর্তী বাংলাভাষী মুসলিম অধ্যুষিত গ্রাম কচুতালি ও তার আশেপাশের প্রায় ২,০০০ ভোটারের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়ে যায়। ওই বছর ১২ই সেপ্টেম্বর বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালানো হয়, যাতে দুজন নিহত এবং ২২ জন সরকারি কর্মচারী ও ১৩ জন বেসামরিক নাগরিক আহত হন।ক্ষতিগ্রস্ত মানুষেরা এখন আশঙ্কা করছেন যে, বৈধ ভোটার কার্ড ছাড়া রাজ্যের ভেতরে ও বাইরে কর্মরতদের জীবিকা হুমকির মুখে পড়তে পারে। এই কার্ডটি পরিচয়, বয়স ও ঠিকানার প্রমাণ হিসেবেও বেশ কার্যকর। আলি বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামটির অনেকেই দিল্লি, কেরালা ও কর্ণাটকে কাজ করেন।উচ্ছেদ-কবলিত এলাকাটিতে আসন্ন নির্বাচনের গুঞ্জন শোনা না গেলেও, উচ্ছেদ হওয়া ভোটারদের কারণেই কাচুতালি আবার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে।
যদিও তাদের পাকা বাড়ি ও দোকানপাট ভেঙে দেওয়া হয়েছে, হাসানের পরিবার এখনও তিন বিঘা জমির উপর বিদ্যুৎ ও পানিবিহীন ঘিঞ্জি ঝুপড়িতে উচ্ছেদ হওয়া আরও ৩৪টি পরিবারের সঙ্গে বসবাস করছে।


হাসান সাংবাদিকদের  বলেন , “আমি ও আমার ভাইবোনেরা এখানেই জন্মেছি। ভাঙনে পৈতৃক বাড়িঘর হারানোর পর আমার বাবা ৪০ বছরেরও বেশি আগে বরপেটা থেকে এখানে এসেছিলেন। আমরা ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে ভোট দিয়েছিলাম, কিন্তু এখন ভোটার তালিকা থেকে আমাদের নাম মুছে দেওয়া হয়েছে।”
অস্থায়ী কুঁড়েঘরগুলোর ঠিক উল্টোদিকে, দখলমুক্ত একটি জমির উপর গড়ে উঠছে কামরূপ (মেট্রো) জেলায় আসাম পুলিশের দশম ব্যাটালিয়নের সদর দপ্তর, যার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ২১ ফেব্রুয়ারি। এই পরিকাঠামো প্রকল্পের জন্য ‘ঘুষপেটিয়াদের ( অনুপ্রবেশকারী)’ কাছ থেকে ১৭৪ বিঘা জমি ‘মুক্ত’ করার জন্য শাহ মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মার প্রশংসা করেছিলেন।
শর্মার মতে, আদিবাসী বলয় ও ব্লক বিভাগের অন্তর্গত এবং সংরক্ষিত এলাকা হিসেবে চিহ্নিত কাচুটালিতে ৭০৮ বিঘা জমি দখলমুক্ত করা হয়েছে। এই বিধানটির অন্যতম উদ্দেশ্য হলো অ-আদিবাসীদের কাছে জমি হস্তান্তর নিষিদ্ধ করার মাধ্যমে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভূমি অধিকার রক্ষা করা।
তবে, হাসান বলেন, প্রশাসন এর আগে তাদের বিদ্যুৎ ও শিক্ষার সুযোগ-সুবিধা দিয়েছিল। “অভিযান চলাকালে একটি সরকারি নিম্ন প্রাথমিক বিদ্যালয় ভেঙে দেওয়া হয়। উচ্ছেদের প্রথম দিনেই এলাকার বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছিল,” তিনি বলেন।
তালেপ আলি  (৩৫), এম. খালেক আলি (৭৫) এবং আকবর আলি (৬০) হাসানের সঙ্গে  যোগ দিয়ে বর্ণনা করেন, কীভাবে ১০ ফেব্রুয়ারি বিশেষ সংশোধনের পর চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশিত হলে, তালিকাভুক্ত হওয়ার জন্য তাঁরা সম্ভাব্য সব দরজায় কড়া নেড়েছিলেন, কিন্তু কোনো লাভ হয়নি।
প্রায় ১০০ মিটার দূরে আরও ৭৪টি পরিবার একই রকম শোচনীয় অবস্থায় বাস করে।
উচ্ছেদ হওয়া আরেকজন, ২৮ বছর বয়সী ইমাম সাকিব আলি বলেন, “আমরা যদি ভোট দিতে না পারি, তাহলে আমাদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার।
ফর্ম ৬-এর মাধ্যমে পুনরায় অন্তর্ভুক্তির জন্য আমাদের অনলাইন আবেদনগুলো প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। আমরা যখন কর্মকর্তাদের কাছে যাই, তারা কোন সাহায্য করেন না। আমরাও ভারতীয়। আমাদের সব কাগজপত্র আছে, কিন্তু তারা ১৯২৩ সাল (যে বছর এলাকাটিকে আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চল হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল) থেকে শুরু করে বিভিন্ন নথিপত্র চাইছে।”
উচ্ছেদ হওয়াদের অধিকাংশই দরং, মরিগাঁও ও বরপেটা জেলার বাসিন্দা।
সাকিব বলেন, “তারা (কর্মকর্তারা) আমাদের আগের জায়গায় ফিরে যেতে বলছেন, কিন্তু সেখানে আমাদের কিছুই নেই। আমরা পুরোপুরি দিশেহারা।”
বুথ-স্তরের কর্মকর্তা (বিএলও) জে. কাকাটি বলেন, “উচ্ছেদের পর প্রায় ১,৪০০ জনকে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। তাদেরকে নিজ নিজ স্থানে ফিরে গিয়ে তালিকাভুক্ত হতে অথবা ১৯২৩ সাল থেকে নথিপত্র জমা দিতে বলা হয়েছে। তারা এবার ভোট দিতে পারবেন না।”
বিএলও হলেন একজন স্থানীয় সরকার বা আধা-সরকারি কর্মকর্তা, যিনি স্থানীয় ভোটারদের সঙ্গে পরিচিত এবং তাঁর উপর অর্পিত এলাকায় সরেজমিনে তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে ভোটার তালিকা সংশোধনের সময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
যাদের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে, তারা আপিল করার জন্য এক মাস সময় পেয়েছিলেন, কিন্তু এবার কাচুতালির অধিকাংশ ভোটারই সফল হতে পারেননি বলে জানিয়েছেন বিএলও। তিনি আরও বলেন, তাদের স্থায়ীভাবে স্থানান্তরিত হিসেবে দেখানো হয়েছে।
পরিচয় গোপন রাখার শর্তে বিএলও জানান, যে ভোটকেন্দ্রগুলো থেকে তারা ভোট দিতেন, সেখান থেকেও তাদের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে।
সারা অসম  জুড়ে চূড়ান্ত ভোটার তালিকা থেকে ২,৪৩,৪৮৫ জনের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে, কারণ তাঁরা হয় মারা গেছেন অথবা স্থায়ীভাবে অন্যত্র চলে গেছেন।
কাচুটালি কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। ধুবড়ি ও গোলাঘাট জেলার অনেক এলাকা থেকেও প্রায় ৫,০০০ উচ্ছেদ হওয়া ব্যক্তির নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।
রাজ্যে শর্মা নেতৃত্বাধীন সরকারের আমলে উচ্ছেদের ফলে প্রায় ৫০,০০০ মানুষ গৃহহীন ও ছয়জন নিহত হয়েছেন, যাদের অধিকাংশই বাংলাভাষী মুসলিম বা মিঞা , যাদেরকে  প্রায়শই বর্তমান বাংলাদেশ থেকে আসা নথিপত্রহীন অভিবাসী হিসেবে অপবাদ দেওয়া হয়।
বিজেপি নেতৃত্বাধীন সরকার অনুপ্রবেশকারীদের উচ্ছেদ করাকে একটি প্রধান নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি হিসেবে গ্রহণ করেছে। শর্মার মতে, তাঁর সরকার প্রধানত মিয়া মুসলিমদের কাছ থেকে দেড় লক্ষ বিঘা জমি দখলমুক্ত করেছে এবং বিজেপি তৃতীয়বারের মতো ক্ষমতায় এলে আরও পাঁচ লক্ষ বিঘা জমি পুনরুদ্ধার করার পরিকল্পনা রয়েছে।
বিজেপির শীর্ষ নেতারা নির্বাচনী জনসভাগুলিতে আদিবাসীদের পরিচয় রক্ষার সরকারি প্রচেষ্টার সঙ্গে উচ্ছেদের বিষয়টিকে যুক্ত করে তুলে ধরলেও, বিরোধী নেতারা ক্ষতিগ্রস্তদের প্রথমে পুনর্বাসন না করেই এই অভিযান চালানোর জন্য শাসক দলের তীব্র সমালোচনা করেছেন।
রাইজোর দলের প্রধান ও বর্তমান বিধায়ক অখিল গগৈ প্রচার অভিযান চলাকালে এই সংবাদপত্রকে বলেন যে, বিজেপি নেতৃত্বাধীন সরকার “ভোটারদের মেরুকরণের জন্য” উচ্ছেদকে ব্যবহার করছে।
“আমরা উচ্ছেদের বিরুদ্ধে নই। নির্বাচনে জয়ী হলে যেখানে প্রয়োজন হবে, আমরাও উচ্ছেদ অভিযান চালাব, কিন্তু ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের পরেই,” গগৈ বলেন।
গুয়াহাটি হাইকোর্টের আইনজীবী জুনাইদ খালিদ বলেছেন, ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য একমাত্র প্রতিকার হল হাইকোর্ট বা সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করা।
আপাতত, ক্ষতিগ্রস্তদের অপেক্ষা করা  ছাড়া  উপায়  নেই ।

সূত্র-সৌজন্য  :দ্য টেলিগ্রাফ