উজ্জ্বল বন্দ্যোপাধ্যায়ঃ সুন্দরবন অঞ্চলে আমন ধান কাটার পর অধিকাংশ জমি সেচের জল না থাকার কারণে পতিত অবস্থায় পড়ে থাকে। আবার ডিসেম্বর মাসে ধান কাটার সময় জমিতে অতিরিক্ত আর্দ্রতা (কাদা) থাকার কারণে কৃষকদের পক্ষে শীতকালীন রবি ফসল চাষ করা কার্যত অসম্ভব। ফলে এই বিস্তীর্ণ জমি কৃষি উৎপাদনের মধ্যে আনা সম্ভব হয় না। আর এই সমস্যার সমাধানে নিমপীঠ রামকৃষ্ণ আশ্রম কৃষি বিজ্ঞান কেন্দ্র নীমপীঠে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন বিকল্প ফসলের সম্ভাবনা নিয়ে কৃষকদের মাঠে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে যাচ্ছে।
আরও পড়ুন:
বিগত কয়েক দশকের চেষ্টায় কৃষি বিজ্ঞান কেন্দ্রের উদ্যোগে সুন্দরবনের লবণাক্ত জমিতে তুলো চাষের প্রযুক্তি সফলভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বর্তমানে এই সুন্দরবনের প্রায় ৮০০ থেকে ১,০০০ হেক্টর জমিতে কৃষকেরা ধান-পরবর্তী ফসল হিসেবে তুলো চাষ করছেন।
কিন্তু তুলো সরাসরি খাদ্য বা গৃহস্থালির কাজেব্যবহার করা যায় না, ফলে উৎপাদিত ফসল বিক্রির জন্য কৃষকদের কে তৃতীয় পক্ষের উপর নির্ভর করতে হয়। তাই ধান পরবর্তী সময়ে কৃষকদের জন্য আরও উপযোগী বিকল্প ফসলের সন্ধানে নিমপীঠ রামকৃষ্ণ আশ্রম কৃষি বিজ্ঞান কেন্দ্র সূর্যমুখী, বিভিন্ন প্রজাতির মিলেট এবং সর্বশেষ বিকল্প হিসেবে স্বল্প মেয়াদি অড়হর ডালের চাষের সম্ভাবনা নিয়ে কাজ শুরু করেছে। বর্তমানে ডালশস্য ও তৈলবীজ উৎপাদনে দেশের স্বনির্ভরতার লক্ষ্যে সারা দেশ জুড়ে মিশন মোড এ কাজ শুরু হয়েছে। কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, সুন্দরবনের পরিবেশ ও মাটির বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে স্বল্পমেয়াদি অড়হর একটি অত্যন্ত সম্ভাবনা ময় ফসল। নিমপীঠ রামকৃষ্ণ আশ্রম কৃষি বিজ্ঞান কেন্দ্রের বরিষ্ঠ বিজ্ঞানী ও প্রধান ড: চন্দন কুমার মণ্ডল বলেন, সুন্দরবনের কৃষিতে ধান-পরবর্তী পতিত জমির পরিমাণ প্রায় ১ লক্ষ হেক্টর। এই জমিগুলিকে উৎপাদনের আওতায় আনতে পারলে কৃষকদের আয় যেমন বাড়বে, তেমনি দেশের ডাল উৎপাদন বৃদ্ধিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা সম্ভব হবে।আরও পড়ুন:
এই স্বল্পমেয়াদি অড়হর জাতগুলি ধান কাটার পর জমিতে অবশিষ্ট আর্দ্রতা ব্যবহার করে সহজেই বৃদ্ধি পায় এবং এছাড়া এই ফসল তুলনামূলকভাবে খরা সহনশীল হওয়ায় অতিরিক্ত সেচের প্রয়োজন হয় না তাই সুন্দরবনের প্রতিকূল পরিবেশে ও স্থিতিশীল ফলন দিতে সক্ষম। বর্তমানে কৃষি বিজ্ঞান কেন্দ্রের উদ্যোগে বিভিন্ন গ্রামের মাঠ পর্যায়ে প্রদর্শনী ও মূল্যায়নের কাজ চলছে এবং প্রাথমিক ফলাফল অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক।তিনি আরও বলেন, সুন্দরবনের ধান পরবর্তী পতিত জমিতে অড়হর চাষ সম্প্রসারণ করা গেলে বছরে প্রায় এক লক্ষ টন ডাল উৎপাদনের সম্ভাবনা আছে।
আরও পড়ুন:
ভারতের ক্রমবর্ধমান ডালের চাহিদা পূরণে এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে কৃষকেরা অতিরিক্ত আয়ের সুযোগ হবে, সুন্দরবনের কৃষি ব্যবস্থায় বৈচিত্র্য আসবে। এছাড়া এই ফসলের চাষ সুন্দরবনের পতিত জমিগুলিকে দুই ভাবে উর্বর করে তুলবে, প্রথমত এর মূলের অর্বুদ জমিতে নাইট্রোজেনের জোগান বাড়াবে, দ্বিতীয়ত চাষ শেষ হয়ে গেলে বর্ষায় অড়হর গাছের ডাল পাতা গুলো মাটিতে মিশে মাটির জৈব কার্বন বৃদ্ধিতে সহায়তা করবে।
ভবিষ্যতে বৃহত্তর পরিসরে এই প্রযুক্তি সম্প্রসারণ করা গেলে সুন্দরবনের কৃষিতে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে পারে বলে তিনি আশাবাদী। এই কেন্দ্রের মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিশেষজ্ঞ কুশল দাশগুপ্ত বলেন,সুন্দরবনের কৃষির অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো মাটির স্বাস্থ্য অবনতি, জৈব কার্বনের স্বল্পতা ও লবণাক্ততার প্রভাব। অড়হর একটি ডালশস্য হওয়ায় এটি রাইজোবিয়াম ব্যাকটেরিয়ার মাধ্যমে বায়ু মণ্ডলীয় নাইট্রোজেন মাটিতে স্থির করে এবং মাটির উর্বরতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।ফসল সংগ্রহের পর গাছের পাতা, সরু ডাল ও অন্যান্য অবশিষ্টাংশ জমিতে মিশে জৈব পদার্থের পরিমাণ বৃদ্ধি করে, যা মাটির গঠন, জলধারণ ক্ষমতা, পুষ্টি ধারণ ক্ষমতা এবং উপকারী অণুজীবের কার্যকলাপ উন্নত করতে সহায়তা করে। এছাড়া শিকড়ের গুটিকায় সঞ্চিত নাইট্রোজেন পরবর্তী ফসলের জন্যও উপকারী হয়। তাই এই চাষ শুধুমাত্র সুন্দরবনের কৃষকের অতিরিক্ত আয়ের উৎস নয়, বরং মাটির দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধার, উর্বরতা বৃদ্ধি এবং স্থিতিশীল কৃষি ব্যবস্থার বিকাশে একটি কার্যকর ও পরিবেশবান্ধব হাতিয়ার হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।আর এই উদ্যোগে খুশি কৃষকরা।