মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনার মধ্যে যুদ্ধ বন্ধ ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ফেরাতে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে নতুন কূটনৈতিক প্রস্তাব দিয়েছে ইরান। পাকিস্তানি মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে পাঠানো এই প্রস্তাবে যুদ্ধবিরতি, হরমুজ প্রণালী পুনরায় চালু এবং পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে ধাপে ধাপে আলোচনার রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই উদ্যোগকে চলমান সংঘাত প্রশমনের একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র অলিভিয়া ওয়ালেস, মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস-এর বরাতে জানিয়েছেন, ইরান পাকিস্তানের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রকে একটি নতুন শান্তি প্রস্তাব দিয়েছে। এই প্রস্তাবের মূল লক্ষ্য হলো যুদ্ধের ইতি টানা এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়া। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ বন্ধ থাকায় বৈশ্বিক জ্বালানি ও বাণিজ্য ব্যবস্থায় বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানের নতুন প্রস্তাবটি তিনটি ধাপে সাজানো হয়েছে।

প্রথম ধাপে ইরান বলেছে, যুদ্ধ পুরোপুরি বন্ধ করতে হবে এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে নিশ্চয়তা দিতে হবে যে, ভবিষ্যতে ইরান ও লেবাননে আর কোনো আগ্রাসী হামলা চালানো হবে না। অর্থাৎ, যেকোনো আলোচনার আগে তেহরান নিরাপত্তার নিশ্চয়তা চায়।

দ্বিতীয় ধাপে, যদি যুদ্ধবিরতির শর্ত মানা হয়, তাহলে হরমুজ প্রণালীর প্রশাসনিক কাঠামো ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনা হবে। এই প্রণালী আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে জ্বালানি তেল পরিবহনের বড় অংশ এই জলপথ দিয়ে হয়ে থাকে। তাই এই পথ পুনরায় সচল করা আন্তর্জাতিক অর্থনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।

তৃতীয় ধাপে বলা হয়েছে, প্রথম দুই ধাপে সমঝোতা হলে ইরানের পরমাণু প্রকল্প নিয়ে আলোচনা শুরু হবে।

অর্থাৎ, ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে সরাসরি আলোচনায় যাওয়ার আগে যুদ্ধ পরিস্থিতির অবসান এবং কৌশলগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চাইছে।

এই প্রস্তাব নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস হোয়াইট হাউসের সঙ্গে যোগাযোগ করলে মুখপাত্র অলিভিয়া ওয়ালেস বলেন,
“এসব খুবই সংবেদনশীল কূটনৈতিক আলোচনার বিষয় এবং যুক্তরাষ্ট্র সংবাদমাধ্যমে এ বিষয়ে আলোচনা করবে না।”

তিনি আরও বলেন,
“আমাদের প্রেসিডেন্ট যেমন বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের হাতে এখনও অনেক বিকল্প আছে এবং আমরা কেবল এমন একটি চুক্তিতেই রাজি হবো, যা মার্কিন জনগণের স্বার্থ রক্ষা করবে এবং ইরানকে কখনও পরমাণু অস্ত্রের অধিকারী হতে দেবে না।”

উল্লেখ্য, ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে গত ১১ এপ্রিল পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিদের মধ্যে বৈঠক হয়েছিল। প্রায় ২১ ঘণ্টা আলোচনা চললেও কোনো সমঝোতা ছাড়াই বৈঠক শেষ হয়। ফলে প্রথম দফার সংলাপ ব্যর্থ হয়।

এরপর পাকিস্তানসহ কয়েকটি দেশ দুই পক্ষকে দ্বিতীয় দফার আলোচনায় বসার আহ্বান জানায়।

তবে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সৈয়দ আব্বাস আরাগচি সরাসরি দ্বিতীয়বার আলোচনায় বসার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। তাঁর এই অবস্থান ইঙ্গিত দেয় যে, ইরান সরাসরি আলোচনার বদলে আঞ্চলিক মধ্যস্থতার পথেই এগোতে চাইছে।
এই অবস্থার প্রেক্ষিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও বলেন, তিনি আর প্রতিনিধি দলকে দীর্ঘ সফরে পাঠাতে আগ্রহী নন। তাঁর ভাষায়, ভবিষ্যতের আলোচনা “ফোনকলের মাধ্যমেই” হবে। ট্রাম্পের এই মন্তব্যের পরই ইরান পাকিস্তানের মাধ্যমে নতুন প্রস্তাব পাঠায়।

রবিবার ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি স্বল্প সময়ের জন্য পাকিস্তান সফর করেন। তার আগে তিনি ওমান সফর করেন এবং পাকিস্তান থেকে রাশিয়ায় যান। ধারাবাহিক এই সফরগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, তেহরান এখন কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়িয়ে আন্তর্জাতিক সমর্থন জোগাড়ের চেষ্টা করছে।