হাজার হাজার ফুট ওপরে আকাশে উড়ছিল একটি বোয়িং ৭৩৭ বিমান। গন্তব্য ছিল যুক্তরাষ্ট্রের ওরেগন অঙ্গরাজ্যের পোর্টল্যান্ড। যাত্রীরা তখন স্বাভাবিকভাবেই নিজ নিজ আসনে বসে ছিলেন। সবকিছু ঠিকঠাক চলছিল। কিন্তু অবতরণের মাত্র আধা ঘণ্টা আগে হঠাৎই বিমানের ভেতর শুরু হয় এক অনাকাঙ্ক্ষিত অথচ বিস্ময়কর ঘটনা— মাঝ আকাশেই জন্ম নেয় এক ফুটফুটে কন্যাশিশু।
শুক্রবার (২৪ এপ্রিল) ডেলটা এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটে ঘটে যাওয়া এই বিরল ঘটনা এখন সবার মুখে মুখে। মানবিকতা, উপস্থিত বুদ্ধি এবং সাহসিকতার এক অসাধারণ উদাহরণ হয়ে উঠেছে ঘটনাটি।

জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের টেনেসির বাসিন্দা অ্যাশলি ব্লেয়ার সন্তান জন্ম দেওয়ার জন্য নিজের মায়ের কাছে যেতে চেয়েছিলেন।

সেই উদ্দেশ্যেই তিনি আটলান্টা থেকে পোর্টল্যান্ডগামী ডেলটা এয়ারলাইনসের ফ্লাইটে ওঠেন। কিন্তু যাত্রাপথেই আচমকা প্রসববেদনা শুরু হয় তার। বিমান অবতরণের তখনও প্রায় ৩০ মিনিট বাকি।

পরিস্থিতি দ্রুত জটিল হয়ে উঠলে ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্টরা বিমানে থাকা জরুরি প্রসব-সহায়ক কিট খুঁজতে শুরু করেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে প্রয়োজনীয় ‘অবস্টেট্রিকাল কিট’ পাওয়া যায়নি। এমন সংকটময় মুহূর্তে এগিয়ে আসেন বিমানে থাকা দুই সহযাত্রী-টিনা ফ্রিটজ ও ক্যারিন পাওয়েল। তারা দুজনেই পেশায় প্যারামেডিক এবং ডমিনিকান রিপাবলিক থেকে ছুটি কাটিয়ে ফিরছিলেন।

প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম না থাকলেও তারা বিচলিত হননি।

উপস্থিত যা ছিল, তাই দিয়েই শুরু করেন প্রসব সহায়তার কাজ। যাত্রীদের কাছ থেকে কম্বল সংগ্রহ করা হয়। আর নবজাতকের নাড়ি বাঁধার জন্য ব্যবহার করা হয় এক ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্টের জুতার ফিতা। অত্যন্ত দক্ষতা ও সাহসিকতার সঙ্গে তারা সফলভাবে প্রসব সম্পন্ন করান।

বিমানের ভেতরেই জন্ম নেয় একটি সুস্থ কন্যাশিশু। শিশুটির ওজন প্রায় সাড়ে পাঁচ পাউন্ড। তার নাম রাখা হয়েছে ব্রিয়েল রেনি ব্লেয়ার। বিমানটি পোর্টল্যান্ডে অবতরণের সঙ্গে সঙ্গেই জরুরি চিকিৎসাকর্মীরা মা ও নবজাতককে হাসপাতালে নিয়ে যান।

বর্তমানে মা ও শিশু দুজনেই সুস্থ আছেন বলে জানা গেছে।

এই অসাধারণ মানবিক উদ্যোগের জন্য ডেলটা এয়ারলাইনস স্বেচ্ছাসেবকদের ধন্যবাদ জানিয়েছে। যদিও এয়ারলাইনসের বিবৃতিতে একজন ডাক্তার ও দুজন নার্সের উপস্থিতির কথা বলা হয়, তবে প্যারামেডিক টিনা ফ্রিটজ জানিয়েছেন, সেখানে কোনো ডাক্তার ছিলেন না। তিনি এবং তার সহযাত্রী ক্যারিন পাওয়েলই পুরো পরিস্থিতি সামাল দিয়েছেন।

এই অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে টিনা ফ্রিটজ বলেন,
“আমার মনে হচ্ছে, আমরা এখন চিরদিনের জন্য বন্ধু হয়ে গেছি।”

মাঝ আকাশে এমন নাটকীয় ও মানবিক এক জন্মের ঘটনা নিঃসন্দেহে বিরল। যাত্রীদের সহমর্মিতা, দুই প্যারামেডিকের সাহসিকতা এবং এক মায়ের অসীম ধৈর্য মিলিয়ে এটি হয়ে উঠেছে অনুপ্রেরণার এক অনন্য গল্প। আকাশপথে জন্ম নেওয়া ছোট্ট ব্রিয়েলের আগমন যেন মনে করিয়ে দেয়— জীবন তার নিজের পথ খুঁজে নিতে জানে, আর মানবতা সব বাধা জয় করতে পারে।